দয়াল নবী আপনার দরবারে আমি গোলাম হাজির হইয়াছি।
জিহাদে আকবর বনাম জিহাদে আসগর কেবল দুটি ইসলামিক পরিভাষা নয়, বরং এটি মানুষের অবয়বের ভেতরে ও বাইরে চলমান হক (সত্য) ও বাতিল (মিথ্যা)-এর মধ্যকার চিরন্তন যুদ্ধের এক গভীর রূহার্নী মানদণ্ড। বর্তমান যান্ত্রিক ও ভোগবাদী সমাজে আমরা মনে করি হক ও বাতিলের লড়াই বুঝি শুধু বাইরের পৃথিবীতে, তলোয়ারের মাধ্যমে কিংবা অস্ত্রের জোরেই সীমাবদ্ধ। কিন্তু সুফি দর্শন ও মরমী তত্ত্ব আমাদের চাক্ষুষ শিক্ষা দেয় যে, মানুষের নিজের ভেতরের নফস বা কুপ্রবৃত্তির (বাতিল) বিরুদ্ধে যে অবিরত আত্মিক সংগ্রাম, সেটিই হলো ইসলামের সবচেয়ে বড় যুদ্ধ বা ‘জিহাদে আকবর’। আজকের এই বিস্তারিত নিবন্ধে আমরা কুরআন, হাদিস এবং ওলী-আউলিয়াদের বাণীর আলোকে অনুসন্ধান করব কীভাবে জিহাদে আকবর বনাম জিহাদে আসগর-এর এই বাতেনি তত্ত্বকে ধারণ করে একজন সাচ্চা আশেক নিজের ভেতরের বাতিলকে পরাস্ত করে হকের নূরানি আলোয় প্রবেশ করতে পারে।
জিহাদে আকবর বনাম জিহাদে আসগর: নূর নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নূরানি ঘোষণা
এই মহিমান্বিত আধ্যাত্মিক দর্শনের মূল উৎস স্বয়ং নূর নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর একটি পরম পবিত্র ও অকাট্য বাণী। ইসলামের ইতিহাসের এক কঠিনতম যুদ্ধ (গাজওয়া) থেকে বিজয়ী হয়ে সাহাবীগণ যখন ক্লান্ত-শ্রান্ত শরীরে মদিনা মুনাওয়ারায় ফিরে আসলেন, তখন রাসূলে পাক সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁদের উদ্দেশ্য করে এক ঐতিহাসিক তত্ত্বের অবতারণা করলেন।
রাসূলে পাক ﷺ-এর নূরানি সতর্কবাণী
নূর নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাহাবীদের ক্লান্তি দূর করে এর চেয়েও বড় এক সংগ্রামের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে ইরশাদ করলেন:
“তোমরা ছোট যুদ্ধ (জিহাদে আসগর) থেকে বড় যুদ্ধের (জিহাদে আকবর) দিকে ফিরে এসেছ।” সাহাবীগণ অত্যন্ত বিনয়ের সাথে আরজ করলেন, “হে আল্লাহর রাসূল! এই ছোট যুদ্ধের চেয়েও বড় যুদ্ধ কোনটি?” নূর নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করলেন, “তা হলো বান্দার নিজের নফস বা কুপ্রবৃত্তির বিরুদ্ধে অবিরাম সংগ্রাম করা।” – (বায়হাকী, কিতাবুয যুহদ: হাদিস নং: ৩৭৩)
এই হাদিসটি আমাদের চোখ খুলে দেয়। রণাঙ্গনে কাফেরদের বিরুদ্ধে তরবারি চালানো যেখানে জান বাজি রাখার মতো কঠিন কাজ, তাকে আমাদের নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন ‘আসগর’ বা ছোট সংগ্রাম। আর নিজের ভেতরের লোভ, লালসা ও অহংকার দমনের কাজকে বললেন ‘আকবর’ বা বড় সংগ্রাম। এখান থেকেই মূলত জিহাদে আকবর বনাম জিহাদে আসগর-এর আধ্যাত্মিক দর্শনের সূচনা হয়।
নফসের হাকিকত: মানুষের ভেতরের আসল ‘বাতিল’ শক্তি
সুফি দর্শনের মূল কথাই হলো- বাইরের শত্রুর চেয়ে ঘরের ভেতরের শত্রু অনেক বেশি বিপজ্জনক। মানুষের শরীরের ভেতরে যে অহংকার, হিংসা, রিয়া (লোক দেখানো মনোভাব) এবং দুনিয়ার মোহ রয়েছে, কারিগরি ভাষায় তাকেই বলা হয় ‘নফস’। এই নফসই হলো মানুষের ভেতরের আসল বাতিল শক্তি, যা মানুষকে সবসময় পাপের দিকে ধাবিত করে।
পবিত্র কুরআনে নফসের কুপ্রবৃত্তির বিবরণ
পবিত্র কুরআন মজিদে আল্লাহ তাআলা নফসের এই ক্ষতিকর রূপ বা ‘নফসে আম্মারা’ সম্পর্কে হযরত ইউসুফ আলাইহিস সালাম-এর জবানিতে স্পষ্ট ঘোষণা করেছেন:
“নিশ্চয়ই মানুষের নফস বা কুপ্রবৃত্তি মানুষকে মন্দের দিকেই নির্দেশ দিয়ে থাকে, কেবল সে ছাড়া যার ওপর আমার পালনকর্তা দয়া করেন।” – (সূরা ইউসুফ, আয়াত: ৫৩)
যখন কোনো মানুষ তার এই নফসের গোলাম হয়ে যায়, তখন তার কলব বা হৃদয় মরে যায়। কিতাব পড়ে বা বাহ্যিক ইবাদত করে এই নফসকে চেনা বা দমন করা কোনো সাধারণ মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়। আর এই নফসের বিরুদ্ধে লড়াই করাই হলো হকের আসল সংগ্রাম।
বাহ্যিক লড়াই বনাম আত্মিক লড়াই: দুই জিহাদের সূক্ষ্ম পার্থক্য
আমাদের এই দুই জিহাদের সূক্ষ্ম পার্থক্যগুলো খুব গভীরভাবে চাক্ষুষ বুঝতে হবে, যাতে সমাজে ধর্মের নামে কোনো উগ্রতা বা বিভ্রান্তি তৈরি না হয়।
জিহাদে আসগর (বাহ্যিক সংগ্রাম): এই যুদ্ধটি সাময়িক এবং একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য কোনো নির্দিষ্ট শত্রুর বিরুদ্ধে অস্ত্রের মাধ্যমে করা হয়। এই যুদ্ধে জয়ী হলে মানুষ গাজী হয়, আর মারা গেলে শহীদ হয়। তবে এই বাহ্যিক যুদ্ধে অংশ নেওয়ার পরেও মানুষের অন্তরে অহংকার থেকে যেতে পারে।
জিহাদে আকবর (আত্মিক সংগ্রাম): এই যুদ্ধটির কোনো বিরতি নেই; এটি মানুষের আমৃত্যু, প্রতি সেকেন্ডে নিজের ভেতরের অদৃশ্য কুপ্রবৃত্তির বিরুদ্ধে করতে হয়। এই যুদ্ধে তলোয়ারের প্রয়োজন হয় না, প্রয়োজন হয় আল্লাহর জিকির এবং ইশকের আগুনের। এই যুদ্ধে যে জয়ী হয়, সে-ই আল্লাহর ওলী বা মাহবুব বান্দায় পরিণত হয়।
ইমাম গাজ্জালী ও মাওলানা রুমি রহমাতুল্লাহি আলাইহি এর সুফি দর্শন
হুজ্জাতুল ইসলাম হযরত ইমাম গাজ্জালী রহমাতুল্লাহি আলাইহি তাঁর কালজয়ী কিতাব ‘এহয়াউ উলুমিদ্দীন’-এ লিখেছেন- মানুষের অন্তর হলো একটি দুর্গের মতো, আর নফস ও শয়তান হলো সেই দুর্গে আক্রমণকারী শত্রু। এই শত্রুকে পরাস্ত করতে হলে বাহ্যিক ইবাদতের চেয়ে অন্তরের আত্মশুদ্ধি (তাজকিয়াতুন নাফস) বেশি প্রয়োজন।
মরমী সাহিত্যের রাজমুকুট হযরত মাওলানা জালাল উদ্দিন রুমি রহমাতুল্লাহি আলাইহি তাঁর মসনবি শরীফে এই নফসের বিরুদ্ধে লড়াইকে এক অনন্য রূপক অর্থে চাক্ষুষ ফুটিয়ে তুলেছেন। তিনি বলেন, “তোমার ভেতরের নফস হলো একটি ড্রাগন বা অজগরের মতো, যা আপাতদৃষ্টিতে মরে গেছে বলে মনে হলেও দুনিয়ার লোভের রোদ পেলেই আবার জ্যান্ত হয়ে ওঠে।” তাই জিহাদে আকবর বনাম জিহাদে আসগর-এর এই তত্ত্ব আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, ভেতরের ড্রাগনকে মারাই হলো একজন সাচ্চা আশেকের প্রধান বীরত্ব।
এই বড় জিহাদে জয়ী হওয়ার একমাত্র উপায়: কামেল মুর্শিদের সোহবত
বর্তমান শেষ জামানার এই কঠিন ফেতনার যুগে, চারদিকে যখন ভন্ড মৌলভী ও স্বার্থান্বেষী সমাজের অবক্ষয় গ্রাস করেছে, তখন একা একা এই জিহাদে আকবরে জয়ী হওয়া কোনো মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়। কারণ নফস অত্যন্ত চতুর; সে অনেক সময় মানুষকে ধার্মিকতার ছদ্মবেশেও বিভ্রান্ত করে।
এই বাতেনি যুদ্ধে জয়ী হওয়ার একমাত্র ঢাল হলো একজন কামেল মুর্শিদের সোহবত। মুর্শিদের কুদরতি নেগাহবানি ও দয়াময় দোয়ার বরকতে মুরিদের কলব থেকে স্বার্থপরতার ময়লা ধুয়ে যায়। মুর্শিদ মুরিদের হাতে আল্লাহর জিকিরের এমন এক আধ্যাত্মিক তলোয়ার তুলে দেন, যার এক আঘাতে নফসের সমস্ত বাতিল শক্তি ধুলোয় মিশে যায় এবং অন্তরে হকের নূরানি আলো স্থায়ীভাবে প্রবেশ করে।
উপসংহার
পরিশেষে বলা যায়, জিহাদে আকবর বনাম জিহাদে আসগর- এই লড়াইয়ে জয়ী হওয়াই মানবজীবনের মূল উদ্দেশ্য। বাহ্যিক আড়ম্বর যান্ত্রিক ইবাদত ত্যাগ করে আমাদের সবার আগে নিজের ভেতরের শত্রুকে চিনতে হবে। আসুন, আমরা কামেল মুর্শিদের পবিত্র চরণে নিজেদের সঁপে দিয়ে এই ‘জিহাদে আকবরে’ শরিক হই। দয়াল মাওলা আমাদের সবাইকে নফসের বাতিল কুপ্রবৃত্তি থেকে মুক্ত করে হকের নূরে কলব জ্যান্ত করার তৌফিক দান করুন। আমিন।







