মিলাদ ও কিয়াম কি বিদআত? পবিত্র মিলাদ ও কিয়ামের অকাট্য কিতাবী দলিল অনুযায়ী ভ্রান্ত আকিদার মুখোশ উন্মোচন।

পবিত্র মিলাদ ও কিয়াম কি বিদআত? জমানার ধর্মীয় অবক্ষয় ও নব্য ফেতনার নোংরা আগ্রাসন চূর্ণ করে সহীহ হাদিস, যুগশ্রেষ্ঠ ফকীহ এবং ওলী-আল্লাহগণের ফতোয়া ও অকাট্য দলিলের আলোকে বাতেল নজদী-সালাফী গোষ্ঠীর বিভ্রান্তিকর মুখোশ উন্মোচন করে খাঁটি সুফি আকিদার মহাবিজয় বিশ্বের দরবারে জাজ্বল্যমান করার চূড়ান্ত রূপরেখা।

মিলাদ ও কিয়াম কি বিদআত? পবিত্র মিলাদ ও কিয়ামের অকাট্য কিতাবী দলিল।
---Advertisement---

দয়াল নবী আপনার দরবারে আমি গোলাম হাজির হইয়াছি।

মিলাদ ও কিয়াম কি বিদআত? জমানার ধর্মীয় অবক্ষয় ও নব্য ফেতনার আগ্রাসনের এই ক্রান্তিলগ্নে, একদল শুষ্ক কুতার্কিক সালাফী-ওহাবী মোল্লা এই পরম বরকতময় আমলকে নিষিদ্ধ ফতোয়া দিয়ে আশেকদের কলবে বিভ্রান্তি তৈরি করার অপচেষ্টায় লিপ্ত। অথচ নূরে মুজাসসাম, ফখরে মওজুদাত, রাহমাতুল্লিল আলামিন সাইয়্যেদুনা ওয়া মাওলানা মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর পৃথিবীতে শুভ আগমন বা মিলাদুন্নবী মোবারক উদযাপন এবং তেনার পরম সম্মানে দাঁড়িয়ে সালাতু সালাম পেশ করা বা পবিত্র কিয়াম শরীফ সুফি আকিদা ও খাঁটি সুন্নাহর এক পরম জাজ্বল্যমান আলোকবর্তিকা। ওলী-আল্লাহগণের রূহার্নী নজর মোবারক এবং কিতাব-সতর্ক নিখুঁত দলিলের তোরণে মিলাদ ও কিয়াম শরীফ এক অপরাজেয় ও শাশ্বত মহাসত্য। এই সুবিশাল নিবন্ধে আমরা কোরআন, সহীহ হাদিস এবং তামাম ওলী-আল্লাহগণের সর্বসম্মত মতের আলোকে নজদী ফেতনার তামাম শুষ্ক মরুভূমির মতো কুযুক্তি লাথি মেরে চূর্ণ করে বাতেল আকিদার মুখোশ এক পলকে উন্মোচন করব।

মিলাদ ও কিয়ামের হাকিকত: কেন এটি ওলী-আল্লাহগণের প্রাণস্পন্দন?

পবিত্র মিলাদ শরীফ হলো আল্লাহর দেওয়া সবচেয়ে বড় নেয়ামত ও রহমতের শুকরিয়া আদায় করা। খোদ আরশের কুদরতি আসমান থেকে শুরু করে তামাম সৃষ্টির মূল বুনিয়াদই হলো নূর নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর মিলাদ মোবারক। ওলীগণের শিক্ষা হলো- যে অন্তরে দয়াল নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর শুভ আগমনের আনন্দ নেই, সেই অন্তরের বাতেনি আয়না ধুলোবালি ও অহংকারে অন্ধ।

সুফি আকিদার মহান সাধক ও ওলী-আল্লাহগণ যুগে যুগে আমাদের এই বাতেনি শিক্ষা দিয়ে এসেছেন যে, পবিত্র মিলাদ ও কিয়াম শরীফ কোনো সাধারণ লৌকিক প্রথা নয়; তেনা হলো মূলত আশেক কলবের ইশকে এলাহী ও ইশকে রাসূল সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম প্রকাশের এক পরম নূরানী ও মূল পথ। বাতেলরা যখনই এই নেয়ামতকে বিদআত বলে ফতোয়া দেওয়ার অপচেষ্টা করে, তারা মূলত ইসলামের বাতেনি ও রূহার্নী প্রাণশক্তিকেই লোহার মহাপ্রাচীরে আঘাত করার চতুর জাল পাতে। কিন্তু আউলিয়া কেরামের রূহার্নী নজর যেখানে জাগ্রত, সেখানে বাতেলদের তামাম চক্রান্ত ধুলোয় মিশে যাওয়া নিশ্চিত প্রমাণিত।

মিলাদ ও কিয়াম কি বিদআত? মানুষের মনস্তত্ত্ব ও ভ্রান্তির জবাব

সাধারণ মানুষ যখনই সত্য অন্বেষণ করতে “মিলাদ ও কিয়াম কি বিদআত” কিংবা “মিলাদ ও কিয়ামের দলিল” খোঁজার জন্য ব্যাকুল হয়, তেনারা মূলত খাঁটি সুন্নাহ ও আত্মিক হেদায়েতের আলোই তালাশ করে। কিন্তু এই ক্রান্তিলগ্নে বিপথগামী নজদী-সালাফী গোষ্ঠী উগ্র বাতেল আকিদার আশ্রয় নিয়ে প্রধান শুষ্ক কুযুক্তি উপস্থাপন করে বলে- “নূর নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম কিংবা সাহাবায়ে কেরাম তো হুবহু এভাবে মিলাদ ও কিয়ামের মজলিস কায়েম করেননি, সুতরাং এটি সম্পূর্ণ বিদআত ও গোমরাহী।” অথচ ওলী-আল্লাহগণের রূহার্নী নজর ও কিতাবের হাকিকত অনুযায়ী, তাদের এই ফতোয়া ইসলামের বাতেনি প্রাণশক্তিকে চূর্ণ করার এক নোংরা চক্রান্ত ছাড়া আর কিছুই নয়। বরং নূর নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম- এর প্রতি তাজিম ও মহব্বত করা উত্তম আমল। কখনোই তা ভ্রান্ত বিদআত হতে পারে না।

ইমাম ও ওলীগণের সর্বসম্মত ফয়সালা হলো- তামাম নতুন জিনিসই শরীয়তে নিষিদ্ধ বা ভ্রান্ত বিদআত, বিদআতে সাইয়্যিআহ নয়। যদি কোনো নতুন আমল কোরআন ও সুন্নাহর মূল বুনিয়াদের সাথে সাংঘর্ষিক না হয়ে বরং নূর নবীজির সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম শান ও তাজিম বৃদ্ধি করে, তবে তা সুন্নাহর আলোকেই উত্তম বিদআত বা বিদআতে হাসনাহ হিসেবে একশত ভাগ পরম গ্রহণযোগ্য ও সওয়াবের কাজ সাব্যস্ত। ইমাম শাফেয়ী রহমাতুল্লাহি আলাইহি স্পষ্ট খোদাই করে গেছেন যে, যে নতুন বিষয় কিতাব, সুন্নাহ বা ইজমার বিরোধী নয়, তা প্রশংসনীয় ও হালাল। অতএব, মিলাদ ও কিয়ামকে ঢালাওভাবে বিদআত বলা ভ্রান্ত আকিদার নোংরা চক্রান্ত মাত্র।

পবিত্র মিলাদ শরীফের পক্ষে পবিত্র কোরআনের ৩টি অকাট্য দলিল

পবিত্র কোরআনের তামাম আয়াতের নূরানী ইশারায় রাব্বুল আলামিন তাঁর হাবিব, নূর নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর পবিত্র মিলাদ ও শুভ আগমনের সুসংবাদ জাজ্বল্যমান করে রেখেছেন। কোরআনের সেই নূরানী ইশারা ঈমানদারের হৃদয়ে নবীপ্রেমের আলো প্রজ্বলিত করে। অথচ বাতেলপন্থীদের অন্ধ অন্তর সেই নূরানী সত্য অবলোকন করতে অক্ষম। দয়াল নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর পবিত্র মিলাদ ও আগমনের বিষয়ে পবিত্র কোরআন ও নির্ভরযোগ্য তাফসিরের আলোকে নিচে তিনটি প্রধান কিতাবি দলিল উপস্থাপন করা হলো:

১. আল্লাহর রহমত ও নেয়ামতে আনন্দের পরম নির্দেশ

সূরা ইউনুসের ৫৮ নম্বর আয়াতে খোদ রাব্বুল আলামিন এরশাদ করেছেন:

বাংলায় উচ্চারণ:
কুল বিফাদলিল্লাহি ওয়া বিরাহমাতিহী, ফাবিযালিকা ফালইয়াফরাহূ; হুয়া খাইরুম মিম্মা ইয়াজমাউন।
বাংলা অর্থ :
“”বলুন (হে হাবিব সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম), আল্লাহর দয়া বা অনুগ্রহ এবং তাঁর রহমত প্রাপ্তিতে তারা যেন আনন্দ প্রকাশ (উৎসব) করে। তা তাদের তামাম সঞ্চিত ধন-সম্পদ অপেক্ষা বেশি উত্তম।”।”

তামাম সৃষ্টি জগতের জন্য খোদ নবী করিম সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম-ই হলেন আল্লাহর সবচেয়ে বড় রহমত ও অনুগ্রহ যেমন সূরা আম্বিয়ার ১০৭ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তাআলা বলেন- “অমা আরসালনাকা ইল্লা রাহমাতাল্লিল আলামিন।” অর্থ- আমি আপনাকে সমগ্র সৃষ্টি জগতের জন্য রহমতস্বরূপ প্রেরণ করেছি।  সুতরাং, দয়াল নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর মিলাদ বা শুভ আগমনের দিনে আনন্দ উৎসব করা খোদ কোরআনেরই পরম ফরজ নির্দেশ।

২. আল্লাহর নেয়ামতের প্রচার ও শুকরিয়া

সূরা আদ-দুহার ১১ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তাআলা এরশাদ করেছেন:

বাংলায় উচ্চারণ:
ওয়া আম্মা বিনি‘মাতি রব্বিকা ফাহাদ্দিছ।

বাংলা অর্থ :
“”এবং আপনার রবের নেয়ামতসমূহ বারবার প্রকাশ করুন বা আলোচনা করুন।”

তামাম কায়নাতের নেয়ামতের মূল চাবিকাঠি, পরম উৎস ও স্পন্দন হলেন স্বয়ং নূরে মুজাসসাম রাসূলে খোদা সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম। তেনাকে লাভ করাই তো আউলিয়া কেরাম ও খাঁটি আশেকদের জীবনের শ্রেষ্ঠতম ও মহান নেয়ামত। অতএব, পবিত্র মিলাদ মাহফিলের মাধ্যমে নূর নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর শুভ আগমনের মহিমান্বিত আলোচনা বারবার করা সরাসরি খোদ রবেরই খাস হুকুম ও পবিত্র সুন্নাহর মহান তোরণ কায়েম করার শামিল। বাতেলদের সকল শুষ্ক মরুভূমির ফতোয়াকে লাথি মেরে চূর্ণ করে এই আমল একশত ভাগ সুফি আকিদার মহাবিজয়কে বিশ্বের দরবারে জাজ্বল্যমান করে তোলে।

৩. নবীগণের শুভ আগমন দিবসে আল্লাহর খাস সালাম মোবারক

পবিত্র কোরআনে সূরা মারইয়াম, আয়াত ১৫ এ আল্লাহ তাআলা হযরত ইয়াহইয়া আলাইহিস সালাম এবং হযরত ঈসা আলাইহি সালাম-এর জন্মদিনের আলোচনা করে এরশাদ করেন-

বাংলা উচ্চারণ:
ওয়াস্-সালামু ‘আলাইহি ইয়াওমা উলিদা।

বাংলা ভাবার্থ:
“এবং তেনার ওপর খাস সালাম (শান্তির অবিরাম কুদরতি ধারা) বর্ষিত হোক যেদিন তিনি শুভ জন্মগ্রহণ করেন।”

খোদ আল্লাহ তাআলা যেখানে অন্য আম্বিয়া কেরামগণের বেলাদাত মোবারকের পবিত্র দিনটিকে স্মরণ করে নিজ কুদরতে খাস সালাম ও শান্তির তোরণ উন্মুক্ত করে দিয়েছেন, সেখানে তামাম আম্বিয়া কেরামের তাজ, সৃষ্টির মূল বুনিয়াদ, নূরে মুজাসসাম সাইয়্যেদুনা ওয়া মাওলানা মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর শুভ আগমনের সেই মহা-মহিমান্বিত দিনটি যে কত কোটি গুণ বেশি বরকতময়, সর্বশ্রেষ্ঠ রহমত এবং আসমানী সালামের মহাসমুদ্র আসীন, তা ভাষায় প্রকাশ করা তামাম কায়েনাতের সৃষ্টির পক্ষে কস্মিনকালেও সম্ভব নয়!

আল্লাহর হাবিব নূর নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর এই পরম পবিত্র মিলাদ মোবারক ও রূহানী সালামের মহিমা অস্বীকার করা কেবল ইশক ও মহব্বতহীন হৃদয়ের শুষ্ক কুযুক্তির পক্ষেই সম্ভব। ওলীগণের রূহানী দৃষ্টি এবং আশেকদের কলবের জাজ্বল্যমান ঈমান সাক্ষ্য দেয়-নূর নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর পবিত্র মিলাদ মোবারক ঈমানদারের জন্য এক মহান নেয়ামত। এর মাধ্যমে হৃদয়ে জাগ্রত হয় বাতেনি নূরের আলো এবং এমন এক রূহানী অমৃতসুধা, যা মুমিনের তৃষ্ণার্ত কলব একবার আস্বাদন করলে বারবার সেই নূর ও ভালোবাসার সুধা পান করার জন্য ব্যাকুল হয়ে ওঠে। এই নূরানী হেদায়েতের আলোই ঈমানদারের হৃদয়ে নবীপ্রেম, ইশক ও মহব্বতকে আরও গভীর করে তোলে।

মিলাদ ও কিয়ামের পক্ষে রাসূলে খোদা সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও সাহাবায়ে কেরামের পবিত্র হাদিসের হাওয়ালা

বিপথগামী সালাফী-ওহাবী গোষ্ঠী অনবরত এই ভুয়া দাবি করে থাকে যে, সাহাবায়ে কেরাম নাকি কখনো মিলাদ পালন করেননি। কিন্তু তাদের এই কুযুক্তির সত্যতা যাচাই করতে হলে আমাদের ফিরে যেতে হবে সহীহ হাদিসের নির্ভরযোগ্য ও অকাট্য মহাফেজখানার দিকে। হাদিস শরীফের সেই বরকতময় পাতায় আমরা এমন কিছু যুগান্তকারী ও অকাট্য বর্ণনা চাক্ষুষ দেখতে পাই, যেগুলো পবিত্র মিলাদ শরীফ ও নূর নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর প্রতি তাজিম প্রকাশের পক্ষে বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক এবং এক পরম আলোকবর্তিকা। আসুন, সহীহ হাদিসের সেই নির্ভরযোগ্য সুরক্ষাকবচ দলিলগুলো একে একে অবলোকন করি এবং সুফি আকিদার আলোকেই মিলাদ শরীফের অকাট্য সত্যতা চাক্ষুষ প্রমাণ করি:

১. খোদ নূর নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজেই নিজের মিলাদ শরীফ পালন করেছেন

সহীহ মুসলিম শরীফের কিতাবুস সিয়াম-এর একটি প্রসিদ্ধ হাদীসে বর্ণিত হয়েছে- সাহাবায়ে কেরাম যখন দয়াল নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কাছে সোমবারের রোজা রাখার কারণ জানতে চাইলেন, তখন আল্লাহর হাবিব সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরশাদ করলেন:

“এই দিনেই আমি শুভ আগমন করেছি এবং এই দিনেই আমার ওপর ওহি নাজিল হয়েছে।”

সুবহানাল্লাহ! দয়াল নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজের শুভ আগমনের দিনের স্মরণে সোমবার রোজা রাখার মাধ্যমে আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করেছেন। এ হাদীস থেকে অন্তত এতটুকু স্পষ্ট যে, নূর নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজের মিলাদের দিনে রোজার মাধ্যমে শুকরিয়া আদায় করে তামাম উম্মতের জন্য মিলাদ পালনের মূল সুন্নাহর বুনিয়াদ গেঁথে দিয়ে গেছেন। 

২. হযরত আব্বাস রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু কর্তৃক রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সামনে মিলাদ পাঠ

বিশ্বখ্যাত হাদিসগ্রন্থ আল-মুস্তাদরাক এবং ইমাম ইবনে হাজার আসকালানী রহমাতুল্লাহি আলাইহি-এর কিতাবে বর্ণিত একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হলো– তাবুক অভিযান থেকে নূর নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর প্রত্যাবর্তনের পর, তেনার সম্মানিত চাচা হযরত আব্বাস রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু আরজ করলেন, “ইয়া রাসূলাল্লাহ সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম! আমি আপনার প্রশংসায় কিছু কবিতা পাঠ করতে চাই।”

তখন নূর নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম তেনাকে সানন্দে অনুমতি প্রদান করে এরশাদ করলেন, “বলুন, আল্লাহ আপনার জবানকে সতেজ রাখুন।”

অতঃপর হযরত আব্বাস রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু দয়াল নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সম্মানিত শান, পবিত্র নূরানী শুভ আগমনকে স্মরণ করে কবিতা পাঠ করলেন। তেনার কবিতায় তিনি বর্ণনা করেন- নূর নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন শুভ আগমন করেন, তখন পৃথিবী আলোকিত হয়েছিল এবং তেনার নূরে দিগন্ত উদ্ভাসিত হয়েছিল। তিনি আরও বলেন, আমরা সেই আলো ও নূরের মধ্যে এবং হেদায়েতের পথ ধরে অগ্রসর হচ্ছি।

সুবহানাল্লাহ! এই বর্ণনাটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ এতে দেখা যায়, হযরত আব্বাস রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু স্বয়ং রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সামনে তেনার পবিত্র শুভ আগমন  ও মহান শানকে কবিতার ভাষায় স্মরণ করেছেন। আর নূর নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম তা শুনেছেন এবং তেনাকে কবিতা পাঠের অনুমতি দিয়েছেন।

অতএব, নূর নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর পবিত্র শুভ আগমন ও শানকে কবিতা ও প্রশংসার মাধ্যমে স্মরণ করার ক্ষেত্রে এই রেওয়ায়েতটি একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত। মিলাদুন্নবী সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর আলোচনায় এই ঘটনা বিশেষ তাৎপর্য বহন করে।

সূত্র: ইমাম হাকিম, আল-মুস্তাদরাক ‘আলা আস-সহীহাইন, হাদিস নং ৫৪৫৮; হাফেজ ইবনে হাজার আসকালানী রহমাতুল্লাহি আলাইহি, আল-ইসাবাহ ফি তাময়ীযিস সাহাবাহ।

কিয়াম শরীফের হাকিকত: দয়াল নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সম্মানে দাঁড়ানোর অকাট্য কিতাবী প্রমাণ

পবিত্র মিলাদ শরীফের আলোচনা শুনে আল্লাহর হাবিব, নূর নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর ধরাবক্ষে শুভ নূরানী আগমনের সেই পরম বরকতময় প্রহর স্মরণ করে আশেকদের দাঁড়িয়ে তাজিম প্রকাশ করার নামই হলো কিয়াম শরীফ।

কিন্তু দুঃখজনকভাবে, বাতেল ওহাবী-সালাফী মতের অনুসারীরা এই কিয়াম শরীফকে কখনো শিরক, কখনো বিদআত বলে মানুষের মাঝে বিভ্রান্তি ছড়ানোর চেষ্টা করে। অথচ ইসলামের ইতিহাস, সাহাবায়ে কেরামের আমল এবং সুন্নাহর বিভিন্ন বর্ণনা পর্যালোচনা করলে দেখা যায়- দয়াল নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর প্রতি তাজিম, সম্মান ও ভালোবাসার প্রকাশ ইসলামী ঐতিহ্যের একটি সুপ্রতিষ্ঠিত বিষয়।

সুতরাং কিয়াম শরীফকে শুধু বিদআত বা শিরক বলে ফতোয়া দেওয়ার আগে এর নিয়ত, উদ্দেশ্য, ইসলামী ঐতিহ্য এবং সাহাবায়ে কেরামের আমল সম্পর্কে যথাযথভাবে জানা ও বিষয়টি গভীরভাবে অনুধাবন করা প্রয়োজন। কারণ, আশেকদের এই দাঁড়িয়ে তাজিম প্রকাশ করা প্রিয় নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর প্রতি গভীর ভালোবাসা, শ্রদ্ধা, তাজিম ও সম্মানের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে পালিত হয়ে থাকে।

১. সাহাবায়ে কেরাম নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নির্দেশে সম্মান প্রদর্শনের জন্য দাঁড়িয়েছেন।

সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিম শরীফের বিশুদ্ধ হাদিসে বর্ণিত আছে- বনু কুরাইযার লোকেরা হযরত সা‘দ ইবনে মু‘আয রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু-এর সিদ্ধান্ত মেনে নিলে, নবী করিম সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁকে ডেকে পাঠান। তিনি যখন মজলিসের নিকট আগমন করছিলেন, তখন প্রিয় নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম উপস্থিত আনসার সাহাবায়ে কেরামকে নির্দেশ দিয়ে বললেন:

“কুমূ ইলা সাইয়্যিদিকুম”
অর্থ: “তোমরা তোমাদের সর্দারের সম্মানে দাঁড়িয়ে যাও।”

দলিল: সহীহ বুখারী, হাদিস ৩৮০৪, ৬২৬২; সহীহ মুসলিম, হাদিস ৪৫৯৬।

সুবহানাল্লাহ! একজন সম্মানিত সাহাবীর আগমনে স্বয়ং দয়াল নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন দাঁড়িয়ে সম্মান প্রদর্শনের নির্দেশ দিয়েছেন, তখন সম্মানার্থে দাঁড়ানোর বিষয়টি যে ইসলামী ঐতিহ্যে একেবারেই অচেনা কোনো আমল নয়, এই হাদিস তার একটি সুস্পষ্ট দৃষ্টান্ত।

তাহলে তামাম কায়নাতের রহমত, সাইয়্যেদুল মুরসালিন, আমাদের প্রাণপ্রিয় নূর নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর পবিত্র নূরানী শুভ আগমনের স্মরণে আশেকদের দাঁড়িয়ে তাজিম ও কিয়াম করা কোটি গুণ বেশি জায়েজ ও বরকতময় আমল। 

২. নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে দেখে সাহাবায়ে কেরামের দাঁড়িয়ে তাজিম করার পরম সুন্নাহ

বিশ্বখ্যাত সুফি আলেম ও হাদিস বিশারদ ইমাম ইউসুফ নাবহানী রহমাতুল্লাহি আলাইহি তেনার অমর ‘শাওয়াহিদুল হক’ কিতাবে এক অকাট্য ও জাজ্বল্যমান কিতাবী হাওয়ালা এনেছেন- রাসূলে খোদা নূর নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম- এর খাস কবি হযরত হাসসান ইবনে সাবিত রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু যখনই আল্লাহর হাবিব সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে মজলিসের দিকে শুভাগমন করতে দেখতেন, তেনাকে দেখামাত্রই তিনি পরম রূহার্নী ইশক ও তাজিম বুকে নিয়ে দাঁড়িয়ে যেতেন। তেনার এই কিয়াম ও দাঁড়ানোর আমলকে অবলোকন করে যখন আপত্তি তোলার চেষ্টা করা হলো, তখন তিনি কবিতার চরণে অকাট্য জবাব দিয়ে আরজ করলেন:
 “আমার পরম প্রিয় ও সম্মানিত সত্তার (নূর নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম) জন্য দাঁড়িয়ে তাজিম করা আমার ওপর এক অবশ্য পালনীয় কর্তব্য; আর এই পরম কর্তব্য বর্জন করা বিন্দুমাত্র সোজা বা সঠিক কাজ নয়। আমি সেই ব্যক্তির ওপর চরম বিস্ময় প্রকাশ করি, যার নূন্যতম বুদ্ধি ও বোধশক্তি আসীন রয়েছে, অথচ সে এই অতুলনীয় নূরানী সৌন্দর্য অবলোকন করার পরেও দাঁড়িয়ে সম্মান প্রদর্শন বা কিয়াম করে না!”
খোদ নূর নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম তেনার খাস আশেক কবির এই গভীর ইশকে ভরা কিয়াম ও দাঁড়িয়ে তাজিম করার আমল চাক্ষুষ অবলোকন করে বিন্দুমাত্র নিষেধ বা বারণ করেননি; বরং তেনার এই বাতেনি মহব্বতকে পরম মৌন সম্মতি ও খাস সন্তুষ্টির চাদরে আবৃত করে ধন্য করেছেন। ওলী-আল্লাহগণের সিলসিলা ও আশেকদের কলবের জাজ্বল্যমান ধবধবে খাঁটি আকিদা সাক্ষ্য দেয় যে, খোদ সাহাবী হযরত হাসসান ইবনে সাবিত রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু-এর এই দাঁড়িয়ে তাজিম করার আমলই হলো তামাম খাঁটি আশেকদের জন্য পবিত্র কিয়াম শরীফের এক অনন্য, অকাট্য ও চিরন্তন দলিল।

৩. নূর নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর মহিমান্বিত শানে দাঁড়িয়ে কবিতা পাঠ ও রূহুল কুদুসের খাস সাহায্যের দলিল

উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়শা সিদ্দীকা রাদ্বিয়াল্লাহু আনহা থেকে অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য সূত্রে বর্ণিত হয়েছে যে- মসজিদে নববীর পবিত্র চত্বরে নূর নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর শান ও আজমত প্রকাশের জন্য একটি খাস মিম্বর স্থাপন করা ছিল হযরত হাসসান ইবনে সাবিত রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু সেই মিম্বরের ওপর পরম আদবে দাঁড়িয়ে তামাম সাহাবাদের মজলিসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর মহিমান্বিত প্রশংসা ও তেনার পবিত্র শানে কবিতা পাঠ করতেন। এ প্রসঙ্গে নূর নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজে সন্তুষ্ট হয়ে এরশাদ করেছেন:
 “নিশ্চয়ই আল্লাহ তাআলা রূহুল কুদুসের (হযরত জিবরাইল আলাইহিস সালাম) মাধ্যমে হাসসানকে খাস সাহায্য করেন, যতক্ষণ তিনি আল্লাহর রাসূলের শান মোবারক বয়ান করেন।”

পবিত্র দলিল: জামে‘ আত-তিরমিজি, হাদিস নম্বর: ২৮৪৬; সুনানে আবু দাাউদ, হাদিস নম্বর: ৫০১৫]
নূর নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর পবিত্র উপস্থিতিতে তেনারই শান ও আজমত একজন বিশিষ্ট সাহাবী মিম্বরের ওপর দাঁড়িয়ে কবিতার মাধ্যমে পাঠ করছেন, আর রাহমাতুল্লিল আলামিন সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম তেনাকে বিন্দুমাত্র নিষেধ বা বারণ না করে-বরং আল্লাহর পক্ষ থেকে রূহুল কুদুসের খাস গায়েবী সাহায্যের মহান গ্যারান্টি ঘোষণা করছেন! এটি সাহাবায়ে কেরামের নবীপ্রেম, দাঁড়িয়ে তাজিম ও সম্মানের এক অনন্য ও শাশ্বত দৃষ্টান্ত।

ওলী-আল্লাহ ও ইমামগণের সর্বসম্মত ফতোয়া ও রায়

বিপথগামী নজদী-সালাফী গোষ্ঠী উগ্র বাতেল আকিদার বশবর্তী হয়ে মনে করে যে, তাদের গুরু ইবনে তাইমিয়াহ আর ইবনে আব্দুল ওহাব নজদীর শুষ্ক মরুভূমির মতো ফতোয়াগুলোই বুঝি ইসলামের শেষ কথা। অথচ খাঁটি সুন্নাহ ও সুফি আকিদার আলোকবর্তিকা বুকে নিয়ে আউলিয়া কেরামের রূহার্নী নজর ও কিতাব অকাট্য সাক্ষ্য দেয় যে, তাদের এই দাবি সম্পূর্ণ অসার ও বিভ্রান্তিকর। আসুন, ইসলামের গত চৌদ্দশত বছরের তামাম যুগের মহান মুহাদ্দিস, যুগশ্রেষ্ঠ ফকীহ এবং ওলী-আল্লাহগণের খাস ফয়সালা ও আলোকময় রায় অবলোকন করি, যা ওলীগণের খাঁটি আশেকদের হৃদয়কে কোটি গুণ বেশি অপরাজেয় ও লোহার মহাপ্রাচীরের মতো সুরক্ষিত করে তুলবে।

১. সুলতানুল ওলামা ইমাম ইজ্জুদ্দিন ইবনে আবদুস সালাম রহমাতুল্লাাহি আলাইহি এর অকাট্য ফয়সালা

ইসলামের ইতিহাসের শ্রেষ্ঠতম ফকীহ ও প্রসিদ্ধ আলেম, সুলতানুল ওলামা ইমাম ইজ্জুদ্দিন ইবনে আবদুস সালাম রহমাতুল্লাহি আলাইহি বিদআত সম্পর্কে এক যুগান্তকারী ব্যাখ্যা প্রদান করেছেন। তিনি তেনার অমর কিতাব ‘কাওয়ায়িদুল আহকাম ফি মাসালিহিল আনাম’ গ্রন্থে স্পষ্ট খোদাই করে গেছেন যে, শরীয়তের দৃষ্টিতে নতুন কোনো বিষয়কে ঢালাওভাবে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা অজ্ঞতা মাত্র; বরং তামাম নতুন আমলকে তার প্রকৃতি ও শরীয়তের মূল বুনিয়াদের সাথে সামঞ্জস্যের ভিত্তিতেই বিচার করতে হবে।
তিনি খাঁটি উসূলের আলোকেই বিদআতকে মূলত পাঁচ প্রকারে বিভক্ত করেছেন-  ওয়াজিব, হারাম, মন্দুব (উত্তম/পছন্দনীয়), মাকরূহ এবং মুবাহ। তিনি স্পষ্ট ফতোয়া খোদাই করে গেছেন যে, পবিত্র মিলাদ মাহফিল করা এবং তাতে ঈমানদারদের অন্নদান করা ও নূর নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর শান ও আজমত আলোচনা করা একশত ভাগ ‘বিদআতে হাসনাহ’ বা সর্বোত্তম নেয়ামত। এই আমলকারী খোদ আল্লাহর দরবারে উত্তম সওয়াবের অধিকারী হবে। সুলতানুল ওলামার এই অকাট্য রায় খাঁটি আশেকদের হৃদয়কে কোটি গুণ বেশি প্রদীপ্ত করে প্রমাণ করে যে, মিলাদুন্নবী মোবারক উদযাপন করা শরীয়তের মন্দুব বা উত্তম আমল।

২. হাফেজ ইবনে হাজার আসকালানী রহমাতুল্লাহি আলাইহি এর অকাট্য কিতাবী দলিল

সহীহ বুখারী শরীফের বিশ্বখ্যাত ও শ্রেষ্ঠতম ব্যাখ্যাকার, হাফেজ ইবনে হাজার আসকালানী রহমাতুল্লাহি আলাইহি অকাট্য দলিলের মাধ্যমে প্রমাণ করেছেন যে, পবিত্র মিলাদ শরীফ উদযাপনের মূল বুনিয়াদ সরাসরি সহীহ হাদিস দ্বারাই প্রমাণিত। তিনি বুখারী ও মুসলিম শরীফে বর্ণিত আশুরা দিবসে হযরত মুসা আলাইহিস সালাম ও তেনার কওম ফেরাউনের কবল থেকে মুক্তি পাওয়ার স্মরণে আল্লাহর দরবারে শুকরিয়া আদায়ের খাস রোজা রাখার হাদিস দিয়ে বাতেলদের বিরুদ্ধে এক অপরাজেয় দলিল স্থাপন করেছেন।
তিনি স্পষ্ট ফয়সালা দিয়েছেন যে, খোদ রবের পক্ষ থেকে কোনো খাস নেয়ামত বা অনুগ্রহ প্রাপ্তির দিনে আল্লাহর ইবাদত, অন্নদান ও শুকরিয়া আদায় করা একশত ভাগ খাঁটি সুন্নাত;  তিনি আরও বলেন খোদ রাব্বুল আলামিনের পক্ষ থেকে তামাম কায়নাত ও ঈমানদারদের জন্য নূরে মুজাসসাম নূর নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর পবিত্র শুভ মিলাদ বা শুভ আগমনের চেয়ে বড় নেয়ামত ও অনুগ্রহ এ দুনিয়ায় আর কিছুই হতে পারে না। অতএব, ওলীগণের খাঁটি আশেকদের হৃদয়কে কোটি গুণ বেশি প্রদীপ্ত করে এই দলিল চাক্ষুষ প্রমাণ করে যে, মিলাদ শরীফের বরকতময় মজলিস কায়েম করা একশত ভাগ সহীহ হাদীসের বুনিয়াদের ওপরই সুরক্ষিত রয়েছে।

৩. ইমাম জালালুদ্দিন সুয়ূতী রহমাতুল্লাহি আলাইহি-এর নূরানী ফয়সালা ও কিতাবী বুনিয়াদ

সুফি আকিদার মহান স্তম্ভ ও নবম শতাব্দীর মুজাদ্দিদ, আল্লামা ইমাম জালালুদ্দিন সুয়ূতী রহমাতুল্লাহি আলাইহি তেনার মিলাদ শরীফ বিষয়ক খাস কিতাব ‘হুসনে মাকসিদ ফী আমালিল মাওলিদ’ (যা তেনার বিখ্যাত ফতোয়া গ্রন্থ ‘আল-হাভী লিল ফাতাওয়ী’-এর ১ম খণ্ডের অন্তর্গত)-এর ভেতর স্পষ্ট ও অকাট্য ফয়সালা জারি করে এরশাদ করেছেন যে:
 “পবিত্র মিলাদ শরীফের মূল বুনিয়াদ বা হাকিকত হলো- মুসলমানদের একত্রিত হওয়া, পবিত্র কোরআন থেকে তেলাওয়াত করা, নূরে মুজাসসাম নূর নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর শুভ আগমনের অলৌকিক মোজেযাসমূহ ও তেনার পবিত্র সীরাত মোবারক আলোচনা করা এবং অতঃপর ঈমানদারদের মাঝে অন্নদান বা তাবাররুক বিতরণ করা। এই তামাম আমল একশত ভাগ শরীয়তের দৃষ্টিতে মোস্তাহাব, প্রশংসনীয় উত্তম বিদআত (বিদআতে হাসনাহ) এবং অত্যন্ত বরকতময় নেয়ামত; যা পালনকারী খোদ আল্লাহর দরবারে মর্যাদার অধিকারী হবে।”
ইমাম জালালুদ্দিন সুয়ূতী রহমাতুল্লাহি আলাইহি তেনার এই কিতাবে আরও স্পষ্ট খোদাই করেছেন যে, যখনই কোনো মজলিসে নবী করিম সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর শুভ আগমনের মহিমান্বিত আলোচনা শুনে আশেকদের কলব আকুল হয়ে ওঠে এবং তেনার সম্মানে দাঁড়িয়ে তাজিম বা কিয়াম প্রদর্শন করে, তখন খোদ আরশের আসমান থেকে আল্লাহর রহমতের ফেরেশতারা সেই পবিত্র স্থানকে সুরক্ষাকবচে আবৃত করে নেয়। অতএব, ওলীগণের খাঁটি আশেকদের হৃদয়কে কোটি গুণ বেশি প্রদীপ্ত করে এই অকাট্য দলিল চাক্ষুষ প্রমাণ করে যে, মিলাদ ও কিয়ামের মহফিল কায়েম করা ইসলামের চৌদ্দশত বছরের তামাম ওলী, মুহাদ্দিস ও মুজাদ্দিদগণের সর্বসম্মত রায়।

৪. ইমাম ইবনে হাজার হাইতামী রহমাতুল্লাহি আলাইহি ও আউলিয়া কেরামগণের নূরানী রায়

সুফি আকিদার অন্যতম স্তম্ভ, যুগশ্রেষ্ঠ ফকীহ ও মুহাদ্দিস আল্লামা ইমাম ইবনে হাজার হাইতামী রহমাতুল্লাহি আলাইহি তেনার পবিত্র মিলাদ শরীফ বিষয়ক সুপ্রসিদ্ধ কিতাব ‘আন-নে’মাতুল কুবরা আলাল আলাম’-এর ভেতর স্পষ্ট ও জাজ্বল্যমান ফয়সালা খোদাই করে এরশাদ করেছেন যে:
“যে কোনো পবিত্র ঘর, মসজিদ বা বরকতময় মজলিসে যখনই নূরে মুজাসসাম নূর নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর পবিত্র মিলাদ ও শুভ আগমন মোবারকের মহিমান্বিত আলোচনা করা হয়, খোদ আরশের আসমান থেকে আল্লাহর রহমতের ফেরেশতারা সেই পবিত্র স্থানকে চারিদিক থেকে পরিবেষ্টিত করে নেয় এবং সেই মজলিস ও স্থানের তামাম মানুষের ওপর আল্লাহর খাস রহমত ও প্রশান্তি বর্ষিত হতে থাকে।”
[অকাট্য দলিল: ইমাম ইবনে হাজার হাইতামী, আন-নে’মাতুল কুবরা আলাল আলাম ফী মাওলিদি সাইয়্যিদি অলাদি আদম]
হাদিস ও ফিকহের ইমামগণের এই অকাট্য বর্ণনার সাথে হুবহু মিল রেখে গাউসুল আজম, বড় পীর দস্তগীর হযরত আব্দুল কাদির জিলানী রহমাতুল্লাহি আলাইহি, সুলতানুল হিন্দ হযরত খাজা গরীবে নেওয়াজ মঈনুদ্দিন চিশতী আজমেরী সানজারি রহমাতুল্লাহি আলাইহি থেকে শুরু করে তামাম হক্কানী সিলসিলার ওলী-আল্লাহ ও সুফি সাধকগণ যুগে যুগে এই পবিত্র মিলাদ ও কিয়ামের মাহফিল পরম ভক্তি ও মহব্বতের সাথে কায়েম করে এসেছেন এবং তাতে রূহার্নী নজর মোবারক বহাল রাখতেন। ওলীগণের খাঁটি আশেকদের হৃদয়কে কোটি গুণ বেশি প্রদীপ্ত করে এই অকাট্য কিতাবী বুনিয়াদ চাক্ষুষ প্রমাণ করে যে, পবিত্র মিলাদ ও কিয়াম শরীফের এই বরকতময় আমল তামাম আউলিয়া কেরামগণের আধ্যাত্মিক দয়া ও সর্বসম্মত সঠিক পথ হিসেবে একশত ভাগ নিরাপদ ও সুরক্ষিত রয়েছে।

বাতেল ওহাবী-সালাফী ফেতনার শুষ্ক কুযুক্তির দাঁতভাঙা জবাব

বিপথগামী নজদী-সালাফী গোষ্ঠীর তামাম শুকনো কুযুক্তির ভুলগুলো প্রমাণ করে খাঁটি সুন্নাহ ও হেদায়েতের আলো বুকে নিয়ে তাদের প্রধান তিনটি বিভ্রান্তিকর কুযুক্তি এবং ওলী-আল্লাহগণের কিতাবের আলোকে তাদের সেই উপযুক্ত ও দাঁতভাঙা জবাব নিচে লিখে দেওয়া হলো, যা খাঁটি আশেকদের হৃদয়কে কোটি গুণ বেশি শক্তিশালী ও সুরক্ষিত করে তুলবে।

বাতেলদের কুযুক্তি- ১

বাত্তেলদের দাবি: “পবিত্র কোরআনে তো কোথাও সরাসরি ‘মিলাদ মাহফিল’ শব্দ দুটি লেখা নেই, সুতরাং এটি হারাম।”
সহজ ও অকাট্য জবাব: পবিত্র কোরআনে তো সরাসরি মাদ্রাসা, মক্তব, বুখারী শরীফ, মুসলিম শরীফ শব্দটিও লেখা নেই; তাহলে কি বিপথগামী মোল্লারা এই গুলোকে হারাম বলবে? খোদ কোরআনে আল্লাহর রহমত ও অনুগ্রহের শুকরিয়া আদায় করার খাস হুকুম দেওয়া আছে। আর আমাদের নূর নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম হলেন তামাম সৃষ্টিজগতের মূল রহমত ও শ্রেষ্ঠ নেয়ামত। অতএব, আল্লাহর হুকুম মেনে এই মহান নেয়ামতের শুকরিয়া আদায়ের জন্য মিলাদের মজলিস করা একশত ভাগ জায়েজ ও সওয়াবের কাজ। শুধু হরফ বা শব্দ খুঁজে মানুষকে বিভ্রান্ত করা বাতেলদের মনের এক কুৎসিত অন্ধত্ব ছাড়া আর কিছুই নয়।

বাতেলদের কুযুক্তি- ২

বাত্তেলদের দাবি: হযরত আনাস রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত তিরমিজি শরীফের ২৭৫৪ নম্বর হাদিসে রয়েছে-সাহাবায়ে কেরাম নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে দেখলে দাঁড়িয়ে যেতেন না, কারণ তিনি তা অপছন্দ করতেন। সুতরাং কিয়াম করা বিদআত।
সহজ ও অকাট্য জবাব: বাতেলদের এই ব্যাখ্যা তাদের মনের এক কুৎসিত অন্ধত্ব ছাড়া আর কিছুই নয়। মুহাদ্দিসীন ও ওলী-আল্লাহগণের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, এই হাদিসের বাতেনি হাকিকত হলো ২টি:
১. নূর নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর পরম বিনয়: কুল কায়েনাতের সকল কিছুর উদ্ধে হওয়া সত্ত্বেও খোদ নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজের জন্য এই দুনিয়ার অহঙ্কারী রাজা-বাদশাহদের মতো লৌকিক বা লোকদেখানো দাঁড়ানোকে পছন্দ করতেন না, তা ছিল তেনার পরম বিনয় ও উম্মতের প্রতি খাস করুণা।
২. সাহাবায়ে কেরামের দাঁড়িয়ে তাজিম করার অন্যান্য সহীহ দলিল: এই হযরত আনাস রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু নিজেই অন্য হাদিসে বর্ণনা করেছেন যা আমরা সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিম শরীফের অকাট্য পাতায় চাক্ষুষ অবলোকন করি। খোদ নূর নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন আনসার সাহাবীগণের সর্দার হযরত সাদ ইবনে মুয়াজ রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু-এর শুভাগমন ঘটল, তখন তামাম সাহাবাদের খাস নির্দেশ জারি করে এরশাদ করেছিলেন- “তোমরা তোমাদের সর্দারের সম্মানে দাঁড়িয়ে যাও!”
হযরত হাসসান ইবনে সাবিত রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে দেখামাত্রই গভীর রূহার্নী ইশকে আকুল হয়ে কিয়ামে দাঁড়িয়ে যেতেন, কিন্তু নূর নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজে তেনাকে বিন্দুমাত্র কোনো বাধা বা বারণ করেননি। 
অতএব, এই সহীহ হাদিস ও অকাট্য দলিল একশত ভাগ প্রমাণ করে যে, রাহমাতুল্লিল আলামিন, শাফিউল মুযনীবীন, নূরে মুজাসসাম নূর নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর মহিমান্বিত শান ও আজমতে পরম ভক্তিতে কিয়াম বা দাঁড়িয়ে তাজিম করা একশত ভাগ বৈধ, জায়েজ এবং সাওয়াবের কাজ।

বাতেলদের কুযুক্তি-৩

বাত্তেলদের দাবি: “পবিত্র মিলাদ শরীফ উদযাপন করা নাসারা বা খ্রিস্টানদের বড়দিনের (ক্রিসমাস) মতো অনুকরণ করা, সুতরাং এটি বিদআত ও নাজায়েজ।”
সহজ ও অকাট্য জবাব: খ্রিস্টানরা হযরত ঈসা আলাইহিস সালাম-কে আল্লাহর পুত্র (নাউজুবিল্লাহ) দাবি করে সরাসরি শিরক করে। আর নূর নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর ঈমানদার উম্মতগণ পবিত্র মিলাদ মাহফিলে নূর নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে তামাম সৃষ্টিজগতের শ্রেষ্ঠ রহমত, ত্বরানে ওয়ালা, বাঁচানে ওয়ালা, শান্তিদাতা, মুক্তিদাতা এবং সৃষ্টিজগতের শ্রেষ্ঠ যেনার সাথে কোনো কিছুর বিন্দুমাত্র তুলনা চলে না- তা জেনেই তেনার পবিত্র শানে দরূদ ও সালাম পেশ করে।
খ্রিস্টানদের সেই জঘন্য শিরকের সাথে আশেকদের এই খাঁটি তওহীদ ও সুন্নাহর তুলনা করা বিপথগামী নজদী-সালাফী গোষ্ঠীর নোংরা চক্রান্ত ছাড়া আর কিছুই নয়। অতএব, ভালোবাসার মিলাদকে শিরকের সাথে মেলানো বাতেলদের চরম গোমরাহী মাত্র।

পরিশেষে: ঈমান রক্ষার চূড়ান্ত রূপরেখা

মিলাদ ও কিয়াম কি বিদআত?- এই প্রশ্নকে কেন্দ্র করে যুগে যুগে সমাজে নানা মত ও বিতর্ক দেখা গেছে। কিন্তু জমানার ধর্মীয় অবক্ষয় ও নব্য ফিতনার ভ্রান্ত আগ্রাসনের মাঝেও আমাদের উচিত কুরআন-সুন্নাহর আলোকে সত্যকে বোঝা এবং নূর নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লামের মহব্বত ও তাজিমকে হৃদয়ে অটুট রাখা।

আউলিয়া কেরামের রূহানী নজর মোবারকের উসিলায় খাঁটি সুফি আকিদার ওপর পাহাড়ের মতো অটল থেকে আমাদের ঈমান ও মহব্বতকে আরও দৃঢ় করতে হবে। পবিত্র মিলাদ ও কিয়াম শরীফ খাঁটি আশেকদের হৃদয়ে নূর নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লামের মহব্বত, তাজিম ও ঈমানী চেতনাকে জাগ্রত রাখার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হিসেবে বিবেচিত।

বিরোধিতা ও বিভ্রান্তির যত কথাই উঠুক না কেন, ওলীগণের হেদায়েতের আলো সত্যের সন্ধানী মানুষের হৃদয়ে জ্বলতেই থাকবে। এই আলো মহব্বত, আদব ও সত্যের পথকে আরও উজ্জ্বল করবে। আসুন, তামাম ভ্রান্ত আকিদার মুখোশ এক পলকে চূর্ণ করে, নিজের অন্তরের বাতেনি আয়না পরিষ্কার করে রাসূলে খোদা নূর নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর পবিত্র ও খাঁটি ইশকে নিজেদের তামাম জীবন সমর্পণ করি।

Hello, Monetag!

👉 এখানে চাপ দিয়ে ফ্রিতে Monetag অ্যাকাউন্ট খুলুন

© ২০২৬ golammorshedjalali.com • সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।

💰 বিজ্ঞাপন ও মনিটাইজেশন: Monetag | 🌐 হোস্টিং: Putul Host

Join WhatsApp

Join Now

Join Telegram

Join Now

Related Stories

Leave a Comment