দয়াল নবী আপনার দরবারে আমি গোলাম হাজির হইয়াছি।
বাংলার জমিনে সুফিবাদের পদযাত্রা— এই এক অমর আধ্যাত্মিক ইতিহাস, যা এই সবুজ বাংলার প্রতিটি ধূলিকণায় ঈমানী নূর ছড়িয়ে দিয়েছে। হাজার বছর আগে যখন এই অঞ্চল ছিল পৌত্তলিকতা ও জাতিভেদের অন্ধকারে নিমজ্জিত, তখন মক্কা-মদীনা, ইয়েমেন ও পারস্য থেকে একদল খোদাপ্রেমী আশেক এ দেশে পা রাখেন। তেনারা তলোয়ার দিয়ে নয়, বরং নিজেদের উন্নত চরিত্র, অগাধ ভালোবাসা আর মরমী প্রেমের যাদু দিয়ে মানুষের হৃদয় জয় করেছিলেন। আজ আমরা জানবো বাংলার আনাচে-কানাচে সেই মহান আউলিয়াগণের ত্যাগের কাহিনী এবং কীভাবে সুফিবাদের হাত ধরে এই সবুজ বাংলায় ইসলামের বিজয় নিশান প্রজ্জ্বলিত হয়েছিল।
মরমী প্রেমের দাওয়াত ও সামাজিক বিপ্লব
বাংলার জমিনে সুফিবাদের পদযাত্রা শুরু হয়েছিল বখতিয়ার খিলজির রাজনৈতিক বিজয়েরও অনেক আগে। একাদশ শতাব্দী থেকেই শাহ সুলতান রুমি রহমাতুল্লাহি আলাইহি-এর মতো মহান সুফিরা ময়মনসিংহের দুর্গম এলাকায় ইসলামের আলো জ্বালাতে শুরু করেন। সেই সময়কার বর্ণবাদী সমাজ ব্যবস্থায় যখন নিম্নবর্ণের মানুষরা অবহেলিত ছিল, তখন সুফিদের খানকাগুলোতে রাজা-প্রজা সবাই এক কাতারে বসে খাবার খেত। এই সাম্য আর ভালোবাসার চাক্ষুষ দৃশ্য দেখে হাজার হাজার মানুষ ইসলামের সুশীতল ছায়ায় আশ্রয় নিয়েছিলেন।
হযরত শাহজালাল রহমাতুল্লাহি আলাইহি ও ৩৬০ আউলিয়া
“বাংলার আধ্যাত্মিক ইতিহাসের সবচেয়ে উজ্জ্বল নক্ষত্র হলেন হযরত শাহজালাল ইয়ামেনি রহমাতুল্লাহি আলাইহি। ১৩০৩ সালে তিনি ৩৬০ জন আউলিয়া নিয়ে সিলেটে পদার্পণ করেন। তাঁদের এই কাফেলা ছিল এক জ্যান্ত মুজিযার মহাসমুদ্র। তাঁরা শুধু নামাজ-রোজা শেখাননি, বরং মানুষের অভাব-অনটন দূর করতে কৃষি ও সমাজ সংস্কারেও ভূমিকা রেখেছেন। সেই সাথে মানুষকে আধ্যাত্মিক শিক্ষা দিয়ে পরিশুদ্ধ করেছেন এবং মহান আল্লাহ ও নূর নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে চিনিয়েছেন। সিলেটের মাটি থেকে শুরু করে চট্টগ্রাম, কুমিল্লা ও নোয়াখালী পর্যন্ত প্রতিটি জনপদে এই ৩৬০ আউলিয়ার ত্যাগ ও সাধনার চিহ্ন আজও অম্লান হয়ে আছে।”
খান জাহান আলী রহমাতুল্লাহি আলাইহি ও দক্ষিণাঞ্চলের জাগরণ
পঞ্চদশ শতাব্দীতে সুন্দরবন সংলগ্ন বাগেরহাট অঞ্চলে নূর নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর মহান আদর্শ নিয়ে হাজির হন হযরত খান জাহান আলী রহমাতুল্লাহি আলাইহি। তিনি শুধু একজন আধ্যাত্মিক সাধকই ছিলেন না, বরং রাস্তাঘাট নির্মাণ, দিঘি খনন এবং অসংখ্য মসজিদ তৈরির মাধ্যমে এই অঞ্চলকে বাসযোগ্য করে তুলেছিলেন। সুফিদের এই জনকল্যাণমূলক কাজগুলোই সাধারণ মানুষকে ইসলামের দিকে সবচেয়ে বেশি আকৃষ্ট করেছিল।
সুফিবাদের মরমী প্রভাব ও বর্তমান বাংলাদেশ
বাংলার জমিনে সুফিবাদের পদযাত্রা এই অঞ্চলের সংস্কৃতি ও সাহিত্যেও গভীর প্রভাব ফেলেছে। ঊনবিংশ শতাব্দী থেকে শুরু করে গাউসুল আজম মাইজভাণ্ডারী রহমাতুল্লাহি আলাইহি সুফিবাদের এই ধারাকে আধুনিক প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিয়েছেন। বিশেষ করে মদীনা থেকে হিজরত করে আসা হযরত আবেদ শাহ আল মাদানী রহমাতুল্লাহি আলাইহি, কুমিল্লার লাকসামের মোল্লা কাজিমুদ্দিন কালিয়াপুরি রহমাতুল্লাহি আলাইহি, গাজী আমিরুল ইসলাম জালালী মাওলা এবং নেত্রকোনার আল্লামা আকবর আলী রেজভী রহমাতুল্লাহি আলাইহি-এর মতো যুগান্তকারী আউলিয়াগণ তাঁদের আধ্যাত্মিক সাধনা ও ত্যাগের মাধ্যমে এই সবুজ বাংলায় ইসলামের মরমী দাওয়াত ছড়িয়ে দিয়েছেন। বিংশ শতাব্দী পেরিয়ে বর্তমান একবিংশ শতাব্দীতেও বাংলাদেশের প্রতিটি দরবার ও মাজারে যে জিকির ও শান্তির নূরানী পরিবেশ পাওয়া যায়, তা এই যুগের পর যুগ ধরে আসা আউলিয়াগণের ত্যাগেরই ফসল।
শেষ কথা
বাংলার জমিনে সুফিবাদের পদযাত্রা- কোনো সাধারণ ঘটনা নয়, এটি ছিল রহমাতাল্লিল আলামিন নূর নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর প্রদর্শিত সত্য ও প্রেমের এক বিশাল প্রতিফলন। বাংলার ওলী-আউলিয়াগণ নিজেদের পরিবার-পরিজন বিসর্জন দিয়ে এই দেশে এসেছিলেন শুধু আমাদের ঈমানের আলো দিতে। মহান আল্লাহ আমাদের সবাইকে এই মহান আউলিয়াগণের দেখানো পথে চলার এবং তেনাদের প্রতি গভীর ভক্তি ও ভালোবাসা পোষণ করার তৌফিক দান করুন। আমীন।










