দয়াল নবী আপনার দরবারে আমি গোলাম হাজির হইয়াছি।
ধর্মীয় ইতিহাসে বারংবার দেখা গেছে, বিভিন্ন সময় ওলী, আউলিয়া, গাউস, কুতুব, ফকির, দরবেশ ও যারা সত্যের পথে নিরলসভাবে চলেছেন, তাঁদের বিরুদ্ধে যুগ যুগ ধরে নানা অভিযোগ তুলে কাফের ফতোয়া জারি করা হয়েছে। আমরা আজকে আলোচনা করবো “ধর্মীয় গোঁড়ামির কারণে যুগে যুগে ওলী-আউলিয়াদের বিরুদ্ধে ফতোয়া”।
ইসলামের ইতিহাসে নজর দিলে দেখা যায়, পীর-মুরিদ সম্পর্ক, ওরস শরীফ উদযাপন, আধ্যাত্মিক গান-বাজনা এবং অন্যান্য আধ্যাত্মিক প্রথা নিয়ে সেই যুগের কিছু তথাকথিত আলেমগণ কট্টর কাফেরি ফতোয়া জারি করেছিলেন। তারা ওলি, আউলিয়া, গাউস, কুতুব, ফকির ও দরবেশদেরও কাফের আখ্যা দিয়েছেন। আসুন, আমরা খুঁজে দেখি-এই তথাকথিত আলেমরা ঠিক কাদেরকে কাফের বলে চিহ্নিত করেছিলেন।
যুগে যুগে কাফের ফতোয়া, কিন্তু আলোর পথ অবিচল
হজরত আব্দুপল কাদের জিলানী রহমাতুল্লাহি আলাইহি
তিনি ছিলেন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর বংশধর। পিতার দিক থেকে হযরত হাসান আলাইহিস সালাম এবং মাতার দিক থেকে হযরত হুসাইন আলাইহিস সালামের বংশধর। ক্বাদেরিয়া তরিকার প্রতিষ্ঠাতা এবং সমগ্র বিশ্বের মুসলমানদের মধ্যে “গাউসুল আজম” নামে পরিচিত। অসংখ্য অলৌকিক ঘটনা (করামত) তেনার আধ্যাত্মিক শক্তি প্রমাণ করে। তবুও, সেই যুগের তথাকথিত আলেমরা তেনাকে কাফের আখ্যা দিয়েছিলেন।
খাজা গরীবে নেওয়াজ মঈনুদ্দিন চিশতি রহমাতুল্লাহি আলাইহি
তিনি ছিলেন চিশতিয়া তরিকার প্রধান ও উপমহাদেশে সুফিবাদের অগ্রদূত। ভারতে এসে তিনি প্রেম, ভালোবাসা ও মানবতার দীপ্ত বার্তা প্রচার করেন। তেনার অলৌকিক ঘটনা এবং আধ্যাত্মিক শক্তির প্রভাবে অসংখ্য মানুষ ইসলামের সুশীতল ছায়ায় আশ্রয় নেয়-শুধু তেনার হাত ধরেই প্রায় ৯২ লক্ষ বিধর্মী ইসলাম গ্রহণ করেন। খাজা গরীবে নেওয়াজ রহমাতুল্লাহি আলাইহি ছিলেন এমন এক আলোর উৎস, যেনার সামনে অন্ধকার টিকতে পারেনি। মানুষ তেনার দরবারে এসে হৃদয়ের শান্তি খুঁজে পেত, কিন্তু সেই যুগের কিছু তথাকথিত আলেম তেনার এই সীমাহীন মানবপ্রেমকেও ভুল বুঝে তেনাকে কাফের আখ্যা দিয়েছিল।
হজরত কুতুবুদ্দিন বখতিয়ার কাকি রহমাতুল্লাহি আলাইহি
তিনি ছিলেন খাজা গরীবে নেওয়াজ মঈনুদ্দিন চিশতি রহমাতুল্লাহি আলাইহির প্রিয়তম শিষ্য ও আধ্যাত্মিক উত্তরসূরি। তিনি সুফিবাদ, ত্যাগ, প্রেম ও মানবতার চিরন্তন আদর্শ প্রচার করেছেন এবং ছিলেন দিল্লির প্রথম সুফি সাধক, যিনি মাওলার প্রেমে নিজের জীবন উৎসর্গ করেছিলেন। তেনার দরবারে দরিদ্র ও রাজা-উভয়ই সমান মর্যাদা পেতেন, কারণ তেনার কাছে মানুষই ছিল আল্লাহর সেরা সৃষ্টি। তেনার মুখে ফুটে উঠত দয়া, তেনার চোখে ঝলমল করত সত্যের নূর। অথচ সেই যুগের কিছু তথাকথিত আলেম, এই প্রেমের মশালকেও ভুল বুঝে, কাফের আখ্যা দিয়েছিল।
শেখ ফরিদ রহমাতুল্লাহি আলাইহি
উপমহাদেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সুফি সাধক ও আধ্যাত্মিক পথপ্রদর্শক ছিলেন তিনি। সারাজীবন আল্লাহর ধ্যানে, ইবাদতে ও মানবতার সেবায় নিজেকে উৎসর্গ করেছিলেন। তেনার মুখে ছিল আল্লাহর নাম, আর তেনার হাতে ছিল মানুষের কল্যাণের দোয়া। শেখ ফরিদ রহমাতুল্লাহি আলাইহি শিখিয়েছিলেন-“যে নিজের অন্তরকে পরিশুদ্ধ করতে পারে, সে-ই প্রকৃত জ্ঞানী।” তেনার দরবারে ধর্ম, বর্ণ ও জাতিভেদ মিলেমিশে যেত আল্লাহপ্রেমের বন্ধনে। অথচ, সেই যুগের কিছু তথাকথিত আলেম তেনার এই ভালোবাসা ও সহনশীলতার শিক্ষা বুঝতে না পেরে তেনাকেও কাফের আখ্যা দিয়েছিল।
হজরত নিজামুদ্দিন আউলিয়া রহমাতুল্লাহি আলাইহি
তিনি মানুষকে আল্লাহর প্রেমে উদ্বুদ্ধ করতেন এবং দুনিয়াবি মোহ থেকে দূরে থাকার উপদেশ দিতেন। তিনি তেনার জীবনব্যাপী শিক্ষা, সাধনা ও মানবসেবার মাধ্যমে অসংখ্য মানুষকে সত্যের পথে নিয়ে আসেন। তেনার দরবারে ধনী-গরিব, রাজা-প্রজা সকলেই সমান মর্যাদা পেতেন- কারণ তেনার মতে, “ভালোবাসাই হলো প্রকৃত ইমানের আলো।” তেনাকেও সেই যুগের তথাকথিত আলেমগণ কাফের ফতোয়া প্রদান করেছিলেন, অথচ তেনার নামই পরবর্তীতে হয়ে ওঠে রহমত, প্রেম ও সহনশীলতার প্রতীক।
হজরত শামস তাব্রিজ রহমাতুল্লাহি আলাইহি
তিনি ছিলেন একজন মহান সুফি সাধক, আধ্যাত্মিক গুরু এবং গোপন জ্ঞানের অধিকারী। তেনার শিষ্য ছিলেন বিশ্ববিখ্যাত মাওলানা জালালউদ্দিন রুমি রহমাতুল্লাহি আলাইহি, যিনি শামসের প্রেমে ও আলোকপ্রভায় জাগ্রত হয়েছিলেন। শামস তাব্রিজ রহমাতুল্লাহি আলাইহি সত্যের এমন কথা বলতেন যা যুগের মানুষ বুঝতে পারত না, তাই তেনাকেও সেই যুগের তথাকথিত আলেমগণ কাফের ফতোয়া প্রদান করেছিলেন। তেনার নূর আজও রুমির কবিতায়, প্রেমিক হৃদয়ের ধ্যানে, আল্লাহপ্রেমের অনন্ত সুরে জ্বলে আছে চিরকাল।
মাওলানা জালালউদ্দিন রুমি রহমাতুল্লাহি আলাইহি
তিনি ছিলেন একজন মহান সুফি সাধক, দার্শনিক, কবি ও আধ্যাত্মিক গুরু। তেনার নাম ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা হয়েছে, বিশেষত তেনার রচিত “মসনবী শরীফ” বিশ্বসাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ আধ্যাত্মিক গ্রন্থ। তেনাকেও সেই যুগের তথাকথিত আলেমগণ কাফের ফতোয়া প্রদান করেছিলেন। অথচ তেনার কবিতার প্রতিটি পঙ্ক্তি মানব আত্মার মুক্তির দিশা দেখায়। রুমি রহমাতুল্লাহি আলাইহির শিক্ষা আজও প্রেম, ঐক্য ও আল্লাহর নূরের সন্ধানীদের অন্তরে জাগিয়ে রাখে এক অনন্ত প্রেরণা।
মনসুর হাল্লাজ রহমাতুল্লাহি আলাইহি
তিনি ছিলেন একজন মহান সুফি সাধক, আধ্যাত্মিক গবেষক ও দার্শনিক। তিনি আল্লাহর প্রতি নিখাদ প্রেম ও তাওহিদের গভীরতম উপলব্ধির জন্য পরিচিত। তেনার বিখ্যাত উক্তি “আনাল হক” (আমি সত্য) এর কারণে তিনি সমসাময়িক রক্ষণশীল আলেমদের বিরোধিতার শিকার হন। তেনাকেও সেই যুগের তথাকথিত আলেমগণ কাফের ফতোয়া প্রদান করেছিলেন। কিন্তু সত্যের পথে তিনি কখনো পিছু হটেননি। তেনার জীবন আজও প্রমাণ করে- যে প্রেমে নিজ সত্তা বিলীন হয়, সেই প্রেমই সর্বোচ্চ ইমানের প্রকাশ।
আল্লামা ইকবাল রহমাতুল্লাহি আলাইহি
তিনি ছিলেন একজন মহান দার্শনিক, কবি ও আধ্যাত্মিক চিন্তাবিদ। তেনার রচিত কবিতা ও দর্শন ইসলামি পুনর্জাগরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। মুসলিম উম্মাহকে জাগ্রত করতে তিনি কবিতার মাধ্যমে আত্মশুদ্ধি, আত্মপরিচয় ও আত্মমর্যাদার বাণী প্রচার করেছেন। তেনাকেও সেই যুগের তথাকথিত আলেমগণ কাফের ফতোয়া প্রদান করেছিলেন। কিন্তু তেনার কলম থামেনি; তেনার কবিতার আগুন নিদ্রিত জাতিকে জাগিয়ে তুলেছিল। তেনার চিন্তা আজও প্রতিটি মুসলমানকে মনে করিয়ে দেয়-“নিজেকে চিনলে, তুমিই তোমার কুদরতের সাক্ষী।”
কাজী নজরুল ইসলাম রহমাতুল্লাহি আলাইহি
তিনি ছিলেন বাংলা ভাষার অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি, সাহিত্যিক, সঙ্গীতজ্ঞ ও বিপ্লবী। তেনার রচনাবলী শুধু সাহিত্যকেই সমৃদ্ধ করেনি, বরং ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক চিন্তাধারায় গভীর প্রভাব ফেলেছে। তেনাকেও সেই যুগের তথাকথিত আলেমগণ কাফের ফতোয়া প্রদান করেছিলেন। কিন্তু তিনি কখনো ভয় পাননি- তিনি কলমকে বানিয়েছিলেন সত্য ও ন্যায়ের তরবারি। তেনার কবিতায় গর্জে উঠেছিল আল্লাহপ্রেম, মানবতা ও প্রতিবাদের শাশ্বত সুর, যা আজও অন্ধকারের বুক চিরে জ্বালায় আলোর প্রদীপ।
এছাড়াও এই সকল তথাকথিত আলেমগণ সুফি সাধক ও আধ্যাত্মিক গুরুগণের বিরুদ্ধে একই ধরনের অভিযোগ অতীতেও করেছিলেন, বর্তমানেও করছেন, ভবিষ্যতেও করবেন। যারা মূল ধর্ম থেকে হাজার মাইল দূরে, কিন্তু ফতোয়া দেওয়াই তাঁদের মূল কাজ। তবে ইতিহাস সাক্ষী, এই ফতোয়া কিংবা নিন্দাকল্পনা কখনোই ওলী, আউলিয়া, গাউস, কুতুব, ফকির, দরবেশগণেরর আধ্যাত্মিক প্রভাব বা মহত্ত্বকে ক্ষুন্ন করতে পারেনি; বরং তেনাদের আদর্শ ও শিক্ষা আরও উজ্জ্বল হয়েছে।
পরিশেষে
প্রতিটি যুগেই ওলী, আউলিয়া, গাউস, কুতুব, ফকির, দরবেশ ও সাধকদের বিরুদ্ধে সেই যুগের তথাকথিত আলেমগণ ফতোয়া দিয়েছেন। কিন্তু সত্য ও জ্ঞানের আলো কখনও নিভে যায়নি। যারা মানবতার কল্যাণে কাজ করেছেন, তাঁদের অবদান ইতিহাসে অমর হয়ে আছে। আজও তেনাদের শিক্ষা আমাদের এক নতুন দৃষ্টিভঙ্গি প্রদান করে, যা সংকীর্ণ চিন্তাভাবনা ও ধর্মীয় গোঁড়ামিকে পরাস্ত করে।










