দয়াল নবী আপনার দরবারে আমি গোলাম হাজির হইয়াছি।
আল্লাহ তাআলা তাঁর প্রিয় বন্ধুদের বিশেষ মর্যাদায় ভূষিত করেন। যুগে যুগে ওলী-আউলিয়াগণ মানবজাতির জন্য হেদায়েতের প্রদীপ হয়ে আবির্ভূত হয়েছেন। তাদের প্রতি ভালোবাসা ও সম্মান প্রদর্শন করা ঈমানের সৌন্দর্য, আর তাদের প্রতি বেয়াদবি ও অবজ্ঞা মানুষের জন্য ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনে।
ইসলামের ইতিহাসে এমন বহু ঘটনা রয়েছে, যা আমাদের শিক্ষা দেয় যে জ্ঞান, খ্যাতি কিংবা প্রতিভা থাকলেই মানুষ নিরাপদ হয়ে যায় না। বরং অহংকার ও আত্মঅহংকার মানুষকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে দিতে পারে। গাউসে পাকের সাথে বেয়াদবি করে ইবনে সাকার করুণ পরিণতি তেমনই এক শিক্ষণীয় ঘটনা।
মূল ঘটনা
ইবনে সাকা ছিল গাউসে পাক রহমতুল্লাহি আলাইহির যুগের একজন প্রসিদ্ধ আলেম। সে কোরআনে কারিমের হাফেজ ছিল এবং শরীয়তের জ্ঞানে বহু আলেমের চেয়েও অগ্রগণ্য হিসেবে পরিচিত ছিল। তর্কশাস্ত্রে তার এমন দক্ষতা ছিল যে, যার সাথেই বিতর্কে অবতীর্ণ হতো, তাকেই পরাজিত করে ছাড়তো।
কিন্তু জ্ঞান ও প্রতিভার সাথে যখন অহংকার যুক্ত হয়, তখন তা মানুষের জন্য কল্যাণের পরিবর্তে ধ্বংসের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। ইবনে সাকাও নিজের জ্ঞান নিয়ে এতটাই গর্বিত হয়ে পড়েছিল যে, একসময় সে গাউসুল আজম রহমতুল্লাহি আলাইহির প্রতি বেয়াদবি ও অসম্মান প্রদর্শন করে।
গাউসে পাকের সাথে বেয়াদবি করার পর তার জীবনে অশুভ পরিবর্তন শুরু হয়। ধীরে ধীরে সে ঈমান থেকে বিচ্যুত হয়ে খ্রিস্টান ধর্ম গ্রহণ করে। খ্রিস্টান বাদশাহ তার জ্ঞান ও খ্যাতিতে মুগ্ধ হয়ে নিজের কন্যার সাথে তার বিবাহও দেন।
কিছুদিন পর সে কঠিন রোগে আক্রান্ত হয়ে পড়ে। ধীরে ধীরে রাজপরিবার ও সমাজ তাকে পরিত্যাগ করে। যে ব্যক্তি একসময় সম্মান ও মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত ছিল, সে-ই একদিন নিঃস্ব হয়ে বাজারের অলিগলিতে ভিক্ষা করে বেড়াতে বাধ্য হয়।
আর গাউসে পাক রহমতুল্লাহি আলাইহির সাথে বেয়াদবি করার কারণেই তার এই চরম দুর্দশায় কেউ তার দিকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয়নি।
একদিন একজন লোক তাকে জিজ্ঞেস করল, “তুমি তো কোরআনের হাফেজ ছিলে। এখন কোরআনের কোনো আয়াত কি তোমার স্মরণে আছে?”
সে দীর্ঘশ্বাস ফেলে উত্তর দিল,
“সব ভুলে গেছি। শুধু একটি আয়াত মনে আছে।”
তারপর সে এই আয়াতটি পাঠ করল-
“কাফিররা একসময় বারবার আকাঙ্ক্ষা করবে- হায়! যদি তারা মুসলমান হতো।”
(সূরা -হিজর: আয়াত-২)
প্রখ্যাত আলেম ইমাম ইবনে আবু আসরূন বলেন,
“আমি একদিন তাকে দেখতে গেলাম। গিয়ে দেখলাম, তার শরীরের অবস্থা অত্যন্ত করুণ। সে মৃত্যুশয্যায় কাতরাচ্ছে। আমি তাকে কিবলার দিকে ফিরিয়ে দিলাম। কিন্তু সে পূর্ব দিকে ফিরে গেল। পুনরায় কিবলার দিকে ফেরালাম, আবারও সে পূর্ব দিকে ফিরে গেল।
আমি যতবার তাকে কিবলামুখী করলাম, ততবারই সে পূর্ব দিকে ফিরে গেল। অবশেষে সে সেই অবস্থাতেই মৃত্যুবরণ করল।”
বর্ণনায় আরও এসেছে, মৃত্যুর আগ পর্যন্ত সে গাউসুল আজম রহমতুল্লাহি আলাইহির ভবিষ্যদ্বাণী স্মরণ করত এবং বুঝতে পারত যে, গাউসে পাকের সাথে বেয়াদবি করার কারণেই তার এই করুণ ও ভয়াবহ পরিণতি হয়েছে।
পরিশেষে
ইবনে সাকার এই ঘটনা আমাদের জন্য গভীর শিক্ষার উৎস। একজন মানুষ যত বড় আলেম, হাফেজ বা জ্ঞানীই হোক না কেন, যদি তার অন্তরে অহংকার জন্ম নেয় এবং সে আল্লাহর প্রিয় বন্ধুদের অসম্মান করে, তাহলে সেই জ্ঞান তার কোনো উপকারে আসে না।
গাউসে পাকের সাথে বেয়াদবি করার পর ইবনে সাকার জীবন যে করুণ পরিণতির দিকে গিয়েছিল, তা আমাদের সতর্ক করে দেয় যে আদব ও বিনয় ঈমানের অমূল্য সম্পদ। আল্লাহর ওলীদের প্রতি শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও সম্মান মানুষের জন্য রহমতের দরজা খুলে দেয়, আর বেয়াদবি ও অহংকার তাকে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যায়।
তাই আমাদের উচিত আল্লাহর ওলীদের প্রতি সর্বদা সম্মান ও আদব বজায় রাখা। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে অহংকার থেকে হেফাজত করুন এবং আদব, বিনয় ও ঈমানের উপর অটল থাকার তাওফিক দান করুন।
আমিন।





