দয়াল নবী আপনার দরবারে আমি গোলাম হাজির হইয়াছি।
গাউছে পাকের কারামত নিয়ে যুগে যুগে অসংখ্য ঘটনা মানুষের মুখে মুখে প্রচলিত হয়েছে। আল্লাহ তাআলা তাঁর প্রিয় ওলীগণকে এমন মর্যাদা দান করেন, যার প্রভাব শুধু মানুষের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং জ্বীন জগতেও তা সুস্পষ্টভাবে প্রকাশ পায়। আজ আমরা জানব গাউছে পাকের কারামত সম্পর্কিত এমন এক বিস্ময়কর ঘটনা, যেখানে হারিয়ে যাওয়া এক কন্যাকে ফিরিয়ে দিতে বাধ্য হয়েছিল জ্বীনদের বাদশাহ।
হঠাৎ নিখোঁজ হয়ে গেল কন্যা
আবুল খায়ের বশির বিন মাহফুজ বর্ণনা করেন-
“আমি এক সময় বাগদাদ শরীফে বসবাস করতাম। আমার একটি কন্যা সন্তান ছিল, যার নাম ফাতেমা। একদিন সে ঘরের ছাদে উঠেছিল। হঠাৎ করেই সে নিখোঁজ হয়ে যায়। চারদিকে অনেক খোঁজাখুঁজি করেও তার কোনো সন্ধান পেলাম না।
প্রিয় কন্যার বিচ্ছেদে আমি দিশেহারা হয়ে পড়লাম। অবশেষে নিরুপায় হয়ে হুযূর গাউছে পাক, সাইয়্যিদুনা শায়খ আবদুল কাদের জিলানী রহমাতুল্লাহি আলাইহির দরবারে উপস্থিত হয়ে সমস্ত ঘটনা খুলে বললাম।”
গাউছে পাকের নির্দেশ
সব কথা শুনে গাউছে পাক রহমতুল্লাহি আলাইহি বললেন-
“করখ অঞ্চলের নির্জন প্রান্তরে চলে যাও। সেখানে একটি উঁচু টিলার উপর বসে নিজের চারপাশে একটি বৃত্ত এঁকে নিও। তারপর আমার দিকে তাওয়াজ্জুহ রেখে ‘বিসমিল্লাহ’ পাঠ করতে থাকো। রাতের অন্ধকারে বিভিন্ন আকৃতির জ্বীন তোমার আশপাশে ঘোরাফেরা করবে। তাদের দেখে ভয় পেয়ো না।
সেহরীর সময় জ্বীনদের বাদশাহ তোমার কাছে আসবে এবং তোমার প্রয়োজন সম্পর্কে জিজ্ঞেস করবে। তখন বলবে- আমাকে বাগদাদ থেকে আবদুল কাদের জিলানী পাঠিয়েছেন; আমার হারিয়ে যাওয়া কন্যাকে খুঁজে দিতে হবে।”
গাউছে পাকের নির্দেশ অনুযায়ী আমি সেই নির্জন স্থানে উপস্থিত হলাম এবং তেনার বলে দেওয়া সবকিছু পালন করলাম।
জ্বীনদের ভয়ংকর উপস্থিতি
গভীর রাত নেমে এলো। আমি দেখতে পেলাম, আমার আঁকা বৃত্তের বাইরে ভয়ঙ্কর আকৃতির অসংখ্য জ্বীন ঘোরাফেরা করছে। তাদের চেহারা এতটাই ভীতিকর ছিল যে, তাদের দিকে তাকিয়ে থাকাও কঠিন হয়ে পড়েছিল।
তবুও আমি গাউছে পাক রহমাতুল্লাহি আলাইহির নির্দেশ স্মরণ করে ধৈর্য ধারণ করলাম।
জ্বীনদের বাদশাহর আগমন
অবশেষে সেহরীর সময় উপস্থিত হলো। হঠাৎ এক বিশাল জাঁকজমকের সঙ্গে ঘোড়ায় আরোহন করে জ্বীনদের বাদশাহ আগমন করল। তার সঙ্গে ছিল অসংখ্য জ্বীন।
সে বৃত্তের বাইরে দাঁড়িয়ে বলল,
“কী প্রয়োজনে আমাকে ডাকা হয়েছে?”
আমি বললাম,
“আমাকে হযরত গাউছে পাক হযরত আবদুল কাদের জিলানী রহমাতুল্লাহি আলাইহি পাঠিয়েছেন।”
গাউছে পাকের নাম শুনেই বদলে গেল দৃশ্য
আমার মুখে গাউছে পাকের নাম উচ্চারিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই এক বিস্ময়কর দৃশ্য দেখা গেল। জ্বীনদের বাদশাহ তৎক্ষণাৎ ঘোড়া থেকে নেমে পড়ল। তার সঙ্গে আগত সমস্ত জ্বীনও সম্মানের সঙ্গে বসে গেল।
এরপর আমি আমার কন্যা নিখোঁজ হওয়ার পুরো ঘটনা খুলে বললাম।
ঘটনা শোনার পর জ্বীনদের বাদশাহ সমস্ত জ্বীনকে লক্ষ্য করে বলল,
“তোমাদের মধ্যে কে এই মেয়েটিকে নিয়ে এসেছে?”
কিছুক্ষণ পর এক জ্বীনকে ধরে তার সামনে হাজির করা হলো।
বাদশাহ তাকে জিজ্ঞেস করল,
“তুমি কেন এই মেয়েটিকে নিয়ে এসেছ?”
সে উত্তর দিল,
“মেয়েটিকে দেখে আমি তার প্রতি আসক্ত হয়ে পড়েছিলাম। তাই তাকে নিয়ে এসেছি।”
অপহৃত কন্যাকে ফিরিয়ে দিল জ্বীনদের বাদশাহ
এ কথা শুনে জ্বীনদের বাদশাহ ভীষণ রাগান্বিত হয়ে উঠল। সে ওই জ্বীনকে কঠোর শাস্তির নির্দেশ দিল এবং সঙ্গে সঙ্গে আমার কন্যাকে আমার কাছে ফিরিয়ে দিল।
হারিয়ে যাওয়া সন্তানকে ফিরে পেয়ে আমার আনন্দের সীমা রইল না। আমি বিস্মিত হয়ে জ্বীনদের বাদশাহকে বললাম,
“গাউছে পাক রহমাতুল্লাহি আলাইহির আদেশ আপনি যে সম্মান ও গুরুত্বের সঙ্গে পালন করলেন, এমন দৃশ্য আমি কখনও দেখিনি।”
জ্বীনদের বাদশাহর বিস্ময়কর স্বীকারোক্তি
আমার কথা শুনে জ্বীনদের বাদশাহ বলল,
“খোদার কসম! যখন গাউছে পাক রহমাতুল্লাহি আলাইহি আমাদের দিকে দৃষ্টিপাত করেন, তখন পৃথিবীর সমস্ত জ্বীন কাঁপতে থাকে।
এই কথা শুনে আমি আরও ভালোভাবে উপলব্ধি করলাম, আল্লাহ তাআলা তাঁর প্রিয় বন্ধুদের কত মহান মর্যাদা দান করেছেন।
গাউছে পাকের কারামত থেকে শিক্ষা
এই ঘটনা গাউছে পাকের কারামত-এর এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। এর মাধ্যমে আমরা জানতে পারি, আল্লাহ তাআলা তাঁর প্রিয় ওলীগণকে বিশেষ মর্যাদা ও গ্রহণযোগ্যতা দান করেন। তাঁদের মাধ্যমে আল্লাহ তাআলা মানুষের উপকার সাধন করেন এবং তাঁর কুদরতের নিদর্শন প্রকাশ করেন।
পরিশেষে
গাউছে পাকের কারামত সম্পর্কিত এই ঘটনাটি আমাদের শেখায় যে, আল্লাহ তাআলার ক্ষমতার কোনো সীমা নেই। তিনি যখন ইচ্ছা করেন, তখন তাঁর প্রিয় বন্ধুদের মাধ্যমে এমন সব বিস্ময়কর ঘটনা প্রকাশ করেন, যা মানুষের চিন্তা ও কল্পনাকেও অতিক্রম করে যায়।
আল্লাহ তাআলা আমাদের অন্তরে তাঁর প্রিয় ওলী-আল্লাহদের প্রতি সত্যিকারের ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা দান করুন, তাঁদের আদর্শ অনুসরণ করার তাওফিক নসীব করুন এবং আমৃত্যু ঈমানের উপর অটল থাকার সৌভাগ্য দান করুন। আমীন ।







