দয়াল নবী আপনার দরবারে আমি গোলাম হাজির হইয়াছি।
মৃত্যু মানব জীবনের এক অবধারিত সত্য, যা প্রতিটি মানুষের জন্য নির্ধারিত। তবে একজন ঈমানদারের মৃত্যুর মুহূর্ত ইসলামী আধ্যাত্মিকতায় শুধুমাত্র একটি সমাপ্তি নয়, বরং এক শান্তিময় যাত্রা হিসেবে বিবেচিত। কোরআন ও হাদীসে ঈমানদারের মৃত্যুকে ভয় নয়, বরং প্রশান্তি ও সুসংবাদের মুহূর্ত হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। এই সময় নূর নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর দিদার একজন মুমিনের অন্তরকে শান্ত করে তোলে।
দয়াল বাবা জালালী মাওলা তেনার আধ্যাত্মিক আলোচনায় হযরত শিবলী রাহমাতুল্লাহি আলাইহির একটি ঘটনাকে কেন্দ্র করে ঈমানদারের মৃত্যুর রূহানী বাস্তবতা তুলে ধরেছেন। এই বর্ণনা শুধু একটি গল্প নয়, বরং মৃত্যুর পরবর্তী সত্য ও আধ্যাত্মিক রহস্য বোঝার একটি মাধ্যম। নিচের ঘটনায় আমরা দেখতে পাবো ঈমানদারের মৃত্যুর গভীর অর্থ।
ঈমানদারের মৃত্যু
দয়াল বাবা জালালী মাওলা বলেন- একজন আলেম আল্লাহর অলি শিবলী রাহমাতুল্লাহি আলাইহির কাছে গিয়ে বলল, “হুজুর, ঈমানদারের মৃত্যু কিভাবে হবে আপনি আমাকে বলেন।” আল্লাহর অলি শিবলী রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বললেন, “বাবারে, ঈমানদারের মৃত্যুর খবর আল্লাহ সূরা ইউসুফের মধ্যে দিয়েছেন। যাও, সূরা ইউসুফ পড়লে পাবা।” আলেম বাড়ি গিয়ে কুরআন শরীফ খুলে সূরা ইউসুফ ৩ (তিন) বার তেলাওয়াত করলেন, কিন্তু ঈমানদারের মৃত্যুর কোন খবর পেলেন না।
প্রশ্ন ও অনুসন্ধান
এবার আলেম কুরআন শরীফ বন্ধ করে দৌড় দিয়ে আল্লাহর অলি শিবলী রাহমাতুল্লাহি আলাইহির কাছে গিয়ে বলল, “হুজুর, সূরা ইউসুফ ৩ (তিন) বার করে তেলাওয়াত করেছি, কিন্তু ঈমানদারের মৃত্যুর খবর পেলাম না।” আল্লাহর অলি শিবলী রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বললেন, “তোমাকে মৌলভী বললেও গোনা হবে, তোমাকে আলেম বললেও গোনা হবে।”
জুলেখা ও মিশরের নারীদের ঘটনা
“তুমি কি দেখ না, মিশরের মেয়েরা বলে- ‘জুলেখা, তুমি আমাদের মেয়েদের ইজ্জত নষ্ট করে দিয়েছো। তুমি একজন বাদশার স্ত্রী হয়ে একজন গোলামের প্রেমে পাগল হয়েছো। আমরা মেয়ে জাত সমাজে মুখ দেখাতে পারি না।’ জুলেখা প্রতিবাদ করে না। ১ (এক) হাজার মেয়েকে দাওয়াত দিয়েছে, সারিবদ্ধভাবে বসিয়ে বলে- ‘বোনগো, ধরো এই ছুরিটা আর এই লেবুটা আমি দিলাম। আমি যখন হুকুম করবো, তখন লেবু কেটে খাওয়া আরম্ভ করবে।’ এই বলে প্রত্যেক মেয়ের হাতে ১ (এক)টা লেবু আর ১ (এক)টা ছুরি দিল।”
হযরত ইউসুফ আলাইহিস সালাম-এর রূপের বিস্ময়
জুলেখা ভিতর বাড়িতে গিয়ে ইউসুফ নবীকে বোরকা পরিয়ে মেয়েদের মজলিসে নিয়ে এসে ইউসুফ নবীর বোরকাটা খুলে বলে- ‘বোন, আমি এই গোলামের পাগল।’ ১ (এক) হাজার মেয়ে ইউসুফ নবীকে দেখে বাহবা শুরু করল। তারা বলতে লাগল-‘এ তো মানুষ নয়, এ তো ফেরেশতা।’ জুলেখা বলল- ‘তোমরা লেবু কাটো আর খানা খাও।’ ঐ মেয়েরা ইউসুফ নবীর দিকে চেয়ে লেবুর জায়গায় লেবু আছে লেবু কাটার পরিবর্তে ১ (এক) হাজার মেয়ে হাতের কব্জি পর্যন্ত আলাদা করে ফেলল। কিন্তু ব্যথা বা রক্তের কোন খবর ছিল না।”
ঈমানদারের মৃত্যুর রূহানী বাস্তবতা
ইউসুফ নবীর রূপ দয়াল নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লামের এক ছটাক রূপ। ইউসুফ নবীর রূপ দেখে যেমন মিশরের মেয়েরা হাতের কব্জি পর্যন্ত আলাদা করে দিয়েছিল, তবুও রক্ত কিংবা ব্যথার কোন খবর ছিল না। তেমনি মদিনার কামালের ওয়ালা নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম ঈমানদার উম্মতের মৃত্যুর সময় সামনে দণ্ডায়মান থাকবেন। আজরাইল যত কষ্টের সাথে মৃত্যু (মৌত) দিক না কেন, উম্মত নূর নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লামের দিকে চেয়ে থাকবে, মৃত্যু (মৌত)-এর কোন খবরই পাবে না।
পরিশেষে
এ ঘটনা থেকে আমরা একটি গভীর আধ্যাত্মিক শিক্ষা লাভ করি- ঈমানদারের মৃত্যুর মুহূর্ত কখনোই কষ্টের নয়, বরং তা নূর নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লামের-এর নূরানী উপস্থিতিতে ভরপুর এক প্রশান্তিময় অভিজ্ঞতা।
হযরত ইউসুফ আলাইহিস সালামের অপরূপ সৌন্দর্যে মিশরের নারীরা বিস্মিত হয়ে বাহ্যিক ব্যথার অনুভূতি ভুলে গিয়েছিল, তেমনি একজন সত্যিকারের ঈমানদার মৃত্যুর কঠিন মুহূর্তে নূর নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লামের নূরানী চেহারা মোবারকের দিকে তাকিয়ে থাকবেন। ফলে মৃত্যু আর ভয় নয়-বরং মাওলার নৈকট্যে পৌঁছানোর এক রূহানী আনন্দময় যাত্রা হয়ে ওঠে।










