দয়াল নবী আপনার দরবারে আমি গোলাম হাজির হইয়াছি।
ওলী আল্লাহদের পরিচয় জানতে হলে প্রথমেই বুঝতে হবে- তাঁরা আল্লাহর সেই প্রিয় বন্ধু, যাদের দিকে তাকালেই অন্তরে অজান্তেই আল্লাহর স্মরণ জেগে ওঠে। তাদের চেহারায় ফুটে ওঠে নূরানী প্রশান্তি, কথায় প্রকাশ পায় হিকমত ও সত্যের দীপ্তি, আর তাদের সান্নিধ্যে এলে হৃদয় দুনিয়ার মোহ থেকে মুক্ত হয়ে রবের দিকে ধাবিত হয়। তাদের উপস্থিতি নিঃশব্দে মানুষকে স্মরণ করিয়ে দেয়-এই পৃথিবী ক্ষণস্থায়ী, চিরস্থায়ী আবাস তো আখিরাত।
আজকের ফিতনার অন্ধকার যুগে ওলী আল্লাহদের পরিচয় অনুধাবন করা সহজ নয়। বাহ্যিক চাকচিক্য, লোকদেখানো আমল আর আত্মপ্রচারের কোলাহলের মাঝে প্রকৃত আল্লাহওয়ালাদের চিনতে হলে দেখতে হবে কোরআন ও হাদিসের মানদণ্ডে, আর উপলব্ধি করতে হবে বুযুর্গানে দ্বীনের জীবনাদর্শের আলোকে। কারণ সত্যিকারের ওলী আল্লাহ নিজের পরিচয় প্রচার করেন না; বরং তাদের নীরব সান্নিধ্যই মানুষকে আল্লাহর দিকে ফিরিয়ে আনে।
কোরআনের আলোকে ওলী আল্লাহদের পরিচয়
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন-
“জেনে রাখো! নিশ্চয়ই আল্লাহর ওলীদের কোনো ভয় নেই, চিন্তা নেই এবং তারা দুঃখিতও হবে না। তারা হলো সেইসব লোক, যারা ঈমান এনেছে এবং তাকওয়া অবলম্বন করেছে।”
(সূরা ইউনুস: ৬২–৬৩)
এই আয়াত স্পষ্ট করে দেয় ওলী আল্লাহদের পরিচয় আল্লাহর ওলী তারা, যারা ঈমানে দৃঢ়, তাকওয়ায় পরিপূর্ণ এবং আল্লাহর আনুগত্যে অবিচল। তাদের জন্য ভবিষ্যতের ভয় নেই, অতীতের দুঃখ নেই; কারণ তারা সর্বদা আল্লাহর রহমতের ছায়াতলে থাকেন।
হাদিসে ওলী আল্লাহদের পরিচয়
হযরত আসমা বিনতে ইয়াযীদ রাদ্বিয়াল্লাহু আনহা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন-
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন:“তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম তারা, যাদের দেখলে আল্লাহর স্মরণ হয়।” (সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস: ৪১১৯)
এই হাদিসের মাধ্যমে ওলী আল্লাহদের পরিচয় অত্যন্ত সুন্দরভাবে ফুটে উঠেছে। প্রকৃত ওলী আল্লাহ তিনিই, যার উপস্থিতি মানুষকে দুনিয়ার মোহ থেকে সরিয়ে আল্লাহর দিকে ফিরিয়ে আনে। তাঁর সান্নিধ্যে হৃদয় নরম হয়, অন্তর জাগ্রত হয় এবং আল্লাহর স্মরণে মন ভরে ওঠে।
বুযুর্গদের বাণীতে ওলী আল্লাহদের পরিচয়
খাজা মইনুদ্দীন চিশতী রহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন-
“আল্লাহর বন্ধুর পরিচয় হলো- তাকে দেখলে তোমার অন্তরে আল্লাহর ভালোবাসা জেগে ওঠে।”
ইমাম গাজ্জালী রহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন-
“ওলী আল্লাহ তিনিই, যার অন্তর আল্লাহর স্মরণে জীবিত এবং দুনিয়ার মোহ থেকে মুক্ত।”
হযরত জুনাইদ বাগদাদী রহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন-
“ওলী সে-ই, যার অন্তর সর্বদা আল্লাহর সাথে থাকে; যদিও দেহ মানুষের মাঝে থাকে।”
ওলী আল্লাহদের পরিচয়ের লক্ষণসমূহ
- তাদের দেখলে খোদার কথা স্মরণ হয়, অন্তরে আল্লাহর ভয় ও ভালোবাসা জাগে
- তাদের দেখলে নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দিদারের আশা ও ভালোবাসা জাগে
- তাদের চেহারায় নূরের ঝলক দেখা যায়
- তাদের কথা হৃদয়ে গভীর প্রভাব ফেলে
- তারা মানুষকে আল্লাহর পথে আহ্বান করেন
- তাদের সান্নিধ্যে গুনাহ থেকে ফেরার অনুভূতি জাগে
- তাদের জীবনযাপন সাধারণ হলেও অন্তর থাকে আল্লাহর স্মরণে পরিপূর্ণ
বর্তমান যুগে ওলী আল্লাহদের পরিচয় বোঝা কঠিন কেন?
আজকের যুগে অনেকেই বাহ্যিক জনপ্রিয়তা, অনুসারীর সংখ্যা কিংবা মানুষের প্রশংসাকেই আধ্যাত্মিকতার মানদণ্ড হিসেবে ধরে নেন। ফলে প্রকৃত ওলী আল্লাহদের পরিচয় অনেক সময় সাধারণ মানুষের কাছে অস্পষ্ট হয়ে যায়।
অথচ প্রকৃত ওলী আল্লাহদের পরিচয় হলো বিনয়, নীরবতা এবং আত্মগোপন। তাঁদের প্রকৃত সৌন্দর্য কখনো প্রচার বা প্রদর্শনীতে নয়; বরং আল্লাহর নৈকট্য এবং অন্তরের পরিশুদ্ধতায় লুকিয়ে থাকে।
তাই সত্যিকারের ওলীরা আত্মপ্রচার থেকে সর্বদা দূরে থাকেন এবং নিজেকে গোপন রাখতেই পছন্দ করেন। কারণ তাঁদের লক্ষ্য মানুষের প্রশংসা নয়, বরং আল্লাহ ও নূর নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সন্তুষ্টি অর্জন করা।
ওলী আল্লাহদের পরিচয় জানার পর আমাদের করণীয়
যদি এমন কোনো ওলী আল্লাহর সান্নিধ্য পান, যাঁকে দেখলে অন্তরে আল্লাহর স্মরণ জেগে ওঠে, তাহলে তাঁর সোহবতকে মূল্যবান মনে করে নিচের বিষয়গুলো অনুসরণ করা উচিত-
- তাঁর সোহবত গ্রহণ করুন
- তাঁর নসিহত মনোযোগ দিয়ে শুনুন
- নিজের আত্মশুদ্ধির চেষ্টা করুন
- আল্লাহ ও রাসূল ﷺ-এর পথে অগ্রসর হোন
কারণ প্রকৃত ওলী আল্লাহদের সান্নিধ্য মানুষকে ধীরে ধীরে আল্লাহ ও তাঁর রাসূল ﷺ-এর দিকে ফিরিয়ে আনে এবং অন্তরকে দুনিয়ার মোহ থেকে মুক্ত করে।
পরিশেষে: ওলী আল্লাহদের পরিচয় আমাদের কী শেখায়?
ওলী আল্লাহদের পরিচয় আমাদের শেখায় যে, আল্লাহর প্রিয় বন্ধুগণ কখনো বাহ্যিক চাকচিক্য বা দুনিয়ার জাঁকজমকে বড় হন না; বরং তাঁদের প্রকৃত মহত্ত্ব গড়ে ওঠে আল্লাহর ভালোবাসা এবং নবীজি ﷺ-এর প্রেমে।
আসুন, আমরা এমন মানুষ হওয়ার চেষ্টা করি-
যাদের দেখলে মানুষ দুনিয়ার মোহে নয়, বরং আল্লাহ ও রাসূল ﷺ স্মরণে ফিরে আসে।










