দয়াল নবী আপনার দরবারে আমি গোলাম হাজির হইয়াছি।
ইসলামের ইতিহাসে মা খাদিজাতুল কুবরা রাদিয়াল্লাহু আনহা এক অনন্য দৃষ্টান্ত। তিনি ছিলেন দয়াল নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লামের স্ত্রী, আমাদের মা। তেনার ধন-সম্পদ, সম্মান ও মর্যাদা আরব সমাজে অতুলনীয় হলেও, তেনার প্রকৃত মহিমা নিহিত ছিল দয়াল নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লামের প্রতি নিঃস্বার্থ ভালোবাসায়।
দয়াল বাবা জালালী মাওলা মা খাদিজাতুল কুবরা রাদিয়াল্লাহু আনহার চারটি সওয়াল এবং নূর নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লামের মহিমাময় প্রতিশ্রুতি সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। আসুন, সে সম্পর্কে জানি।
মা খাদিজাতুল কুবরা রাদিয়াল্লাহু আনহা
সিদ্দিকে আকবর রাদিয়াল্লাহু আনহুর ৯ বছর পূর্বে মা খাদিজাতুল কুবরা রাদিয়াল্লাহু আনহা ইমানদার মুসলমান। খানায়ে কাবার পর, মসজিদে আকসার পরে যদি কোনো বিল্ডিং হয়ে থাকে তা ছিল মা খাদিজাতুল কুবরা রাদিয়াল্লাহু আনহার। ইয়াকুত, মর্মরসহ সাত প্রকার পাথর দ্বারা নির্মিত। বিল্ডিং এর দৈর্ঘ্য ছিল ৮৬ হাত, প্রস্থ ৩৬ হাত। জাজিরাতুল আরবের ধনীদের মধ্যে তিনি ছিলেন অপ্রতিদ্বন্দ্বী।
তেনার তিনবার বিয়ে হয়েছিল নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সঙ্গে বিবাহের আগে। কিন্তু কোনো স্বামী তেনার শরীর স্পর্শ করতে পারেনি। পিতার সম্পদ ও পূর্ববর্তী স্বামীদের সম্পদে তিনি হয়ে ওঠেন আরবের সবচেয়ে ধনী নারী। সেই ধন-সম্পদ দিয়েই তিনি মানব ইতিহাসের প্রথম বিল্ডিং নির্মাণ করেন।
মা খাদিজাতুল কুবরা রাদিয়াল্লাহু আনহার আবেগঘন আলাপন
৪০ বছর বয়সে তিনি বিয়ে করেন নূর নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লামকে, তখন নবীজির বয়স ছিল ২৫। মা খাদিজাতুল কুবরা রাদিয়াল্লাহু আনহা অসুস্থ অবস্থায় তেনার মাথাটা নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর উরু মোবারকের উপর রাখলেন। হঠাৎ দেখা গেল, তেনার চোখের কোটা দিয়ে মাছির মাথা পরিমাণ পানি গড়িয়ে নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর উরু মোবারকে পড়েছে। তখন নবীজি তেনার কপালে হাত রেখে বললেন-
“খাদিজা, আমি গর্ভে থাকতেই আমার পিতাকে হারালাম। ১৪ দিন কম ৬ বছর বয়সে আমি আমার মা আমেনাকে হারালাম। ১৪ দিন কম ৭ বছর বয়সে আমি আমার চাচী বিনতে ফাতিমাকে হারালাম। [বিনতে ফাতিমা ছিলেন আমির হামজার স্ত্রী। কোরআন, হাদিস, ইজমা ও কিয়াস-চার দলিলে বলা হয়েছে, পৃথিবীর শুরু থেকে কেয়ামত পর্যন্ত সমস্ত মায়ের মহব্বত এক পাল্লায় নিলে আর বিনতে ফাতিমার মহব্বত অপর পাল্লায় নিলে তেনার মহব্বতই ভারী হবে। তিনি নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লামকে এত ভালোবাসতেন।]
১৪ দিন কম ৯ বছর বয়সে আমি আমার দাদা আবদুল মুতাল্লিবকে হারালাম। খাদিজা, আপনার কাছে আমি পিতার ভালোবাসা, দাদার ভালোবাসা, মায়ের মহব্বত, চাচীর মহব্বত পেয়েছি। আমার উরুতে আপনার মাথা, আর এই মুহূর্তে আপনার চোখের কোটা দিয়ে মাছির মাথা পরিমান পানি আমার উরুতে পড়ছে- এই জন্য আমার কলিজায় আগুন লেগেছে।
তখন মা খাদিজাতুল কুবরা রাদিয়াল্লাহু আনহা নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর নূরানী কদম মোবারকে হাত রেখে বললেন-“নবীগো, আপনার নূরানী কদমে আমি খাদিজার জীবনটা কুরবান। নবীগো, আমি জয়নবের মা, আমি রুকাইয়ার মা, আমি কুলসুমের মা, আমি খাতুনে জান্নাত ফাতিমার মা, আমি তাহেরের মা, আমি তৈয়বের মা, আমি কাসেমের মা। তিনটা ছেলে আর চারটা মেয়ে আমার ঔরসজাত সন্তান।
নবীগো, আপনার কাছে ইমান আনার পর দুনিয়ার কোনো বেগানা পুরুষ-মহিলা তো দূরের কথা, আমার এই সাতজন ঔরসজাত সন্তানরাও আমার একটি পশমও দেখেনি। নবীগো, না দেখে বিশ্বাস করার নাম হলো ইমান, আর দেখার নাম হলো প্রমাণ। নবীগো, এতোদিন আজরাইল আমার কাছে গায়েব ছিলেন, এখন তিনি আমার ঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে আছেন। আমি আমার দুই চোখ দিয়ে আজরাইলকে দেখছি। নবীগো, আপনার অনুমতিক্রমে তিনি আমার জানটা নিয়ে যাবেন।”
মা খাদিজাতুল কুবরা রাদিয়াল্লাহু আনহার চারটি সওয়াল
১ম সওয়াল:
মা খাদিজাতুল কুবরা রাদিয়াল্লাহু আনহা বললেন,
“নবীগো, আপনার কাছে আমার ১ নম্বর সওয়াল-নবীগো, আমার মরণের পরে যদি দুনিয়ার বেগানা মহিলারা আমার শেষ গোসল দেন, তারা তো আমার অঙ্গপ্রত্যঙ্গ দেখবে, তারা তো আমার ইজ্জত দেখবে; কাল কেয়ামতে আল্লাহর হাইকোর্টে আমি মুখটা দেখাতে পারবো না। নবীগো, আপনি তো আমার উজ্জতের মালিক, আপনি তো আমার জীবন ও যৌবনের মালিক। নবীগো, দুনিয়ার বেগানা মহিলাদের দিয়ে আমার শেষ গোসল না দিয়ে আপনি আল্লাহর বন্ধু, আমার শেষ গোসলটি আপনি দিতে পারবেন কি?”
➡ নূর নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন- “কবুল করলাম।”
২য় সওয়াল:
মা খাদিজাতুল কুবরা রাদিয়াল্লাহু আনহা বললেন,
“নবীগো, আপনার কাছে আমার ২য় নম্বর সওয়াল- নবীগো, হাটবাজারের মার্কিন কাপড়, হাটবাজারের মখমলের কাপড়, হাটবাজারের জরির কাপড় দিয়ে আমার কাফনটা না দিয়ে আপনিতো আল্লাহ পাকের জাতি নূরের জ্যোতি। নবীগো, আপনার বদনে যে পোশাকটা লেগেছে, সেটা জ্যোতিসময় হয়ে গেছে। ওগো নবী, হাটবাজারের মার্কিন কাপড়, জরির কাপড়, মখমলের কাপড় দিয়ে আমার কাফন না দিয়ে- আপনি আল্লাহর বন্ধু- আপনার জুব্বা মোবারক দিয়ে আমি খাদিজার কাফন দিবেন কি?” “
➡ নূর নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন-“কবুল করলাম।”
৩য় সওয়াল:
মা খাদিজাতুল কুবরা রাদিয়াল্লাহু আনহা বললেন,
“নবীগো, আপনার কাছে আমার ৩য় নম্বর সওয়াল- নবীগো, যেইখানে আমাকে মাটি দিবেন, কবর করবেন, নবীগো আপনার নূরানী জবান মোবারক থেকে শুনছি- কবরে মাটি দেওয়ার পরে ৪০ গজ দূরে যখন আসবেন, আমার কবরের মাটিটা চতুর্দিক থেকে ৪০ গজ দূরে গিয়ে দৌড়ে আমাকে তিনটা চিপা দিবে। আমি মাটির চিপায় নিশপিশ হয়ে যাবো, আমার কোনো অস্তিত্ব থাকবেনা। নবীগো, মাটির এই চিপা আমি সহ্য করতে পারবো না। ও নবী, আপনিতো আল্লাহ পাকের জাতি নূরের জ্যতি। নবীগো, আমার কবর খোঁড়ার পরে আপনার জামা-কাপড় খুলে আমি খাদিজার কবরে একটা গড়াগড়ি দিতে পারবেন কি? আপনার নূরানী বদন যে কবরে লেগে গেছে, তার জন্য কবরের চিপা দেওয়া হারাম হয়ে গেছে।”
➡ নূর নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন-“কবুল করলাম।”
৪র্থ সওয়াল:
মা খাদিজাতুল কুবরা রাদিয়াল্লাহু আনহা বললেন,
“নবীগো, আপনার কাছে আমার ৪র্থ নম্বর সওয়াল- নবীগো, যেই খানে আমাকে মাটি দিবেন, নবীগো, মাটি দিয়ে ৪০ গজ দূরে আসার পর আমার কবরে দুই ফেরেশতা, মুনকার ও নাকীর, আমার কাছে এসে আমাকে প্রশ্ন করবে- ‘মান রব্বুকা, তোমার আল্লাহ কে?’
নবীগো, আমি খাদিজা জীবনে আল্লাহকে চোখে দেখিনি। ও নবী, আল্লাহর আওয়াজ চিকন না মোটা কখনো আমার কানে শুনাননি। আল্লাহ দুগন্ধ না সুগন্ধ আমি নাকে নিতে পারিনি। আল্লাহ তিতা না মিঠা, আমার জিভে সাদ পায় নাই। আল্লাহর বাতাসটা গরম না ঠান্ডা, আমার চামড়ায় লাগেনি। নবীগো, আপনিতো মেরাজের রাতে আপনার চোখ মোবারক দিয়ে আল্লাহকে ১০ বার দেখেছেন। ও নবী, আমি জীবনে মিথ্যা কথা বলিনি। কবরে মুনকার ও নাকীরের সাথে আমি মিথ্যা বলতে পারব না। আপনি তো আপনার চোখ দিয়ে আল্লাহকে ১০ বার দেখেছেন। আমাকে মাটি দিয়ে একলা কবরে ফেলে আসবেন না। নবীগো, মুনকার-নাকীরের সওয়ালের জওয়াবটা আমার কবরের পাশে দাঁড়িয়ে আপনি দেবেন কি?”
➡ নূর নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন-“কবুল করলাম।”
জান্নাতুল মুয়াল্লার নামকরণ
মা খাদিজাতুল কুবরা রাদিয়াল্লাহু আনহাকে সকাল ১০টার সময় মাটি দিয়েছে। সাহাবিরা বললো, “নবীগো, চলুন।” নূর নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেলেন “না, আমি খাদিজার সঙ্গে ওয়াদা করছি। খাদিজার কবরের তিনটি সওয়ালের জওয়াব আমি দেবো।”
নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম লাঠি মোবারক থুতনি মোবারকে নিচে দিয়ে মা খাদিজাতুল কুবরা রাদিয়াল্লাহু আনহার কবরের পাশে ১০টার সময় দাঁড়িয়ে আছেন। বেলা চলে গেছে, মুনকার-নাকীর কবরে আসে না। হঠাৎ দেখা যায়, জিব্রাইল চলে এসেছে নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর কাছে। জিব্রাইল এর চোখ ফোলা চোখের কোটায় পানি।
নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, “ইয়া আখি জিব্রাইল, হে ভাই জিব্রাইল, তোমার চোখের কোটায় কেন পানি দেখা যাচ্ছে?”
জিব্রাইল হাউমাউ করে কেঁদে নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম কদম মোবারক জড়িয়ে ধরে বললেন, “নবীগো, আজকে আরশ, কুরসি, লৌহ, কলম, বেহেশত, দোজখ- আল্লাহর সৃষ্টির যত ফেরেশতা আছে, সবাই কাঁদছে। স্বয়ং মুনকার-নাকীরও কাঁদতে কাঁদতে পেরেশান হয়ে গেছে।”
নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম জিজ্ঞেস করলেন, “কেন?”
জিব্রাইল বললেন, “নবীগো, মা খাদিজাতুল কুবরা রাদিয়াল্লাহু আনহার কবরের পাশে আপনি থুতনি মোবারকের নিচে লাঠি দিয়ে, চোখ বন্ধ করে, আপনার ইমানদার উম্মতের কথা স্মরণ করে, যখন আপনার চোখ মোবারক দিয়ে মাছির মাথা সমান পানি মা খাদিজাতুল কুবরা রাদিয়াল্লাহু আনহার কবরে পড়েছে। আল্লাহর আরশে আগুন লেগে গেছে। আল্লাহ ডেকে বলেছেন, ‘জিব্রাইল, যে কবরে আমার বন্ধুর চোখ মোবারকের পানি পড়েছে এটা আর কবর রইছে না কেয়ামত হবে এই কবসস্থানে মুনকার-নাকীর আসবেন না। আমি আমার বন্ধুর চোখ মোবারকের পানির বদলৌতে এই কবর স্থানের নাম রাখলাম- জান্নাতুল মুয়াল্লা।’
পরিশেষে
“মা খাদিজাতুল কুবরা রাদিয়াল্লাহু আনহার নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লামের প্রতি অগাধ ভালোবাসাই প্রমাণ করে যে, নূর নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর মর্যাদা সবার ঊর্ধ্বে; আর তেনার দয়া ও ভালোবাসাই সমগ্র উম্মতের সর্বশ্রেষ্ঠ আশ্রয়।”











খুব সুন্দর উপস্থাপন ধন্যবাদ দরদী