দয়াল নবী আপনার দরবারে আমি গোলাম হাজির হইয়াছি।
ওলী-আল্লাহগণ কি মাজার শরীফে সশরীরে জীবিত-এই পরম রূহার্নী ও দালিলিক জিজ্ঞাসার চিরন্তন উত্তর খুঁজতে গেলে আমরা চাক্ষুষ দেখতে পাই যে, আহলে সুন্নাত ওয়াল জামায়াতের অকাট্য আকিদা এবং সুফি দর্শনের মূল ভিত্তিই হলো আউলিয়ায়ে কেরামের অবিনশ্বর আধ্যাত্মিক জীবন। ইসলামি শরিয়তের পরিভাষায় ওলী-আল্লাহগণের এই ইহধাম ত্যাগ করাকে সাধারণ মানুষের সাধারণ মৃত্যুর মতো মনে করা সুফি সাহিত্যের ভাষায় সর্বোচ্চ বেআদবি; বরং তরিকতের সর্বোচ্চ আদবের পরিভাষায় ওলীগণের এই প্রস্থানকে বলা হয় ‘পর্দা করা’। মহান আল্লাহ রব্বুল আলামীন তাঁর খাস বন্ধুদের রওজা মোবারক বা মাজার শরীফে এক বিশেষ কুদরতি জিন্দেগী দান করেন, আল্লাহর ওলীগণ মাজার শরীফে মহান আল্লাহর কুদরতি রহমত ও সম্মানের চাদর গায়ে জড়িয়ে সেখানে পরম জ্যান্ত ও জাগ্রত অবস্থায় অবস্থান করছেন।
কিন্তু বর্তমান সময়ে ওহাবী, সালাফী ও লা-মাাজহাবী নামক একদল বাতিল উগ্রপন্থী ফেরকা ওলীগণের এই জ্যান্ত অস্তিত্বকে চাক্ষুষ অস্বীকার করে সাধারণ মুসলমানদের ঈমান হরণ করার অপচেষ্টা করছে। আজ আমরা পবিত্র কুরআন, সহীহ বুখারী ও মুসলিম শরীফের অকাট্য দলীল এবং সুলতানুল আউলিয়া ও মহামনীষীদের অমর বাণীর জৌলূস ছড়ানো আলোয় জানবো ওলীগণের সশরীরে জীবিত থাকার নিগূঢ় হাকিকত এবং বাতিল ফেরকাদের সেই ভ্রান্ত আকিদার আসল মুখোশ উন্মোচন।
ইসলামে আউলিয়ায়ে কেরামের পর্দা করার প্রকৃত হাকিকত ও বাতেনি জিন্দেগী
সুফি আকিদা ও ইলমে তাসাউফের উচ্চ কিতাবী মানদণ্ড অনুযায়ী, ওলী-আল্লাহগণের পর্দা করা মূলত তেনাদের রূহার্নী অস্তিত্বের বিনাশ নয়, বরং তেনাদের বাতেনি শক্তি আরও বহুগুণ বৃদ্ধি পাওয়ার এক কুদরতি মাধ্যম। সাধারণ মানুষ যেভাবে মারা যায় এবং মাটির সাথে মিশে যায়, আল্লাহর আশেক ওলীগণের জীবন মোটেও তেমন নয়। জগৎবিখ্যাত সুফি সাধক, সুলতানুল আউলিয়া হযরত খাজা গরীবে নওয়াজ মুঈনুদ্দীন চিশতী রহমাতুল্লাহি আলাইহি তেনার খাস মারেফতি বাণীতে এই বিষয়ের জৌলূস এনে এরশাদ করেছেন, “আল্লাহর ওলীগণ যখন দুনিয়ার এই মাটির খাঁচা থেকে পর্দা নেন, তখন প্রকৃতপক্ষে তেনারা এক সংকীর্ণ কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে মহান আল্লাহর অনন্ত কুদরতের আসমানে ডানা মেলেন।”
অতএব, ওলী-আল্লাহগণ কি মাজার শরীফে সশরীরে জীবিত এই প্রশ্নের উত্তর স্বয়ং আউলিয়ায়ে কেরামের জীবনের নূরানী আলোতেই দিবালোকের মতো স্পষ্ট। তেনারা মাজার শরীফে কোনো জড় বস্তুর মতো শুয়ে নেই, বরং পরম মর্যাদার সাথে সেখানে তাশরীফ রাখছেন। ভ্রান্ত সালাফী ও ওহাবী ফেরকারা তেনাদের সাধারণ মাটির লাশ মনে করে যে উগ্র ফতোয়া দেয়, তা আসলে তাদের কলবের অন্ধত্ব ও বাতেনি অজ্ঞতারই চাক্ষুষ প্রমাণ।
পবিত্র কুরআনের আলোয় ওলীগণের বাতেনি হায়াতের অকাট্য দলিল
পবিত্র কুরআনের সূরা আল-বাকারার ১৫৪ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ রব্বুল আলামীন স্পষ্ট এরশাদ করেন- ওয়ালা- তাকুলূ লিমাইঁ ইয়ুকতালু ফী সাবীলিল্লা-হি আমওয়া-ত; বাল আহইয়া-উঁও ওয়ালা-কিল্লা- তাশ’উরূন। অর্থ- “আর যারা আল্লাহর রাস্তায় শহীদ হয়, তেনাদের তোমরা মৃত বলো না; বরং তাঁরা জীবিত, কিন্তু তোমরা তা উপলব্ধি করতে পারো না।” ইসলামি শরিয়তের উসুলে ফেকাহ অনুযায়ী, একজন সাধারণ শহীদ যদি আল্লাহর রাস্তায় নিজের জীবন উৎসর্গ করে মাজার শরীফে সশরীরে জিন্দা থাকতে পারেন; তবে শহীদের চেয়েও যাঁদের মর্যাদা বহুগুণ উচ্চে আসীন, যাঁরা সারা জীবন নিজের নফসের বিরুদ্ধে জিহাদ করে বেলায়েতের সর্বোচ্চ মাকামে পৌঁছে ‘ওলী-আল্লাহ’ হয়েছেন-তাঁরা যে মাজার শরীফে সশরীরে জিন্দা থাকবেন এবং আশেকদের মাঝে বাতেনি ফয়েজ বিতরণে একশত ভাগ সচল থাকবেন, তা পরম সত্য।
স্বয়ং আল্লাহ পাক সূরা আল-ইমরানের ১৬৯ নম্বর আয়াতে আরও এরশাদ করেন- ওয়ালা- তাহসাবান্নাল্লাযীনা কুতিলূ ফী সাবীলিল্লা-হি আমওয়া-তা-; বাল আহইয়া-উন ‘ইনদা রব্বিহিম ইউরযাকূ-ন, অর্থ- “আর যারা আল্লাহর রাস্তায় নিহত হয়েছে, তেনাদের কখনোই ‘মৃত’ মনে করো না; বরং তাঁরা তাঁদের প্রতিপালকের নিকট জীবিত, তেনাদের রিজিক প্রদান করা হয়।” এই কুদরতি আয়াত প্রমাণ করে যে, ওলী-আল্লাহদের সশরীরে জীবিত থাকা কোনো মনগড়া রূপকথা নয়, বরং স্বয়ং আল্লাহর কিতাব দ্বারা সুরক্ষিত এক অকাট্য ঈমানী রাজপথ। যারা এই অকাট্য কুদরতি আয়াত দেখার পরও, মাজার শরীফে চির জাগ্রত থাকা ওলী-আল্লাহদের মৃত বা মাটির সাথে মিশে যাওয়া সাধারণ লাশ দাবি করার দুঃসাহস দেখায়, তাদের বাতিল মুখোশ আজ সুন্নী মুসলমানদের দরবারে চাক্ষুষ উন্মোচিত।
সহীহ হাদিস শরীফের আয়নায় মাজার শরীফে ওলীগণের সশরীরে জীবিত থাকার দলিল
সহীহ হাদিস শরীফ চাক্ষুষ সাক্ষ্য দেয় যে, আম্বিয়ায়ে কেরাম এবং আউলিয়ায়ে কেরাম পর্দা করার পরও সশরীরে জীবিত ও ইবাদতরত থাকেন। সহীহ মুসলিম শরীফের ২য় খণ্ডের ‘কিতাবুল ফাযায়েল’ অধ্যায়ে স্পষ্ট বর্ণিত আছে, রাসূলে পাক নূর নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরশাদ করেছেন, “মেরাজের রাতে আমি মূসা আলাইহিস সালাম-এর মাজারের পাশ দিয়ে তাশরীফ নেওয়ার সময় দেখেছি- তিনি তেনার মাজারে দাঁড়িয়ে সশরীরে সালাত (নামাজ) আদায় করছেন।” এই সহীহ হাদিস অকাট্যভাবে প্রমাণ করে যে, পর্দা করার পরও আল্লাহর নেক বান্দাগণ মাজার শরীফে সশরীরে জ্যান্ত থাকেন এবং আল্লাহর ইবাদতে মগ্ন থাকেন।
শুধু তাই নয়, জগৎবিখ্যাত মুহাদ্দিস ইমাম বায়হাকী রহমাতুল্লাহি আলাইহি তেনার ‘হায়াতুল আম্বিয়া ফী কুবূরিহিম’ গ্রন্থে সহীহ সনদে হাদিস উল্লেখ করেছেন যে, আম্বিয়ায়ে কেরাম ও ওলী-আল্লাহগণ পর্দা করার পরও মাজার ও রওজা শরীফে সশরীরে জীবিত আছেন। হযরত আবু দারদা রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলে পাক নূর নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরশাদ করেছেন: তোমরা জুমার দিনে আমার ওপর বেশি বেশি দুরুদ শরীফ পাঠ করো। নিশ্চয় আল্লাহ তাআলা মাটির জন্য ‘নবীদের শরীর’ ভক্ষণ করা হারাম করে দিয়েছেন।” এই কুদরতি ঘোষণা চাক্ষুষ প্রমাণ করে যে, আম্বিয়ায়ে কেরামগণের পাশাপাশি ওলী-আল্লাহদের পবিত্র শরীর মোবারকে মাটি বিন্দু মাত্র স্পর্শ করতে পারে না; বরং তা দুনিয়ার জীবনের মতোই একশত ভাগ অক্ষত, সতেজ ও সশরীরে জিন্দা থাকে।
এখন কেউ যদি কুযুক্তি দিয়ে বলে যে, উক্ত হাদিসে তো সরাসরি ‘ওলীগণের’ কথা আলাদা করে উল্লেখ করা হয়নি; তবে তেনাদের বাতেনি অন্ধত্ব খণ্ডন করতে আমাদের বুঝতে হবে যে- ওলী-আল্লাহগণ স্বয়ং নূর নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নূরের কুদরতি আলোয় আলোকিত হয়েই বেলায়েতের মাকামে উন্নীত হয়েছেন। আর যিনি স্বয়ং নূর নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর বাতেনি আলোয় আলোকোজ্জ্বল হয়েছেন, তেনার পবিত্র শরীর মোবারক ভক্ষণ করবে-মাটির এমন কোনো সাধ্য বা ক্ষমতা নেই। অতএব, ওহাবী ও সালাফীদের সেই ভ্রান্ত ফতোয়া যে ওলীগণ নাকি মাটিতে মিশে গেছেন-তা সহীহ হাদিসের আলোয় লোহার মতো মজবুত দলিলের প্রচণ্ড আঘাতে আজ চাক্ষুষ চূর্ণ হয়ে মাটির সাথেই মিশে গেছে।
গাউছে পাক ও মুজাদ্দিদে আলফে সানীর অমিয় বাণী
গাউসুল আজম, বড় পীর হযরত আব্দুল কাদির জিলানী রহমাতুল্লাহি আলাইহি তেনার অমর কিতাব ‘ফুতুহুল গাইব’-এ এক জগতকাঁপানো হাকিকত চাক্ষুষ এরশাদ করেছেন। তিনি বলেন, “আল্লাহর খাঁটি ওলীগণ কখনো মরেন না, তেনাদের কেবল এক জগত থেকে অন্য জগতে স্থানান্তর ঘটে। তেনারা মাজার শরীফে সশরীরে জীবিত থেকে আশেক মুরিদদের কলব পরিষ্কার করার ফয়েজ ও রূহার্নী তাওয়াজ্জুহ কিয়ামত পর্যন্ত চাক্ষুষ জারি রাখেন।”
একইভাবে, ইমামে রব্বানী মুজাদ্দিদে আলফে সানী রহমাতুল্লাহি আলাইহি তেনার অমর ‘মাকতুবাত শরীফ’-এ লিপিবদ্ধ করেছেন, ‘ওলী-আল্লাহগণের রূহার্নী শক্তি পর্দা করার পর তেনাদের পবিত্র মাজার শরীফে আরও বেশি তীব্র ও সচল হয়। কারণ, দুনিয়ার জীবনে তেনাদের শরীর মোবারক বাতেনি আত্মার জন্য একটি বাহ্যিক পর্দা ছিল; কিন্তু পর্দা করার পর সেই বাতেনি পর্দা চিরতরে উঠে যায়।’ গাউছে পাক ও মুজাদ্দিদে আলফে সানী রাহমাতুল্লাহি আলাইহির এই অমিয় বাণী চাক্ষুষ প্রমাণ করে যে- ওলী-আল্লাহগণ কি মাজার শরীফে সশরীরে জীবিত, এই পরম সত্য কেবল কিতাবের পাতায় সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি প্রকৃত আশেকদের কলবের এক জীবন্ত ও চিরন্তন আধ্যাত্মিক অনুভূতি।
মাজার ভাঙচুরকারী বাতিল ফেরকাদের মুখোশ উন্মোচন
বর্তমান সময়ে বাংলাদেশে একদল উগ্র ও বাতিল ওহাবী-সালাফী ফেরকা ওলী-আল্লাহদের পবিত্র মাজার ও খানকাহ ভাঙচুর করার যে জঘন্য অপচেষ্টা চালাচ্ছে, তা মূলত তেনাদের আকিদাগত দেউলিয়া ও কুফরি ফেতনারই চাক্ষুষ বহিঃপ্রকাশ। এই নজদী ফেতনাবাজরা আরবের মুহাম্মদ ইবনে আব্দুল ওহাব নজদীর সেই আড়াইশো বছর পুরানো চরমপন্থী বাতিল মতাদর্শের ছায়ায় অনুপ্রাণিত হয়ে বাংলার শান্তিময় সুফি ঐতিহ্যকে ধ্বংস করতে চায়। তাদের উগ্র দাবি হলো ওলীগণ মৃত, তাই মাজার জিয়ারত করা শিরক।
কিন্তু ইতিহাস চাক্ষুষ সাক্ষী- ওলী-আউলিয়াগণের পবিত্র মাজার শরীফের উসিলাতেই আজ আমরা ঈমানের পরম দৌলত চাক্ষুষ লাভ করেছি। ওলীগণ মাজার শরীফে সশরীরে জীবিত আছেন বলেই প্রতিদিন লাখ লাখ আশেক মুরিদ ওলীদের দরবারে গিয়ে রূহার্নী প্রশান্তি ও আল্লাহর নৈকট্য লাভ করে। মাজারের সৌধ বা বুনিয়ান ভাঙলেই ওলীদের আধ্যাত্মিক বেলায়েতের শান কখনো মুছে ফেলা যায় না। যারা আজ মাজার ভাঙছে, তেনাদের এই বাতিল ও উগ্র মুখোশ বাংলার কোটি কোটি সুন্নী মুসলমান আজ চাক্ষুষ উন্মোচন করে দিয়েছে এবং হকের ময়দানে তেনাদের চূড়ান্ত পরাজয় সুনিশ্চিত।
শেষ কথা- ওলী-আল্লাহদের দেখানো হকের পথে অটল থাকার রাজকীয় আহ্বান
ওলী-আল্লাহগণ কি মাজার শরীফে সশরীরে জীবিত- এই পরম জ্যান্ত মহাসত্যটিই পরিশেষে সুফি সাহিত্য, উসুলে ফেকাহ এবং শরিয়তের অকাট্য দলীলমালার আলোকে একশত ভাগ প্রমাণিত। অতএব, আউলিয়ায়ে কেরামের এই সশরীরে জিন্দা থাকার সত্যকে অস্বীকার করা প্রকৃতপক্ষে পবিত্র কুরআন ও সহীহ সুন্নাহর জ্যান্ত নূরকে অস্বীকার করার শামিল। আউলিয়ায়ে কেরামের পবিত্র স্মৃতিবিজড়িত মাজার শরীফ জিয়ারত করা এবং তেনাদের উসিলায় রূহার্নী বিকাশ হাসিল করা একশত ভাগ শরীয়তসম্মত।
আসুন, আমরা বাতিল ওহাবী-সালাফীদের উগ্র ও মনগড়া ফতোয়াকে বর্জন করি, ওলীগণের ইশকে নিজেদের কলবকে সর্বদা সজীব রাখি এবং পবিত্র মাজার শরীফ সুরক্ষায় ঐক্যবদ্ধ হয়ে হকের বিজয় সুনিশ্চিত করি। মহান আল্লাহ রব্বুল আলামীন আমাদের সকলকে ওলী-আল্লাহদের খাস মহব্বতে দুনিয়া ও আখেরাতে চিরন্তন কামিয়াবি দান করুন। আমীন।







1 thought on “ওলী-আল্লাহগণ কি মাজার শরীফে সশরীরে জীবিত? কুরআন ও সুন্নাহর অকাট্য দলীলের আলোকে বাতিল ফেরকার মুখোশ উন্মোচন।”