দয়াল নবী আপনার দরবারে আমি গোলাম হাজির হইয়াছি।
ইসলামের ইতিহাসে নবীগণের শুভ আগমন মানবজাতির জন্য এক মহান রহমত। আল্লাহ তাআলা তেনাদের মাধ্যমে মানুষকে সঠিক পথ দেখিয়েছেন এবং নানা মোজেজার মাধ্যমে সত্যের প্রমাণ দিয়েছেন।
কিন্তু সকল নবীগণের শ্রেষ্ঠ নবী, রহমাতুল্লিল আলামিন, নূর নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম-তিনি এমন এক নবী, যাঁর শুভ আগমন পুরো সৃষ্টি জগতের জন্য রহমত।
তেনার জীবন, তেনার চরিত্র, তেনার বাণী-সবকিছুই একেকটি জীবন্ত মোজেজা। আর পবিত্র কুরআন তেনার সেই চিরন্তন মোজেজা, যা আজও মানবজাতিকে হেদায়েতের পথে আহ্বান জানায়।
তাই প্রিয় নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর মোজেজা নিয়ে আলোচনা মানে শুধু অলৌকিক ঘটনা বলা নয়, বরং তেনার মহত্ত্ব ও অনুপম মর্যাদাকে উপলব্ধি করা।
নবীজির প্রধান মোজেজা – কুরআন
সমস্ত নবীগণের মধ্যে শ্রেষ্ঠ, রহমাতুল্লিল আলামিন, নূর নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সর্বশ্রেষ্ঠ ও চিরন্তন মোজেজা হলো পবিত্র কুরআন শরীফ।
এই কুরআন কোনো সাধারণ গ্রন্থ নয়-এটি আল্লাহ তাআলার কালাম, যা প্রিয় নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর পবিত্র হৃদয়ে নাযিল হয়েছে সমগ্র মানবজাতির হেদায়েতের জন্য।
যুগের পর যুগ অতিবাহিত হলেও কুরআনের একটি বর্ণও পরিবর্তিত হয়নি। এটি আজও তেমনি জীবন্ত, তেমনি প্রভাবশালী, যেমনটি নাযিলের সময় ছিল।
নূর নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর পবিত্র জীবন যেমন সমগ্র মানবজাতির জন্য হেদায়েতের উজ্জ্বল প্রদীপ, তেমনি কুরআন শরীফও তেনার উপর নাযিলকৃত এক মহান ও চিরন্তন মোজেজা-যা মানুষকে অন্ধকার থেকে আলোয়, ভ্রান্তি থেকে সত্যের পথে পরিচালিত করে।
অতএব, পবিত্র কুরআন শুধু একটি মোজেজা নয়-
এটি নূর নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর অনুপম মর্যাদা, তেনার সত্যতার সুস্পষ্ট দলিল।
কুরআনের অলৌকিকতা
পবিত্র কুরআন শরীফ হলো নূর নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর উপর নাযিলকৃত এক মহান ও চিরন্তন মোজেজা। এর অলৌকিকতা এমন গভীর ও বিস্তৃত, যা যুগে যুগে মানুষের অন্তরকে আলোকিত করে এসেছে।
১. অক্ষুণ্ণতা (অবিকৃত সংরক্ষণ):
পবিত্র কুরআনের সবচেয়ে বড় অলৌকিকতা হলো-এটি আজ পর্যন্ত অবিকৃত রয়েছে। আল্লাহ তাআলা নিজেই এর সংরক্ষণের দায়িত্ব নিয়েছেন (সুরা হিজর, আয়াত ১৫:৯)। তাই কুরআনের একটি বর্ণও পরিবর্তিত হয়নি। এটি প্রমাণ করে-এটি সেই মহান কালাম, যা প্রিয় নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর উপর নাযিল হয়েছিল।
২. ভাষার অনন্য সৌন্দর্য:
কুরআনের ভাষা এমন মাধুর্যময়, প্রাঞ্জল ও গভীর যে, তা মানুষের হৃদয়কে স্পর্শ করে। এর প্রতিটি আয়াতে রয়েছে এক অপূর্ব ছন্দ, সুর ও অর্থের গভীরতা-যা মানব ভাষার সীমাকে অতিক্রম করেছে। এ সৌন্দর্যই প্রমাণ করে, এটি কোনো মানুষের রচনা নয়; বরং নূর নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর মাধ্যমে প্রেরিত আল্লাহর কালাম।
৩. সৃষ্টি ও প্রকৃতির নিদর্শন:
কুরআনে আকাশ, পৃথিবী, মানুষ ও সৃষ্টিজগতের নানা রহস্যময় দিক তুলে ধরা হয়েছে। এসব নিদর্শন মানুষকে চিন্তা করতে শেখায় এবং স্রষ্টার মহত্ত্ব উপলব্ধি করায়। এতে বোঝা যায়-প্রিয় নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম এমন এক বার্তা এনেছেন, যা সমগ্র সৃষ্টির জন্য দিশারী।
৪. অজানা বিষয়ের সংবাদ:
পবিত্র কুরআনে বহু অদৃশ্য ও অজানা বিষয়ের সংবাদ রহমাতুল্লিল আলামিন সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম উম্মতের সামনে প্রকাশ করেছেন-যা তেনার যুগের মানুষের পক্ষে জানা কোনোভাবেই সম্ভব ছিল না।
যেমন-
রোমান সাম্রাজ্যের পরাজয়ের পর পুনরায় বিজয়ের ভবিষ্যদ্বাণী (সুরা রূম), মানুষের সৃষ্টি ধাপে ধাপে গঠিত হওয়ার বর্ণনা, আকাশমণ্ডল ও পৃথিবীর বিস্তৃত রহস্য, এমনকি মানব হৃদয় ও নফসের গভীর অবস্থার কথাও কুরআনে সুস্পষ্টভাবে তুলে ধরা হয়েছে।
কুরআনের বার্তা
কুরআন শুধু অলৌকিক গ্রন্থ নয়, এটি মানবজীবনের জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ নির্দেশিকা। এর মধ্যে রয়েছে:
আল্লাহর একত্ববাদ: কুরআন সর্বত্র আল্লাহর একত্বের কথা প্রচার করেছে এবং মানুষের উদ্দেশ্যে একমাত্র আল্লাহর প্রতি পূর্ণ আনুগত্যের আহ্বান জানিয়েছে।
নৈতিক শিক্ষা: কুরআনে মানুষের নৈতিক চরিত্র গঠনের জন্য নির্দেশনা রয়েছে, যেমন সততা, ইমান, দয়া, সহানুভূতি এবং অন্যদের সাহায্য করা।
আধ্যাত্মিক উন্নতি: কুরআন মানুষের আধ্যাত্মিক উন্নতির পথও দেখায়, যার মাধ্যমে একজন মুসলিম আল্লাহর নিকট আরও কাছে যেতে পারে।
সামাজিক ন্যায্যতা: কুরআনে সমাজের মধ্যে ন্যায্যতা এবং মানবাধিকার রক্ষা করার জন্য বিভিন্ন নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে, যা সমাজে শান্তি এবং সাম্য প্রতিষ্ঠা করতে সহায়ক।
নবীজির অন্যান্য মোজেজা
দয়াল নবীজি হজরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর অন্যান্য কিছু মোজেজাও ছিল, যেমন:
শাহাদাতের পাথর: দয়াল নবীজি হজরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সময়ে কিছু অলৌকিক ঘটনা ঘটেছিল, যার মধ্যে ছিল শাহাদাতের পাথরের কথা। নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সময়ে কিছু পাথর কথা বলেছিল এবং মানুষকে ইসলামের পথে আহ্বান করেছিল।
আঙুল মোবারক দিয়ে পানি বের হওয়া: দয়াল নবীজি হজরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সময় একটি অলৌকিক ঘটনা ঘটেছিল, যখন তিনি তেনার আঙুল মোবারক দিয়ে পানি বের করেছিলেন, যা মুসলিম সেনাদের জন্য পানীয় হয়ে উঠেছিল।
মিরাজ: দয়াল নবীজি হজরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর মিরাজ ছিল একটি অসাধারণ অলৌকিক ঘটনা, যেখানে তিনি আল্লাহর সঙ্গে সরাসরি সাক্ষাৎ করেছিলেন। এটি ইসলামের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা।
পরিশেষে
দয়াল নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর প্রধান মোজেজা হলো কুরআন। কুরআন আজও অক্ষুণ্ণ রয়েছে এবং বিশ্বের সকল মুসলিমদের জন্য আল্লাহর নির্দেশনার এক চিরকালীন উৎস হিসেবে রয়েছে। কুরআনের অলৌকিকতা, বৈজ্ঞানিক ও নৈতিক দিক, ভাষাগত সৌন্দর্য এবং মানবতার জন্য এর শিক্ষাগুলি এই গ্রন্থকে ইসলামের প্রধান মোজেজা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
আল্লাহর এই মহা উপহারকে সঠিকভাবে বুঝতে এবং অনুসরণ করতে পারলে একজন মুসলিম জীবনে সাফল্য এবং আধ্যাত্মিক উন্নতি অর্জন করতে পারবেন।








