জশনে জুলুসে ঈদে মিলাদুন্নবী ﷺ: সকল ঈদের সেরা ঈদ এবং বাতিল ফেরকার মুখোশ উন্মোচন।

জশনে জুলুসে ঈদে মিলাদুন্নবী ﷺ সকল ঈদের সেরা ঈদ। পবিত্র কুরআন, সহীহ মুসলিমের ১১৬২ নম্বর হাদিস এবং আল্লামা ইবনে হাজার হাইতামী রহমাতুল্লাহি আলাইহি-এর আন-নে'মাতুল কুবরা কিতাবের অকাট্য দলিলের আলোকে ঈদে মিলাদুন্নবী পালনের বাতেনি হাকিকত ও বাতিল ওহাবী-সালাফী ফেরকাদের মনগড়া ফতোয়ার দাঁতভাঙা জবাবসহ পূর্ণাঙ্গ আলোচনা।

August 20, 2026 9:19 PM
জশনে জুলুসে ঈদে মিলাদুন্নবী সকল ঈদের সেরা ঈদ বাতিল ফেরকা
---Advertisement---

দয়াল নবী আপনার দরবারে আমি গোলাম হাজির হইয়াছি।

জশনে জুলুসে ঈদে মিলাদুন্নবী ﷺ সকল ঈদের সেরা ঈদ। যদি প্রশ্ন করা হয় কেন ঈদে মিলাদুন্নবী ﷺ সকল ঈদের সেরা ঈদ? তবে তার সহজ উত্তর হলো- যাঁকে সৃষ্টি না করলে মহান আল্লাহ কোনো কিছুই সৃষ্টি করতেন না; যাঁর ওপর স্বয়ং আল্লাহ তাআলা এবং সমস্ত ফেরেশতাগণ অহর্নিশ সদা-সর্বদা দুরুদ পাঠ করেন; যাঁর মাধ্যমে আজ আমরা পবিত্র কালেমা, নামাজ, রোজা, হজ্ব ও যাকাত সমস্ত কিছু লাভ করেছি। যিনি স্বয়ং ইসলাম, ঈমান এবং ধর্ম। যিনি সমগ্র সৃষ্টিজগতের পরম রহমত। তেনার মাধ্যমে আমরা পেয়েছি নামাজ, তেনার মাধ্যমে আমরা পেয়েছি রোজা, তেনার মাধ্যমে আমরা পেয়েছি হজ্ব, তেনার মাধ্যমে আমরা পেয়েছি যাকাত এবং তেনার মাধ্যমে আমরা পেয়েছি ঈদ। এমনকি মহান আল্লাহ রব্বুল আলামীন যে এক ও অদ্বিতীয় এবং তিনিই একমাত্র উপাস্য, তাও আমরা নূর নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লামের মাধ্যমেই জানতে পেরেছি

যাঁর মাধ্যমে আজ আমরা পবিত্র কালেমা লাভ করেছি; যাঁর মাধ্যমে পেয়েছি নামাজ, যাঁর মাধ্যমে ধন্য হয়েছে রোজা; যাঁর উসিলায় হাসিল করেছি হজ্ব ও যাকাত এবং যাঁর দয়ায় আমাদের জীবনে তাশরীফ এনেছে পবিত্র ঈদের পরম আনন্দ; যাঁর রহমতের চাদরে সদা-সর্বদা সুরক্ষিত ও টিকে আছে সমগ্র সৃষ্টিজগত- তবে কেন সেই নূর নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর শুভ আগমন সমগ্র কায়েনাতের বুকে সকল খুশির সেরা খুশি হবে না? কেনই বা তাঁর পবিত্র শুভ আগমন সকল ঈদের সেরা ঈদ হবে না- এটি কি আমাদের প্রত্যেকের গভীরভাবে ভাবা উচিত নয়? আসুন, ‘জশনে জুলুসে ঈদে মিলাদুন্নবী ﷺ’ কেন সকল ঈদের সেরা ঈদ, পবিত্র কুরআন এবং সহীহ হাদিস শরীফের অকাট্য দলিলসহ সেই পুঙ্খানুপুঙ্খ ও পূর্ণাঙ্গ আলোচনা চাক্ষুষ প্রত্যক্ষ করি। যার উসিলায় প্রতিটা খাঁটি ঈমানদারের ঈমানী শক্তি পাহাড়ের মতো দৃঢ় ও বৃদ্ধি পাবে এবং যারা এই জশনে জুলুসে ঈদে মিলাদুন্নবী ﷺ-কে মান্য করে না, তাদেরও বাতেনি ভাবনার রূহার্নী দ্বার চিরতরে উন্মুক্ত হবে

পবিত্র ‘ঈদে মিলাদুন্নবী সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম কী? এর শাব্দিক অর্থ ও বাতেনি হাকিকত

পবিত্র ‘ঈদে মিলাদুন্নবী’ সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম কী?- তা গভীরভাবে হৃদয়ঙ্গম করা প্রতিটি খাঁটি ঈমানদারের জন্য পরম সৌভাগ্য ও ঈমানী দায়িত্ব। আমরা যদি ঈদে মিলাদুন্নবী এর শাব্দিক অর্থের দিকে তাকাই, তবে দেখতে পাই- আরবি শব্দতত্ত্ব অনুযায়ী ‘ঈদ’ শব্দের অর্থ হলো খুশি হওয়া, আনন্দ উদযাপন করা কিংবা বারবার ফিরে আসা। আর ‘মিলাদুন্নবী’ বলতে আমরা সৃষ্টির মূল নূর নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর এই ধরণীতে পবিত্র শুভ আগমনকে বুঝি। অতএব, শাব্দিক ও সামষ্টিক অর্থে ‘ঈদে মিলাদুন্নবী’ সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলতে- নূর নবীজি এর শুভ আগমনের পরম ও পবিত্র নেয়ামত লাভ করায় শুকরিয়া স্বরূপ পরম আনন্দ ও খুশি উদযাপন করাকেই বোঝায়।
নূর নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর শুভ আগমনের বাতেনি হাকিকত ও আধ্যাত্মিক রহস্য আরও গভীর ও অলৌকিক। ইতিহাস সাক্ষী- অশান্তি, বর্বরতা, কুসংস্কার আর ঘোর অন্ধকারে ভরপুর সংঘাতময় আরবের বুকে যখন মানবতা ও ইনসাফ ডুকরে কাঁদছিল, ঠিক তখন আঁধারের বুক চিরে নূর নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম শুভ আগমন করেছেন। তিনি সমগ্র মানবজাতিকে সত্য, সুন্দর, উচ্চ সভ্যতা ও পরম ন্যায়ের অলৌকিক দিক-নির্দেশনা দিয়ে গোটা বিশ্বকে এক স্বর্গীয় বাতেনি শান্তিতে পরিপূর্ণ করে তোলেন। সৃষ্টির সেই পরম ও মূল নেয়ামত নূর নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর পবিত্র শুভাগমনে নিজের নফস ও কলব বিলিয়ে দিয়ে খুশি উদযাপন করাটাই হচ্ছে হাকিকি ‘ঈদে মিলাদুন্নবী’ সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম

পবিত্র কুরআনের অকাট্য দলিলের আলোকে নূর নবীজি এর শুভ আগমন ও খুশি প্রকাশ

ওলী-আল্লাহগণের বাতেনি নজর অনুযায়ী, মিলাদুন্নবী পালনের নির্দেশ স্বয়ং আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে প্রদান করেছেন। সূরা ইউনুসের ৫৮ নম্বর আয়াতে আল্লাহ রব্বুল আলামীন স্পষ্ট এরশাদ করেন- কুল বিফাদ্বলিল্লাহি ওয়াবিরাহমাতিহী ফাবিযালিকা ফালইয়াফরাহূ; হুওয়া খাইরুম মিম্মা ইয়াজমাঊন “ অর্থ- আপনি বলুন- আল্লাহর অনুগ্রহ এবং তাঁরই রহমত লাভ করার কারণে, অতএব তারা যেন আনন্দ প্রকাশ করে। এটি তাদের সমস্ত সঞ্চিত ধন-সম্পদ অপেক্ষা বহুগুণ উত্তম।

এখন প্রশ্ন হলো- সমগ্র সৃষ্টিজগতের বুকে আল্লাহর সবচেয়ে বড় অনুগ্রহ, দয়া এবং নেয়ামত কে? পবিত্র কুরআনের সূরা আম্বিয়ার ১০৭ নম্বর আয়াতে আল্লাহ নিজেই তেনার উত্তর দিয়ে বলেছেন, ওয়ামা আরসালনাকা ইল্লা রাহমাতাল লীল আলামীন। অর্থ- এবং (হে মাহবূব!) আমি আপনাকে সমগ্র সৃষ্টিজগতের জন্য কেবল রহমত করেই পাঠিয়েছি“।” এই দুটি আয়াতের বাতেনি হাকিকত মেলালে একশত ভাগ চাক্ষুষ স্পষ্ট হয়ে যায় যে, নূর নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর চেয়ে বড় নেয়ামত আল্লাহর সৃষ্টিজগতে আর কিছু হতে পারে না। আর সেই নেয়ামত পাওয়ার দিনে খুশি প্রকাশ করার হুকুম স্বয়ং আল্লাহ তাআলা দিয়েছেন।

সুফিবাদের মূল তত্ত্ব অনুযায়ী, যখন আমরা আশেকগণ ‘জশনে জুলুসে ঈদে মিলাদুন্নবী ﷺ’-এর এই বরকতময় রাজকীয় শোভাযাত্রায় শরিক হই, তখন স্বয়ং নূর নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর রূহার্নী তাওয়াজ্জুহ আমাদের কলবকে স্পর্শ করে। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হলো, ওহাবী ও সালাফী সম্প্রদায় এই নিয়ে সাধারণ মুসলমানদের বিভ্রান্ত করার অপচেষ্টা করে। তারা দাবি করে যে- ঈদে মিলাদুন্নবী পালন করা নাকি এক প্রকার বিদআত এবং এটি নাকি খ্রিষ্টানদের বড়দিন (Christmas) উদযাপনের সমতুল্য! সুফি দর্শনের প্রামাণ্য হাকিকত ও দলিলের সম্মুখে বাতিল ফেরকাদের এই মনগড়া যুক্তি সম্পূর্ণ অসার, মিথ্যা ও বাতিল।

খ্রিষ্টানরা হযরত ঈসা আলাইহিস সালাম-কে আল্লাহর পুত্র বলে দাবি করে উৎসব করে, যা সম্পূর্ণ শিরক। পক্ষান্তরে, খাঁটি সুন্নী মুসলমানগণ নূর নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে আল্লাহর সৃষ্টির সর্বশ্রেষ্ঠ, উম্মতের ত্রাণকর্তা, পরম উদ্ধারকারী এবং স্বয়ং রাহমাতুল্লিল আলামিন হিসেবে সর্বোচ্চ আদবের সাথে মান্য করেন। আশেক ঈমানদারগন নূর নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর পবিত্র শুভ আগমন এর উসিলায় ইহকালীন ও পরকালীন মুক্তি পাওয়ার আশায় মহান আল্লাহর দরবারে শুকরিয়া আদায় করে জশনে জুলুস উদযাপন করেন। অতএব, আল্লাহর সর্বশ্রেষ্ঠ নেয়ামত ও রহমতের শুকরিয়া স্বরূপ এই পবিত্র মিলাদুন্নবী পালন করা একশত ভাগ হকের ওপর প্রতিষ্ঠিত এবং একে অস্বীকার করা বাতিল ফেরকাদের অন্তরের অন্ধত্ব ও হিংসার বহিঃপ্রকাশ মাত্র

সহীহ হাদিস শরীফের অকাট্য প্রমাণ এবং স্বয়ং নবীজির মিলাদ উদযাপন

বাতিল ওহাবী সম্প্রদায় প্রায়শই দাবি করে যে, সাহাবায়ে কেরাম কিংবা স্বয়ং নূর নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম নাকি কখনো মিলাদুন্নবী পালন করেননি। তেনাদের এই অজ্ঞতা ও ভ্রান্তি দূর করতে সহীহ মুসলিম শরীফের আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে ১১৬২ নম্বর হাদিসটিই চাক্ষুষ যথেষ্ট। যেখানে স্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে- নূর নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে যখন সোমবার দিন রোজা রাখার কারণ জিজ্ঞেস করা হলো, তখন তিনি এরশাদ করলেন, ‘এই দিনে আমি শুভ আগমন করেছি এবং এই দিনেই আমার ওপর পবিত্র কুরআন নাজিল হয়েছে। স্বয়ং দয়াল নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজের পবিত্র শুভ আগমনের শান ও নেয়ামতের পরম শুকরিয়া হিসেবে প্রতি সপ্তাহে সোমবার দিন রোজা রেখে নিজের মিলাদ উদযাপন করেছেন। যা দিবালোকের মতো চাক্ষুষ প্রমাণ করে যে, ‘জশনে জুলুসে ঈদে মিলাদুন্নবী ﷺ’ অত্যন্ত ভক্তিভরে উদযাপন করা স্বয়ং সুন্নাহরই এক অনন্য ও অকাট্য অন্তর্ভুক্ত

শুধু তাই নয়, ইমাম বুখারী রহমাতুল্লাহি আলােইহি তেনার সহীহ বুখারী শরীফের ‘কিতাবুন নিকাহ’ (বিবাহ) অধ্যায়ের আন্তর্জাতিক ৫১০১ নম্বর হাদিসে বর্ণনা করেছেন যে- কাফের আবু লাহাবের দাসী সুওয়াইবা যখন আবু লাহাবকে নূর নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর পবিত্র শুভ আগমনের সুসংবাদ দিয়েছিল, তখন আবু লাহাব খুশিতে তার তর্জনী আঙুল ইশারা করে সুওয়াইবাকে চিরতরে মুক্ত করে দিয়েছিল। তাঁরই ফলশ্রুতিতে, আবু লাহাব কাফের এবং জাহান্নামী হওয়া সত্ত্বেও প্রতি সোমবার দিন জাহান্নামে তাঁর আজাব শিথিল করা হয় এবং তাঁর সেই আঙুল দিয়ে পবিত্র ঠান্ডা পানি প্রবাহিত হয়

ওলী-আল্লাহগণ এই ঘটনার নিগূঢ় মারেফতি হাকিকত বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন- যদি একজন কট্টর কাফের ও আবু লাহাবের মতো জাহান্নামী ব্যক্তি নূর নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর শুভ আগমনের খুশিতে আনন্দিত হওয়ার কারণে প্রতি সোমবার জাহান্নামের আগুন হতে মুক্তি লাভ করতে পারে, তবে আমরা যারা নূর নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর পবিত্র শুভ আগমনের খুশিতে আত্মহারা হয়ে আজীবন ‘জশনে জুলুসে ঈদে মিলাদুন্নবী ﷺ’ পালন করি, আমাদের জান্নাতী বিদায় ও সাকরাতের কষ্টহীন ঈমানী মউত যে একশত ভাগ সুনিশ্চিত, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না

খোলাফায়ে রাশেদীনের দৃষ্টিতে ঈদে মিলাদুন্নবী ﷺ: আল্লামা শাহাবুদ্দীন ইবনে হাজার হাইতামী-এর অকাট্য কিতাবী দলিল

ভ্রান্ত ওহাবী ও সালাফী সম্প্রদায় ঈমানদার মুসলমানদের মনে প্রায়শই এই ঘোর সন্দেহ জ্যান্ত করার অপচেষ্টা করে যে, খোলাফায়ে রাশেদীনের আমলে পবিত্র ‘ঈদে মিলাদুন্নবী’ ﷺ পালনের নাকি কোনো অস্তিত্ব ছিল না। তাদের এই অজ্ঞতা ও মিথ্যা অপপ্রচারকে সম্পূর্ণ চাক্ষুষ খণ্ডন করে ইসলামের অন্যতম প্রধান ফকীহ, মুহাদ্দিস ও প্রখ্যাত সুফি সাধক আল্লামা শাহাবুদ্দীন ইবনে হাজার হাইতামী রহমাতুল্লাহি আলাইহি আজ থেকে প্রায় ৪৫০ বছর পূর্বে পবিত্র মক্কা শরীফে অবস্থানকালীন সময়ে মীলাদুন্নবী ﷺ বিষয়ে একটি অত্যন্ত চমৎকার ও প্রসিদ্ধ কিতাব রচনা করেন। কিতাবটির পূর্ণাঙ্গ নাম হলো- আন-নে’মাতুল কুবরা আলাল আলাম ফী মাওলিদি সাইয়্যেদি ওলদি আদম’, যা আমাদের উপমহাদেশে এবং সুন্নী ওলী-আল্লাহদের দরবারে সংক্ষেপে ‘আন-নে’মাতুল কুবরা’ নামে পরিচিত ও সমাদৃত। এই জগৎবিখ্যাত কিতাবের মূল আরবি পাণ্ডুলিপির ৭ ও ৮ নম্বর পৃষ্ঠায় খোলাফায়ে রাশেদীনের চার খলিফার ঈমানী ও মারেফতি বাণীগুলো হুবহু উল্লেখ রয়েছে, যা নিচে তুলে ধরা হলো:
১. হযরত আবু বকর সিদ্দিক রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু-এর ঐতিহাসিক ঘোষণা:
“যে ব্যক্তি ‘মিলাদুন্নবী’ সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম পাঠ বা উদযাপনের মজলিসের জন্য এক দিরহাম অর্থ খরচ করবে, সে ব্যক্তি বেহেশতে আমার পরম সাথী হবে।”
২. হযরত ওমর ফারুক রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু-এর জগতকাঁপানো বাণী:

“যে ব্যক্তি ‘মিলাদুন্নবী’ সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে তাজীম করলো এবং অনন্য সম্মান প্রদর্শন করলো, সে যেন স্বয়ং দ্বীন ইসলামকেই নতুন করে জ্যান্ত ও জীবিত রাখলো।”
৩. হযরত ওসমান জিন্নুরাইন রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু-এর অভিমত:

“যে ব্যক্তি ‘মিলাদুন্নবী’সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম পাঠের পবিত্র মাহফিলে এক দিরহাম অর্থ ব্যয় করলো, সে যেন ইসলামের ঐতিহাসিক বদর ও হুনাইনের মহাযুদ্ধে সরাসরি সশরীরে শরিক হলো।”
৪. মাওলা আলী আলাইহিস সালাম-এর রাজকীয় ফয়সালা:

“যে ব্যক্তি ‘মিলাদুন্নবী’সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে সম্মান জানাবে এবং নূর নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর পবিত্র শুভ আগমন উপলক্ষে মাহফিল আয়োজনের মূল উদ্যোক্তা হবে, সে দুনিয়া থেকে খাঁটি তওবার মাধ্যমে একশত ভাগ ঈমানের সাথে বিদায় নেবে এবং হাশরের ময়দানে কোনো প্রকার হিসাব ছাড়া সরাসরি জান্নাতে প্রবেশ করবে।”
চার খলিফার এই বলিষ্ঠ ও নূরের বাণী চাক্ষুষ প্রমাণ করে যে, জশনে জুলুসে ঈদে মিলাদুন্নবী ﷺ অত্যন্ত ভক্তিভরে উদযাপন করা সাহাবায়ে কেরামের খাস আমল ও হকের এক অনন্য নিদর্শন। অতএব, আল্লাহর সর্বশ্রেষ্ঠ নেয়ামত ও রহমতের এই শুকরিয়াকে অস্বীকার করা বাতিল ফেরকাদের অন্তরের অন্ধত্ব ও হিংসার চাক্ষুষ বহিঃপ্রকাশ মাত্র

বাতিল ফেরকাদের বিদআত ফতোয়ার মুখোশ উন্মোচন ও দাঁতভাঙা জবাব

ওহাবী, সালাফী ও দেওবন্দী ফেরকারা প্রায়ই একটি হাদিসের ভুল প্রয়োগ করে বলে যে, “নবীজির যুগে যা ছিল না, তার সবকিছুই বিদআত এবং প্রতিটি বিদআতই হলো গোমরাহী বা দোজখ।” তাদের এই সংকীর্ণ যান্ত্রিক বুদ্ধি সুফি দর্শন ও উসুলে ফেকাহর সম্পূর্ণ পরিপন্থী। ইসলামি শরিয়তের প্রখ্যাত ইমামগণ বিদআতকে দুই ভাগে ভাগ করেছেন- ‘বিদআতে সাইয়্যেয়াহ’ (মন্দ কাজ) এবং ‘বিদআতে হাসানা’ (উত্তম কাজ)। ইসলামের ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, সাহাবায়ে কেরামের যুগেও এমন অনেক আমল  শুরু হয়েছিল যা নূর নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম সশরীরে উপস্থিত থাকাকালীন প্রথা হিসেবে ছিল না। যেমন- হযরত ওমর রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু-এর যুগে জামায়াতের সাথে ২০ রাকাত তারাবীহ নামাজ সুসংগঠিত করা, হযরত আবু বকর রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু ও হযরত ওসমান রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু-এর যুগে পবিত্র কুরআনের সমস্ত পঙক্তি একত্র করে কিতাব আকারে বাঁধাই করা, এবং পরবর্তীতে কুরআনের হরফে জের-জবর-পেশ যুক্ত করা।

যদি ওহাবী ও সালাফী সম্প্রদায়ের মনগড়া ফতোয়া সত্য বলে ধরে নেওয়া হয়, তবে কুরআনে জের-জবর দেওয়া, মাদ্রাসার ক্লাসরুম তৈরি করা, বুখারী-মুসলিম শরীফ কিতাব আকারে পড়া এবং ল্যাপটপ বা ইন্টারনেটে ধর্মের প্রচার করা- এই সবকিছুই বিদআত হিসেবে গণ্য হবে। কিন্তু তারা নিজেদের স্বার্থে এই আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করছে, অথচ নূর নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর পবিত্র শানে যখনই মিলাদ পড়ার বা জশনে জুলুস বের করার কথা আসে, তখনই তাদের কলব হিংসায় ও কুফুরিতে অন্ধ হয়ে যায়। সুফিবাদের মূল শিক্ষা অনুযায়ী, যে কাজে দ্বীনের এবং মিল্লাতের উপকার হয় এবং যা নূর নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর মহব্বতকে আশেকদের কলবে বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়, তা কখনো গোমরাহী হতে পারে না। বরং তা পুণ্যময় ইবাদত। অতএব, বাতিল ফেরকাদের এই মুখোশ আজ মুসলমানদের সামনে উন্মোচিত করা অত্যন্ত জরুরি

ওলী-আল্লাহগণের মতাদর্শ, সুফি দর্শন ও জশনে জুলুসের মারেফতি হাকিকত

সকল কামেল ওলী-আউলিয়া ও সুফি সাধকগণের আধ্যাত্মিক জীবনের মূল ভিত্তিই হলো- নূর নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর প্রতি সর্বোচ্চ আদব ও নিঃশর্ত ইশক বা ভালোবাসা। ওলী-আউলিয়াগণ সর্বদা দরবার শরীফে মিলাদ ও কিয়ামের মজলিস কায়েম করার খাস তাগিদ দেন। ওলীগণের বাতেনি নজরের উসিলায় আশেক মুরিদগণ যখন মিলাদ শরীফে দাঁড়িয়ে ‘ইয়া নবী সালামু আলাইকা’ বলে নূর নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর শানে দরুদ ও সালামের নূরের তোহফা আরজ করেন, তখন তাঁদের নফস সমস্ত কুপ্রবৃত্তি ও জিঞ্জির থেকে চিরতরে মুক্তি পেয়ে এক নির্মল আধ্যাত্মিক মাকামে পৌঁছায়। ওলী-আল্লাহদের কিতাব ও জীবনদর্শন আমাদের এই পরম শিক্ষাই দেয় যে- ঈদে মিলাদুন্নবী সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম কেবল একটি ঐতিহাসিক দিন নয়, বরং ইহা হলো ঈমানদারের কলব পরিষ্কার করার এবং নবীজি ﷺ’ এর রূহার্নী তাওয়াজ্জুহ হাসিল করার এক রাজকীয় মিলনমেলা। ‘জশনে জুলুসে ঈদে মিলাদুন্নবী ﷺ’-এর এই রাজকীয় আমল আশেকদের ঈমানকে আরও সতেজ ও শক্তিশালী করে তোলে

শেষ কথাঃ

পরিশেষে বলা যায়, জশনে জুলুসে ঈদে মিলাদুন্নবী ﷺ এবং ওলী-আল্লাহদের দেখানো সুন্নী মতাদর্শই হলো সিরাতুল মুস্তাকিমের একমাত্র রাজপথ। আজকের এই বস্তুবাদী ও ফেতনার যুগে বাতিল ওহাবী ও সালাফী ফেরকাদের বিভ্রান্তিকর বয়ান থেকে নিজের এবং নিজের পরিবারের ঈমান রক্ষা করা প্রত্যেকটি খাঁটি ঈমানদার মুসলমানের জন্য পরম ফরজ দায়িত্ব। আসুন, আমরা ওলী-আউলিয়াদের প্রতি মহব্বত রাখি, বাতিলদের সমস্ত মনগড়া ফতোয়াকে প্রত্যাখ্যান করি এবং নূর নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর ইশকে নিজের জীবনকে আল্লাহর রঙে রঙিন করি। এটিই একজন খাঁটি সুন্নী ঈমানদারের জীবনের চরম ও পরম সার্থকতা এবং ইহকাল ও পরকালে মুক্তির একমাত্র পাথেয়। মহান আল্লাহ রব্বুল আলামীন আমাদের সকলকে ওলী-আল্লাহদের উসিলায় ঈদে মিলাদুন্নবীর বাতেনি ফয়েজ নসীব করুন। আমীন।

Join WhatsApp

Join Now

Join Telegram

Join Now

1 thought on “জশনে জুলুসে ঈদে মিলাদুন্নবী ﷺ: সকল ঈদের সেরা ঈদ এবং বাতিল ফেরকার মুখোশ উন্মোচন।”

Leave a Comment