দয়াল নবী আপনার দরবারে আমি গোলাম হাজির হইয়াছি।
নূর নবীজির মুজিযা- রাহমাতাল্লিল আলামিন নূর নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর প্রতিটি কদম মোবারকই ছিল মোজেজার এক জীবন্ত মহাসমুদ্র। তেনার পবিত্র হাত মোবারকের ইশারায় চন্দ্র-সূর্য, গ্রহ-নক্ষত্রও নিজেদের গতিপথ পরিবর্তন করেছে। ইসলামের ইতিহাসে এমন একটি অবিশ্বাস্য, রোমাঞ্চকর ও হৃদয়স্পর্শী অলৌকিক ঘটনা রয়েছে, যা চাক্ষুষ দেখে মক্কার কাফেরদের অহংকার চূর্ণ হয়ে গিয়েছিল। সেটি হলো ভরা পূর্ণিমার রাতে আকাশের বিশাল চাঁদ এক ইশারায় দুই টুকরো হয়ে যাওয়ার জ্যান্ত মুজিযা। আজকের পোস্টে আমরা জানবো সেই ঐতিহাসিক ঘটনা এবং আধুনিক বিজ্ঞানের আলোকে এর অবিশ্বাস্য সত্যতা, যা শুনলে যেকোনো ঈমানদারের অন্তর নূর নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর প্রেমে ব্যাকুল হয়ে উঠবে।
মক্কার কাফেরদের কঠিন শর্ত ও অন্ধকার রাত
ঘটনাটি হিজরতের আগের। মক্কার কাফেররা দিন দিন নূর নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নবুওয়াতকে অস্বীকার করার জন্য নিত্যনতুন বাহানা খুঁজছিল। এক ভরা পূর্ণিমার রাতে আবু জাহেলসহ মক্কার বড় বড় কাফের নেতারা নূর নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর দরবারে হাজির হলো। তারা কুটিল হাস্যে বলল, “হে মুহাম্মাদ! তুমি যদি সত্যিই আল্লাহর নবী হয়ে থাকো, তবে আকাশের এই পূর্ণ চাঁদকে আমাদের সামনে দুই টুকরো করে দেখাও। যদি পারো, তবেই আমরা ঈমান আনবো।” কাফেররা ভেবেছিল, জমিনের বুকে জাদুটোনা করা গেলেও আকাশের চাঁদের ওপর তো কারো হাত নেই! সুতরাং, এবার তারা নূর নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে পরাস্ত করতে পারবে।
নূরানী আঙুলের এক ইশারা এবং অলৌকিক দৃশ্য
দয়ার সাগর নূর নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম বিন্দুমাত্র বিচলিত হলেন না। তিনি পরম শান্তভাবে আকাশের উজ্জ্বল চাঁদের দিকে তাকালেন। রাতটি ছিল চতুর্দশীর, চারিদিকের আলোতে মরুভূমি ঝলমল করছিল। নূর নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম পবিত্র শাহাদাত আঙুল মোবারক দিয়ে আকাশের চাঁদের দিকে একটি মৃদু ইশারা করলেন।
সাথে সাথে ঘটে গেল সৃষ্টির ইতিহাসের সবচেয়ে বড় এবং রোমহর্ষক অলৌকিক ঘটনা! মহান আল্লাহর কুদরতে আকাশের সেই বিশাল চাঁদটি এক সেকেন্ডের মধ্যে মাঝখান থেকে চিরে গিয়ে দুটি আলাদা টুকরো হয়ে গেল। শুধু তাই নয়, চাঁদের এক টুকরো জাবালে আবি কুবাইস পর্বতের ওপর এবং অন্য টুকরোটি জাবালে কুয়াইকিআন পর্বতের ওপর গিয়ে স্থির হলো। দুই টুকরোর মাঝখান দিয়ে সাহাবিরা চাক্ষুষ আকাশ দেখতে পাচ্ছিলেন। নূর নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম তখন বললেন, “হে আবু সালামা! হে ইবনে মাসউদ! তোমরা সাক্ষী থাকো!” কাফেররা চোখ কচলিয়ে বারবার দেখল, কিন্তু সত্যকে আড়াল করার কোনো উপায় ছিল না। মরুভূমির অন্ধকার রাত তখন নূর নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নবুওয়াতের আলোতে আলোকিত হয়ে গিয়েছিল।
কাফেরদের বাহানা ও ইতিহাসের অকাট্য দলিল
এই জ্যান্ত মুজিযা দেখার পরও আবু জাহেল বলল, “এটি চোখের জাদু!” কিন্তু অন্য কাফেররা বলল, “জাদু হলে তা শুধু আমাদের ওপর হতো। মক্কার বাইরে থেকে যারা সফরে আসছে, তারা ফিরে আসুক। তাদের জিজ্ঞেস করলেই সত্য জানা যাবে।” কয়েকদিন পর যখন দূর-দূরান্ত থেকে কাফেলাগুলো মক্কায় ফিরল, তারা সবাই একবাক্যে সাক্ষ্য দিল যে, হ্যাঁ, অমুক রাতে আমরাও সফরকালে আকাশ চিরে চাঁদ দুই টুকরো হতে দেখেছি। শুধু আরব নয়, ভারতের প্রাচীন ইতিহাসে ‘চক্রবর্তী ফরমাশ’ নামক মালবারের এক রাজার কিতাবেও এই রাতে চাঁদ দ্বিখণ্ডিত হওয়ার এবং তা দেখে রাজার আরব অভিমুখে সফরের সত্য ইতিহাস লিখিত আছে।
আধুনিক বিজ্ঞানের সত্যতা ও নাসার চাঞ্চল্যকর আবিষ্কার
১৪০০ বছর আগের এই অলৌকিক ঘটনাকে একসময় আধুনিক বিজ্ঞান রূপকথা মনে করত। কিন্তু মহাকাশ গবেষণার আধুনিক যুগে বিজ্ঞান যখন চাঁদের বুকে পা রাখল, তখন সত্যের আলো আর চেপে রাখা গেল না। মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা ‘নাসা’ যখন অ্যাপোলো মিশনের মাধ্যমে চাঁদের উচ্চমানের ছবি তুলল, তখন বিজ্ঞানীরা চাঁদের একদম মাঝখানে একটি বিশাল ফাটল চাক্ষুষ দেখতে পান। এই ফাটলটিকে বিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় ‘রিলি’।
বিজ্ঞানীরা পরীক্ষা করে স্তব্ধ হয়ে যান যে, এই ফাটলটি চাঁদের এক প্রান্ত থেকে শুরু হয়ে অন্য প্রান্ত পর্যন্ত বিস্তৃত এবং এটি কোনো আগ্নেয়গিরি বা সাধারণ চ্যুতির কারণে হয়নি। বরং এটি চাক্ষুষ প্রমাণ করে যে, কোনো এক অতীতে এই গ্রহটি মাঝখান থেকে সম্পূর্ণ দুই টুকরো হয়ে গিয়েছিল এবং পরবর্তীতে তা আবার জোড়া লেগেছে। নূর নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর আঙুল মোবারকের সেই ইশারা আজ চাঁদের বুকে চিরস্থায়ী দাগ হয়ে নবুওয়াতের সত্যতা ঘোষণা করছে।
শেষ কথা
নূর নবীজির মুজিযা- মহাবিশ্বের প্রতিটি সৃষ্টির বুকে এক অম্লান সত্যের দলিল। আকাশের চাঁদ যেভাবে নূর নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর ইশারায় নিজের বুক চিরে সাক্ষ্য দিয়েছিল, তা কিয়ামত পর্যন্ত আসা প্রতিটি পথহারা মানুষের ঈমানকে তাজা রাখার জন্য যথেষ্ট। মহান আল্লাহ আমাদের সবাইকে নূর নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর প্রতি গভীর ভক্তি, অন্তহীন ভালোবাসা এবং সহীহ ঈমানের ওপর আজীবন অবিচল থাকার তৌফিক দান করুন। আমীন।








