দয়াল নবী আপনার দরবারে আমি গোলাম হাজির হইয়াছি।
নূর নবীজি ﷺ নূর নাকি মাটি-বর্তমান মুসলিম সমাজে তথাকথিত কিছু ইসলামপন্থী ও উগ্র সালাফী-ওহাবী ফেরকাদের মনগড়া ফতোয়ার কারণে এটি একটি চরম বিতর্কিত বিষয়ে পরিণত হয়েছে, যা আধুনিক যুগের এক জঘন্য ধর্মীয় অবক্ষয় ও বাস্তবতা। মুখে নিজেদের ইসলামের ধারক-বাহক দাবি করলেও, এই বাতিল ফেরকারা নূর নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম যে নূর তা অস্বীকার করে, তাদের নিজেদের মতো একজন ‘সাধারণ মাটির মানুষ’ বলে দাবি করার দুঃসাহস দেখায়। তাদের এই ভ্রান্ত আকিদা মূলত ঈমান হরণের এক জঘন্য চক্রান্ত। আজ আমরা পবিত্র কুরআন, সহীহ হাদিস শরীফের অকাট্য দলিল, সাহাবায়ে কেরামের পবিত্র আকিদা এবং আউলিয়ায়ে কেরামের অমিয় বাণীর জৌলূস ছড়ানো আলোয় জানবো নূর নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নূরানী সত্তার নিগূঢ় হাকিকত এবং বাতিলদের কুযুক্তির মুখোশ চাক্ষুষ উন্মোচন করব।
পবিত্র কুরআনের অকাট্য দলীলের আয়নায় রাসূলে পাক ﷺ-এর নূরানী হাকিকত
আহলে সুন্নাত ওয়াল জামায়াতের আকিদা অনুযায়ী মহান আল্লাহ রব্বুল আলামীন আল্লাহ তাঁর প্রিয় হাবীব নূর নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে সর্বপ্রথম নিজের নূর থেকে সৃষ্টি করেছেন। পবিত্র কুরআনের সূরা মায়েদার ১৫ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ পাক এরশাদ করেন: “ক্বাদ জা-আকুম মিনাল্লাতি নূরুন ওয়া কিতাবুম মুবীন।” অর্থাৎ, “নিশ্চয়ই তোমাদের নিকট আল্লাহর পক্ষ থেকে এসেছে নূর এবং সুস্পষ্ট কিতাব।”
আলা হযরত ইমাম আহমদ রেযা খান বেরলভী রহমাতুল্লাহি আলাইহি তেনার কালজয়ী ‘তাফসীরে কানযুল ঈমান’ এবং হাকিমুল উম্মাত মুফতি আহমদ ইয়ার খান নঈমী রহমাতুল্লাহি আলাইহি তেনার ‘তাফসীরে নূরুল ইরফান’-এ অকাট্য আরবী ব্যাকরণের আলোয় চাক্ষুষ প্রমাণ করেছেন যে- এই আয়াতে বর্ণিত ‘নূর’ শব্দের একমাত্র প্রকৃত হাকিকত হলেন স্বয়ং নূর নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবং ‘কিতাব’ হলো পবিত্র কুরআন।
জগৎবিখ্যাত তাফসীর কারক ইমাম জালালুদ্দীন সুয়ূতী রহমাতুল্লাহি আলাইহি তেনার ‘তাফসীরে জালালাইন’ ইমাম তাবারী রহমাতুল্লাহি আলাইহি তেনার ‘তাফসীরে তাবারী’ এবং ইমাম ফখরুদ্দীন রাযী রহমাতুল্লাহি আলাইহি তেনার ‘তাফসীরে কাবীরে অকাট্য সনদে লিপিবদ্ধ করেছেন যে- এই আয়াতে ‘নূর’ শব্দ দ্বারা স্বয়ং নূর নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে বোঝানো হয়েছে। অতএব, স্বয়ং আল্লাহ পাক যেনাকে ‘নূর’ বলে পাঠালেন, তেনাকে যারা অবলীলায় শুধু ‘মাটি’ বলে ফতোয়া দেয়, তাদের বাতেনি অন্ধত্ব এক পরম মূর্খতার শামিল। নূর নবীজি ﷺ নূর নাকি মাটি এই প্রশ্নের চূড়ান্ত ফয়সালা স্বয়ং আল্লাহর কালাম দ্বারাই একশত ভাগ প্রমাণিত।
সহীহ হাদিস শরীফের আলোয় সৃষ্টির আদি হাকিকত ও ‘নূরে মোহাম্মদী’
পবিত্র হাদিস শরীফের মহাসমুদ্র গভীর অনুসন্ধান করলে দেখা যায়, যখন আসমান, জমিন, আরশ-কুরসি, লওহ-কলম, জান্নাত কিংবা জাহান্নাম- কোনো কিছুরই অস্তিত্ব ছিল না, তখনও নূর নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নূর মোবারক আল্লাহর দরবারে ছিল। মুসান্নাফে ইবনে আবী শায়বাহ এবং ইমাম কাসতালানী রহমাতুল্লাহি আলাইহি তেনার ‘মাওয়াহিবুল লাদুন্নিয়া’ গ্রন্থে মুহাদ্দিসগণের নির্ভরযোগ্য ও বিশুদ্ধ সনদে হযরত জাবের রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত বিখ্যাত হাদিসটি উল্লেখ করেছেন।
হযরত জাবের রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু আরজ করলেন, “ইয়া রসূলাল্লাহ সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম! আমার পিতা-মাতা আপনার কদম মোবারকে কোরবান হোক, আপনি মেহেরবানী করে জানান-মহান আল্লাহ সর্বপ্রথম কোন জিনিস সৃষ্টি করেছিলেন?” তখন কুল কায়েনাতের রহমত, দয়াল নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরশাদ করলেন, “হে জাবের! নিশ্চয়ই মহান আল্লাহ রব্বুল আলামীন সমস্ত কিছু সৃষ্টির পূর্বে তেনার নিজের নূর হতে তোমার নবীর নূরকে সৃষ্টি করেছেন।” এই সহীহ দালিলিক বিবরণ চাক্ষুষ প্রমাণ করে যে, মহান আল্লাহ নূর নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নূর মোবারক সর্বপ্রথম সৃষ্টি করেছেন। যা উগ্র ওহাবী ও সালাফী ফেরকাদের কুযুক্তির বুকে হকের এক প্রচণ্ড আঘাত।
সাহাবায়ে কেরামগণের আকিদা এবং নূর নবীজির শানে ঈমানী কাসিদা
১. সুনানে তিরমিযী শরীফ: ইমাম তিরমিযী রহমাতুল্লাহি আলাইহি তেনার ‘কিতাবুশ শিমায়িল’ (শিমায়িলে তিরমিযী)-এর শুরুতেই মওলা আলী আলাইহিস সালাম থেকে এই হাদিসটি নির্ভরযোগ্য সনদে বর্ণনা করেছেন [হাদিস নম্বর: ৭]।
২. দলাইলুন নবুওয়াত: ইমাম বায়হাকী রহমাতুল্লাহি আলাইহি তেনার কিতাবের ১ম খণ্ডে মওলা আলী আলাইহিস সালাম-এর সূত্রে স্পষ্ট উল্লেখ করেছেন যে-নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন হাঁটতেন, তেনার নূরানী শরীর মোবারক থেকে কুদরতি আলো বিচ্ছুরিত হতো এবং তেনার কোনো ছায়া মাটিতে পড়ত না।”
নূর নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর আপন চাচাতো ভাই হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু, যিনি ছোটবেলা থেকেই নূর নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর খেদমত করেছেন। একদিন তেনার পরম আদব দেখে নূর নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম তেনার বুকে কুদরতি হাত মোবারক রেখে খাস দোয়া করলেন-‘হে আল্লাহ! তুমি একে দ্বীনের গভীর জ্ঞান এবং কুরআনের তাফসীর বোঝার খাস তৌফিক দান করো।’
এই কুদরতি দোয়ার বরকতেই তিনি ইসলামের ইতিহাসে ‘রইসুল মুফাসসিরীন’ (তাফসীর কারকগণের সুলতান) এবং ‘বাহরুল এলম’ (জ্ঞানের মহাসমুদ্র) উপাধিতে ভূষিত হয়েছেন। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু তেনার জগতখ্যাত ‘তাফসীরে আব্বাসিয়া’তে সূরা মায়েদার ১৫ নম্বর আয়াতের তাফসির করতে গিয়ে স্পষ্ট এরশাদ করেন- পবিত্র কুরআনে আল্লাহ পাক যে ‘নূর’ এর কথা বলেছেন, সেই নূর হলো স্বয়ং দয়াল নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম। তিনি আরও বলেন- নূর নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন সূর্যের আলোতে কিংবা চাঁদের আলোতে হাঁটতেন, তেনার কোনো ছায়া জমিনে দৃশ্যমান হতো না। কারণ আলোর কখনো কোনো ছায়া হয় না, ছায়া কেবল অন্ধকার বা ঘন অস্বচ্ছ বস্তুর হয়।
দলিল: ইমাম জালালুদ্দীন সুয়ূতী রহমাতুল্লাহি আলাইহি তেনার ‘আল-খাসাইসুল কুবরা, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা নং ১৫৬ কিতাবে উল্লেখ করেছেন।”
নূর নবীজি ﷺ নূর নাকি মাটি? ওলী-আল্লাহগণের বাণীর আয়নায় আসল সত্য উন্মোচন
গাউছুল আজম বড় পীর হযরত আব্দুল কাদির জিলানী রহমাতুল্লাহি আলাইহি তেনার অমর আধ্যাত্মিক কিতাব ‘সিররুল আসরার’-এর প্রথম অধ্যায়ে সৃষ্টির আদি রহস্য উন্মোচন করে এক জগতকাঁপানো হাকিকত এরশাদ করেছেন। তিনি বলেন, ‘জেনে রাখো, মহান আল্লাহ রব্বুল আলামীন সর্বপ্রথমে যা সৃষ্টি করেছেন, তা হলো নূরে মোহাম্মদী সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম। স্বয়ং আল্লাহ পাক এরশাদ করেছেন-আমি আমার কুদরতি নূর থেকে আমার বন্ধু নূর নবীজি ﷺ-এর নূর মোবারক সৃষ্টি করেছি, আর সেই পবিত্র নূর হতেই আরশ, কুরসি, লওহে মাহফুজ, কলম, ফেরেশতা এবং সমগ্র কুল কায়েনাত সৃষ্টি করেছি।
ইমামে রব্বানী মুজাদ্দিদে আলফে সানী রহমাতুল্লাহি আলাইহি তেনার অমর কিতাব ‘মাকতুবাত শরীফ’-এর ১ম খণ্ডে এক জগতকাঁপানো হাকিকত চাক্ষুষ বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন- নবীজির এই বাশারিয়্যাত হলো মূলত আল্লাহর একটি কুদরতি পর্দা। যদি নবীজি তেনার আসল নূরের তীব্র জ্যোতি নিয়ে সরাসরি প্রকাশ পেতেন, তবে দুনিয়ার কোনো মানুষ তেনার সামনে এক সেকেন্ডও টিকতে পারত না, সবাই নূরের আলোয় পুড়ে ছাই হয়ে যেত। উম্মত যেন তেনার কাছে এসে ঈমান কবুল করতে পারে, সেজন্যই তিনি বাশারী সুরতে শুভ আগমন করেছেন। অতএব, দুনিয়ার কোনো সাধারণ মাটির মানুষের সাথে তেনাকে তুলনা করা এক পরম বাতেনি অন্ধত্বের শামিল।
ইমামে রব্বানী মুজাদ্দিদে আলফে সানী রহমাতুল্লাহি আলাইহি আরও এরশাদ করেন, ‘দয়াল নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর বাশারিয়্যাত বা মানবীয় লেবাস হলো মূলত একটি কুদরতি পর্দা; যাতে সাধারণ মানুষ তেনার নূরের তীব্র জ্যোতিতে পুড়ে না গিয়ে পরম সুখে তেনার সান্নিধ্যে এসে ঈমান কবুল করতে পারে। কিন্তু যারা কেবল সেই বাহ্যিক পর্দাকেই একমাত্র সত্য মনে করে ভেতরের আসল কুদরতি নূরকে অস্বীকার করে, তাদের মানসিক হাকিকত মূলত আবু লাহাব ও আবু জাহেলের সেই বাতেনি অন্ধত্বের মতোই-যারা নূর নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে কেবলই একজন সাধারণ মাটির মানুষ মনে করে চিরতরে ঈমান থেকে মাহরূম হয়েছিল।
ভারতবর্ষের আধ্যাত্মিক সম্রাট, সুলতানুল হিন্দ হযরত খাজা মঈনুদ্দীন চিশতী গরীব নওয়াজ রহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, ‘নূর নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম হলেন আল্লাহর জাতি নূরের জ্যোতি। আজ সমগ্র হিন্দুস্তানে ইসলামের যে নূরের আলো ছড়িয়ে পড়েছে, তা মূলত দয়াল নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সেই পবিত্র নূরে মোহাম্মদীরই এক জ্যান্ত মোজেজা!’ চিশতীয়া তরিকার এই মহান ওলীর নূরানী বাণী ঈমানদার মুসলমানদের আকিদাকে যুগের পর যুগ ধরে হিরের টুকরোর মতো ঝকঝকে ও লোহার মতো মজবুত করে তোলে।
একইভাবে চতুর্দশ হিজরীর মহান মুজাদ্দিদ, আলা হযরত ইমাম আহমদ রেযা খান ফাযেলে বেরলভী রহমাতুল্লাহি আলাইহি তেনার বিশ্ববিখ্যাত ও কালজয়ী পবিত্র কুরআনের তরজমা ‘তাফসীরে কানযুল ঈমান’ এবং তেনারই খাস শরাহ ‘তাফসীরে নূরুল ইরফান’-এ সূরা আল-মায়েদার ১৫ নম্বর আয়াতের তাফসির ও বাতেনি মর্ম চাক্ষুষ উন্মোচন করতে গিয়ে স্পষ্ট ফয়সালা দান করেছেন যে- এই পবিত্র আয়াতে আল্লাহ পাক বর্ণিত ‘নূর’ বলতে একক ও সুনির্দিষ্টভাবে স্বয়ং নূর নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে বোঝানো হয়েছে।
তরিকতের আসমানের উজ্জ্বল নক্ষত্র, দয়াল বাবা জালালী মাওলা বলেন- ‘আমার দয়াল নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম কেবল কোনো সাধারণ সৃষ্টিগত নূর নন, তেনাকে অন্য কোনো সৃষ্টির মতো সহজে পরিমাপ করা যায় না; বরং তিনি হলেন স্বয়ং আল্লাহ পাকের পবিত্র জাতি নূরের জ্যোতি! তিনি হলেন রহমাতুল্লিল আলামিন, সমগ্র সৃষ্টিজগৎ তেনার রহমতে টিকে আছে। যে সৌভাগ্যবান ব্যক্তি নূর নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর এই চিরন্তন, অলৌকিক ও নূরানী হাকিকতকে কোনো প্রকার কুযুক্তি ছাড়া নিজের অন্তরের অন্তস্তল থেকে বিশ্বাস ও মনে-প্রাণে স্বীকার করে, সে-ই হলো জগতের বুকে রাসূলে পাকের প্রকৃত আশেকে রসূল, হক্কানী সুন্নী এবং একশত ভাগ খাঁটি ঈমানদার।










