নূর নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর মুজিযা: মালিকের বিরুদ্ধে উটের নালিশ!

নূর নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর মুজিযা ইসলামের ইতিহাসে এক পরম বিস্ময়। মদীনার খেজুর বাগানে একটি বোবা উটের অশ্রু বিসর্জন এবং নিজের মালিকের নিষ্ঠুর অত্যাচারের বিরুদ্ধে নালিশ করার অলৌকিক ঘটনাটি পশুর অধিকার, আধুনিক জীব-মনস্তত্ত্ব ও কুদরতি ইনসাফের এক জ্যান্ত ও অকাট্য দলিল।

August 4, 2026 6:37 PM
নূর নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর মুজিযা উটের নালিশ
---Advertisement---

দয়াল নবী আপনার দরবারে আমি গোলাম হাজির হইয়াছি।

নূর নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর মুজিযা ঈমানদারের অন্তরে ইশকের জোয়ার সৃষ্টি করে এবং সাধারণ মানুষের চিন্তাজগতকে এক পরম বিস্ময়ে স্তব্ধ করে দেয়। সাইয়্যিদুল মুরসালীন নূর নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম কেবল মানুষের হেদায়েতের জন্যই দুনিয়াতে শুভ আগমন করেননি; বরং তিনি হলেন সমগ্র সৃষ্টিজগতের জন্য পরম রহমত। মহাবিশ্বের গাছপালা, পাহাড়-পর্বত, জড় পদার্থ থেকে শুরু করে বোবা পশুপাখিও চেনে যে তিনিই হলেন রাহমাতুল্লিল আলামীন

এক আনসারী সাহাবীর একটি বোবা উটের অশ্রু বিসর্জন এবং নিজের মালিকের নিষ্ঠুর অত্যাচারের বিরুদ্ধে সরাসরি নূর নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর দরবারে হাজির হয়ে নালিশ করার অলৌকিক ঘটনাটি ঈমানদারের অন্তরে বাতেনি নূর বৃদ্ধি করে, তেমনই আধুনিক জীব-মনস্তত্ত্ব ও পশুর অধিকারের বৈজ্ঞানিক সমীকরণকেও এক পরম বিস্ময়ের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয়, যার পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ নিচে আলোচনা করা হলো

সমগ্র সৃষ্টির রহমত: নূর নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর দরবারে বোবা পশুর আশ্রয়প্রার্থনা

নূর নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম হলেন আল্লাহর জাতি নূরের জ্যেতি। সৃষ্টির আদি কণা থেকে শুরু করে এই মহাবিশ্বের প্রতিটি জীব তেনার বাতেনি তাওয়াজ্জুহ এবং কুদরতি পরশে সচল রয়েছে। যখন কোনো সৃষ্টির ওপর জাগতিক কোনো জুলুম বা অত্যাচার সীমা লঙ্ঘন করে, তখন সেই বোবা সৃষ্টিও তেনার রূহার্নী দরবারে সান্ত্বনা ও বাতেনি আশ্রয় খুঁজে পায়। মদীনার পবিত্র জীবনে ঘটে যাওয়া এই উটের অলৌকিক নালিশের ঘটনাটি প্রমাণ করে যে, বোবা পশুপাখিরাও তেনাকে নিজেদের একমাত্র ত্রাণকর্তা এবং পরম দয়ালু বিচারক হিসেবে মনেন। পার্থিব লজিক ও যান্ত্রিক বুদ্ধি যেখানে এসে থমকে দাঁড়ায়, নূর নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর মুজিযা ঠিক সেখান থেকেই শুরু হয়।

মালিকের বিরুদ্ধে উটের নালিশ ও অলৌকিক রোদনের ঘটনা

ইসলামের প্রামাণ্য ইতিহাস ও বিশুদ্ধ হাদিস গ্রন্থের বর্ণনা অনুযায়ী, একদিন নূর নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম কতিপয় সাহাবিদের সাথে নিয়ে মদীনার একটি আনসারী সাহাবীর খেজুর বাগানের ভেতর প্রবেশ করলেন। সেই বাগানের এক কোণায় একটি উট বাঁধা ছিল, যা অত্যন্ত হিংস্র ও রাগান্বিত হয়ে উঠেছিল এবং তার কাছাকাছি কোনো মানুষের যাওয়ার সাধ্য ছিল না। কিন্তু যখনই নূর নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম সেই বাগানে কদম মোবারক রাখলেন, অমনি এক পরম অলৌকিক ও অবিশ্বাস্য দৃশ্যের অবতারণা হলো। সেই হিংস্র উটটি তেনাকে দেখামাত্রই সমস্ত রাগ ভুলে এক শান্ত ও অনুগত সৃষ্টিতে পরিণত হলো এবং এক দৌড়ে এসে তেনার পবিত্র কদম মোবারকে সিজদাবনত হয়ে নিজের মাথাটি অর্পণ করল।

উপস্থিত সাহাবায়ে কেরাম পরম বিস্ময়ে চাক্ষুষ দেখলেন যে, উটটির দুই চোখ বেয়ে অঝোরে অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে এবং সে এক বুক কান্না নিয়ে নূর নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর পবিত্র চরণে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে। সে যেন জ্যান্ত মানুষের মতো বাকশক্তি লাভ করে নিজের বাতেনি ভাষায় তেনার দরবারে এক পরম করুণ আর্জি পেশ করছে। নূর নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম পরম মমতায় উটটির কুঁজ এবং কানের পেছনের অংশ মোবারক নিজের কুদরতি হাত দিয়ে মুছে দিলেন, যা পাওয়া মাত্রই উটটি শান্ত হয়ে গেল এবং তার ক্রন্দন থেমে গেল।

কুদরতি আদালত ও উটের মালিককে তলব

উটটিকে শান্ত করার পর, নূর নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাহাবিদের দিকে তাকালেন এবং এরশাদ করলেন, “এই উটের মালিক কে? এই উটটি কার?”  তখন আনসারদের এক যুবক সাহাবী সশরীরে সামনে এগিয়ে এলেন এবং হাত জোড় করে আরজ করলেন, ” ইয়া রাসূল আল্লাহ ! এই উটটি আমার।” নূর নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম তখন সেই মালিককে লক্ষ্য করে এক পরম কুদরতি ঘোষণা দিলেন। তিনি এরশাদ করলেন, “তুমি কি এই বোবা পশুর ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় করো না, যিনি তোমাকে এর মালিক বানিয়েছেন? এই উটটি আমার কাছে নালিশ করেছে যে-তুমি তাকে দিয়ে দিনরাত কঠোর খাটুনি করাও, তার সাধ্যের বাইরে ভারী বোঝাবহন করাও, কিন্তু তাকে ঠিকমতো পর্যাপ্ত খাবার দাও না এবং ক্ষুধার্থ রাখো!” নূর নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর এই অকাট্য বাণী শুনে সেই মালিক লজ্জিত হলেন এবং তেনার কদমে ক্ষমা চেয়ে ভবিষ্যতে পশুর প্রতি সদয় হওয়ার দৃঢ় অঙ্গীকার ব্যক্ত করলেন।

সিহাহ সিত্তাহর আলোয় অকাট্য হাদিস ও নির্ভরযোগ্য দলিলসমূহ

নূর নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর এই বিস্ময়কর মুজিযাটি ইসলামের প্রধান প্রধান বিশুদ্ধ হাদিস গ্রন্থে অত্যন্ত উচ্চ ও নির্ভরযোগ্য সনদে সংরক্ষিত রয়েছে। পাঠকদের ঈমানী দৃঢ়তার জন্য নিচে দলিলসমূহ নম্বরসহ তুলে ধরা হলো:

সুনানে আবু দাউদ শরীফের বিশুদ্ধ বর্ণনা

হযরত আবদুল্লাহ ইবনে জাফর রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত হয়েছে, নূর নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম আনসারদের এক বাগানে প্রবেশ করলে একটি উট তেনাকে দেখে কাঁদতে লাগল  এবং তার চোখ থেকেও অশ্রু গড়িয়ে পড়ে। নূর নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম তেনার কুদরতি হাত মোবারক দিয়ে তার মাথার পেছনের অংশ মুছে দেন এবং উটের নালিশের ভিত্তিতে তার মালিককে ডেকে সাবধান করেন।

দলিল:  সুনানে আবু দাউদ, হাদিস নম্বর- ২৫৪৯ (অধ্যায়: জিহাদ, অনুচ্ছেদ: পশুর ওপর সাধ্যের অতীত বোঝা না চাপানো)।

মুসনাদে আহমদের অকাট্য প্রমাণ

ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল রহমাতুল্লাহি আলাইহি তেনার জগৎবিখ্যাত হাদিস গ্রন্থে এই অলৌকিক ঘটনাটি আরও বিস্তারিত সনদে চাক্ষুষ উল্লেখ করেছেন, যেখানে পশুর অধিকার রক্ষায় নূর নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর এই কুদরতি তাওয়াজ্জুহকে তেনার নবুওয়াত ও রেসালাতের এক পরম জ্যান্ত মুজিযা হিসেবে গণ্য করেছেন।

দলিল : মুসনাদে আহমদ, হাদিস নম্বর- ১৭৪৬।

আধুনিক জীব-মনস্তত্ত্ব ও পশুর অধিকারের বৈজ্ঞানিক বিস্ময়

চৌদ্দশত বছর আগে ঘটে যাওয়া নূর নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর এই পরম অলৌকিক মুজিযাটি বর্তমান একবিংশ শতাব্দীর আধুনিক বিজ্ঞান, পশুর অধিকার (Animal Rights) এবং জীব-মনস্তত্ত্ব বিজ্ঞানীদের গভীরতম গবেষণার এক পরম খোরাক। বর্তমান যুগ বিজ্ঞান ও সভ্যতার চরম উৎকর্ষের কথা বললেও, চৌদ্দশত বছর আগে যখন পৃথিবীতে মানুষেরই কোনো মৌলিক অধিকার ছিল না, তখন নূর নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম একটি বোবা পশুর চোখের অশ্রু দেখে তার মনিবকে ডেকে কুদরতি ইনসাফ ও বাতেনি পরম প্রশান্তি প্রদান করেছিলেন।

কোষের অনুভূতি ও শক্তির রূপান্তর

আধুনিক বিজ্ঞান আজ স্বীকার করতে বাধ্য হচ্ছে যে, প্রাণীদের শরীরেও মানুষের মতোই তীব্র মানসিক কষ্ট, অবহেলা এবং ক্ষুধা স্মৃতি সংরক্ষিত হয়, যাকে বিজ্ঞানের ভাষায় কোষীয় অনুভূতি বলা চলে। উটটির মগজ এবং শরীরের কোষগুলো তার মালিকের দীর্ঘদিনের অত্যাচার নিজের স্মৃতিতে ধারণ করে রেখেছিল। যখনই নূর নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম আনসারী সাহাবীর খেজুর বাগানের ভেতর প্রবেশ করলেন তেনার নূরানী কদম মোবারক রাখার সাথে সাথেই উটের সেই নিষ্ক্রিয় কোষগুলোর ভেতরের বাতেনি শক্তি এক অলৌকিক তরঙ্গে জাগ্রত হয়ে উঠল। ফলে সেই বোবা পশুটি শব্দের তরঙ্গে রোদন করে স্বয়ং আল্লাহর হাবীব নূর নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর  চরণে নিজের দুঃখের কথা প্রকাশ করে দিল।

হক্কানী ওলী-আউলিয়াগণের আধ্যাত্মিক দর্শন: নূর নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর মুজিযা ও ইশকের হাকিকত

কামেল ওলী ও গাউস-কুতুবগণের বাতেনি তাহকীক অনুযায়ী, নূর নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর এই জগতকাঁপানো মুজিযাটি কেবল শুষ্ক কোনো ঐতিহাসিক ঘটনামাত্র নয়; বরং এটি হলো সমগ্র সৃষ্টিজগতের ওপর স্রষ্টার প্রিয়তম হাবীবের রূহার্নী আধিপত্য ও নবুওয়াতের এক অনন্ত প্রকাশ। সুফি সাধকগণের আধ্যাত্মিক উন্মোচন বা ‘কাশফ’ তত্ত্ব অনুযায়ী, মহাবিশ্বের প্রতিটি ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র পরমাণু বা বাতেনি কণা একে অপরের সাথে এক রূহার্নী তারে সংযুক্ত থাকে। নূর নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর পবিত্র হাত মোবারকের কুদরতি স্পর্শ যখনই কোনো মজলুম বা আশেক সৃষ্টির ওপর পড়ে, অমনি তেনার বাতেনি দৃষ্টি বা ‘তাওয়াজ্জুহ’-এর পরম ছোঁয়ায় সেই সৃষ্টির ভেতরের সমস্ত জমানো কষ্ট এক নিমেষে রূহার্নী শান্তিতে রূপান্তর হয়ে যায়। মদীনার সেই বোবা পশুর  নালিশ ও কদমে মাথা অর্পণ প্রমাণ করে যে- আল্লাহর হাবীব নূর নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর পবিত্র সংস্পর্শে আসলে শুধু পশুর দুঃখই দূর হয় না, বরং তেনাদের রূহার্নী ফয়েজে আশেকদের মৃত কলব জাগ্রত হয় এবং অন্ধ অন্তরের বাতেনি চোখও এক সেকেন্ডে খোদার নূরে আলোকিত হয়ে ওঠে।

পরিশেষে: ঈমানদারের ঈমানী আলো ও তাজকিয়াতুন নাফসের শিক্ষা

পরিশেষে বলা যায়, মদীনার খেজুর বাগানে ঘটে যাওয়া এই বোবা উটের অলৌকিক নালিশ ও কুদরতি ইনসাফ পাওয়ার ঘটনাটি কেয়ামত পর্যন্ত প্রত্যেক ঈমানদারের অন্তরে ঈমানী আলো প্রস্ফুটিত করার এক মহিমান্বিত আলোর দিশারী। এই মুজিযা আমাদের এই পরম শিক্ষাই দেয় যে- একটি বোবা পশু হয়েও সে যেভাবে নূর নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে চিনে তেনার কদম মোবারকে নিজের মাথাটি সঁপে দিয়েছিল, ঠিক তেমনি একজন ঈমানদারের তাজকিয়াতুন নাফস বা আত্মশুদ্ধি অর্জনের মূল চাবিকাঠিই হলো নিজের নফস, অহংকার এবং জাগতিক বুদ্ধিকে আল্লাহর হাবীবের নূর নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নূরানী কদমে শর্তহীনভাবে কোরবানি করা

আধুনিক বিজ্ঞান ও বস্তুবাদের এই চরম উৎকর্ষের যুগেও নূর নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর প্রতিটি কুদরতি পরশ মানবজাতির ঘুমন্ত ও মৃত কলব জাগ্রত করার এবং বাতেনি রূহার্নী প্রশান্তি লাভ করার এক জ্যান্ত মাধ্যম হিসেবে বিদ্যমান থাকবে। আসুন, আমরা তেনার প্রতি একশত ভাগ খাঁটি ইশক ও মহব্বত পোষণ করি এবং তেনার জ্যান্ত মুজিযাসমূহের ওপর দৃঢ় বিশ্বাস রেখে নিজেদের অন্তরের অন্ধত্ব দূর করে খাঁটি ঈমানদার হিসেবে জীবন গড়ে তুলি

Join WhatsApp

Join Now

Join Telegram

Join Now

Leave a Comment