দয়াল নবী আপনার দরবারে আমি গোলাম হাজির হইয়াছি।
আল্লাহ তাআলার প্রিয় বন্ধুগণ, অর্থাৎ ওলী আল্লাহদের শান ও মান সাধারণ মানুষের বোধের ঊর্ধ্বে। তাঁদের অন্তর আল্লাহর নূরে আলোকিত, তাঁদের হৃদয় সদা আল্লাহর স্মরণে জাগ্রত এবং তাঁদের জীবনজুড়ে প্রকাশ পায় এমন সব বিস্ময়কর কারামাত, যা সাধারণ মানুষের বোধশক্তিকেও অভিভূত করে।
পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন-
“জেনে রেখো, নিশ্চয়ই আল্লাহর ওলীদের কোনো ভয় নেই, চিন্তা নেই এবং তারা দুঃখিত হবে না।”
(সূরা ইউনুস: ৬২)
এই আয়াত স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে, ওলী আল্লাহদের শান ও মান আল্লাহপ্রদত্ত এক বিশেষ মর্যাদা। তাঁরা আল্লাহর বিশেষ রহমত ও সান্নিধ্যের অধিকারী। তাঁদের মর্যাদা সাধারণ বান্দাদের চেয়ে ভিন্ন এবং তাঁদের ওপর আল্লাহ তাআলার বিশেষ অনুগ্রহ বর্ষিত হয়। এই অনুগ্রহেরই বহিঃপ্রকাশ হলো তাঁদের কারামাত।
ওলীদের জন্য জমিন গুটিয়ে যায়
প্রখ্যাত মুহাদ্দিস ও ফকীহ মোল্লা আলী ক্বারী রহমাতুল্লাহি আলাইহি তাঁর বিখ্যাত কিতাব মিরকাতুল মাফাতীহ-এ ‘জিসমে মিসালী’ প্রসঙ্গে বলেন-
“আল্লাহ যখন আউলিয়াদের জন্য জমিন গুটিয়ে দেন, তখন একই সময়ে বিভিন্ন স্থানে তাঁদের উপস্থিতির প্রকাশকে অসম্ভব মনে করার কারণ নেই।”
মূল কথা হলো- আল্লাহ যখন তাঁর প্রিয় বন্ধুদের প্রতি বিশেষ অনুগ্রহ প্রকাশ করেন, তখন দূরত্ব আর তাঁদের জন্য কোনো প্রতিবন্ধকতা থাকে না। আল্লাহর অসীম কুদরতের সামনে স্থান ও সময়ের সব সীমাবদ্ধতা মুছে যায়, আর তখন অসম্ভবও সম্ভব হয়ে ওঠে।
এটাই হলো ওলী আল্লাহদের শান ও মান-যেখানে যুক্তি থেমে যায়, সেখানে আল্লাহর কুদরত কথা বলে।
গাউসুল আজম রহমাতুল্লাহি আলাইহির বিস্ময়কর কারামাত
ওলী আল্লাহদের জগতে উজ্জ্বলতম নক্ষত্রদের অন্যতম হলেন হযরত সৈয়দুনা গাউসুল আজম আব্দুল কাদির জিলানী রহমাতুল্লাহি আলাইহি
একবার বাগদাদের একশ’ জন মানুষ পৃথক পৃথকভাবে গাউসুল আজম আব্দুল কাদির জিলানী রহমাতুল্লাহি আলাইহিকে ইফতারের দাওয়াত দিয়েছিলেন। প্রত্যেকের অন্তরে আশা ছিল-হয়তো হুযূর আমার ঘরেই আসবেন।
ইফতারের সময় প্রত্যেকেই বিস্ময়ে দেখলেন-গাউসে পাক রহমাতুল্লাহি আলাইহি তাঁদের ঘরেই উপস্থিত, তাঁদের সাথেই ইফতার করছেন।
পরবর্তীতে সবাই একত্র হলে প্রত্যেকেই একই ঘটনা বর্ণনা করলেন। তখন সকলেই বুঝতে পারলেন-এটি কোনো সাধারণ ঘটনা নয়; বরং আল্লাহপ্রদত্ত এমন এক মহান কারামাত, যার মাধ্যমে একই সময়ে গাউসুল আজম রহমাতুল্লাহি আলাইহি একশ’ ঘরে উপস্থিত হয়েছিলেন।
এ ঘটনা প্রমাণ করে-আল্লাহ যখন তাঁর প্রিয় বন্ধুকে সম্মানিত করেন, তখন পৃথিবীর নিয়মকানুনও তাঁর জন্য বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে না। এটাই ওলী আল্লাহদের শান ও মান-এর বাস্তব প্রমাণ।
কেন ওলী আল্লাহদের সম্মান করা জরুরি?
আজকাল কিছু মানুষ ওলী আল্লাহদের শান ও মান শুনে অবিশ্বাস প্রকাশ করে। অথচ ইতিহাস, তাফসীর, হাদিসের ব্যাখ্যা এবং আকাবির আলেমদের কিতাব এসব কারামাতে পরিপূর্ণ।
ওলী আল্লাহদের সম্মান করা মানে কোনো ব্যক্তিকে অতিরঞ্জিত করা নয়; বরং আল্লাহ যাঁদের ভালোবাসেন, তাঁদের ভালোবাসা।
নূর নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন, আল্লাহ তাআলা বলেন-
“যে আমার কোনো ওলীর সাথে শত্রুতা করে, আমি তার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করি।”
— সহিহ -বুখারি, হাদিস: ৬৫০২
এই হাদিসে কুদসিই ওলী আল্লাহদের শান ও মান বোঝাতে যথেষ্ট।
পরিশেষে
ওলী আল্লাহদের শান ও মান আমাদের এই শিক্ষা দেয়- যে ওলী আল্লাহগণ আল্লাহর প্রেমে নিজেকে সম্পূর্ণভাবে বিলীন করে দেয়, আল্লাহ তাআলা তাদেরকে এমন মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করেন, যা সাধারণ উপলব্ধির সীমাকেও অতিক্রম করে যায়।
মোল্লা আলী ক্বারী রহমাতুল্লাহি আলাইহির ব্যাখ্যা এবং গাউসুল আজম আব্দুল কাদির জিলানী রহমাতুল্লাহি আলাইহির বিস্ময়কর কারামাত আমাদের সামনে সেই সত্যই উন্মোচন করে-আল্লাহর প্রিয় বন্ধুদের জন্য জমিন গুটিয়ে যায়, দূরত্ব মুছে যায়, আর আল্লাহর অসীম কুদরতে অসম্ভবও সম্ভব হয়ে ওঠে।
তাই ওলী আল্লাহদের শান ও মান অস্বীকার নয়; বরং তাঁদের সম্মান করা, তাঁদের জীবন থেকে শিক্ষা নেওয়া এবং তাঁদের মাধ্যমে আল্লাহর দিকে ফিরে আসাই একজন ঈমানদারের প্রকৃত পরিচয়।
আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে ওলী আল্লাহদের মহব্বত দান করুন, তাঁদের আদর্শে চলার তাওফিক দান করুন এবং তাঁদের উসিলায় আমাদের ঈমানকে দৃঢ় করুন। আমিন।










