দয়াল নবী আপনার দরবারে আমি গোলাম হাজির হইয়াছি।
আল্লামা ইমাম জালালুদ্দীন সুয়ুতীর অলৌকিক কারামত: মাত্র ২৭ কদমে মিশর থেকে মক্কা শরীফে পৌঁছে যাওয়ার এই বিস্ময়কর ঘটনাটি তাসাউউফ ও ওলীগণের ইতিহাসের এক পরম অলৌকিক নিদর্শন। আল্লামা ইমাম জালালুদ্দীন সুয়ুতী রহমাতুল্লাহি আলাইহি মিশরের কায়রো শহরে জন্মগ্রহণ করেন, যিনি ছিলেন ইসলামের এক মহান মুজাদ্দিদ ও ওলী। তেনার এক বিশ্বস্ত খাদেম ছিলেন, নাম তার মুহাম্মদ ইবনে আলী হাব্বাক। আজ আমরা সুফি সাহিত্যের অকাট্য ইতিহাসের আলোকে জানবো ইসলামের এই মহান ইমামের জিন্দা ইতিহাস এবং আল্লামা ইমাম জালালুদ্দীন সুয়ুতীর অলৌকিক কারামত এর পেছনের মূল ঐতিহাসিক সত্যতা আসলে কী।
নূর নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লামকে জাগ্রত অবস্থায় দর্শন
ইসলামের ইতিহাসে আল্লামা ইমাম জালালুদ্দীন সুয়ুতী রহমাতুল্লাহি আলাইহি এক অনন্য মর্যাদার অধিকারী ছিলেন। তিনি ৭৫ বার নূর নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লামকে সরাসরি জাগ্রত অবস্থায় সশরীরে দেখার সৌভাগ্য লাভ করেছিলেন। শুধু তাই নয়, তেনি জিন্দা অবস্থায় সরাসরি নূর নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর পবিত্র মুখ মোবারক থেকে সরাসরি হাদিস জিজ্ঞেস করে তেনারি উত্তরের পরম সৌভাগ্য লাভ করেছেন, যা তেনার উচ্চ বেলায়েত ও রূহের মারফতি ক্ষমতার এক অনন্য অকাট্য দলিল।
খাদেমের সাথে দুপুরের খাবারের পর অলৌকিক সফর
আল্লামা ইমাম জালালুদ্দীন সুয়ুতী রহমাতুল্লাহি আলাইহি-এর একজন খাদেম ছিলেন, নাম তার মুহাম্মদ ইবনে আলী হাব্বাক। একদিন দুপুরে খাবারের পর আল্লামা ইমাম জালালুদ্দীন সুয়ুতী রহমাতুল্লাহি আলাইহি বললেন, “আজ আসরের সালাত তোমাকে মক্কা শরীফে পড়ার ব্যবস্থা করবো।” মুহাম্মদ ইবনে আলী হাব্বাক কথাটি শুনেই বললেন, “আলহামদুলিল্লাহ।”
মাত্র ২৭ কদমে মক্কা শরীফে আগমন
আল্লামা ইমাম জালালুদ্দীন সুয়ুতী রহমাতুল্লাহি আলাইহি বললেন, “তাহলে তোমার চোখ বন্ধ করো।” মুহাম্মদ ইবনে আলী হাব্বাক চোখ বন্ধ করলেন। আল্লামা ইমাম জালালুদ্দীন সুয়ুতী রহমাতুল্লাহি আলাইহি মুহাম্মদ ইবনে আলী হাব্বাকের হাত ধরে প্রায় ২৭ কদম সামনে অগ্রসর হলেন। তারপর তিনি বললেন, “চোখ খোল।” মুহাম্মদ ইবনে আলী হাব্বাক চোখ খুলতেই দেখলেন মিশরের কায়রো থেকে হাজার মাইলের পথ পাড়ি দিয়ে সরাসরি পবিত্র মক্কা শরীফের হেরেম শরীফে এসে দাঁড়িয়ে আছেন।
এরপর তারা কাবা শরীফে তাওয়াফ করলেন, পবিত্র জমজমের পানি পান করলেন এবং আসরের সালাত আদায় করলেন। মুহাম্মদ ইবনে আলী হাব্বাক দেখলেন হেরেমের আশেপাশে তাদের পরিচিত মিশরের অনেক লোক রয়েছে, কিন্তু তারা তাদের চিনতে পারেনি। আল্লামা ইমাম জালালুদ্দীন সুয়ুতী রহমাতুল্লাহি আলাইহি মুহাম্মদ ইবনে আলী হাব্বাককে বললেন, “তুমি ইচ্ছে করলে আমার সঙ্গেই যেতে পারো অথবা হাজীদের সঙ্গে চলে এসো।”
মুহাম্মদ ইবনে আলী হাব্বাক বললেন, “আপনার সঙ্গেই যাব।” সুফি পরিভাষায় ওলীগণের এই চোখের পলকে হাজার মাইলের পথ পাড়ি দেওয়ার অলৌকিক ক্ষমতাকে “তৈয়ুল আরদ” (Tayy al-Ard) বলা হয়।
একই পদ্ধতিতে মিশরে প্রত্যাবর্তন
তারপর তেনারা রওনা হলেন। মক্কা শরীফের গেটে পৌঁছালে আল্লামা ইমাম জালালুদ্দীন সুয়ুতী রহমাতুল্লাহি আলাইহি মুহাম্মদ ইবনে আলী হাব্বাককে বললেন, “তোমার চোখ বন্ধ করো।” মুহাম্মদ ইবনে আলী হাব্বাক চোখ বন্ধ করলেন। ২৭ কদম অগ্রসর হওয়ার পর আল্লামা ইমাম জালালুদ্দীন সুয়ুতী রহমাতুল্লাহি আলাইহি বললেন, “এবার চোখ খোল।” মুহাম্মদ ইবনে আলী হাব্বাক চোখ খুলতেই দেখলেন তারা চোখের পলকে মিশরের কায়রোর তেনাদের সেই নিজের ঘরে ফিরে এসেছেন। এটি ছিল বেলায়েতের এক চরম প্রকাশ এবং ওলীগণের রূহের সুউচ্চ ক্ষমতার এক পরম জিন্দা নিদর্শন।
সুফি দর্শনে নাফসকে পবিত্র করার সুফল
সুফি সাধকগণের মতে, আল্লামা ইমাম জালালুদ্দীন সুয়ুতী রহমাতুল্লাহি আলাইহি তেনার এই জিন্দা কারামতটি আমাদের এক গভীর রূহানী শিক্ষা দেয়। ওলীগণ যখন কঠোর সাধনার মাধ্যমে তেনাদের নাফসকে পবিত্র করেন (তাজকিয়াতুন নাফস) এবং কলবকে সাফ করেন, তখন তেনাদের রূহ মাটি, বাতাস ও দূরত্বের জাগতিক সীমাবদ্ধতা থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত হয়ে আল্লাহর কুদরতের ইচ্ছার সাথে একাকার হয়ে যায়।
উপসংহার
পরিশেষে বলা যায়, আল্লামা ইমাম জালালুদ্দীন সুয়ুতীর অলৌকিক কারামত বা মিশর থেকে মাত্র ২৭ কদমে মক্কা শরীফ সফরের এই জিন্দা ইতিহাসটি আল্লাহর দরবারে তেনার সুউচ্চ আধ্যাত্মিক মর্যাদারই এক অনন্য প্রতীক। মহান আল্লাহ আমাদের সকলকে ওলী-আউলিয়াগণের এই পরম কারামত থেকে শিক্ষা নিয়ে নিজেদের নাফসকে পবিত্র করার এবং তেনাদের প্রতি সত্যিকারের আদব ও মহব্বত রাখার তৌফিক দান করুন। আমীন।
খাদেম মুহাম্মদ ইবনে আলী হাব্বাককে নিয়ে কাটানো ইমাম সুয়ুতীর এই অলৌকিক রূহানী কারামত নিয়ে আপনার মনে কি কোনো বিশেষ অনুভূতির সৃষ্টি হয়েছে? কমেন্ট করে আমাদের জানান এবং পোস্টটি ভালো লাগলে অবশ্যই শেয়ার করুন।










