নফসের সাতটি স্তর এবং হক-বাতিলের আধ্যাত্মিক সংগ্রাম: এক পূর্ণাঙ্গ গাইডলাইন।

নফসের সাতটি স্তর হলো হক ও বাতিল চেনার পরম আধ্যাত্মিক মানদণ্ড। সূরা ইউসুফ, কিয়ামাহ, শামস ও ফজরের আয়াতের আলোকে নফসের বিভিন্ন পর্যায় এবং ইমাম গাজ্জালী ও মাওলানা রুমীর বাতেনি ব্যাখ্যার বিস্তারিত নিবন্ধটি পড়ুন।

July 23, 2026 8:52 PM
নফসের সাতটি স্তর এবং হক বাতিলের আধ্যাত্মিক সংগ্রাম
---Advertisement---

দয়াল নবী আপনার দরবারে আমি গোলাম হাজির হইয়াছি।

নফসের সাতটি স্তর চেনা কেবল আধ্যাত্মিক সাধকদের জন্য নয়, বরং এটি প্রতিটি ঈমানদারের জন্য হক ও বাতিলের পার্থক্য বোঝার এক অনিবার্য মানদণ্ড। তাসাঊফ বা সুফি দর্শনের মূল লক্ষ্য হলো মানুষের ভেতরের ‘নফস’ বা অহং সত্তাকে পরিশুদ্ধ করে আল্লাহর নূরে আলোকিত করা। বর্তমান সময়ের চারিত্রিক ও ধর্মীয় অবক্ষয় থেকে বাঁচতে হলে আমাদের নিজের ভেতরের নফসকে চিনতে হবে। কারণ হাদিসে এসেছে- “যে ব্যক্তি নিজের নফসকে চিনতে পেরেছে, সে তার প্রভুকে চিনতে পেরেছে।” আজকের এই বিস্তারিত নিবন্ধে আমরা পবিত্র কুরআনের আয়াত, মাওলানা রুমীর মরমী দর্শন এবং ইমাম গাজ্জালীর বাতেনি বিশ্লেষণের আলোকে নফসের সাতটি স্তর এবং হক-বাতিলের আত্মিক সংগ্রাম নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব

নফসে আম্মারা (গোনাহের আদেশকারী নফস)

এটি হলো নফসের সর্বনিম্ন এবং সবচেয়ে বিপদজনক স্তর। এই স্তরে মানুষ তার পাশবিক ও শয়তানি নফসের গোলাম হয়ে পড়ে। আম্মারা নফস মানুষকে সর্বদা অশ্লীলতা, মিথ্যা, অহংকার এবং স্বার্থপরতার দিকে ধাবিত করে।

কুরআনি দলিল

মহান আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনুল কারীমে এই নফসের ভয়াবহতা ও এর কুপ্রবৃত্তি সম্পর্কে আমাদের কঠোরভাবে সতর্ক করেছেন। তিনি স্পষ্টভাবে এই নফসের পরিচয় দিতে গিয়ে ইরশাদ করেছেন:
“ইন্নান নাফসা লা আম্মারাতুম বিস-সূয়ি ইল্লা মা রহিমা রব্বী।”
আয়াতের অর্থ:
“নিশ্চয়ই নফস (আম্মারা) মন্দের দিকে প্রবলভাবে প্ররোচিত করে, কেবল সে-ই রক্ষা পায় যার ওপর আমার রব দয়া করেন।”
— (সূরা ইউসুফ, আয়াত: ৫৩) 

ইমাম গাজ্জালী ও মাওলানা রুমীর ব্যাখ্যা

ইমাম গাজ্জালী রহমাতুল্লাহি আলাইহি তাঁর ‘এহয়াউ উলুমিদ্দীন’ কিতাবে বলেছেন, নফসে আম্মারা হলো একটি অবাধ্য ঘোড়ার মতো, যার ওপর কোনো নিয়ন্ত্রণ থাকে না। অন্যদিকে মাওলানা রুমি রহমাতুল্লাহি আলাইহি তাঁর মসনবি শরীফে একে ‘ড্রাগন’ বা ‘অজগর’ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন, যা মানুষকে গিলে ফেলার জন্য সর্বদা মুখিয়ে থাকে

নফসে লাউয়ামাহ (ধিক্কারদাতা নফস)

এই স্তরে বান্দার বিবেক জাগ্রত হতে শুরু করে। মানুষ যখন কোনো ভুল করে বা হকের পথ থেকে বিচ্যুত হয়, তখন তার ভেতর থেকে এক অদৃশ্য কণ্ঠস্বর তাকে তিরস্কার করে। এটি আধ্যাত্মিক যাত্রার দ্বিতীয় ধাপ।

কুরআনি দলিল

মহান আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনুল কারীমে এই নফসের বিশেষ গুরুত্ব ও মাহাত্ম্য বর্ণনা করেছেন। তিনি স্পষ্টভাবে এই নফসের পরিচয় দিতে গিয়ে ইরশাদ করেছেন:
“ওয়া লা উকসিমু বিন-নাফসিল লাউওয়ামাহ।”
আয়াতের অর্থ:আর আমি কসম করছি ধিক্কারদাতা (লাউয়ামাহ) নফসের।
— (সূরা কিয়ামাহ, আয়াত: ২)

ইমাম গাজ্জালী ও মাওলানা রুমীর ব্যাখ্যা

ইমাম গাজ্জালী রহমাতুল্লাহি আলাইহি তাঁর ‘এহয়াউ উলুমিদ্দীন’ কিতাবে বলেছেন, নফসে লাউয়ামাহ হলো ঈমানদারের অন্তরের সেই প্রহরী যা তাকে পাপাচার থেকে ফিরিয়ে আল্লাহর দিকে ধাবিত করে। অন্যদিকে মাওলানা রুমি রহমাতুল্লাহি আলাইহি তাঁর মসনবি শরীফে এই স্তরকে একটি ‘পবিত্র গৃহযুদ্ধের’ সাথে তুলনা করেছেন, যেখানে মানুষের আল্লাহর প্রতি মহব্বত তার কুপ্রবৃত্তির সাথে প্রতিনিয়ত লড়াই করে জয়ী হয়

নফসে মুলহিমা (অনুপ্রেরণা প্রাপ্ত নফস)

এই স্তরে পৌঁছালে মানুষের কলব সরাসরি আল্লাহর পক্ষ থেকে দিকনির্দেশনা বা ‘ইলহাম’ পেতে শুরু করে। মানুষ ভালো ও মন্দের পার্থক্য পরিষ্কারভাবে বুঝতে পারে।

কুরআনি দলিল

মহান আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনুল কারীমে এই নফসের বিশেষ মর্যাদা ও অলৌকিক হাকিকত বর্ণনা করেছেন। তিনি স্পষ্টভাবে এই নফসের পরিচয় দিতে গিয়ে ইরশাদ করেছেন:
“ফা আলহামাহা ফুজুরাহা ওয়া তাকওয়াহা।”
আয়াতের অর্থ: “অতঃপর তাকে (নফসকে) তার অসতর্কতা ও তার সতর্কতা সম্পর্কে জ্ঞান (ইলহাম) দিয়েছেন।”
— (সূরা আশ-শামস, আয়াত: ৮)

ইমাম গাজ্জালী ও মাওলানা রুমীর ব্যাখ্যা

ইমাম গাজ্জালী রহমাতুল্লাহি আলাইহি তাঁর ‘এহয়াউ উলুমিদ্দীন’ কিতাবে বলেছেন, নফসে মুলহিমা হলো সেই ধন্য অবস্থা যেখানে বান্দার অন্তরে শয়তানের কুমন্ত্রণা (ওয়াসওয়াসা) পরাজিত হয় এবং ফেরেশতাদের মাধ্যমে আল্লাহর নূরানি অনুপ্রেরণা বা ‘ইলহাম’ অবতীর্ণ হতে শুরু করে। অন্যদিকে মাওলানা রুমি রহমাতুল্লাহি আলাইহি তাঁর মসনবি শরীফে এই স্তরকে একটি ‘উর্বর মাটির’ সাথে তুলনা করেছেন, যেখানে মুর্শিদের নেগাহবানির ফলে আল্লাহর মহব্বতের ফসল ফলতে শুরু করে

নফসে মুতমাইন্নাহ (প্রশান্ত আত্মা)

এটি হলো নফসের চতুর্থ স্তর, যেখানে মানুষ তার নফসকে সম্পূর্ণ বশ করে ফেলে। বাতিলের সমস্ত অন্ধকার দূর হয়ে অন্তরে হকের নূর স্থায়ী হয়। ইবাদতে গভীর স্বাদ ও শান্তি অর্জিত হয়। এটি মানুষের আত্মিক বিজয়ের এক অনন্য মঞ্জিল।

কুরআনি দলিল

মহান আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনুল কারীমে এই প্রশান্ত নফসের অধিকারী বান্দাদের পরম মহব্বতে ডেকে জান্নাতের সুসংবাদ দিয়েছেন। তিনি এই নফসের পরিচয় দিতে গিয়ে ইরশাদ করেছেন:
“ইয়া আইয়্যাতুহান নাফসুল মুতমাইন্নাহ।”
আয়াতের অর্থ: “হে প্রশান্ত আত্মা (মুতমাইন্নাহ)!”
— (সূরা আল-ফজর, আয়াত: ২৭)

ইমাম গাজ্জালী ও মাওলানা রুমীর ব্যাখ্যা

ইমাম গাজ্জালী রহমাতুল্লাহি আলাইহি তাঁর ‘এহয়াউ উলুমিদ্দীন’ কিতাবে স্পষ্ট করেছেন যে, নফসে মুতমাইন্নাহ হলো সেই মোবারক স্তর যেখানে নফসের ভেতরের সমস্ত হিংসা, লালসা এবং দুনিয়াবী অস্থিরতা চিরতরে শান্ত হয়ে যায় এবং আত্মা কেবল আল্লাহর জিকিরেই পরম তৃপ্তি লাভ করে। অন্যদিকে মাওলানা রুমি রহমাতুল্লাহি আলাইহি তাঁর মসনবি শরীফে এই স্তরকে ‘শান্ত ও স্থির সমুদ্রের’ সাথে তুলনা করেছেন, যা আর কোনো জাগতিক ঝড় বা শয়তানি ফেতনায় বিচলিত হয় না। এই প্রশান্ত আত্মাই কেবল আল্লাহর চাক্ষুষ ভালোবাসার স্বাদ আস্বাদন করতে পারে

নফসে রাজিয়া (সন্তুষ্ট আত্মা)

এই স্তরে বান্দা তার ওপর অর্পিত আল্লাহর প্রতিটি সিদ্ধান্তে সন্তুষ্ট থাকে। অভাব, দুঃখ, জিল্লতি বা কঠিন বিপদেও তাঁর মনে কোনো ক্ষোভ বা অভিযোগ থাকে না। তিনি কেবল মাওলার সন্তুষ্টি ও প্রেমের নেশায় সর্বদা মগ্ন থাকেন।

কুরআনি দলিল

মহান আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনুল কারীমে এই পরম সন্তুষ্ট নফসের অধিকারী ওলী-আল্লাহদের মহান মর্যাদার কথা ঘোষণা করেছেন। তিনি এই নফসের পরিচয় দিতে গিয়ে ইরশাদ করেছেন:
“ইরজিঈ ইলা রব্বিকি রাজিইয়াতান”
আয়াতের অর্থ: “তুমি তোমার রবের কাছে ফিরে এসো সন্তুষ্ট (রাজিয়া) হয়ে।”
— (সূরা আল-ফজর, আয়াত: ২৮-এর প্রথমাংশ)

ইমাম গাজ্জালী ও মাওলানা রুমীর ব্যাখ্যা

হুজ্জাতুল ইসলাম ইমাম গাজ্জালী রহমাতুল্লাহি আলাইহি তাঁর আধ্যাত্মিক পথপ্রদর্শক গ্রন্থ ‘এহয়াউ উলুমিদ্দীন’-এর চতুর্থ খণ্ডের ‘কিতাবুর রিযা’ (পরম সন্তুষ্টি অধ্যায়)-এ স্পষ্ট করেছেন যে, নফসে রাজিয়া হলো আধ্যাত্মিক জগতের সেই সর্বোচ্চ মাকাম বা মঞ্জিল, যেখানে বান্দার নিজের কোনো ব্যক্তিগত ইচ্ছা, আকাঙ্ক্ষা বা দুনিয়াবী কামনা অবশিষ্ট থাকে না। এই স্তরে পৌঁছালে বান্দা নিজের নফসকে মাওলার মর্জির সাগরে ফানা বা বিলীন করে দেয়। দয়াল আল্লাহ তাকে যেভাবে রাখেন-তা জাগতিক দৃষ্টিতে অভাব-অনটন, রোগ-শোক কিংবা কঠিন বিপদ যাই হোক না কেন-আশেক তার অন্তরে বিন্দুমাত্র উষ্মা বা অভিযোগ পোষণ করে না, বরং আল্লাহর প্রতিটি তাকদীর ও কুদরতি ফয়সালাতেই পরম আত্মিক আনন্দ ও স্বর্গীয় তৃপ্তি লাভ করে।
অন্যদিকে, মরমী সাহিত্যের রাজমুকুট মাওলানা জালাল উদ্দিন রুমী রহমাতুল্লাহি আলাইহি তাঁর অমর সৃষ্টি ‘মসনবি শরীফ’-এ নফসের এই সুউচ্চ অবস্থাকে ‘প্রেমিকের চূড়ান্ত আত্মসমর্পণ’ (Total Surrender of a Lover) হিসেবে চাক্ষুষ ফুটিয়ে তুলেছেন। মাওলানা রুমীর দর্শন অনুযায়ী, সাচ্চা আশেকের কাছে দয়াল মাওলার দেওয়া ‘লুত্বফ’ (দয়া বা সুখ) এবং ‘ক্বহর’ (কষ্ট বা দুঃখ) দুই-ই সমান মধুময়। আশেক কখনো মাওলার হাতের উপহার বা দুনিয়াবী নেয়ামতের দিকে তাকায় না, সে তাকায় স্বয়ং নেয়ামতদাতা মাওলার দিকে। এই স্তরের পবিত্র আত্মারা জগতের প্রতিটি দৃশ্যমান ঘটনা ও পরীক্ষার আড়ালে কেবল দয়াল মাওলার কুদরতি ইশারা, বাতেনি ইশকের ইঙ্গিত এবং কুদরতের লীলা চাক্ষুষ দেখতে পায়। ফলে তাদের আনন্দ ও সন্তুষ্টি চিরন্তন হয়ে যায়।

নফসে মারজিয়া (আল্লাহর সন্তোষভাজন আত্মা)

এটি ওলী-আউলিয়াগণের সুউচ্চ স্তর। এই স্তরে বান্দা কেবল আল্লাহর ওপর সন্তুষ্ট নন, বরং স্বয়ং মহান আল্লাহ তাঁর এই বান্দার ওপর সন্তুষ্ট হয়ে যান। সুফি তত্ত্বে একে ‘মাকামুল ইহসান’ বা চারিত্রিক ও আত্মিক শ্রেষ্ঠত্বের চূড়ান্ত শিখর বলা হয়।

কুরআনি দলিল

মহান আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনুল কারীমে এই পরম প্রিয় ও সন্তোষভাজন নফসের অধিকারী বান্দাদের পরম মহব্বতে ডেকে জান্নাতের সুসংবাদ দিয়েছেন। আল্লাহ এই নফসের পরিচয় দিতে গিয়ে ইরশাদ করেছেন:
“মারজিইয়াহ। ফাদখুলী ফী ইবাদী।”
আয়াতের অর্থ: “এবং তুমি তোমার রবের সন্তোষভাজন (মারজিয়া) হয়ে যাও। অতঃপর প্রবেশ করো আমার (মকবুল) বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে।” 
(সূরা আল-ফজর, আয়াত: ২৮-২৯)

ইমাম গাজ্জালী ও মাওলানা রুমীর ব্যাখ্যা

হুজ্জাতুল ইসলাম ইমাম গাজ্জালী রহমাতুল্লাহি আলাইহি তাঁর আধ্যাত্মিক পথপ্রদর্শক ও কালজয়ী গ্রন্থ ‘এহয়াউ উলুমিদ্দীন’-এর চতুর্থ খণ্ডের ‘কিতাবুত তাওবা’ এবং ‘কিতাবুর রিযা ওয়া মহব্বাহ’ (ঐশ্বরিক প্রেম অধ্যায়)-এ এই আয়াত মোবারকার এক পরম বাতেনি রহস্য উন্মোচন করেছেন। ইমাম গাজ্জালীর মতে, যখন কোনো খাঁটি আশেক নফসে রাজিয়ার স্তর পার হয়ে আল্লাহর প্রতিটি ফয়সালাকে নিজের পরম ভাগ্য বলে আনন্দচিত্তে আলিঙ্গন করে, তখন আল্লাহ তাআলা তাঁর কুদরতের বিশেষ রহমত দিয়ে সেই বান্দাকে নিজের সন্তোষভাজন তথা ‘মারজিইয়াহ’ চাদরে আবৃত করে নেন।
ইমাম গাজ্জালী রহমাতুল্লাহি আলাইহি কিতাবে স্পষ্ট দলিল দিয়েছেন যে, এই স্তরে পৌঁছানোর পরেই স্বয়ং আল্লাহ রাব্বুল আলামিন সেই বান্দাকে নিজের বিশেষ খাস বান্দা হিসেবে কবুল করে ঘোষণা করেন— ‘ফাদখুলী ফী ইবাদী’ (অতঃপর প্রবেশ করো আমার মকবুল ও বিশেষ বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে)। এই মাকামে ওলীর নিজস্ব কোনো নফসের বা বাহ্যিক অস্তিত্বের জোর থাকে না, তাঁর হাত, পা, চোখ ও যবান স্বয়ং আল্লাহর কুদরতের পবিত্র আয়নায় পরিণত হয়; যা সুফি পরিভাষায় ‘ফানা ফিল্লাহ’ বা আল্লাহর সত্তায় বিলীন হওয়ার চূড়ান্ত মঞ্জিল।
অন্যদিকে, মরমী সাহিত্যের রাজমুকুট এবং আশেকুল মুমিনীন মাওলানা জালাল উদ্দিন রুমী রহমাতুল্লাহি আলাইহি তাঁর অমর সৃষ্টি ‘মসনবি শরীফ’-এর বিভিন্ন খণ্ডে (বিশেষ করে যেখানে ওলীগণের রূহার্নী মিলন ও শান বর্ণনা করেছেন) এই আয়াত মোবারকার ভাবার্থকে ‘নূরের মহিমান্বিত সমুদ্র’ (The Glorious Ocean of Divine Light) হিসেবে চাক্ষুষ ফুটিয়ে তুলেছেন। মাওলানা রুমীর দর্শন অনুযায়ী, আশেক যখন নিজের নফসের আমিত্বকে সম্পূর্ণ মিটিয়ে দিয়ে আল্লাহর সন্তোষভাজন বা ‘মারজিইয়াহ’ স্তরে লীন হয়, তখন সে এক জ্যান্ত ওলীতে রূপান্তরিত হয়।
মাওলানা রুমী রহমাতুল্লাহি আলাইহি মসনবিতে এক চমৎকার রূপক দিয়ে বলেছেন— নদী যতক্ষণ সাগরের বাইরে থাকে ততক্ষণ তার আলাদা অস্তিত্ব ও নাম থাকে, কিন্তু নদী যখন সাগরে পতিত হয় তখন সে সাগরের অংশ হয়ে যায়। একইভাবে ওলী-আল্লাহগণ যখন নফসে মারজিয়া অর্জন করে আল্লাহর খাস ও মকবুল বান্দাদের জামাতে (‘ফাদখুলী ফী ইবাদী’) প্রবেশ করেন, তখন তাঁদের প্রতিটি নেগাহবানি ও ইচ্ছাই আল্লাহর কুদরতি ইচ্ছার সাথে একাকার হয়ে এক হয়ে যায়। এই কারণেই ওলীদের দরবারে মাওলার গায়েবী রহমত চাক্ষুষ বর্ষিত হয়

নফসে কামিলা বা সাফিয়া (পূর্ণাঙ্গ ও পবিত্র আত্মা)

এটি নফসের চূড়ান্ত ও সপ্তম স্তর। এখানে মানুষ ‘ইনসানে কামেল’ বা পূর্ণাঙ্গ মানুষে পরিণত হয়। তার ভেতর থেকে অহংকার বা জাগতিক সব কালিমা সম্পূর্ণ ধুয়ে যায়। মাওলানা রুমি ও ইমাম গাজ্জালী উভয়েই এই স্তরকে আল্লাহর নূরের একটি স্বচ্ছ আয়না হিসেবে বর্ণনা করেছেন, যেখানে কোনো আবরণ থাকে না।

কুরআনি দলিল

বিখ্যাত তাফসীরবিদ ইমাম ফখরুদ্দীন রাজী রহমাতুল্লাহি আলাইহি তাঁর তাফসীরে স্পষ্ট করেছেন যে, পবিত্র কুরআনের সূরা আল-মায়েদাহর ৮৩ নম্বর আয়াতে এই পরম পবিত্র ও পূর্ণাঙ্গ আত্মার (নফসে কামিলা) চাক্ষুষ ইঙ্গিত ও দলিল রয়েছে। আল্লাহ তাআলা এই স্তরের খাঁটি আশেকদের পরিচয় দিতে গিয়ে ইরশাদ করেছেন:
ওয়া ইযা সামিউ মা উনযিলা ইলার রসূলি তারা আ’ইয়ুনাহুম তাফীদ্বু মিনাদ্দাম’ই মিম্মা আরাফূ মিনাল হাক্কি”
আয়াতের অর্থ: “আর রসূলের প্রতি যা অবতীর্ণ হয়েছে যখন তারা তা শ্রবণ করে, তখন আপনি তাদের চোখসমূহ অশ্রুসজল চাক্ষুষ দেখতে পাবেন; কারণ তারা হকের (সত্যের) হাকিকত চিনে নিয়েছে।”
(সূরা আল-মায়েদাহ, আয়াত: ৮৩)

ইমাম গাজ্জালী ও মাওলানা রুমীর ব্যাখ্যা

হুজ্জাতুল ইসলাম ইমাম গাজ্জালী রহমাতুল্লাহি আলাইহি তাঁর ‘এহয়াউ উলুমিদ্দীন’-এর আত্মশুদ্ধি অধ্যায়ে দলিল দিয়েছেন যে, নফসে কামিলা বা সাফিয়া হলো কলবের সেই নিষ্পাপ ও মাছুম অবস্থা, যেখানে বান্দার নিজ সত্তার আর কোনো পর্দা থাকে না। সে যখনই আল্লাহর কালাম বা ওলীর ইশারা শোনে, তার রূহ নূরের তীব্রতায় ব্যাকুল হয়ে ওঠে এবং চোখ দিয়ে প্রেমের অশ্রু ঝরতে থাকে। এই স্তরে ওলীগণের মাধ্যমে অলৌকিক কারামত বা মুজিজা প্রকাশ পাওয়া একটি অতি সাধারণ ঘটনা হয়ে দাঁড়ায়
অন্যদিকে, মরমী সাহিত্যের রাজমুকুট মাওলানা জালাল উদ্দিন রুমী রহমাতুল্লাহি আলাইহি তাঁর অমর সৃষ্টি ‘মসনবি শরীফ’-এ নফসের এই চূড়ান্ত বিজয়কে ‘নূরের স্বচ্ছ আয়না’ (The Pure Mirror of Divine Light) হিসেবে চাক্ষুষ ফুটিয়ে তুলেছেন। মাওলানা রুমীর দর্শন অনুযায়ী, লোহা বা তামা যেমন আগুনে পুড়তে পুড়তে একসময় নিজের কালো রঙ হারিয়ে আগুনের মতোই লাল টকটকে হয়ে ওঠে, তেমনি ওলীর রুহ মোবারকও কামেল মুর্শিদের গোলামীতে জিকির ও মোরাকাবার আগুনে পুড়তে পুড়তে নফসে কামিলা অর্জন করে। তখন সেই ওলীর প্রতিটি কথা, কাজ এবং বাতেনি নেগাহবানি সরাসরি দয়াল মাওলার কুদরতের ছায়া হয়ে সমাজকে আলোকিত করে

উপসংহার

পরিশেষে বলা যায়, নফসের সাতটি স্তর অতিক্রম করা আমাদের জীবনের প্রকৃত সার্থকতা। হক পথে চলতে হলে আমাদের নফসে আম্মারা থেকে শুরু করে নফসে মারজিয়া পর্যন্ত পৌঁছানোর লড়াই চালিয়ে যেতে হবে। কামেল মুর্শিদের সোহবত ছাড়া এই কঠিন আধ্যাত্মিক লড়াইয়ে জয়ী হওয়া অসম্ভব। আসুন, আমরা আত্মশুদ্ধির মাধ্যমে আমাদের নফসকে নূরে খোদার আলোয় আলোকিত করি

Join WhatsApp

Join Now

Join Telegram

Join Now

Leave a Comment