দয়াল নবী আপনার দরবারে আমি গোলাম হাজির হইয়াছি।
জান্নাতুল বাকীর পবিত্র মাজারসমূহ ভাঙার জঘন্য ইতিহাস- মূলত সমগ্র মুসলিম উম্মাহর বুকে এক চিরন্তন বেদনাদায়ক ও চরম কলঙ্কজনক অধ্যায়। পবিত্র মদিনা মোনাওয়ারার বুকে অবস্থিত জান্নাতুল বাকী হলো সেই পবিত্রতম স্থান, যেখানে স্বয়ং দয়াল নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর পবিত্র আহলে বাইত, উম্মাহাতুল মুমিনীন এবং ১০ হাজারেরও বেশি সাহাবায়ে কেরাম চির জাগ্রত অবস্থায় অবস্থান করছেন। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এই পবিত্র স্থানের মাজার মোবারকসমূহের ওপর সুদৃশ্য গম্বুজ ও সৌধ নির্মিত ছিল, যা বিশ্বজুড়ে মুসলমানদের হৃদয়ের স্পন্দন ছিল। কিন্তু হিজরি চতুর্দশ শতাব্দীর শুরুতে নজদ মরুভূমি থেকে আগত উগ্র, চরমপন্থী মুহাম্মদ ইবনে আব্দুল ওহাব নজদীর ভ্রান্ত আকিদায় দীক্ষিত ওহাবী-সালাফী ফেরকা এবং আল-সাউদ বংশের দস্যুরা পবিত্র মদিনা আক্রমণ করে এই জান্নাতী মাজারসমূহকে মাটির সাথে মিশিয়ে দেয়। আজ আমরা ইতিহাসের নির্ভরযোগ্য দলিল এবং সত্য খতিয়ানের আলোয় জানবো জান্নাতুল বাকী ধ্বংসের সেই জঘন্য নেপথ্য কাহিনী এবং ওহাবী সম্প্রদায়ের ভ্রান্ত আকিদার আসল মুখোশ উন্মোচন।
জান্নাতুল বাকীর ঐতিহাসিক গুরুত্ব ও আহলে বাইতের পবিত্র মাকাম
ইসলামের সোনালী ইতিহাস এবং মুহাদ্দিসগণের নির্ভরযোগ্য কিতাবসমূহ গভীর অনুসন্ধান করলে চাক্ষুষ দেখা যায়, জান্নাতুল বাকী কেবল একটি সাধারণ কবরস্থান নয় বা সামাজিক সমাধিস্থল নয়, বরং এটি হলো নূরানী আলোয় ঘেরা জান্নাত। এখানে শুয়ে আছেন খাতুনে জান্নাত মা ফাতেমা আলাইহাস সালাম, ইমাম হাসান আলাইহিস সালাম, ইমাম জয়নুল আবেদীন আলাইহিস সালাম, ইমাম মুহাম্মদ বাকের আলাইহিস সালাম এবং ইমাম জাফর সাদিক আলাইহিস সালাম। এছাড়াও নূর নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর পবিত্র সহধর্মিণীগণ তথা উম্মাহাতুল মুমিনীন এবং ইসলামের ৩য় খলিফা হযরত উসমান জিন্নূরাইন রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু-এর পবিত্র মাজার শরীফ এখানেই অবস্থিত। তেনাদের এই পবিত্র পবিত্র অবস্থানের কারণে মদিনা শরীফের এই মাটি যুগ যুগ ধরে ঈমানদার মুসলমানদের জন্য ফয়েজ ও বরকতের মূল আধার হয়ে আছে।
শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে বাগদাদ, কায়রো, দামেস্ক এবং উসমানীয় খিলাফতের রাজকীয় সুলতানগণ এই পবিত্র মাজারসমূহের ওপর অত্যন্ত চমৎকার এবং শৈল্পিক গম্বুজ তৈরি করেছিলেন। বিশেষ করে খাতুনে জান্নাত মা ফাতেমা আলাইহাস সালাম এবং ইমাম হাসান আলাইহিস সালাম-এর রওজা মোবারকের ওপর নির্মিত সেই বিশাল ও রাজকীয় গম্বুজটি দূর থেকে চাক্ষুষ দেখা যেত, যা জিয়ারতকারীদের কলবকে এক পরম আধ্যাত্মিক শান্তিতে সিক্ত করত। প্রতিটি গম্বুজের নিচে রাজকীয় রেশমী চাদর ও সুগন্ধি মোবারক দিয়ে সাজানো থাকত, যা ছিল নূর নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর পরিবারের প্রতি ঈমানদার মুসলমানদের সর্বোচ্চ শ্রদ্ধা, পরম সম্মান এবং গভীরতম ভালোবাসার এক জীবন্ত নিদর্শন। কিন্তু উগ্র নজদী ওহাবীদের কলবে আহলে বাইতের এই মহব্বত সহ্য হয়নি, যার ফলে তারা এই কুদরতি ঐতিহ্যকে ধ্বংস করার জঘন্য ছক কষে।
ওহাবী ফেতনার উত্থান এবং পবিত্র হেজাজে প্রথম রক্তক্ষয়ী আক্রমণ (১৮০৬ খ্রিষ্টাব্দ)
ইতিহাসের পাতা ওল্টালে চাক্ষুষ সত্য প্রমাণিত হয় যে, জান্নাতুল বাকীর ওপর এই জঘন্য আঘাত ১৯২৬ সালে হঠাৎ করে আসেনি, বরং তার পেছনে রয়েছে ওহাবী ফেরকার আড়াইশো বছরের দীর্ঘ হিংস্র ও রক্তপিপাসু ইতিহাস। অষ্টাদশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে আরবের নজদ মরুভূমি থেকে মুহাম্মদ ইবনে আব্দুল ওহাব নজদী যখন তার চরমপন্থী ও ভ্রান্ত মতবাদ প্রচার শুরু করে, তখন তার প্রথম টার্গেটই ছিল ওলী-আল্লাহদের মাজারসমূহ। ১৭৪৪ খ্রিষ্টাব্দে সে দিরইয়ার শাসক ইবনে সাউদের সাথে হাত মিলিয়ে একটি উগ্র সামরিক চুক্তি করে, যা ইতিহাসে ‘সাউদ-ওহাবী জোট’ নামে পরিচিত।
এই উগ্র বাহিনী প্রথমবার ১৮০৬ খ্রিষ্টাব্দে (১২২১ হিজরীতে) পবিত্র মদিনা মোনাওয়ারা আক্রমণ করে দখল করে নেয়। মদিনায় পা রেখেই ওহাবী দস্যুরা জান্নাতুল বাকীর পবিত্র মাজারসমুহ ভাঙচুর চালায়। সমকালীন আরব্য ইতিহাসবিদ ইবনে বিশর তার ওহাবী ঘেঁষা কিতাবেও স্বীকার করেছেন যে, ওহাবীরা মদিনার সমস্ত মাজারের গম্বুজ ভেঙে মাটির সাথে মিশিয়ে দিয়েছিল এবং রওজা শরীফগুলোর ভেতরে থাকা সোনা, রূপা ও রাজকীয় উপহারসামগ্রী লুণ্ঠন করে নজদে নিয়ে গিয়েছিল। পরবর্তীতে উসমানীয় খিলাফতের খলিফা সুলতান মাহমুদ (দ্বিতীয়) মিশরের গভর্নর মুহাম্মদ আলী পাশাকে পাঠিয়াই এই ওহাবী দস্যুদের মদিনা থেকে বিতাড়িত করেন এবং সরকারি কোষাগার থেকে কোটি স্বর্ণমুদ্রা খরচ করে জান্নাতুল বাকীর মাজারসমূহ পুনরায় আরও সুদৃশ্য গম্বুজে জ্যান্ত করে গড়ে তোলেন।
১৩৪৪ হিজরীর ৮ই শাওয়াল: মদিনার ইতিহাসে ওহাবী বর্বরতার দ্বিতীয় কালো দিন
উসমানীয় খিলাফতের পতনের পর, ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের বাতেনি ইশারায় ওহাবী সাউদ বাহিনী পুনরায় শক্তি সঞ্চয় করে ১৯২৫ সালে পবিত্র মক্কা ও মদিনা দখল করে নেয়। এরপর আসে সেই ইসলামের ইতিহাসের কলঙ্কিত কালো দিন- ১৯২৬ খ্রিষ্টাব্দের ২১শে এপ্রিল, মোতাবেক ১৩৪৪ হিজরীর ৮ই শাওয়াল। নজদী ওহাবী শাসক ইুন সাউদের প্রধান কাজী ইবনে বুলাইহিদ মদিনার আলেমদের তলোয়ারের মুখে জিম্মি করে একটি মনগড়া ও জোরপূর্বক ফতোয়া আদায় করে, যেখানে দাবি করা হয় যে মাজারের ওপর সৌধ রাখা নাকি ইসলাম বিরোধী।
এই ভ্রান্ত ও মনগড়া আকিদার ছায়ায় অন্ধ হয়ে তারা জান্নাতুল বাকীর পবিত্র মাজারসমূহের ওপর চড়াও হয়ে খাতুনে জান্নাত মা ফাতেমা আলাইহাস সালাম-এর রওজা, ইমামগণের রওজা, নবীজির চাচা হযরত আব্বাস রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু এবং নবীজির দুধমাতা হযরত হালিমা সা’দিয়ার মাজার শরীফ চূর্ণ-বিচূর্ণ করে ফেলে। সমকালীন বিশ্বের বিখ্যাত ইতিহাসবিদগণ লিখেছেন, যেদিন জান্নাতুল বাকীর গম্বুজগুলো ভেঙে মাটির সাথে মিশিয়ে দেওয়া হচ্ছিল, সেদিন মদিনার আকাশ কালো মেঘে ঢেকে গিয়েছিল এবং মদিনার সাধারণ মুসলমানরা ওহাবী দস্যুদের তলোয়ারের ভয়ে ঘরে বসে অশ্রুবিসর্জন করছিল। জান্নাতুল বাকীর পবিত্র মাজারসমূহ ভাঙার জঘন্য ইতিহাস কেবল পাথরের সৌধ ভাঙার ঘটনা নয়, এটি ছিল ঈমানদার মুসলমানদের আকীদা ও হৃদয়ের ওপর উগ্র সালাফী ফেরকার এক প্রচণ্ড ও জঘন্য আঘাত।
মুহাম্মদ ইবনে আব্দুল ওহাব নজদীর ভ্রান্ত আকিদা ও চরমপন্থার আসল মুখোশ
এই জঘন্য ধ্বংসযজ্ঞের নেপথ্যে যে মূল কুফরি আকিদাটি জ্যান্ত ছিল, তা হলো নজদের ইবনে আব্দুল ওহাবের তৈরি করা মনগড়া ওহাবী মতাদর্শ। এই বাতিল ফেরকার প্রধান ভ্রান্ত আকিদা হলো- ওলী-আল্লাহদের মাজার জিয়ারত করা, তেনাদের উসিলা ধরা কিংবা ওলীদের শানে গম্বুজ নির্মাণ করা নাকি বড় শিরক। তারা নিজেদের ছাড়া দুনিয়ার সমস্ত সুন্নী মুসলমানকে ‘মুশরিক’ ও ‘কাফের’ বলে ফতোয়া দেয়। এই উগ্র আকিদার কারণেই তারা মদিনার মুসলমানদের রক্ত ও সম্পদ হালাল মনে করেছিল এবং পবিত্র মাজারসমূহ ভাঙাকে সওয়াবের কাজ বলে বিশ্বাস করেছিল। তাদের মতে, মাজারের অস্তিত্ব নাকি তাওহীদের পরিপন্থী, যা এক মূর্খতার শামিল।
কিন্তু পবিত্র কুরআনের সূরা আল-কাহাফের ২১ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ স্পষ্ট এরশাদ করেছেন, আসহাবে কাহাফের ওফাতের পর তেনাদের স্মৃতিবিজড়িত গুহার ওপর বিশ্বাসী মুসলমানগণ বলেছিলেন- “আমরা অবশ্যই তেনাদের স্মরণে একটি মসজিদ (উপাসনালয় বা সৌধ) নির্মাণ করব।” উসুলে ফেকাহর আলোকে এই আয়াত চাক্ষুষ প্রমাণ করে যে, আল্লাহর খাস নেক বান্দা ও ওলীদের স্মরণে মাজার বা ইমারত তৈরি করা মোটেও শিরক নয়, বরং এটি পূর্ববর্তী আম্বিয়া ও সালেহীনদের এক পবিত্র সুন্নাত। জগতখ্যাত সুফী আলেম আল্লামা জামিল এফেন্দী সিদকী আল-জাহাবী তেনার ‘আল-ফজরুল সাদিক’ কিতাবে ওহাবীদের এই ভ্রান্ত আকিদাকে দাঁতভাঙা জবাব দিয়ে ধুলোয় মিশিয়ে দিয়েছেন। ওহাবী ও সালাফীদের এই মনগড়া ফতোয়া যে মাজার ভাঙা নাকি ইসলামের কাজ, তা কুরআনের এই অকাট্য দলিলের আঘাতে চূর্ণ হয়ে গেছে।
খিলাফতের ঐতিহ্য এবং বিশ্ব মুসলিমের চিরন্তন রক্তক্ষরণ
ইতিহাস চাক্ষুষ সাক্ষী, যতদিন পর্যন্ত পবিত্র মক্কা ও মদিনায় খেলাফতে উসমানী বা তুর্কি সুলতানদের শাসন কায়েম ছিল, ততদিন পর্যন্ত জান্নাতুল বাকী এবং মক্কা শরীফের জান্নাতুল মুয়াল্লার মাজারসমূহ অত্যন্ত রাজকীয় মর্যাদায় সুরক্ষিত ছিল। সুলতান আব্দুল হামীদ এবং সুলতান মাহমুদ তেনাদের নিজস্ব তহবিল থেকে অর্থ খরচ করে এই রওজা শরীফগুলোর গম্বুজ প্রতি বছর মেরামত করতেন। কিন্তু ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদীদের বাতেনি ইশারায় ওহাবী ফেরকারা উসমানীয় খেলাফতের বুকে পেছন থেকে ছুরি মারে এবং পবিত্র হেজাজ ভূমি দখল করে নিজেদের পারিবারিক রাজত্ব কায়েম করে।
১৯২৬ সালের ৮ই শাওয়ালের এই জঘন্য ঘটনার পর সমগ্র সুফি বিশ্ব তথা ভারত, পাকিস্তান, মিশর, সিরিয়া ও ইরানের মুসলমানদের মধ্যে এক প্রচণ্ড ক্ষোভ ও চিরন্তন রক্তক্ষরণ শুরু হয়। কলকাতার সুন্নী আলেমগণ এবং বোম্বাইয়ের আশেকানরা তীব্র প্রতিবাদ মিছিল করেন। বিশ্ববিখ্যাত সুন্নী আলেম আল্লামা কাযী ফজলুল্লাহ তেনার ঐতিহাসিক বাণীতে বলেছিলেন- “নজদীরা মদিনার মাজারগুলো ভাঙেনি, ভেঙেছে সুন্নী মুসলমানদের কলব।” কিন্তু উগ্র নজদী সরকার তাদের অস্ত্রের দাপটে ঈমানদার মুসলমানদের সেই বৈধ দাবিকে দাবিয়ে রাখে। আজকের দিনেও যারা সেই বাতিল আকিদার ছায়ায় অনুপ্রাণিত হয়ে ওলীদের মাজার ও খানকাহর শানে অসম্মান প্রদর্শন করে, তেনারা প্রকৃতপক্ষে মদিনার সেই ঐতিহাসিক নজদী ফেতনারই মানসিকতার এক জ্যান্ত প্রতিচ্ছবি।
শেষ কথা: ৮ই শাওয়ালকে স্মরণ এবং হকের ময়দানে সুন্নী জাগরণের আহ্বান
জান্নাতুল বাকীর পবিত্র মাজারসমূহ ভাঙার জঘন্য ইতিহাস- পরিশেষে সত্য ইতিহাস এবং কিতাবী দলীলমালার আলোকে এ কথা সত্য প্রমাণ করে যে, এটি মূলত নজদী ওহাবী ফেরকাদের আউলিয়া-বিদ্বেষ এবং ঈমান হরণের এক প্রকাশ্য ও কলঙ্কজনক দলিল। প্রতি বছর ৮ই শাওয়াল বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি ঈমানদার সুন্নী মুসলমান ‘ইয়াওমে গম’ বা শোক দিবস হিসেবে পালন করে এবং মদিনা শরীফের সেই পবিত্র মাজারসমূহ পুনরায় রাজকীয় গম্বুজে সুসজ্জিত করার বাতেনি দোয়া ও দাবি উত্থাপন করে। আসুন, আমরা ওহাবী-সালাফীদের এই মনগড়া ফতোয়া ও চরমপন্থী আকিদাকে বর্জন করি, আহলে বাইত ও ওলী-আল্লাহদের ইশকে নিজেদের কলবকে সর্বদা সজীব রাখি এবং হকের পথে অটল থাকি। মহান আল্লাহ রব্বুল আলামীন আমাদের সকলকে ফেতনাকারীদের হাত থেকে ঈমান রক্ষা করার খাস তৌফিক দান করুন। আমীন।







1 thought on “জান্নাতুল বাকীর পবিত্র মাজারসমূহ ভাঙার জঘন্য ইতিহাস: পবিত্র মদিনায় নজদী ওহাবী ফেতনার আসল মুখোশ উন্মোচন।”