দয়াল নবী আপনার দরবারে আমি গোলাম হাজির হইয়াছি।
মুর্শিদের প্রয়োজনীয়তা ও বায়াত— এই বিষয়টি আধ্যাত্মিক জগতের এক মহাসমুদ্র, যার গভীরতা ছাড়া খোদা প্রেমের সন্ধান পাওয়া অসম্ভব। সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ, নূর নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম মানবজাতিকে অন্ধকারের বুক চিরে আলোর পথ দেখিয়েছেন। তবে সেই মরমী আলোর পথ চিনে অন্তরের কলুষতা দূর করতে এবং আত্মশুদ্ধি অর্জন করতে একজন কামেল ওলী বা আধ্যাত্মিক শিক্ষকের নির্দেশনা অপরিহার্য। সুফি পরিভাষায় যাঁকে বলা হয় ‘মুর্শিদ’ বা পথপ্রদর্শক। আজকের পোস্টে আমরা পবিত্র কোরআন ও সুন্নাহর অকাট্য দলিলের আলোকে জানবো কীভাবে একজন কামেল মুর্শিদের হাত ধরে বায়াত গ্রহণের মাধ্যমে আধ্যাত্মিক জগতের সত্য গন্তব্যে পৌঁছানো সম্ভব হয়, যা শুনলে যেকোনো ঈমাদারের অন্তর খোদা প্রেমে ব্যাকুল হয়ে উঠবে।
পবিত্র কোরআনের অকাট্য দলিল
ইসলামের বাহ্যিক নিয়মকানুন কিতাব পড়ে শেখা গেলেও, অন্তরের রোগ নিরাময় এবং খোদা প্রেমের নিগূঢ় তত্ত্ব কোনো কামেল ওলীর সোহবত বা সান্নিধ্য ছাড়া অর্জন করা যায় না। পবিত্র কোরআনের সূরা আল-কাহাফের ১৭ নম্বর আয়াত থেকে স্পষ্ট বোঝা যায়, “আল্লাহ যাকে পথভ্রষ্ট করেন, তার জন্য কোনো সাহায্যকারী পথপ্রদর্শক (কামেল মুর্শিদ) থাকে না।”
শুধু তাই নয়, সুফি সাধক ও ওলী-আউলিয়াগণের অনুসরণের নির্দেশ দিয়ে সূরা তাওবার ১১৯ নম্বর আয়াতে আল্লাহ পাক ইরশাদ করেন, “হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহকে যথাযথ ভাবে ভয় করো এবং সত্যবাদীদের (সাদেকীন) সাথী হয়ে যাও।” এই আয়াত প্রমাণ করে যে, আল্লাহর চেনার পথে একজন কামেল মুর্শিদের ছায়া গ্রহণ করা খোদারই হুকুম।
হাদিস শরীফের আলোয় বায়াত গ্রহণের গুরুত্ব
বায়াত শব্দের অর্থ হলো আত্মসমর্পণ করা। নিজের হাত কামেল মুর্শিদের হাতে সঁপে দিয়ে আল্লাহর রাস্তায় চলার অঙ্গীকার করা। নূর নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর পবিত্র হাত মোবারকে হাত দিয়ে সাহাবায়ে কেরাম রাদিয়াল্লাহু আনহুম বায়াত গ্রহণ করেছেন।
সহীহ মুসলিম শরীফে বর্ণিত একটি বিখ্যাত হাদিসে নূর নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন, “যে ব্যক্তি বায়াত বা ইমামের আনুগত্যের চুক্তি ছাড়া মৃত্যুবরণ করল, সে জাহেলিয়াতের (অজ্ঞতার) ওপর মৃত্যুবরণ করল।” এই বাণীটি প্রমাণ করে যে, নিজের নফস বা অহংকারকে কোরবানি দিয়ে কোনো কামেল ওলীর হাত ধরে নূর নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর আধ্যাত্মিক চেইনে যুক্ত হওয়া কতটা জরুরি।
মুর্শিদ চেনার আসল হাকিকত ও বাদশাহর উদাহরণ
কামেল মুর্শিদ হলেন অন্তরের এমন একজন চিকিৎসক, যিনি শিষ্যের ভেতরের হিংসা, অহংকার ও দুনিয়ার মোহ দূর করে আল্লাহর জিকিরে অন্তরকে জ্যান্ত করে তোলেন। সুফি সাধকগণ একটি সুন্দর উদাহরণ দিয়ে বলেন, একজন সাধারণ মানুষ যদি কোনো অচেনা দুর্গম মরুভূমি পাড়ি দিতে চায়, তবে তার একজন অভিজ্ঞ পথপ্রদর্শকের প্রয়োজন হয়। পথপ্রদর্শক ছাড়া একা চলতে গেলে সে পথ হারিয়ে বিনাশ হয়ে যাবে। ঠিক তেমনি, নফসের ধোঁকা আর শয়তানের চক্রান্তের এই কঠিন দুনিয়ায় আল্লাহর সান্নিধ্য পেতে হলে একজন আধ্যাত্মিক গাইড বা মুর্শিদের সান্নিধ্যের কোনো বিকল্প নেই।
শেষ কথা
মুর্শিদের প্রয়োজনীয়তা ও বায়াত- কোনো মনগড়া প্রথা নয়, বরং এটি নূর নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবং তেনার সাহাবায়ে কেরাম রাদিয়াল্লাহু আনহুম-এর দেখানো জ্যান্ত আধ্যাত্মিক ধারা। ওলী-আউলিয়াগণের কারামত এবং তাঁদের পবিত্র জীবন আমাদের শিক্ষা দেয় যে, মুর্শিদের প্রতি গভীর ভক্তি এবং আদব বজায় রেখেই তাসাউফের সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছানো সম্ভব। মহান আল্লাহ আমাদের সবাইকে একজন কামেল মুর্শিদের নেক নজর নসিব করুন এবং তাঁর উসিলায় আমাদের অন্তরকে নূর নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর মহব্বতে জ্যান্ত রাখার তৌফিক দান করুন। আমীন।










