---Advertisement---

চার কাজীর লালসা, আর সুলাইমান আলাইহিস সালাম এর ন্যায়বিচার।

October 28, 2025 3:11 PM
চার কাজীর লালসা, আর সুলাইমান আলাইহিস সালাম এর ন্যায়বিচার।
---Advertisement---

দয়াল নবী আপনার দরবারে আমি গোলাম হাজির হইয়াছি।

ন্যায়বিচার সবসময় সত্য ও প্রজ্ঞার ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত হওয়া উচিত। কিন্তু মানুষের লালসা, রূপের মোহ বা অহংকার কখনো কখনো বিচারকে অন্ধ করে দিতে পারে। হযরত দাউদ আলাইহিস সালাম এর যুগের এক নারী সেই বাস্তবতার শিকার হন। চারজন কাজী তাঁর প্রতি লোভে অন্ধ হয়ে মিথ্যা সাক্ষ্য ও অন্যায়ের পথে চলে যান। তবে আল্লাহ প্রদত্ত প্রজ্ঞা শেষ পর্যন্ত সত্যকে জয়ী করে।

মিথ্যার দেয়াল ভেঙে সত্যের উদয়

হযরত দাউদ আলাইহিস সালাম এর জমানায় একদিন এক সুন্দরী রমনী অত্যাচারিত হয়ে যালিমদের বিরুদ্ধে কাজীর কাছে গিয়ে মোকদ্দমা দায়ের করল। উক্ত মহিলার অপরূপ রূপের এমন এক মোহনীয় বৈশিষ্ট্য ছিল যে, দর্শণমাত্রই তার প্রতি আকৃষ্ট হত

কাজী তার রূপ-সৌন্দর্য দেখে আসক্ত হয়ে তার সঙ্গে নিজে বিবাহের প্রস্তাব দিল। সে কাজীর প্রস্তাবে অসন্মতি জানিয়ে কাজীকে বলল, “এখন আমার বিয়ে করার মত মানসিকতা নেই।” এতে কাজী স্বাভাবিকভাবেই মনক্ষুণ্ন হলো

সুন্দরী মহিলা বুঝতে পারল যে, এ কাজীর মাধ্যমে ন্যায্য বিচার আশা করা নিরর্থক। তাই সে অন্য কাজীর দরবারে বিচার প্রার্থী হলো। কিন্তু মহিলার ভাগ্যে এখানেও একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটল। এ কাজীও মহিলার রূপে মুগ্ধ হয়ে গেল। শুধু মুগ্ধই নয়, সে প্রথম কাজীর ন্যায় একব্যক্তি মারফত মহিলার কাছে বিবাহের প্রস্তাব পাঠাল এবং একথাও বলল যে, যদি বিবাহে রাজি না হয়, তবে অন্তত যেন অনুগ্রহ করে কাজীর সঙ্গে বন্ধুত্ব স্থাপন করে।

মহিলার কাছে যখন এ প্রস্তাব পৌঁছল, তখন সে বিরক্ত হয়ে তৃতীয় কাজীর দরবারে অভিযোগ পেশ করল। তৃতীয় কাজীও পূর্বের কাজীদের পদাঙ্ক অনুসরণ করল। তখন মহিলা বাধ্য হয়ে চতুর্থ কাজীর শরনাপন্ন হলো। বেচারীর ভাগ্যই খারাপ। চতুর্থ কাজীও পূর্বের কাজীদের মতো মহিলার রূপে মুগ্ধ হয়ে গেল এবং পূর্বের কাজীদের মতোই তাকে বিবাহের প্রস্তাব দিল। তখন মহিলা কাজীদের কাছে বিচারের আশা সম্পূর্ণরূপে ত্যাগ করে দুঃখ ভারাক্রান্ত হৃদয়ে গৃহে প্রত্যাবর্তন করল

মহিলা বিচার প্রত্যাশা পরিত্যাগ করলেও চারজন কাজী মহিলাকে দেমাগী মনে করে তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়ে গেল। একদিন তারা সম্মিলিতভাবে হযরত দাউদ আলাইহিস সালাম এর দরবারে এই মহিলার বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের করল, যে এই মহিলা ধর্মীয় বিধান অনুসারে কারও সঙ্গে বিবাহে সম্মত নয়, অথচ সে রাতে কুকুরের সঙ্গে এক বিছানায় শয়ন করে।

তাদের অভিযোগ শুনে হযরত দাউদ (আলাইহিস সালাম চমকে উঠলেন এবং ঘৃণায় নাসিকা কুঁচকিত করে বললেন, “তোমরা কি এ ধরনের অপকর্মের সাক্ষী হাজির করতে পারবে?” তারা বলল, অবশ্যই চারজন সাক্ষী দরবারে হাজির করবো।”

হযরত দাউদ আলাইহিস সালাম বললেন, “তবে যাও, তোমাদের সাক্ষীদেরকে দরবারে উপস্থিত কর।” সাক্ষী সকলে ছিল বেদ্বীন ও অর্থলোভী। তারা কিছু অর্থের লোভে একসাথে হযরত দাউদ আলাইহিস সালাম এর দরবারে আগমন করে একবাক্যে সাক্ষ্য প্রদান করল, যে সত্যিই উক্ত মহিলা কুকুরকে নিজ বিছানায় শয়ন করায়।

সাক্ষীদের সাক্ষ্য গ্রহণের পর হযরত দাউদ আলাইহিস সালাম নিজ কর্মচারীদের নির্দেশ দিলেন, এই মহিলাকে কোমর পর্যন্ত মাটিতে পুঁতে পাথর নিক্ষেপ করা হোক। হযরত দাউদ আলাইহিস সালাম মহিলার প্রতি এমন দণ্ডাদেশ প্রদানের পর দরবার থেকে চলে যাওয়ার সময় উপস্থিত জনতার কতক লোক বলাবলি করতে লাগল, যে সাক্ষীরা অর্থলোভে মহিলার প্রতি মিথ্যা সাক্ষ্য প্রদান করে তাকে বিপদাপন্ন করেছে। মূলত মহিলা সম্পূর্ণ নির্দোষ ও নিস্কলঙ্ক।

দরবারে কিছু লোকের এসব কথা শুনে হযরত সুলাইমান আলাইহিস সালাম দরবার কক্ষে প্রবেশ করলেন এবং বিষয়টি সম্পর্কে হযরত দাউদ আলাইহিস সালাম এর কাছে আরজ করলেন, “হে পিতা, এই মহিলার দণ্ডাদেশ স্থগিত রেখে তার বিরুদ্ধে সাক্ষীদের কাছ থেকে পুনরায় সাক্ষ্য গ্রহণ করুন। তারপর তার দণ্ডাদেশ কার্যকর করুন।”

হযরত দাউদ আলাইহিস সালাম পুত্রের আরজি কবুল করে পুনরায় চারজন সাক্ষীকে তলব করে পুত্রকে বললেন, “হে পুত্র, এবার তুমি এদের সাক্ষ্য গ্রহণ কর।” দরবারেই তাদের পুনরায় সাক্ষ্য গ্রহণ অনুষ্ঠান শুরু হলো। বাদশা হযরত দাউদ আলাইহিস সালামও সাক্ষ্য গ্রহণ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।

প্রথম সাক্ষীকে হাজির করে জিজ্ঞেস করা হলো, “তুমি এ মহিলার শয্যায় যে কুকুরটি দেখেছ, সে কুকুরটি কি রঙের ছিল?” সে বলল, “কালো বর্ণের ছিল।”

অতঃপর হযরত সুলাইমান আলাইহিস সালাম এই সাক্ষীকে দরবারে আবদ্ধ রেখে দ্বিতীয় সাক্ষীকে তলব করলেন। সে হাজির হলে তাকেও একই কথা জিজ্ঞেস করা হলো, যে এ মহিলার শয্যায় যে কুকুরটি তুমি দেখেছিলে তার গায়ের রঙ কিরূপ ছিল? দ্বিতীয় সাক্ষী উত্তর দিল, “তার গায়ের রঙ লাল ছিল।”

অতঃপর এই সাক্ষীকেও দরবারে আবদ্ধ করে একে একে তৃতীয় ও চতুর্থ সাক্ষীদের কাছ থেকেও অনুরূপ সাক্ষ্য গ্রহণ করা হলো। তারা কুকুরটির গায়ের বর্ণ ভিন্ন ভিন্ন বলল।

এবার দাউদ আলাইহিস সালাম এর কাছে ঘটনা স্পষ্ট হয়ে গেল, যে মহিলার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা । তখন তিনি পুত্র হযরত সুলাইমান আলাইহিস সালাম এর সঙ্গে একত্র হয়ে এ মহিলার বদলে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা চারজন কাজী এবং চারজন সাক্ষীকেই মাটি পুঁতে পাথর নিক্ষেপ করে হত্যা করার নির্দেশ দিলেন

পরিশেষে

এই ঘটনা আমাদের শেখায়-

  • লালসা, অহংকার ও রূপের মোহ মানুষকে অন্ধ করে দিতে পারে।

  • মিথ্যা সাক্ষ্য ও অন্যায় দীর্ঘস্থায়ী হয় না।

  • আল্লাহ প্রদত্ত প্রজ্ঞা সত্যকে বিজয়ী করে।

  • সত্যের জয় নিশ্চিত, আর অন্যায় নিজের হাতে ধ্বংস হয়

Join WhatsApp

Join Now

Join Telegram

Join Now

Leave a Comment