দয়াল নবী আপনার দরবারে আমি গোলাম হাজির হইয়াছি।
ওলী-আউলিয়াদের রূহানী সান্নিধ্য লাভ করা ইসলামের আধ্যাত্মিক সাধনা বা তাসাউউফের একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। যুগে যুগে সাধারণ মানুষকে আল্লাহর পথ দেখানো এবং তাদের অন্তরের কালিমা দূর করার পেছনে ওলী-আউলিয়াদের অবদান অনস্বীকার্য। তবে আধুনিক সমাজে পীর-মুরিদী বা ওলী-আউলিয়াদের প্রতি ভক্তি নিয়ে নানা প্রশ্ন দেখা যায়। অনেকের মতে এটি কেবলই অন্ধ আনুগত্য, আবার সুফি গবেষকদের মতে এটি হলো আত্মশুদ্ধি বা তাজকিয়াতুন নফসের এক অনন্য মাধ্যম।
আজ আমরা গভীর আধ্যাত্মিক ও কোরআন-সুন্নাহর আলোকে জানবো ওলী-আউলিয়াদের রূহানী সান্নিধ্য এর আসল উদ্দেশ্য আসলে কী।
ওলী-আউলিয়া কারা এবং তাসাউউফে তাঁদের অবস্থান কী?
ইসলামী পরিভাষায় ‘ওলী’ শব্দের অর্থ হলো বন্ধু, আর আউলিয়া হলো এর বহুবচন। অর্থাৎ, যাঁরা আল্লাহর অত্যন্ত নিকটবর্তী এবং তাঁর প্রিয় বন্ধু, তাঁরাই ওলী-আউলিয়া। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ইরশাদ করেছেন- “মনে রেখো, আল্লাহর বন্ধুদের কোনো ভয় নেই, চিন্তা নেই এবং তাঁরা দুঃখিতও হবে না।” (সূরা ইউনুস: ৬২)। ওলী-আউলিয়াদের অন্তর সবসময় আল্লাহর স্মরণে মগ্ন থাকে এবং তাঁদের সংস্পর্শে এলে সাধারণ মানুষের মনেও আল্লাহর ভয় এবং মহব্বত জাগ্রত হয়।
ওলী-আউলিয়াদের রূহানী সান্নিধ্য এর প্রয়োজনীয়তা কেন?
মানবাত্মার রোগ যেমন-অহংকার, হিংসা, রিয়া (লোকদেখানো ভাব) এবং দুনিয়ার লোভ দূর করার জন্য একজন দক্ষ রূহানী শিক্ষকের প্রয়োজন হয়। আর এই শিক্ষকই হলেন ওলী-আউলিয়া বা পীর-মুর্শিদ। ওলী-আউলিয়াদের রূহানী সান্নিধ্য মানুষের ভেতরকার এই আত্মিক রোগগুলো দূর করতে অলৌকিক ভূমিকা পালন করে।
কুরআনের আলোয় সৎ সঙ্গের গুরুত্ব
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা আদেশ দিয়েছেন, “হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহকে ভয় করো এবং সত্যবাদীদের (সাদেকীন) সাথী হও।” (সূরা তাওবা: ১১৯)। এই আয়াতে ‘সত্যবাদী’ বা আল্লাহওয়ালাদের সাথে থাকার যে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, তা-ই মূলত সুফিবাদের পরিভাষায় রূহানী সান্নিধ্য বা সোহবত। ভালো মানুষের সঙ্গ যেমন মানুষকে ভালো বানায়, তেমনি আল্লাহর বন্ধুদের সঙ্গ মানুষকে আল্লাহর খাঁটি বান্দা হতে সাহায্য করে।
আনুগত্য নাকি আত্মশুদ্ধি?
ওলী-আউলিয়া বা পীর-মুর্শিদের আদেশ-নিষেধ মানা আনুগত্য মনে হলেও, এর অভ্যন্তরীণ গভীর সত্যটি হলো সম্পূর্ণ আত্মশুদ্ধি। পীর-মুরিদী বা ওলী-আউলিয়াদের রূহানী সান্নিধ্য এর মূল কাজই হলো মানুষের নফসকে দমন করা।
আত্মশুদ্ধির আসল পাঠশালা
মানুষ যখন নিজের অহংকার বিসর্জন দিয়ে একজন কামেল ওলীর কাছে আত্মসমর্পণ করে, তখন তার ভেতরের ‘আমি’ ভাবটি ধ্বংস হয়ে যায়। সুফি সাধকগণ বিভিন্ন আমল, জিকির এবং মোরাকাবার মাধ্যমে মুরিদের কলব বা অন্তরকে পরিষ্কার করেন। লোহা যেমন কামারের আগুনে পুড়ে খাঁটি ইস্পাতে পরিণত হয়, তেমনি একজন সাধারণ মানুষ ওলীর রূহানী ফয়েজ ও নেক নজরে পড়ে একজন মুত্তাকী পরহেজগার মানুষে রূপান্তরিত হয়।
রূহানী সম্পর্কের গভীরতা
এই সম্পর্কটি কেবল জাগতিক কোনো লেনদেনের সম্পর্ক নয়, এটি রূহের সাথে রূহের সম্পর্ক। ওলী-আউলিয়াদের নেক দোয়া এবং রূহানী দৃষ্টি মানুষের অন্তরের মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে। ইসলামের ইতিহাসে দেখা গেছে, বড় বড় পাপাচারী মানুষও কোনো ওলীর একটি মাত্র ফয়েজের নজরে পড়ে যুগের শ্রেষ্ঠ ওলীতে পরিণত হয়েছেন।
উপসংহার
পরিশেষে বলা যায়, ওলী-আউলিয়াদের রূহানী সান্নিধ্য কোনো অন্ধ প্রথা বা লোকদেখানো আনুগত্য নয়, বরং এটি হলো মনকে পবিত্র করার এবং আল্লাহর কাছে পৌঁছানোর একটি রূঢ় সত্য ও পরীক্ষিত মাধ্যম। যতক্ষণ না আমরা কোনো আল্লাহওয়ালার হাত ধরে আমাদের ভেতরের হিংসা ও অহংকার দূর করতে পারছি, ততক্ষণ কিতাব পড়ে প্রকৃত আধ্যাত্মিক স্বাদ পাওয়া অসম্ভব। তাসাউউফ আমাদের এটাই শেখায় যে, নিজেকে আল্লাহর প্রেমে বিলীন করতে হলে এমন একজনের সাহায্য চাই যিনি নিজে সেই পথ চিনেছেন। মহান আল্লাহ আমাদের সকলকে ওলী-আউলিয়াদের মর্যাদা বোঝার এবং তাঁদের রূহানী ফয়েজ লাভ করার তৌফিক দান করুন। আমীন।










