দয়াল নবী আপনার দরবারে আমি গোলাম হাজির হইয়াছি।
ইশকে হাকিকি বা খোদা প্রেম— এই হলো আধ্যাত্মিক জগতের সেই পরম আগুন, যা কোনো অন্তরে একবার জ্বলে উঠলে দুনিয়ার সব মোহ এক সেকেন্ডে পুড়ে ছাই হয়ে যায়। নূর নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম মানবজাতিকে আল্লাহর প্রেমের যে স্বর্গীয় সুধা পান করিয়েছেন, তারই মরমী রূপ হলো ইশকে হাকিকি। এটি কোনো লৌকিক প্রেম নয়, বরং ক্ষণস্থায়ী পৃথিবীর মায়া ছিন্ন করে চিরন্তন স্রষ্টার মহব্বতে নিজের সত্তাকে বিলীন করে দেওয়ার নাম। আজকের পোস্টে আমরা ইসলামের মহান ওলী-আউলিয়া এবং সুফি সাধকদের অমর বাণীর আলোকে জানবো কীভাবে পার্থিব মোহ ছেড়ে খোদা প্রেমের এই মরমী দর্শনে মগ্ন হওয়া যায়, যা শুনলে যেকোনো আশেক ও ঈমানদারের রুহ জ্যান্ত হয়ে উঠবে।
ইশকে মায়াজি বনাম ইশকে হাকিকি
সুফি দর্শনে প্রেমকে প্রধানত দুটি ভাগে ভাগ করা হয়েছে। একটি হলো ‘ইশকে মায়াজি’ বা নশ্বর সৃষ্টির প্রতি সাময়িক মোহ, আর অন্যটি হলো ‘ইশকে হাকিকি’ বা অবিনশ্বর আল্লাহর প্রতি খাঁটি প্রেম। পার্থিব প্রেম মানুষকে একসময় ধোঁকা দেয়, কাঁদাবে এবং শূন্য করে দেয়। কিন্তু খোদা প্রেম মানুষকে দেয় অন্তহীন প্রশান্তি এবং আত্মিক মুক্তি। কামেল মুর্শিদগণ বলেন, ইশকে মায়াজি হলো এক ফোঁটা পানির মতো যা রোদে শুকিয়ে যায়, আর ইশকে হাকিকি হলো এমন এক অন্তহীন মহাসমুদ্র যার গভীরতা কিয়ামত পর্যন্ত শেষ হয় না।
হযরত রাবেয়া বসরী রহমাতুল্লাহি আলাইহা-এর ভালোবাসার হাকিকত
খোদা প্রেমের ইতিহাসে বসরা শহরের মহান সুফি সাধিকা হযরত রাবেয়া বসরী রহমাতুল্লাহি আলাইহা এক অনন্য নাম। তেনারপুরো জীবনটাই ছিল ইশকে হাকিকির এক জ্যান্ত মুজিযা। তিনি এক হাত মোবারকে জ্বলন্ত আগুন আর অন্য হাতে পানির পাত্র নিয়ে বসরার রাস্তায় দৌড়াতেন।”। মানুষ অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, “হে রাবেয়া! তুমি এমন করছ কেন?”
তিনি মরমী স্বরে উত্তর দিয়েছিলেন, “আমি এই পানি দিয়ে দোজখের আগুন নিভিয়ে দিতে চাই আর এই আগুন দিয়ে বেহেশতকে পুড়িয়ে দিতে চাই। যাতে মানুষ জাহান্নামের ভয়ে বা জান্নাতের লোভে আল্লাহর ইবাদত না করে; বরং শুধু আল্লাহর প্রেমে মগ্ন হয়ে খাঁটি ইশকে হাকিকির কারণে তাঁর সেজদা করে।” তাঁর এই বাণী আজও ওলী-আউলিয়াগণের তরিকার অন্যতম প্রধান ভিত্তি।
সুলতানুল আরেফীন বায়েজীদ বোস্তামী রহমাতুল্লাহি আলাইহি-এর অমর বাণী
আধ্যাত্মিক জগতের সুলতান হযরত বায়েজীদ বোস্তামী রহমাতুল্লাহি আলাইহি খোদা প্রেমের গভীরতা প্রকাশ করতে গিয়ে বলেছিলেন, “আমি দীর্ঘ ৩০ বছর ধরে আল্লাহর ইবাদত ও সাধনা করেছি। কিন্তু যখন আমি প্রেমের চোখ দিয়ে চাক্ষুষ তাকালাম, তখন দেখলাম যে- আমার সাধনা বা জিকির বড় কথা ছিল না, বরং আল্লাহর পক্ষ থেকে আমার প্রতি যে ভালোবাসা ছিল, সেটাই ছিল আসল চাবিকাঠি।” অর্থাৎ, বান্দা যখন আল্লাহর দিকে এক কদম বাড়ায়, আল্লাহ রহমতের হাত বাড়িয়ে বান্দাকে নিজের ইশকে নিমজ্জিত করে নেন।
মাওলানা জালালুদ্দিন রুমী রহমাতুল্লাহি আলাইহি -এর মরমী দর্শন
বিশ্ববিখ্যাত সুফি কবি হযরত মাওলানা জালালুদ্দিন রুমী রহমাতুল্লাহি আলাইহি তাঁর ‘মসনবী শরীফ’-এ ইশকে হাকিকির আগুনকে খুব সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। তিনি বলেছেন, “প্রেম হলো সেই উজ্জ্বল আলো, যা আল্লাহ ছাড়া অন্য সবকিছুকে জ্বালিয়ে দেয়।” তিনি আরও বলেছিলেন, “তোমার হৃদয়ে যদি খোদা প্রেমের সামান্য কণাটুকুও থাকে, তবে জেনো যে তুমি বিশ্বজগতের সবচেয়ে ধনী মানুষ।” ওলী-আউলিয়াগণের কারামত এবং তাঁদের জ্যান্ত বাণী আমাদের শিক্ষা দেয় যে, আল্লাহর প্রেম ছাড়া মানুষের এই জীবন এক প্রাণহীন রুহহীন খাঁচার মতো।
শেষ কথা
ইশকে হাকিকি বা খোদা প্রেম কোনো মৌখিক দাবি নয়, এটি হলো অন্তরের জ্যান্ত অবস্থা। যখন একজন বান্দা নূর নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর খাঁটি সুন্নাহ অনুসরণের মাধ্যমে কোনো কামেল মুর্শিদের সোহবতে গিয়ে নিজের অন্তর পরিষ্কার করে, তখনই এই প্রেমের নূর হৃদয়ে প্রবেশ করে। মহান আল্লাহ আমাদের সবাইকে দুনিয়ার মিথ্যা ও ক্ষণস্থায়ী মোহ থেকে মুক্ত রাখুন এবং আমাদের অন্তরে নূর নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর প্রতি অন্তহীন মহব্বত ও আল্লাহর খাঁটি ইশকে হাকিকি নসিব করুন। আমীন।










