স্বার্থান্বেষী সমাজ ও পরোপকার: সুফি সাধকদের উদারতা কি আজ কেবলই ইতিহাস?

স্বার্থান্বেষী সমাজ ও পরোপকার আজ এক বড় দ্বন্দ্বে লিপ্ত। সুফি সাধকদের সেই উদারতা ও আত্মত্যাগের দর্শন কি আজ কেবলই ইতিহাস? বর্তমান সমাজের নৈতিক অবক্ষয় ও পারিবারিক শিক্ষার অভাব নিয়ে এই বিস্তারিত মরমী নিবন্ধটি পড়ুন।

July 21, 2026 4:49 PM
স্বার্থান্বেষী সমাজ ও পরোপকার সুফি সাধকদের উদারতা
---Advertisement---

দয়াল নবী আপনার দরবারে আমি গোলাম হাজির হইয়াছি।

স্বার্থান্বেষী সমাজ ও পরোপকার— এই দুটি বিষয় বর্তমান আধুনিক সভ্যতায় এক বড় দ্বন্দ্বে লিপ্ত। বর্তমান সময়ে মানুষ কেবল নিজের ক্ষুদ্র স্বার্থ, ব্যক্তিগত লাভ এবং জাগতিক সফলতার মোহে অন্ধ হয়ে পড়ছে। অন্যের কল্যাণে নিজেকে বিলিয়ে দেওয়ার যে শাশ্বত সুফি দর্শন আমাদের ওলী-আউলিয়াগণ শিখিয়েছিলেন, তা না মানার কারণে আমাদের সমাজকে এক নির্দয় ও পাথুরে মরুভূমিতে পরিণত করছে। আজকের এই বিস্তারিত নিবন্ধে আমরা কুরআন, হাদিস এবং ওলী-আউলিয়াদের মরমী আদর্শের আলোকে অনুসন্ধান করব যে, কেন স্বার্থান্বেষী সমাজ ও পরোপকার-এর এই ব্যবধান আমাদের আত্মিক পচনের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে

স্বার্থপরতার অন্ধকার বনাম সুফিদের আলোকিত পরোপকার

বর্তমান ভোগবাদী সমাজ আমাদের শেখায় ‘আগে নিজে বাঁচো’। কিন্তু ইসলামের মরমী দর্শন বা সুফিবাদ আমাদের শেখায় ‘আগে অন্যকে বাঁচাও’। সুফি সাধকদের কাছে পরোপকার বা ‘খিদমতে খালক’ ছিল স্রষ্টাকে পাওয়ার অন্যতম প্রধান মাধ্যম। তাঁরা বিশ্বাস করতেন, স্রষ্টার সৃষ্টির সেবা না করে স্রষ্টার সন্তুষ্টি অর্জন করা অসম্ভব।

সুফি দর্শনে আত্মত্যাগ ও পরোপকার

হযরত খাজা মঈনুদ্দিন চিশতী রহমাতুল্লাহি আলাইহি-এর একটি বিখ্যাত বাণী আছে: “ওলীর বৈশিষ্ট্য হলো তিনটি- নদী হার মে মেখাওয়াত (নদীর মতো দানশীলতা), সূর্য হার মে শফাকাত (সূর্যের মতো সমভাবে মমতা) এবং ধরিত্রী হার মে তাওয়াজু (জমিনের মতো বিনয়)।” স্বার্থান্বেষী সমাজ ও পরোপকার-এর এই ভারসাম্যহীন যুগে এই সুফি আদর্শই পারে আমাদের হৃদয়ে দয়া ও মমতার নূর জাগ্রত করতে। ওলীগণ নিজেদের ক্ষুধার্ত রেখে অন্যকে খাবার খাইয়েছেন, যা আজ আমাদের সমাজে কেবল ইতিহাসের গল্প মনে হয়

কুরআন ও হাদিসের আলোকে পরোপকারের গুরুত্ব

ইসলামে পরোপকার বা অন্যের হক আদায় করাকে ইমানের অবিচ্ছেদ্য অংশ করা হয়েছে। কুরআন মজিদে আল্লাহ তাআলা সেই সব মানুষের প্রশংসা করেছেন যারা নিজের অভাব থাকা সত্ত্বেও অন্যকে প্রাধান্য দেয়।

পবিত্র কুরআনের ঘোষণা

“তারা নিজেদের ওপর অন্যদের প্রাধান্য দেয়, যদিও তারা অভাবগ্রস্ত থাকে। আর যারা মনের কার্পণ্য থেকে মুক্ত থাকে, তারাই সফলকাম” (সূরা হাশর, আয়াত: ৯)। এই আয়াতটি আমাদের বর্তমান স্বার্থান্বেষী সমাজ ও পরোপকার-হীনতার মুখে এক বিশাল চপেটাঘাত। হকের পথে চলতে হলে নিজের স্বার্থ ত্যাগের মানসিকতা তৈরি করতে হবে।

নূর নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নূরানি বাণী

রাসূলে পাক সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন, “সৃষ্টিজগত আল্লাহর পরিবারস্বরূপ। আল্লাহর কাছে সেই ব্যক্তিই সবচেয়ে প্রিয়, যে তাঁর পরিবারের (সৃষ্টির) সাথে উত্তম আচরণ করে” (বায়হাকী)। এই হাদিসটি স্পষ্ট করে দেয় যে, মানুষ যখন স্বার্থপর হয়, তখন সে আসলে আল্লাহর পরিবার বা সৃষ্টির অবমাননা করে।

আধুনিক সমাজের পাথুরে বাস্তবতা ও ধর্মীয় অবক্ষয়

বর্তমান সময়ে আমরা আধুনিক প্রযুক্তিতে অনেক উন্নত হলেও মানসিকভাবে অনেক বেশি স্বার্থপর হয়ে পড়েছি। ‘আমি এবং আমার পরিবার’—এই গণ্ডির বাইরে আমরা তাকাতে ভুলে গেছি। এই ধর্মীয় অবক্ষয় ও বাস্তবতা আমাদের কলবকে বা হৃদয়কে কঠিন করে তুলছে। পাথুরে হৃদয়ে কখনো আল্লাহর রহমতের নূর প্রবেশ করে না।

পারিবারিক ও সামাজিক শিক্ষার অভাব

পারিবারিক শিক্ষার বিলুপ্তি ও ধর্মীয় অবক্ষয় আমাদের সন্তানদের শেখাচ্ছে কেবল প্রতিযোগিতা করতে, সহযোগিতা করতে নয়। যখন একটি শিশু তার পরিবারে পরোপকারের শিক্ষা পায় না, তখন বড় হয়ে সে কেবল নিজের লাভ খোঁজে। এর ফলে সমাজে হিংসা, হানাহানি এবং খোদাদ্রোহিতা বেড়ে যায়।

মওলা আলী আলাইহিস সালাম-এর উদারতা ও আমাদের শিক্ষা

মওলা আলী আলাইহিস সালাম-এর জীবন ছিল পরোপকারের এক জীবন্ত দলিল। তিনি নিজের ইফতারের খাবার ভিক্ষুক, এতিম ও বন্দীদের দিয়ে দিয়েছিলেন, যার ফলে আল্লাহ তাআলা কুরআনের আয়াত নাজিল করেছিলেন। মওলা আলী আলাইহিস সালাম বলতেন, “সবচেয়ে বড় অভাব হলো মানুষের মধ্যে সহমর্মিতার অভাব।” বর্তমান স্বার্থান্বেষী সমাজ ও পরোপকার-এর দ্বন্দ্বে মওলা আলী আলাইহিস সালাম-এর এই শিক্ষা আমাদের জন্য অন্ধকার পথের প্রদীপ।

উত্তরণের পথ: কামেল মুর্শিদের সোহবত ও আত্মশুদ্ধি

নফসের গোলামি বা স্বার্থপরতা থেকে মুক্তি পেতে হলে একজন কামেল মুর্শিদের সোহবত অত্যন্ত প্রয়োজন। মুর্শিদ মুরিদের কলব থেকে স্বার্থপরতার ময়লা ধুয়ে সেখানে ‘ইশক’ বা ভালোবাসার বীজ বপন করেন। সুফি দর্শন আমাদের শেখায় যে, নিজের জন্য যা পছন্দ করো, তা অন্যের জন্যও পছন্দ করো। এই দর্শনের পুনর্জাগরণই পারে সমাজকে এই নৈতিক পচন থেকে রক্ষা করতে।

উপসংহার

পরিশেষে বলা যায়, স্বার্থান্বেষী সমাজ ও পরোপকার-এর এই লড়াইয়ে আমাদের জয়ী হতে হলে আবারও সুফি সাধকদের উদারতার পথে ফিরতে হবে। পরোপকার কেবল একটি সমাজসেবা নয়, এটি একটি উচ্চতর ইবাদত। আসুন, আমরা আমাদের ক্ষুদ্র স্বার্থ বিসর্জন দিয়ে আর্তমানবতার সেবায় এগিয়ে আসি এবং কলবকে আল্লাহর মহব্বতে জ্যান্ত করি

Join WhatsApp

Join Now

Join Telegram

Join Now

Leave a Comment