দয়াল নবী আপনার দরবারে আমি গোলাম হাজির হইয়াছি।
মারেফাতের গহীন রহস্য হলো অন্তরের এমন এক ঐশ্বরিক আলো, যা কোনো সাধারণ কাগজের পাতায় বা কিতাবের অক্ষরে লিখে প্রকাশ করা যায় না। যান্ত্রিক এই দুনিয়ায় মানুষ আজ কেবল কাগজের বই আর কিতাবের পাতার বাহ্যিক জ্যামের মাঝে প্রকৃত জ্ঞান খুঁজে বেড়ায়। কিন্তু স্রষ্টাকে পাওয়ার আসল জ্যান্ত এলেম কিতাবের শুষ্ক অক্ষরে নয়, বরং ওলী-আল্লাহদের নূরানি হৃদয়ের গহীনে চাক্ষুষ লুকিয়ে থাকে।
আজ আমরা পরম আদবে উন্মোচন করবো মারেফাতের গহীন রহস্য, যা ওলীগণের সিনা-বসিনা আধ্যাত্মিক শিক্ষার মহিমান্বিত ফয়েজের মাধ্যমে এক হৃদয় থেকে অন্য হৃদয়ে স্বয়ংক্রিয়ভাবে স্থানান্তরিত হয়। কিতাবি এলেমের চাক্ষুষ সীমানা যেখানে শেষ, মারেফাতের আধ্যাত্মিক জগতের মহাসমুদ্রের রাজকীয় যাত্রা ঠিক সেখান থেকেই শুরু হয়।
কিতাবি এলেম বনাম সিনা-বসিনা নূরানি শিক্ষা
বাহ্যিক কিতাব পড়ে শরীয়তের নিয়ম-কানুন শেখা যায়, কিন্তু নফসকে পবিত্র করতে হলে কামেল মুর্শিদের নূরানি নজরের কোনো বিকল্প নেই। এই মারেফাতের গহীন রহস্য বুঝতে হলে কাগজের এলেমের অহংকার চাক্ষুষ বিসর্জন দিতে হয়। আধ্যাত্মিক জগতের সম্রাট মাওলানা জালালুদ্দিন রুমি রহমাতুল্লাহি আলাইহি তেনার কিতাবে এক অমর অমিয় বাণীতে বলেছেন-“তুমি যদি কিতাবের পৃষ্ঠা উল্টিয়ে পন্ডিত হতে চাও, তবে জানবে তুমি কেবল কাগজের বোঝা বহন করছ। যদি প্রকৃত সত্যকে জানতে চাও, তবে কোনো ওলী-আল্লাহর হৃদয়ের আয়নায় নিজেকে সমর্পণ করো।” ওলীগণের এই সিনা-বসিনা শিক্ষাই ঈমানদারের কলবকে জিন্দা করে।
মুর্শিদের সোহবত ও কলব জিন্দা করার হাকিকত
মারেফাতের পথে কিতাবের চেয়ে মুর্শিদের সোহবত বা সান্নিধ্য মস্ত বড় নেয়ামত। বড়পীর হযরত আব্দুল কাদির জিলানী রহমাতুল্লাহি আলাইহি তেনার এক বরকতময় নসিহতে পরিষ্কার করে বলেছেন- “হে মানুষ! তোমার কলব যখন দুনিয়ার মোহে অন্ধ হয়ে যায়, তখন কোনো কিতাব তোমাকে আলো দিতে পারে না। কেবল একজন জিন্দা আরিফ বিল্লাহর নূরানি সিনা থেকে নির্গত ফয়েজ ও বরকতই তোমার অন্ধ কলবকে এক সেকেন্ডে চাক্ষুষ জিন্দা করতে পারে।” ওলীগণের এই গোপন রূহার্নী দৃষ্টিই বান্দাকে স্রষ্টার খাঁটি প্রেমে মত্ত করে তোলে।
মারেফাতের গহীন রহস্য ও ওলীগণের ৩টি পরম বাণী
এই আধ্যাত্মিক শিক্ষার গভীরতা ও সৌন্দর্য বুঝতে হলে নিম্নের এই ৩টি অমিয় বাণী অন্তরের কান দিয়ে চাক্ষুষ অনুভব করতে হবে:
মাওলা আলী আলাইহিস সালাম: “যে নিজের নফস বা আত্মাকে চিনতে পেরেছে, সে মূলত তেনারি পরম প্রতিপালক আল্লাহকে চাক্ষুষ চিনতে পেরেছে।”
সুলতানুল হিন্দ খাজা মঈনুদ্দিন চিশতী রহমাতুল্লাহি আলাইহি: “মারেফাত হলো আমিত্বের দেয়াল ভেঙে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দেওয়া। বান্দা যখন নিজের অস্তিত্ব বিলীন করে দেয়, তখন পরম স্রষ্টা ছাড়া আর কিছুই অবশিষ্ট থাকে না।”
হযরত শামস তাবরিজি রহমাতু্ল্লাহি আলাইহি: “তামাম দুনিয়ার কিতাব তোমাকে শুধু পথ দেখাতে পারে, কিন্তু গন্তব্যে পৌঁছানোর রাজকীয় আলো কেবল মুর্শিদের মহব্বত থেকেই আসে।”
উপসংহার: হৃদয়ের আয়নায় স্রষ্টার চাক্ষুষ দর্শন
পরিশেষে বলা যায়, মারেফাতের গহীন রহস্য হলো নিজের ভেতরের ‘আমি’ তথা প্রকৃত আত্মাকে চাক্ষুষ চেনা ও জানা। কারণ আধ্যাত্মিক জগতের সত্য হলো-যে ব্যক্তি নিজের নফসের হাকিকত বা নিজেকে চিনতে পেরেছে, সে মূলত তেনার পরম প্রতিপালক মহান রবকেই চিনে নিয়েছে। আর যখনই বান্দার অন্তর থেকে আমিত্বের তামাম পর্দা সরে যায়, তখনই হৃদয়ের স্বচ্ছ আয়নায় স্রষ্টার মহব্বতের এক অলৌকিক ও চাক্ষুষ দর্শন ঘটে যায়।
কামেল ওলী-আল্লাহগণ তেনাদের সিনা-বসিনা নূরানি তাওয়াজ্জুহ ও আধ্যাত্মিক শিক্ষার মাধ্যমে এই ‘আমি’ বা আত্মার গোপন রহস্য প্রতিটি যুগের মানুষকে চাক্ষুষ বিলিয়ে আলোর পথ দেখিয়েছেন। দয়াল আল্লাহ আমাদের সবাইকে কামেল ওলীগণের উসিলায় কিতাবি এলেমের তামাম অহংকার ও জ্যাম থেকে মুক্ত করে অন্তরের সেই খাঁটি নূরানি এলেম ও মারেফাতের পরম সুধা অর্জন করার তৌফিক দান করুন। আমীন।










