নূর নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর ক্ষমা ও দয়া ইসলামের মানবিক সৌন্দর্যের এক অনন্য নিদর্শন। তায়েফের ময়দানে নবীজির ধৈর্য এবং মক্কা বিজয়ের পর শত্রুদের সাধারণ ক্ষমার ঐতিহাসিক ঘটনা জানতে এই আধ্যাত্মিক নিবন্ধটি পড়ুন।
দয়াল নবী আপনার দরবারে আমি গোলাম হাজির হইয়াছি।
নবীজি ﷺ-এর ক্ষমা ও দয়া কেবল ইসলামের ইতিহাসের কোনো সাধারণ অধ্যায় নয়, বরং এটি হলো মানব চরিত্রের চূড়ান্ত শিখর। বর্তমান পৃথিবীতে যখন প্রতিশোধের নেশা মানুষকে অন্ধ করে তুলছে, তখন দয়ার নবী, নূরে মুজাসসাম সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর ক্ষমার আদর্শ আমাদের আধ্যাত্মিক মুক্তির পথ দেখায়। সুফি সাধক ও ওলী-আল্লাহগণ বলেন, নফসকে জয় করার সবচেয়ে বড় অস্ত্র হলো ক্ষমা। আজকের এই বিশেষ নিবন্ধে আমরা তায়েফের রক্তঝরা ময়দান থেকে শুরু করে মক্কা বিজয়ের সেই ঐতিহাসিক মুহূর্ত পর্যন্ত- নবীজি ﷺ-এর ক্ষমা ও দয়ার এমন কিছু চাক্ষুষ ঘটনা আলোচনা করব, যা আপনার ঈমানকে জ্যান্ত করবে এবং অন্তরে শান্তির নূর ছড়িয়ে দেবে।
তায়েফের ময়দান: পাথরের আঘাতেও ঝরেছে কেবল দোয়া
ইসলামের ইতিহাসের সবচেয়ে হৃদয়বিদারক অথচ শিক্ষণীয় ঘটনা হলো তায়েফের সফর। আল্লাহর নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন ইসলামের দাওয়াত নিয়ে তায়েফে গেলেন, তখন সেখানকার মানুষ তাঁকে ফুলের মালায় বরণ করেনি, বরং লেলিয়ে দিয়েছিল মদমত্ত একদল বখাটে যুবককে। তারা নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে লক্ষ্য করে বৃষ্টির মতো পাথর ছুঁড়তে লাগল। নবীজির পবিত্র শরীর মোবারক রক্তে রঞ্জিত হলো, জুতো মোবারক রক্তে জমাট বেঁধে গেল।
সেই মরমী দৃশ্য- যখন জিবরাঈল আলাইহিস সালাম পাহাড়ের ফেরেশতাকে নিয়ে হাজির হয়ে বললেন, “ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনি অনুমতি দিলে আমি এই দুই পাহাড়কে একত্র করে তায়েফবাসীকে পিষে ধ্বংস করে দেব।” কিন্তু রহমাতুল্লিল আলামিন নূর নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম কী বললেন? তিনি ব্যথায় কুঁকড়ে না গিয়ে পরম মমতায় হাত তুলে দোয়া করলেন-“হে আল্লাহ! ওদের ক্ষমা করো, ওরা তো জানে না আমি কে।” শত্রুর জন্য এই পর্যায়ের করুণা ও ক্ষমা কেবল আল্লাহর মাহবুবেরই সাজে। এটিই হলো ক্ষমার রূহার্নী শক্তি।
মক্কা বিজয়: প্রতিশোধের পরিবর্তে সাধারণ ক্ষমা
দীর্ঘ আট বছর নির্বাসিত থাকার পর নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন বিজয়ী বেশে মক্কায় প্রবেশ করলেন, তখন তেনার সামনে দাঁড়িয়ে ছিল সেইসব মানুষ, যারা তেনাকে দেশছাড়া করেছিল, তাঁর সাহাবীদের হত্যা করেছিল এবং তেনার দাঁত মোবারক শহীদ করেছিল। তৎকালীন আরবের নিয়ম অনুযায়ী সেদিন রক্তের বন্যা বয়ে যাওয়ার কথা ছিল।
কিন্তু নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম সেদিন এক অনন্য নজির স্থাপন করলেন। তিনি আবু সুফিয়ানের মতো কট্টর শত্রুকেও ক্ষমা করে দিলেন এবং ঘোষণা করলেন- “আজ তোমাদের বিরুদ্ধে আমার কোনো অভিযোগ নেই। তোমরা সবাই মুক্ত।” এই যে ‘আম-ক্ষমা’ বা সাধারণ ক্ষমা, এটিই মক্কার মানুষের কলবকে আল্লাহর নূরে আলোকিত করে দিয়েছিল। সুফি দর্শনে একে বলা হয় ‘বিজয় নয়, বরং হৃদয়ের জয়’।
হিন্দা ও ওয়াহশীর ক্ষমা: ক্ষমার এক অনন্য উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত
উহুদ যুদ্ধের ময়দানে নূর নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর প্রিয় চাচা এবং ইসলামের নির্ভীক সেনাপতি হযরত হামজা রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু-কে অত্যন্ত নৃশংস ও পৈশাচিক কায়দায় শহীদ করা হয়েছিল। কাফের ওয়াহশী আড়াল থেকে বল্লম ছুঁড়ে তাঁকে শহীদ করে এবং হিন্দা পরম প্রতিহিংসায় তাঁর পবিত্র লাশের বুক চিরে কলিজা বের করে চিবিয়ে খেয়েছিল। নিজের অতি আদরের চাচার প্রতি এমন বর্বরোচিত আচরণ দেখে নূর নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর পবিত্র অন্তর শোকে স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল। নূর নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম তেনার জীবনে এত গভীর আঘাত আর কখনো পাননি।
কিন্তু মক্কা বিজয়ের পর যখন ইসলামের বিজয় পতাকা চারদিকে উড়ছে, তখন সেই হিন্দা ও ওয়াহশী নিজেদের কৃতকর্মের জন্য অনুতপ্ত হয়ে নূর নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর দরবারে হাজির হলো। তারা জানত যে, দুনিয়াবী কোনো বিচারে তাদের ক্ষমা পাওয়ার অধিকার নেই। কিন্তু দয়ার সাগর নূর নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজের সমস্ত কষ্ট, চোখের জল এবং চাচার বিয়োগব্যথাকে তুচ্ছ করে তাঁদের দু’জনকেই বিনা শর্তে ক্ষমা করে দিলেন।
যদিও চাচার স্মৃতি মনে পড়লে নূর নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর দু’চোখ বেয়ে অশ্রু ঝরতো, তবুও তিনি হিন্দা ও ওয়াহশীকে কেবল চোখের সামনে থেকে দূরে থাকতে বলেছিলেন যাতে পুরনো শোকের স্মৃতি নবীজির কোমল
অন্তরকে ব্যথিত না করে।
ইহুদি বৃদ্ধার ঘটনা: নবীজির সেবার অলৌকিক যাদু ও অনুপম আদর্শ
আমরা অনেকেই সেই বৃদ্ধার ঐতিহাসিক ঘটনাটি জানি, যে নূর নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর প্রতি চরম শত্রুতা ও বিদ্বেষে লিপ্ত ছিল। প্রতিদিন যখন নূর নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম পথ দিয়ে হেঁটে যেতেন, তখন সেই বৃদ্ধা পরম ঘৃণায় তেনার চলার পথে ধারালো কাঁটা ও নোংরা আবর্জনা বিছিয়ে রাখত। নবীজির পবিত্র কদম মোবারক যেন রক্তাক্ত হয় এবং তিনি যেন কষ্ট পান- এটাই ছিল বৃদ্ধার কুটিল উদ্দেশ্য। কিন্তু রহমাতুল্লিল আলামিন নূর নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম প্রতিদিন সেই নিদারুণ কষ্ট হাসিমুখে সহ্য করতেন এবং কোনোদিন একটি কটু কথাও সেই বৃদ্ধাকে বলেননি।
হঠাৎ একদিন নূর নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম পথে চলতে গিয়ে দেখলেন সেখানে কোনো কাঁটা বা ময়লা নেই। পরম দয়ালু নবীজির মনে কোনো প্রতিশোধের আনন্দ নয়, বরং গভীর দুশ্চিন্তা জাগল। তিনি ভাবলেন-প্রতিদিন যে বৃদ্ধা এখানে কাঁটা রাখত, আজ সে নিশ্চয়ই কোনো কঠিন বিপদে পড়েছে। নূর নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম খোঁজ নিয়ে বৃদ্ধার ঘরে গিয়ে দেখলেন সে একাকী শয্যাশায়ী এবং ভীষণ অসুস্থ। নবীজিকে নিজ ঘরে দেখে বৃদ্ধা ভয়ে কুঁকড়ে গেল, সে ভাবল হয়তো আজ নবীজি তার দীর্ঘদিনের অপকর্মের প্রতিশোধ নিতে এসেছেন।
কিন্তু দয়ার সাগর নূর নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম প্রতিশোধ নেওয়া তো দূরের কথা, পরম মমতায় বৃদ্ধার শিয়রে বসলেন। তিনি নিজের কুদরতি হাতে বৃদ্ধার সেবা করতে লাগলেন, তাঁর ঘর পরিষ্কার করলেন এবং তাঁর জন্য পথ্যের ব্যবস্থা করলেন। বৃদ্ধা অবাক হয়ে চাক্ষুষ প্রত্যক্ষ করল যে-যাঁকে সে প্রতিদিন নির্মমভাবে কষ্ট দিয়েছে, তিনিই আজ তাঁর একমাত্র সেবক ও ত্রাণকর্তা হয়ে পাশে দাঁড়িয়েছেন। নূর নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম বৃদ্ধাকে আশ্বস্ত করে বললেন যে, অসুস্থ অবস্থায় সেবা করা আল্লাহরই হুকুম।
নবীজির এই অভাবনীয় ক্ষমা ও মহানুভবতা দেখে বৃদ্ধার পাষাণ হৃদয় মোমের মতো গলে গেল। সে নিজের ভুল বুঝতে পেরে কান্নায় ভেঙে পড়ল এবং নূর নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর পবিত্র কদম মোবারকে পড়ে ইসলাম গ্রহণ করল।
ওহুদ যুদ্ধের হত্যাকারী সুমামাহ বিন উছালের প্রতি রহমত
সুমামাহ বিন উছাল ছিলেন আরবের ইয়ামামা অঞ্চলের এক প্রভাবশালী নেতা এবং মদীনার এক কট্টর শত্রু। ইসলামের পথে বাধা দিতে গিয়ে তিনি অনেক সাহাবীকে নৃশংসভাবে শহীদ করেছিলেন। যখন তিনি মুসলমানদের হাতে বন্দী হলেন, তখন নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁকে মসজিদে নববীর একটি খুঁটির সাথে বেঁধে রাখার নির্দেশ দিলেন।
খুঁটির সাথে একজন খুনি বন্দী হয়ে আছেন, অথচ রহমাতুল্লিল আলামিন নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম তেনাকে দেখে ধমক দিলেন না কিংবা কোনো প্রতিশোধের কথা বললেন না। বরং দয়াল নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজ হাত মোবারক দিয়ে সুমামাহকে দুধ পান করাতেন এবং অত্যন্ত কোমল স্বরে তাঁর কুশল বিনিময় করতেন। সাহাবীরা অবাক হয়ে দেখতেন-যাঁর হাতে তলোয়ার নিয়ে প্রতিশোধ নেওয়ার কথা, তিনি নিজ হাতে শত্রুর সেবা করছেন! নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর এই অভাবনীয় ক্ষমা ও রূহার্নী দয়া দেখে সুমামাহর পাথরের মতো কঠিন অন্তর মুহূর্তেই স্তম্ভিত হয়ে যায়।
তিন দিন পর যখন নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁকে বিনা শর্তে মুক্তি দিলেন, তখন সুমামাহর কলব বা বাতেনি জগত নূরে হেদায়েতে আলোকিত হয়ে উঠল। তিনি মুক্ত হয়ে পালিয়ে গেলেন না, বরং পবিত্র গোসল সেরে ফিরে এসে নবীজির পবিত্র কদমে আছড়ে পড়লেন এবং স্বেচ্ছায় কালিমা পড়ে ইসলাম কবুল করলেন। তিনি কেঁদে বললেন-
“ইয়া রাসূলাল্লাহ! পৃথিবীতে আপনার চেহারার চেয়ে ঘৃণ্য আর কেউ আমার কাছে ছিল না, কিন্তু আজ আপনার চেহারাই আমার কাছে সবচেয়ে প্রিয়।”
ক্ষমার আধ্যাত্মিক ও বাতেনি উপকারিতা
ইমাম গাজ্জালী রহমাতুল্লাহি আলাইহি তাঁর ‘এহয়াউ উলুমিদ্দীন’ কিতাবে বলেছেন, ক্ষমা হলো নফসকে পিষে ফেলার সবচেয়ে কার্যকর ঔষধ। মানুষ যখন কাউকে ক্ষমা করে, তখন সে আসলে নিজের আত্মা বা রূহকেই মুক্ত করে। মাওলানা রুমি রহমাতুল্লাহি আলাইহি তাঁর মসনবিতে বলেছেন- “ক্ষমা হলো সেই সুগন্ধি, যা পিষে ফেলার পরেও ফুলের পাপড়ি থেকে ঝরতে থাকে।” নবীজি ﷺ-এর ক্ষমা ও দয়ার শিক্ষা আমাদের শেখায় কীভাবে শত্রুকে বন্ধুতে রূপান্তর করতে হয়।
উপসংহার
নবীজি ﷺ-এর ক্ষমা ও দয়া কোনো অলীক কাহিনী নয়, বরং এটিই হলো হকের পথে চলার আসল পাথেয়। আমরা যারা আজ নিজেদের ঈমানদার দাবি করি, আমাদের কি উচিত নয় নবীজির এই আদর্শ নিজের জীবনে ধারণ করা? নবীজির শিক্ষাই হলো— কাউকে ক্ষমা করতে পারাটাই আসল বীরত্ব। আসুন, আমরা মানুষের ভুলগুলো মাফ করতে শিখি এবং নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর দয়ার চাদরের নিচে আশ্রয় খুঁজি। দয়াল মাওলা আমাদের সবাইকে নবীজির এই মহৎ গুণ অর্জন করার তৌফিক দিন। আমিন।