দয়াল নবী আপনার দরবারে আমি গোলাম হাজির হইয়াছি।
টিকটক, রিলস ও নগ্নতার জোয়ার বর্তমান আখেরী জমানায় মুসলিম উম্মাহর পারিবারিক হায়া-শরম ও নৈতিক মূল্যবোধ চূর্ণ-বিচূর্ণ করার সবচেয়ে ভয়ঙ্কর আধুনিক শয়তানি ফাঁদ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। আমরা এমন এক সংকটময় ও পিচ্ছিল শতাব্দীতে বসবাস করছি, যেখানে প্রযুক্তির ছদ্মবেশে বাতেল ও কামুক শক্তি প্রতিটি ঈমানদারের ঘরের ভেতর, এমনকি বেডরুমের পর্দা ও আব্রু ধ্বংস করার জন্য ওত পেতে রয়েছে। আজকের জমানার সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি হলো, মানুষ অতি অল্প সময়ে সস্তা সখ্যতা, সস্তা সস্তা ভিউ ও সামান্য ভাইরাল হওয়ার মোহে পড়ে নিজের অজান্তেই নফসের দাসত্বে এবং হারামের অতল গহ্বরে তলিয়ে যাচ্ছে।
মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন পবিত্র কুরআনে ঈমানদারের দৃষ্টি সংযত রাখার এবং হায়া-শরম অক্ষত রাখার কড়া হুকুম জারি করেছেন। কিন্তু সাইবার সংস্কৃতির এই সর্বনাশা জোয়ারে তরুণ প্রজন্ম আজ নিজের ঈমানী আভিজাত্য বিসর্জন দিচ্ছে। যদি আমাদের পারিবারিক কাঠামোই কলুষিত ও বেহায়াপনায় লিপ্ত হয়ে যায়, তবে আমাদের তামাম ইবাদত, জিকির-আজকার এবং রূহার্নী মেহনত খোদ আরশের মালিকের দরবারে চিরতরে বাতেল ও প্রত্যাখ্যাত হয়ে যাবে।
তাই সমকালীন এই কঠিন বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে ঈমান ও আমল অক্ষত রাখতে হলে হারামের তামাম আধুনিক শয়তানি তোরণ লাথি মেরে চূর্ণ করে খাঁটি বাতেনি নূরে ফিরে আসা ফরজ।
শর্ট ভিডিওর মহামারী: স্মার্টফোনের স্ক্রিনে ইবলিসের জ্যান্ত আস্তাবল
আজকের ডিজিটাল যুগে মানুষের হাতে থাকা স্মার্টফোনটি অনেক সময় ইবলিসের প্রধান কার্য্যালয় হিসেবে কাজ করছে। আধুনিক সমাজে ১৫ থেকে ৩০ সেকেন্ডের শর্ট ভিডিওর যে নোংরা প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে, তা মূলত মানুষের মনস্তত্ত্বকে চিরতরে বিকৃত করার এক সুগভীর মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ। ক্যাসিনো বা নোংরা নাচের আড্ডায় মানুষকে এখন আর কোনো বাহ্যিক নিষিদ্ধ পল্লীতে যেতে হয় না; বরং খোদ বেডরুমে বসে ১ ক্লিকে লাখ লাখ নগ্ন ও অর্ধনগ্ন দৃশ্য চোখের সামনে ভেসে উঠছে।
ইসলামী শরীয়তের অকাট্য নীতি অনুযায়ী, বেহায়াপনা ছড়ানো এবং পরনারীর দিকে কুদৃষ্টি দেওয়া এক শত পার্সেন্ট হারাম এবং কবিরা গুনাহ। মহান আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনের সূরা আন-নূরের ৩০ নম্বর আয়াতে এরশাদ করেছেন:
“মুমিনদেরকে বলো, তারা যেন তাদের দৃষ্টি সংযত রাখে এবং তাদের লজ্জাস্থানের হেফাজত করে। এটাই তাদের জন্য অধিকতর পবিত্র।”
স্মার্টফোনের স্ক্রিনে অনবরত স্লাইড করতে করতে তরুণ সমাজ আজ অলস ও রূহার্নীভাবে অন্ধ হয়ে যাচ্ছে। কয়েক মুহূর্তের লোভের ফাঁদে পড়ে লাইক-কমেন্ট পাওয়ার আশায় লাখ লাখ মুসলিম সন্তান নিজের ঘরের মা-বোনদের অবয়ব তামাম দুনিয়ার সামনে উন্মুক্ত করে দিচ্ছে। এই নোংরা উপার্জনের মাধ্যমে যে রিজিক বা ট্রাফিক ঘরে আসে, তা পুরো পরিবারের রূহার্নী বরকত ও শান্তি চিরতরে পুড়িয়ে ভস্ম করে দেয়।
হায়া-শরম ধ্বংসের নীল নকশা: পশ্চিমা সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের বুনিয়াদ
বর্তমান আখেরী জমানার আরেকটি মেগা ধোঁকাবাজি এবং আধুনিক প্রযুক্তিগত ভাইরাস হলো বিনোদনের নামে হায়া-শরম ও লজ্জা উচ্ছেদ করার এই নব্য পাশ্চাত্য আগ্রাসন। ইন্টারনেটের আসমানে বিভিন্ন সোশ্যাল মিডিয়া অ্যালগরিদম এমনভাবে সাজানো আসীন, যা মানুষকে অনবরত নগ্নতার দিকে ধাবিত করে। যে জাতি আজ থেকে এক দশক আগেও লোকচক্ষুর অন্তরালে শালীন জীবনযাপন করত, তেনাদের ঘরের ভেতর আজ প্রকাশ্য বেহায়াপনা জহির রয়েছে।
ইসলামের বাতেনি হাকিকত ও আধ্যাত্মিক সুফি দর্শন অনুযায়ী, হায়া বা লজ্জাই হলো মুমিনের ঈমানের প্রধান সুরক্ষাকবচ। সহীহ বুখারী শরীফের ৯ নম্বর হাদীসে নূর নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম স্পষ্ট এরশাদ করেছেন:
“ঈমানের ষাটেরও অধিক শাখা রয়েছে, আর হায়া (লজ্জা) হলো ঈমানের একটি প্রধান শাখা।”
যখন একটি সমাজ থেকে এই হায়ার মহাপ্রাচীর ভেঙে পড়ে, তখন তার ভেতর শয়তানের রাজত্ব কায়েম হতে এক সেকেন্ডও সময় লাগে না। এই শর্ট ভিডিওর ফাঁদগুলো মূলত আখেরী জমানার সেই দাজ্জালী প্রতারণার সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ, যেখানে যা চাক্ষুষ আনন্দ মনে হয়, তা মূলত ঈমান ধ্বংসের গভীর অতল অন্ধকার।
পারিবারিক ভাঙন ও নৈতিক অবক্ষয়: ঘরের তোরণে দাজ্জালী ফেতনা
সুদের জালের পাশাপাশি এই আধুনিক নগ্নতার আগ্রাসন তামাম পারিবারিক বৈবাহিক ও রূহার্নী কাঠামোকে এমনভাবে গ্রাস করে রেখেছে যে, সাধারণ একজন মানুষের পক্ষেও নিজের সন্তানদের চরিত্র রক্ষা করা লোহার মহাপ্রাচীর পার হওয়ার মতো কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। তথাকথিত আধুনিকতা ও প্রগতির আড়ালে বেহায়াপনাকে আজ ‘স্মার্টনেস’ বা ‘ট্যালেন্ট’ নাম দিয়ে হালাল করার নোংরা বস্তুবাদী চক্রান্ত জারি রয়েছে।
নূর নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম তেনার পবিত্র বাণীতে আখেরী জমানার নারীদের এমন কিছু পোশাকের বিবরণ বাতেনি নূরে চাক্ষুষ দেখে ভবিষ্যদ্বাণী করে গিয়েছিলেন, যা আজ অক্ষরে অক্ষরে সত্য প্রমাণিত। সহীহ মুসলিম শরীফের হাদীসে দয়াল নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরশাদ করেছেন:
“জাহান্নামবাসী দুটি দল রয়েছে – এক দল হলো এমন নারী যারা পোশাক পরিধান করেও উলঙ্গ থাকবে, যারা পুরুষদের আকর্ষণ করবে এবং নিজেরাও আকৃষ্ট হবে। তাদের মাথা উটের কুঁজের মতো হেলানো থাকবে। তারা জান্নাতে প্রবেশ করবে না, এমনকি জান্নাতের সুঘ্রাণও পাবে না।”
আজ আমাদের সমাজে এই হাদীসের বাস্তবায়ন চাক্ষুষ অবলোকন করা যায়। টিকটক ও রিলসের স্ক্রিনে লাখ লাখ মুসলিম তরুণী আজ উটের কুঁজের মতো চুল বেঁধে তামাম দুনিয়ার পরপুরুষদের নিজের দিকে আকর্ষণ করছে। এর ফলে পারিবারিক শান্তি চিরতরে মরে যাচ্ছে, ঘরে ঘরে তালাক ও চারিত্রিক কলহ মহামারী আকারে বৃদ্ধি পাচ্ছে।
রিজিকের বরকত ও দোয়া কবুল হারানোর রহস্য
অনেকে মনে করেন, দিন-রাত সোশ্যাল মিডিয়ায় নগ্ন ভিডিও দেখে বা বানিয়ে কোটি টাকা কামিয়ে যদি বড় মসজিদ বানানো যায় কিংবা মক্কা শরীফে গিয়ে হজ-ওমরাহ করা যায়, তবে তামাম গুনাহ মাফ হয়ে যাবে। এই আকিদা এক শত পার্সেন্ট ভ্রান্ত, বাতেল এবং শয়তানের ধোঁকা।
হারাম উপার্জনের পাশাপাশি চোখের জেনা এবং কানের জেনার কারণে মানুষের অন্তরে দয়া, মায়া ও আধ্যাত্মিক রূহানিয়াত চিরতরে মরে যায় এবং কলব পাথর হয়ে যায়। যার কলব আল্লাহর জিকির ও নবীপ্রেমের পবিত্র নূর থেকে বঞ্চিত হয়ে নোংরা কামুক চিন্তায় মগ্ন থাকে, তাদের দোয়া খোদ আরশের মালিকের দরবারে চিরতরে বাতেল ও প্রত্যাখ্যাত হয়ে যায়।
নূর নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরশাদ করেছেন, “নিশ্চয়ই আল্লাহ পবিত্র এবং তিনি পবিত্র বস্তু ছাড়া অন্য কিছু কবুল করেন না।”
অতএব, আপনার ঘরের ভেতর যদি দিন-রাত স্মার্টফোনে নগ্নতার জোয়ার বইতে থাকে, তবে আপনার তামাম ইবাদত আসমানে না উঠে সরাসরি আপনার মুখে লাথি মেরে ফেরত পাঠিয়ে দেওয়া হবে।
ডিজিটাল সুরক্ষাকবচ: ঈমান ও পরিবার রক্ষার ৩টি ব্যবহারিক শাহী কদম
হারামের এই বৈশ্বিক মহামারী থেকে বাঁচতে হলে এবং নিজের পরিবারকে জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা করতে হলে অবিলম্বে ৩টি ব্যবহারিক কদম লোহার মহাপ্রাচীরের মতো গেঁথে রাখা ফরজ:
১. ডিজিটাল ফিল্টারিং ও কড়া নজরদারি: তামাম নোংরা শর্ট ভিডিওর অ্যাপস ও আইডি এক পলকে ডিলিট করে দিয়ে মোবাইল স্ক্রিনকে স্রেফ হালাল ও ইসলামিক জ্ঞান অর্জনের তোরণে রূপান্তর করা।
২. পারিবারিক সচেতনতা ও সুফি শাসন: ঘরের মা-বোন ও সন্তানদের ফ্রিতে একা একা স্মার্টফোন ব্যবহারের স্বাধীনতা লাথি মেরে বর্জন করে ওনাদের সুন্নতি পর্দা ও ইসলামিক হায়ার আবরণে আবৃত করা।
৩. ওলীগণের সুহবত ও যিকর: কামেল মুর্শিদের নূরানী সুহবতে এসে নিজের কলবকে দিন-রাত আল্লাহর যিকিরে মশগুল রাখা, যাতে নফসের তামাম ভাইরাস ও শয়তানের কু-মন্তরণা এক চাক্ষুষ পলকে চূর্ণ হয়ে যায়।
উপসংহার
টিকটক, রিলস ও নগ্নতার জোয়ার আখেরী জমানায় মুসলিম উম্মাহর পারিবারিক হায়া-শরম ও নৈতিক মূল্যবোধ চূর্ণ-বিচূর্ণ করার সবচেয়ে ভয়ঙ্কর আধুনিক শয়তানি ফাঁদ হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে। এই পিচ্ছিল প্রহরে নিজের ঈমান রক্ষা করতে এবং ইবাদত কবুলের প্রধান শর্ত হিসেবে আখেরী জমানায় নিজের চোখ, কান ও কলবকে হারামের তামাম স্পর্শ থেকে ধবধবে পরিষ্কার রাখা আমাদের প্রধান ঈমানী দায়িত্ব।
আমাদের মনে রাখতে হবে, এই দুনিয়ার জীবন স্রেফ কয়েক দিনের মুসাফিরখানা মাত্র, কিন্তু পরকালের জীবন আজীবনের জন্য শাশ্বত ও চিরস্থায়ী। হারামের লোভনীয় তোরণগুলো দেখা মাত্রই তেনাদের পরম অবহেলায় লাথি মেরে বর্জন করে, দয়াল নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর পবিত্র সুন্নতের আলোয় নিজের পরিবারকে ধবধবে পরিষ্কার রাখা আমাদের ঈমানী দায়িত্ব।
মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন আমাদের-কে নফসের ধোঁকা থেকে হেফাজত করুন, আমাদের কলবকে বাতেনি নূরে জহির রাখুন এবং খাঁটি হালাল ও পবিত্র জীবনের ওপর কায়েম ও দায়ী বহাল রাখুন। আমীন, ছম্মা আমীন।
👉 এখানে চাপ দিয়ে ফ্রিতে Monetag অ্যাকাউন্ট খুলুন
© ২০২৬ golammorshedjalali.com • সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।
💰 বিজ্ঞাপন ও মনিটাইজেশন: Monetag | 🌐 হোস্টিং: Putul Host










