হক ও বাতিলের প্রকৃত পরিচয়
দয়াল নবী আপনার দরবারে আমি গোলাম হাজির হইয়াছি।
আজকের পৃথিবীতে হক ও বাতিল চিনে রাখা একজন ঈমানদারের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। কারণ সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে হক ও বাতিল এমনভাবে একত্রে উপস্থাপিত হচ্ছে যে সাধারণ মানুষের জন্য সত্য ও মিথ্যার পার্থক্য নির্ণয় করা কঠিন হয়ে পড়েছে। কুরআনুল কারিমে আল্লাহ তাআলা বারবার হক ও বাতিল-এর পার্থক্য স্পষ্ট করেছেন এবং সত্যের পথে অটল থাকার নির্দেশ দিয়েছেন। কিন্তু বর্তমান সমাজে বাতিল অনেক সময় চাকচিক্য, যুক্তি ও বাহ্যিক আকর্ষণের মোড়কে হাজির হয়, ফলে অনেকেই বিভ্রান্ত হয়ে পড়ে।
হক ও বাতিল কী, তা বুঝতে হলে কুরআন-হাদিসের গভীর জ্ঞান অর্জনের পাশাপাশি আউলিয়ায়ে কেরামের জীবনাদর্শ থেকেও শিক্ষা নিতে হয়। কারণ সত্য কখনও বাহ্যিক চাকচিক্যে নয়, বরং আল্লাহর নির্দেশনা ও নূর নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সুন্নাহর অনুসরণেই প্রকাশিত হয়।
হক কী?
“হক” অর্থ সত্য, ন্যায় এবং আল্লাহ তাআলার নির্ধারিত সঠিক পথ। যা কুরআন ও সুন্নাহর সঙ্গে সম্পূর্ণ সামঞ্জস্যপূর্ণ, তাই হক। হক এমন এক চিরন্তন সত্য, যা কখনও পরিবর্তিত হয় না এবং কোনো মিথ্যার আড়ালে স্থায়ীভাবে আচ্ছাদিত থাকতে পারে না। আল্লাহ তাআলার নির্দেশনা, নূর নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর শিক্ষা এবং আউলিয়ায়ে কেরামের পথই হলো প্রকৃত হকের দিশা। যে পথ মানুষকে আল্লাহর সন্তুষ্টি, ন্যায়পরায়ণতা ও মুক্তির দিকে পরিচালিত করে, সেটিই হক।
হকের ভিত্তি সম্পর্কে নূর নবীজি ﷺ-এর নির্দেশনা
নূর নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন:
“আমি তোমাদের মাঝে দুটি জিনিস রেখে যাচ্ছি, যতদিন তোমরা তা আঁকড়ে ধরবে ততদিন পথভ্রষ্ট হবে না- আল্লাহর কিতাব এবং আমার আহলে বাইত।”
নূর নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম উম্মতকে পথভ্রষ্টতা থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য দুটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়কে আঁকড়ে ধরার নির্দেশ দিয়েছেন আল্লাহর কিতাব এবং আহলে বাইত। এই দুটি বিষয়কে যারা দৃঢ়ভাবে অনুসরণ করেছেন, তাঁদের মধ্যে অন্যতম হলেন ওলী আল্লাহগণ।
ওলী আল্লাহগণ কুরআন ও আহলে বাইতের শিক্ষা এবং নূর নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সুন্নাহকে জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে বাস্তবায়ন করেছেন। তাঁদের জীবন, আমল ও সোহবতের মাধ্যমে মানুষ হক ও বাতিলের সঠিক পার্থক্য বুঝতে সক্ষম হয়।
অতএব, ওলী আল্লাহদের অনুসরণ ও সান্নিধ্যের মাধ্যমে একজন ঈমানদার হক ও বাতিল সম্পর্কে সঠিক ধারণা লাভ করতে পারে এবং সরল পথের দিকে অগ্রসর হতে পারে।
আল্লাহ তাআলা বলেন-
” এবং বলুন, সত্য এসেছে এবং মিথ্যা বিলুপ্ত হয়েছে। নিশ্চয়ই মিথ্যা বিলুপ্ত হওয়ারই ছিল।”
(সূরা- সূরা বনী ইসরাঈল, আয়াত: ৮১)
হক এমন এক শক্তি যা কখনও ধ্বংস হয় না। সাময়িকভাবে চাপা পড়লেও একসময় তা প্রকাশিত হয়।
বাতিল কী?
বাতিল হলো অসত্য, বিভ্রান্তি ও আল্লাহর পথ থেকে বিচ্যুতি।
বাতিল অনেক সময় আকর্ষণীয় রূপে সামনে আসে। বাহ্যিকভাবে শক্তিশালী মনে হলেও এর ভিত্তি দুর্বল।
পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে-
“ফেনা যেমন ভেসে যায়, তেমনি বাতিলও বিলীন হয়ে যায়; আর যা মানুষের উপকারে আসে, তাই পৃথিবীতে স্থায়ী হয়।”
(সূরা আর-রা’দ: ১৭)
হক ও বাতিলের চিরন্তন সংঘর্ষ
আদম আলাইহিস সালাম থেকে শুরু করে সকল নবী-রাসুলের যুগে হক ও বাতিল-এর লড়াই ছিল।
- নূর নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবং আবু জেহেল নেতৃত্বাধীন বাতিলপন্থী শক্তি”
- হযরত মূসা আলাইহিস সালাম এবং ফিরআউন
- হযরত ইবরাহিম আলাইহিস সালাম এবং নমরুদ
প্রত্যেক যুগে বাতিল শক্তিশালী মনে হয়েছে, কিন্তু শেষ বিজয় হকেরই হয়েছে।
বর্তমান যুগে হক ও বাতিল চেনার উপায়
- ওলী আল্লাহদের শিক্ষা অনুসরণ করুন। ওলী আল্লাহগণ হলেন আল্লাহর প্রিয় বন্ধু। তাঁদের জীবন, আমল ও উপদেশ হকের পথে চলার বাস্তব দিশা দেয়। তাঁদের সোহবত ও শিক্ষায় অন্তর পরিশুদ্ধ হয় এবং সত্য-মিথ্যা পার্থক্য বুঝতে সহজ হয়।
- কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে যাচাই করুন
যা কুরআন-হাদিসের বিরোধী, তা নিঃসন্দেহে বাতিল। - বাহ্যিক চাকচিক্যে বিভ্রান্ত হবেন না
সব আকর্ষণীয় ও জনপ্রিয় বিষয়ই সত্য নয়।
একজন ঈমানদারের করণীয়
বর্তমান যুগে হক ও বাতিল চেনা এবং হকের পথে অটল থাকা একজন ঈমানদারের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। ফিতনার এই সময়ে কুরআন ও সুন্নাহকে দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরে ঈমানকে মজবুত রাখা জরুরি।
হক ও বাতিল বুঝতে এবং হকের ওপর অবিচল থাকতে ওলী আল্লাহদের সোহবত গ্রহণ করা অত্যন্ত উপকারী। কারণ তাঁদের জীবন ও শিক্ষা মানুষের অন্তরকে আল্লাহর দিকে ফিরিয়ে আনে এবং সঠিক পথ চিনতে সাহায্য করে।
তাছাড়া হক ও বাতিল চেনার পর বাতিল থেকে দূরে থাকা এবং ঈমানদার মানুষের সাথে সম্পর্ক বজায় রাখা একজন মুমিনের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। এভাবেই একজন ঈমানদার তার ঈমানকে শক্তিশালী করে দুনিয়া ও আখিরাতে সফলতা অর্জন করতে পারে।
পরিশেষে
হক ও বাতিল-এর দ্বন্দ্ব কিয়ামত পর্যন্ত চলবে। বাতিল যতই শক্তিশালী মনে হোক, শেষ বিজয় হকেরই হবে। একজন সত্যিকার ঈমানদারের দায়িত্ব হলো কুরআন-হাদিসের আলোকে সত্যকে আঁকড়ে ধরা এবং বাতিল থেকে দূরে থাকা।
আল্লাহ আমাদের সবাইকে হক ও বাতিল চিনে হকের পথে অটল থাকার তাওফিক দান করুন। আমিন।








