দয়াল নবী আপনার দরবারে আমি গোলাম হাজির হইয়াছি।
হযরত কেবলা মাইজভাণ্ডারীর অলৌকিক কারামত এক পরম রহমতের ধারা, যা কেয়ামত পর্যন্ত ঈমানদারদের তৃষ্ণার্ত কলবকে আল্লাহর মহব্বতে এবং ঈমানের পবিত্র আলোয় সিক্ত করে যাবে। মহান আল্লাহ রব্বুল আলামীন যুগে যুগে এই ধরাধামে তাঁর খাস ও প্রিয় ওলী-আউলিয়াদের পাঠিয়েছেন পথহারা মানুষকে হেদায়েতের সরল ও সঠিক পথ দেখাতে এবং তেনাদের পবিত্র উসিলার মাধ্যমে মানবজাতিকে দুনিয়া ও আখেরাতের চিরন্তন কল্যাণ দান করতে। আহলে সুন্নাত ওয়াল জামায়াতের বিশুদ্ধ আকিদা, পবিত্র কুরআন ও সুন্নাহর অকাট্য দলিল এবং সুফি দর্শন অনুযায়ী, সর্বশক্তিমান আল্লাহ তাআলা তাঁর প্রিয় বন্ধুদের মাধ্যমে এমন কিছু অলৌকিক কারামত চাক্ষুষ প্রকাশ করেন, যা সাধারণ মানুষের যান্ত্রিক বুদ্ধির সম্পূর্ণ অতীত এবং যা প্রকৃত বিশ্বাসীদের ঈমানী শক্তিকে পাহাড়ের মতো দৃঢ়, অটল ও মজবুত করে তোলে। হযরত কেবলা মাইজভাণ্ডারীর অলৌকিক কারামত যা প্রকাশ করেছেন, তা বিশ্বজুড়ে আশেকদের কলবে এক অনন্য ইশকের জোয়ার সৃষ্টি করছে এবং করবে।
পুকুর পাড়ের ওজু ও বাতেনি জালালী হালতের নিগূঢ় রহস্য
মাইজভাণ্ডারী তরিকতের মহান প্রবর্তক গাউসুল আজম সৈয়দ আহমদ উল্লাহ মাইজভাণ্ডারী রহমাতুল্লাহি আলাইহি-এর আধ্যাত্মিক জীবনের এক বিস্ময়কর দিক হলো সৃষ্টির প্রতিটি স্তরের ওপর তেনার বাতেনি আধিপত্য। তেনার বাতেনি ‘তছরূফ’ বা আধ্যাত্মিক ক্ষমতা ছিল এতটাই প্রখর যে, তেনার একটি বাতেনি ইশারা মহান আল্লাহর হুকুমে প্রকৃতির হাজার বছরের সুপ্রতিষ্ঠিত নিয়মকেও এক নিমেষে পাল্টে দিতে পারত।
একদিন হযরত কেবলা পুকুর পাড়ে বসে ওজু করছিলেন। ওজু চলাকালীন হঠাৎ তিনি বাতেনি জালালী হালতে প্রচণ্ড গর্জে উঠে বললেন, “হারামজাদা তুই এখান হইতে দূর হস্ নাই!” এই বলেই তিনি নিজের হাতের ওজুর লোটাটি পুকুরের পানিতে সজোরে নিক্ষেপ করলেন। তখনো কিন্তু তেনার পবিত্র ওজু সমাপন বা শেষ হয় নাই। ওলীর এই আকস্মিক জালালী রূপ দেখে চারপাশের পরিবেশ স্তব্ধ হয়ে গেল। উপস্থিত খাদেমগণ পরম বিস্ময়ে তাড়াতাড়ি অন্য একটি লোটা এনে তেনাকে দিলেন। তিনি শান্তভাবে ওজু শেষ করে দারবার শরীফে চলে গেলেন।
এদিকে হযরত কেবলা মাইজভাণ্ডারীর অলৌকিক কারামত এর এই পরম দৃশ্য এবং ওজু করার সময় লোটা ফেলে দিয়েছেন চাক্ষুষ দেখে খাদেমগণ অবাক হলেন। ওলী-আল্লাহদের কার্যের নিগূঢ় রহস্য বোঝা সাধারণ মানুষের সীমিত বুদ্ধির বড়ই মুশকিল। খাদেমগণ পরম কৌতুহলে পুকুরের পানিতে নেমে হন্যে হয়ে সেই পিতলের ভারী লোটা তালাশ বা খোঁজ করতে লাগলেন।
কিন্তু অনেকক্ষণ ধরে পুকুরের তলদেশ চষে ফেলার পরও যখন লোটার কোনো সন্ধান পাওয়া গেল না, তখন তারা হতাশ চিত্তে পুকুর হতে উঠে এলেন। দরবারের প্রত্যেকেই গভীর চিন্তায় মগ্ন হলেন যে- হযরত কেবলা আজ ওজু রত অবস্থায় কাকে গালি দিলেন, কেনই বা লোটাটি পুকুরে নিক্ষেপ করলেন, আর পুকুরে এত খোঁজাখুঁজির পরেও সেই ভারী লোটাটি না পাওয়ার আসল রহস্য বা কারণই বা কী? এই রহস্য ভেদ করার ক্ষমতা সাধারণ মানুষের বুদ্ধির বাইরে ছিল।
দুই দিন পর দরবারে অলৌকিক লোটার আবির্ভাব ও কৌতূহল
এই রহস্যময় ঘটনার ঠিক দুই দিন পর, দরবার শরীফে এক অভূতপূর্ব ও জ্যান্ত দৃশ্যের অবতারণা হলো, যা উপস্থিত সকল মুরিদ ও আশেকদের অন্তরে এক নতুন ভক্তির আলো জ্বেলে দিয়েছিল। রাঙ্গুনিয়া নিবাসী আছমত আলী নামক হযরত কেবলার এক পরম ভক্ত দরবার শরীফে হাজির হলেন। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, তেনার হাতে ছিল কিছু নাস্তা এবং হযরত কেবলার পুকুরে নিক্ষেপ করা সেই হারিয়ে যাওয়া পবিত্র লোটাটি! তিনি পরম ভক্তিভরে হযরত কেবলার সামনে গিয়ে লোটা ও নাস্তাগুলো রাখলেন এবং কদমবুচি করে অনেকক্ষণ যাবত হযরত কেবলার পবিত্র কদমের কাছে দাঁড়িয়ে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগলেন। তেনার চোখের পানি ও এই অলৌকিক লোটা যেন বাতেনি জগতের এক গোপন রহস্যের চাক্ষুষ জানান দিচ্ছিল, যা উপস্থিত সকলের হৃদয়ে এক অন্যরকম বিস্ময় ও ভক্তির উন্মেষ ঘটালো।
পরবর্তীতে আছমত আলী যখন হুজুর কেবলার পবিত্র সান্নিধ্য ও কাছ হতে পরম শান্তিতে বাইরে বাহির হয়ে আসলেন, তখন দরবারের অন্য সকল খাদেম ও আশেকগণ তেনাকে ঘিরে ধরলেন। সবাই পরম কৌতূহল নিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “ভাই আছমত আলী, হুজুর কেবলার পুকুরে হারিয়ে যাওয়া এই খাস লোটাটি আপনি রাঙ্গুনিয়ায় বসে কোথায় পাইলেন? এর ভেতরের আসল রহস্যটা কী, দয়া করে আমাদের খুলে বলুন। আমরা পুকুরের সমস্ত পানি চষে ফেলেও যে লোটা খুঁজে পেলাম না, তা আপনার হাতে কীভাবে এলো?” তখন আছমত আলী গভীর আবেগ আপ্লুত হয়ে তেনার জীবনের সেই অপূর্ব, অলৌকিক ও রোমাঞ্চকর ঘটনাটি সবার সামনে চাক্ষুষ বর্ণনা করতে লাগলেন। তেনার চোখ বেয়ে তখন অশ্রুধারা ঝরছিল এবং কণ্ঠস্বর কাঁপছিল।
রাঙ্গুনিয়ার কোদালা পাহাড়ের ঘটনা ও বাঘের মুখে অলৌকিক আঘাত
আছমত আলী বলতে লাগলেন, “ভাই সব, এই পিতলের লোটার দ্বারা স্বয়ং হযরত কেবলা দূর থেকে বাতেনি নজরে আমার জান বাঁচিয়েছেন। আমি অত্যন্ত গরীব মানুষ, দিন আনি দিন খাই। মনে মনে নিয়ত করেছিলাম, পাহাড় হতে কিছু কাঠ বা লাকড়ি সংগ্রহ করে আনবো এবং তা বাজারে বিক্রয় করে যা কিছু অর্থ পাব, তা দিয়ে সামান্য নাস্তা তৈরি করে হযরত কেবলার খেদমতে হাদিয়া হিসেবে নিয়ে যাব। এই উদ্দেশ্যে আমি মাইজভাণ্ডার দরবার শরীফ হতে প্রায় ৪২ মাইল দূরে অবস্থিত রাঙ্গুনিয়ার গভীর কোদালা পাহাড়ে গিয়েছিলাম। সেখানে এক গাছ তলায় বসে যখন কাঠ সংগ্রহ করে আঁটি বাঁধছিলাম, ঠিক তখনই ঘটল সেই ভয়াবহ ও লোমহর্ষক ঘটনা, যা মনে করলে আজও আমার গায়ের লোম খাড়া হয়ে যায়।”
তিনি কাঁপানো কণ্ঠে বলতে লাগলেন, “হঠাৎ কোথা হতে এক প্রকাণ্ড ও বলিষ্ঠকায় হিংস্র বন্য বাঘ আমার সামনে এসে জ্যান্ত হাজির হলো! বাঘের সেই হিংস্র চোখ ও আকস্মিক আক্রমণ প্রচেষ্টা দেখে আমি সম্পূর্ণ অনন্যোপায় ও ভীত হয়ে পড়লাম। নিশ্চিত মৃত্যুর হাত হতে প্রাণে বাঁচতে আমি তখন সর্বশক্তি দিয়ে ‘ইয়া গাউছুল আজম’ বলে চিৎকার করে উঠি। সুবহানাল্লাহ! ইয়া গাউছুল আজম বলতে না বলতেই, আকস্মিক শূন্য হতে একটি ভারী লোটা উড়ে এসে সেই হিংস্র বাঘের মুখের ওপর সজোরে আঘাত করে! বাঘটি সেই অলৌকিক আঘাতে তীব্র যন্ত্রণায় ভয় পেয়ে চিৎকার করতে করতে গভীর জঙ্গলের দিকে পালিয়ে যায়। ফলে আমি নিশ্চিত মৃত্যুর মুখ থেকে এবং বাঘের কবল থেকে অলৌকিকভাবে রক্ষা পাইলাম এবং আল্লাহর অলি যে ভক্তের ডাকে সাড়া দেন, তার চাক্ষুষ প্রমাণ পেলাম।”
আছমত আলী দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, “বাঘ পালিয়ে যাওয়ার পর আমি সেই শূন্য থেকে পড়া লোটাটি হাতে নিয়ে দেখলাম এবং চিনতে পারলাম- ইহাতো অন্য কারও নয়, স্বয়ং আমার দয়াল হযরত কেবলার পবিত্র লোটা, যা আমি দরবারে তেনাকে সর্বদা ওজুর সময় ব্যবহার করতে দেখেছি! তাই আমি সেই অলৌকিক লোটাটি ও কাঠ বিক্রির টাকা দিয়ে তৈরি সামান্য নাস্তা নিয়ে আজ হযরতের পবিত্র খেদমতে হাজির হলাম।
আমার দয়াল হযরত কেবলা অসীম দয়া ও মেহেরবানি করে তেনার বাতেনি বেলায়েতী ক্ষমতা বলে ৪২ মাইল দূর থেকে বাঘের হাত হতে আমার প্রাণ রক্ষা করেছেন! না হয় আজ আমার দুনিয়া থেকে বিদায় নেওয়া ছাড়া আর কোনো উপায় ছিল না।” তেনার এই সত্য বর্ণনা শুনে দরবারের সকল খাদেম ও মুরিদগণের কলব আল্লাহর কুদরত ও ওলীর শানে নূরে নূরান্বিত হয়ে গেল। এটিই হলো হযরত কেবলা মাইজভাণ্ডারীর অলৌকিক কারামত যা স্থান ও কালের দূরত্বকে এক নিমেষে তুচ্ছ প্রমাণ করে দেয়।
ওলী-আউলিয়াগণের বেলায়েতী ক্ষমতার প্রকৃত হাকিকত
সুফিবাদ এবং বেলায়েতের মূল শিক্ষা ও হাকিকত অনুযায়ী, যখন একজন ঈমানদার বান্দা আল্লাহর খাঁটি ইবাদতে, জিকিরে এবং নূর নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর ইশকে নিজের নফসকে সম্পূর্ণ কুরবান করে দেন, তখন তেনার আত্মা কুপ্রবৃত্তির হীন দাসত্ব ও জিঞ্জির থেকে চিরতরে মুক্তি পেয়ে এক নির্মল, পবিত্র ও কামেল মাকামে পৌঁছায়। এই উচ্চ আধ্যাত্মিক মাকামকে সুফি সাধকগণ ‘বেলায়েত’ বলে আখ্যায়িত করেন। হযরত কেবলা আহমদ উল্লাহ মাইজভাণ্ডারী রহমাতুল্লাহি আলাইহি ছিলেন বেলায়েতের সেই সুউচ্চ শিখরের অধিকারী এক মহান আউলিয়া।
তেনার শানে বাঘের এই আনুগত্য বা ৪২ মাইল দূর থেকে ভক্ত রক্ষা করার এই জগতকাঁপানো কারামত আমাদের এই পরম আত্মিক শিক্ষাই দেয় যে- মানুষের জীবনে যেকোনো বড় বিপদ-আপদে, কঠিন প্রয়োজনে বা মনের যেকোনো নেক চাহিদা ও মুসিবতের সময় যদি কেউ খাঁটি অন্তরে, সরল মনে ও গভীর বিশ্বাসে আল্লাহর প্রিয় ওলী-আউলিয়াদের প্রতি মহব্বত ও ভরসা রাখে এবং তেনাদের পবিত্র উসিলা ধরে আল্লাহর দরবারে ফরিয়াদ করে, তবে মহান আল্লাহ রব্বুল আলামীন তেনার অসীম দয়ার ও রহমতের কুদরতি দরজা বান্দার জন্য উন্মুক্ত করে দেন। ওলীদের এই বাতেনি শক্তি মূলত আল্লাহর দেওয়া এক পরম নিয়ামত।
তরিকতের এই সুগভীর নিয়ম ও উসুল আমাদের শেখায় যে, ওলী-আল্লাহগণের চোখ কেবল বাহ্যিক জগত দেখে না, তেনাদের অন্তরের চোখ বা বাতেনি নজর সর্বদা জাগ্রত থাকে। ৪২ মাইল দূরের কোদালা পাহাড়ে যখন একজন আশেক বিপদে পড়ে আকুল আর্তনাদ করে, তখন ওলীর কলবে সেই বাতেনি তরঙ্গ এক সেকেন্ডে আঘাত করে। আর তখনই ওলী তেনার অলৌকিক তছরূফের মাধ্যমে প্রকৃতির স্বাভাবিক নিয়মকে উল্টে দিয়ে সাহায্য পাঠান।
পিতলের একটি ভারী লোটা পুকুরের অতল জলে না হারিয়ে কীভাবে আকাশে উড়ে ৪২ মাইল দূরে চলে গেল- আধুনিক বিজ্ঞান বা কোনো লৌকিক যুক্তি দিয়ে তেনাকে ব্যাখ্যা করা অসম্ভব। এটিই হলো বেলায়েতের সেই কুদরতি রাজত্ব, যা আল্লাহ কেবল তাঁর খাস ও ভালোবাসার বান্দাদের দান করে থাকেন। এই কারামতগুলো যুগে যুগে মানুষের ভেঙে পড়া বিশ্বাসকে পুনরায় পাহাড়ের মতো অটল করতে পরম সহায়তা করে।
উপসংহার ও রূহার্নী চেতনার শাশ্বত প্রতিফলন
পরিশেষে বলা যায়, হযরত কেবলা মাইজভাণ্ডারীর অলৌকিক কারামত আমাদের এই পরম ও শাশ্বত শিক্ষাই দেয় যে- আল্লাহর ওলিদের পবিত্র সংস্পর্শে আসলে মানুষের অবাধ্য ও বিদ্রোহী নফস যেমন চিরতরে শান্ত হয়, তেমনি তেনাদের বাতেনি তাওয়াজ্জুহের উসিলায় জীবনের সমস্ত জটিল মুসিবত ও বিপদ থেকে উদ্ধার পাওয়া সম্ভব। আজকের এই যান্ত্রিক ও বস্তুবাদী যুগে, যেখানে মানুষ কেবল জাগতিক মোহে অন্ধ হয়ে দিগভ্রান্তের মতো ছুটছে এবং আত্মিক শান্তি হারিয়ে হাহাকার করছে, সেখানে ওলী-আউলিয়াদের জীবনদর্শন ও পবিত্র বাণীই হতে পারে আমাদের আত্মিক প্রশান্তির একমাত্র চাবিকাঠি।
আসুন, আমরা ওলী-আউলিয়াদের প্রতি মহব্বত ও সর্বোচ্চ আদব বজায় রাখি এবং তেনাদের বাণীর আলোকে নিজের জীবনকে আল্লাহর রঙে রঙিন করি। তেনাদের শেখানো ইশকের পথে চললে যেমন নফসের জিঞ্জির থেকে মুক্তি মিলবে, তেমনি মানুষের কলব হবে সম্পূর্ণ পাপমুক্ত, নির্মল ও আয়নার মতো স্বচ্ছ। এটিই একজন খাঁটি ঈমানদারের জীবনের চরম ও পরম সার্থকতা এবং ইহকাল ও পরকালে মুক্তির একমাত্র রাজপথ। মহান আল্লাহ রব্বুল আলামীন আমাদের সকলকে তেনার এই খাস ও মকবুল বান্দাদের প্রতি খাঁটি ভালোবাসা অন্তরে ধারণ করার তৌফিক দান করুন। আমীন।










