দয়াল নবী আপনার দরবারে আমি গোলাম হাজির হইয়াছি।
“শব” ফারসি শব্দ, যার অর্থ রাত । “মেরাজ” আরবি শব্দ, যার অর্থ ঊর্ধ্বগমন, উচ্চে আরোহণ বা আকাশে গমন । শবে মেরাজ এমন এক পবিত্র রাত, যখন আল্লাহর প্রিয় বন্ধু, দয়াল নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম আল্লাহর দরবারে পৌঁছান। এই রাতেই ঘটে সেই মহান মুহূর্তের দিদার, যেখানে আল্লাহ ও প্রিয় নবীর মধ্যে সংঘটিত হয় এক অলৌকিক কথোপকথন, যা নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর ইমানদার উম্মতের হৃদয়কে ভরে রাখে প্রেম, করুণা ও আধ্যাত্মিক রহস্যে।
দয়াল বাবা জালালী মাওলা মেরাজের ঘটনা উল্লেখ করে সেই মহিমান্বিত মুহূর্তে আল্লাহ ও নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর মধ্যে যে কথোপকথন সংঘটিত হয়েছিল এবং সেখানে কী কী ঘটনা ঘটেছিল, তা বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করেছেন। আসুন, সেই আলোচনাটি জানার মাধ্যমে আমরা আমাদের ঈমানকে আরও দৃঢ় করি।
আল্লাহর সঙ্গে নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর কথোপকথন‘
আল্লাহর বন্ধু নূর নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম আল্লাহর দিদারে গেছেন। আল্লাহ একটি টেবিল সাজিয়েছেন, যার মধ্যে রাখা আছে এক গ্লাস মধু ও এক গ্লাস দুধ। নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম রূপার কুর্সিতে বসেছেন, আর আল্লাহ তাআলা বসেছেন স্বর্ণের কুর্সিতে।
আল্লাহ বলেন-
“বন্ধু! (নূর নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম ) আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে যেতে হলে কিছু না কিছু নেওয়া – এটা হলো সুন্নতে মুয়াল্লা, অর্থাৎ আল্লাহ পাকের সুন্নত।” “বন্ধু, আপনি যে আমার বাড়িতে এসেছেন, আপনার জন্য সাত আসমান ও জমিন আমি সাজিয়েছি। আমি আমার বাড়িতে আপনাকে আনলাম, অথচ আপনি কিছুই আমার জন্য আনলেন না।”
দয়াল নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন-
“আনছিতো।”
আল্লাহ জিজ্ঞেস করেন-
“কোথায়?”
নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম উত্তর দেন-
“আত্তাহিয়াতু লিল্লাহি ওয়াস সালাওয়াতু ওয়াত্ তাইয়িবাত।”
নবীজি বলেন-
আল্লাহ! আমি আমার উম্মতের সম্পূর্ণ গুনাহের বোঝা নিয়ে আপনার দরবারে হাজিরা দিয়েছি।”
আল্লাহ বলেন-
আসসালামু আলাইকা আইয়্যুহান নাবিয়্যু ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু।
ওয়ালা ইবাদিল্লাহিস সালিহিন।
“বন্ধু! আপনি আমার জন্য এত বড় নিয়ামত আনছেন।
আমি আপনার উপরে খুশি হয়ে, কিয়ামত পর্যন্ত আপনার যত মুমিন আছে, তাদের সমস্ত গুনাহ মাফ করে দিলাম।”
নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লামের উম্মতের কতটুকু গুনাহ রয়ে গেছে?
টেবিলের উপর রাখা ছিল এক গ্লাস মধু ও এক গ্লাস দুধ।
নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম দেখছেন, আল্লাহ বলেন-
“বন্ধু! আপনি যে নিয়ামত আমাকে দিয়েছেন, আমি এত কিছুই আপনাকে দিলাম না। ধরুন, মধুটা খান।”
নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম মধু খেয়ে নেন। এরপর দুধের গ্লাসটি দিলে
নবীজি বলেন-
“বন্ধু, আমার খিদা নেই।”
আল্লাহ বলেন-
“বন্ধু, আমি যদি খেতাম, তাহলে দুধ খেতাম।”
এই কথা শোনামাত্রই নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম দুধের গ্লাস টান দিয়ে নিয়ে দুধ খেয়ে ফেলেন।
আমরা যদি গ্লাসে দুধ অথবা মধু খাই খাওয়ার পর যদি গ্লাসটি উল্টানো হয় দেখবেন গ্লাস থেকে কিছু না কিছু পানি অথবা দুধ পড়ে যায়। নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম দুধ খাওয়ার পর যখন গ্লাসটি উল্টানো হয়, অল্প কিছু দুধ পড়ে যায়।
আল্লাহ বলেন-
“বন্ধু, আমি রাজি খুশি; কিন্তু এই যতটুকু দুধ রয়ে গেছে, আপনার উম্মতের এতটুকু গুনাহ রয়ে গেছে।”
এই কথা শোনার পর নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম লাফাতে শুরু করেন।
আল্লাহ বলেন-
“জিব্রাইল! আমি বন্ধুর পাগল; কিন্তু আমার বন্ধু তো আমার পাগল নয়, আমার বন্ধু উম্মতের পাগল।”
নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর জান্নাতুল ফেরদৌস সফর
আল্লাহ বলেন-
“জিব্রাইল, তুমি আমার বন্ধুকে বেহেশত ফেরদৌসে নিয়ে যাও। জান্নাতুল ফেরদৌসের খুশবু, সৌন্দর্য ও রং দেখলে আমার বন্ধু খুশি হবে।”
জিব্রাইল নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর ডান হাতের কব্জি ধরে জান্নাতুল ফেরদৌসে প্রবেশ করালেন। জিব্রাইল নবীজিকে এটা দেখাচ্ছেন, এটা দেখাচ্ছেন, আর নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম চুপ করে আছেন।
হঠাৎ নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন-
“ইয়া আখি জিব্রাইল- হে ভাই জিব্রাইল!
জিব্রাইল বলেন- ‘ইয়া রাসূলআল্লাহ, নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন- আপনি যে আমাকে এত কিছু দেখাচ্ছেন, আমি আপনাকে একটা জিনিস দেখাই।”
জিব্রাইল মনে মনে বলেন-
“নবীজি আমাকে কী দেখাবেন? বেয়াদবি হলে আমার সর্বনাশ।
জিব্রাইল জিজ্ঞেস করলেন-
“ইয়া রাসূলআল্লাহ, আপনি আমাকে কী দেখাবেন?”
নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন-
“এই উটগুলো আসছে, দেখছো? জিব্রাইল বললেন- ‘হ্যাঁ, দেখছি। নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন- এই উটগুলোর উৎপত্তি কোথায়, কোথা থেকে আসছে এবং শেষ কোথায়, আমাকে একটু বলো।
জিব্রাইল বলেন—
“ইয়া রাসূলাল্লাহ, এই খবর তো আমার জানা নেই।”
নবীজি বললেন-
“উৎপত্তি বাদ দাও, শেষ কোথায়, আমাকে খবর দাও।”
জিব্রাইলের শরীরে ছয়শত নূরের পাখা আছে। প্রতিটি পাখা বাড়ি দিলে, জমিন থেকে পাঁচশত বছরের পথ অতিক্রম করে আসমানে চলে যায়। এইভাবে জিব্রাইল ছয়শত নূরের পাখা ব্যবহার করে ২৭ বছর উড়েছেন। ২৭ বছর উড়ার পরও জিব্রাইল দেখলেন- উট এখনও যেতেই আছে, উট এর শেষ নেই।
অবশেষে জিব্রাইল আল্লাহকে বললেন-
“মাবুদ, আমার বেয়াদবি মাফ করুন। আমি আপনার হাবীবের গোলামী খাতায় নাম লিখলাম। আমার ছয়শত নূরের পাখা অবশ হয়ে গেছে, তবুও উট এখনও যাচ্ছে। এর শেষ কোথায়, তা আপনি এবং আপনার হাবীব সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম ভালো জানেন। অনুগ্রহ করে আমাকে নামিয়ে নিন।
তালার চাবি হলো ‘বিসমিল্লাহ’, আর মালিক হলেন বাবা হুসাইন
জিব্রাইল নবীজির কাছে আসলেন। নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন—
“উঠের শেষ তুমি পেয়েছো কি?”
জিব্রাইল বললেন—
“ইয়া রাসূলআল্লাহ, ইয়া হাবিব আল্লাহ! আপনি এবং আমার মাওলা ভালো জানেন, উঠের শেষ কোথায়, সেটা আমার জানা নেই।”
নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন-
“তাহলে একটা কাজ করো।”
জিব্রাইল আলাইহিস সালাম জিজ্ঞেস করলেন-
ইয়া রাসূলআল্লাহ কি কাজ?
নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন-
“উঠের মধ্যে একটা বাক্স দেখেছো? ওই বাক্সটি খুলে আমাকে দেখাও।” জিব্রাইল দৌড়ে গিয়ে উঠের লাগামের মধ্যে ধরেন। পিছনের উটগুলো দাঁড়িয়ে যায়, আর সামনের উটগুলো যেতেই আছে। এবার জিব্রাইল বাক্সটির মধ্যে নজর করলেন। দেখলেন, বাক্সটির মধ্যে ছোট একটি তালা রয়েছে।
জিব্রাইল বললেন-
“ইয়া রাসূলআল্লাহ, বাক্সের মধ্যে তালা আছে।”
নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন-
“খুলে ফেল।”
জিব্রাইল জিজ্ঞেস করলেন-
“ইয়া রাসূলআল্লাহ, কি দিয়ে খুলব?”
নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন-
“ভাঙো।” জিব্রাইল সমস্ত শক্তি দিয়ে চেষ্টা করলেও তালা ভাঙতে পারলেন না।
জিব্রাইল বললেন-
“ইয়া রাসূলাল্লাহ, আমার জিব্রাইলি শক্তি দিয়ে চেষ্টা করলাম, তালা ভাঙতে পারিনি। এর হকিকতটা আসলে কী?”
নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন-
“জিব্রাইল, এই তালার মালিক হলো হুসাইন। চাবি আছে আমার হুসাইনের কাছে।”
জিব্রাইল জিজ্ঞেস করলেন-
“হুসাইন কোন দেশে আছে?”
নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন-
“তুমি ইল্লিন নামক দেশে তালাশ করো।
এবার জিব্রাইল ইল্লিন নামক দেশে গেছে। সেখানে গিয়ে ২৭ বছর খুঁজে দেখতেছেন।
হাত্তা উরজুনিল কাদিম- এই আয়াতের তাফসির করতেছেন আল্লামা জালাল উদ্দিন সুয়ুতি। তাফসিরে দুররে মানসুরে একটি খেজুর গাছ খেজুর গাছে বাবা হুসাইন দাঁড়িয়ে আছেন।
জিব্রাইল এসে বাবা হুসাইন এর কদমগুছি করতেছে। বাবা হুসাইন জিব্রাইলকে থুতনির মধ্যে ধরে বললেন-
“ইয়া আখি জিব্রাইল, হে ভাই জিব্রাইল, ব্যাপার কি?”
জিব্রাইল বললেন-
“নানা নাতি, এত ভঙ্গিমা জানেন, উঠের পিঠে বাক্সে তালা লাগানো আছে। চাবি নাকি আপনার কাছে?”
বাবা হুসাইন হাসি দিয়ে বললেন-
“জিব্রাইল, এই তালার চাবি হলো বিসমিল্লাহ, আর মালিক হলাম আমি- হুসাইন। যাও, আমি হুকুম দিলাম। বিসমিল্লাহ বলে তালার মধ্যে হাত দিলে তালা খুলে যাবে।” এবার জিব্রাইল এসে যখন বিসমিল্লাহ বলে তালার মধ্যে ধরছে। তালা খুলে গেছে।
এরপর নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন-
“জিব্রাইল, বাক্সের ডাকনাটা একটু খুল আমি দেখব।”
জিব্রাইল তার শক্তি দিয়ে ডাকনাটা কোন রকমে খুলেলে, নবীজি বললেন-
“ভিতরের দিকে নজর কর। জিব্রাইল ভিতরের দিকে তাকাতেই একটি চিল্লানি দিল।
নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন-
“চিল্লাও কেন, জিব্রাইল?”
জিব্রাইল বললেন—
“নবীগো, আপনার নূরানী কদমে আমার জীবন কুরবান। আমি দেখতেছি, আপনি নবী, আমার সামনে দাঁড়িয়ে আছেন। বাক্সের মধ্যে দেখতেছি, আশি হাজার আলম, সমস্ত আলমের দরজায় আপনি মোস্তফা সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম দাঁড়িয়ে আছেন।
পরিশেষে
শবে মেরাজের রাতে নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম শুধুমাত্র নিজের জন্য যাননি, বরং উম্মতের ক্ষমা, রহমত ও মুক্তির বার্তা নিয়ে ফিরেছেন।










