দয়াল নবী আপনার দরবারে আমি গোলাম হাজির হইয়াছি।
গাউসুল আজম সৈয়দ আহমদ উল্লাহ মাইজভান্ডারী হলেন বেলায়েতের আকাশের এক অনন্য ও জ্যোতির্ময় মহাদূতি, যাঁর পবিত্র আধ্যাত্মিক জিন্দেগী, রূহার্নী সাধনা এবং জ্যান্ত কারামতসমূহ কেয়ামত পর্যন্ত সত্যসন্ধানী ঈমানদার মুসলমানদের কলবে ঈমানের সুশীতল আলো প্রস্ফুটিত করছে এবং করবে। তরিকত, তাসাউফ এবং সুফি সাধনার গভীর রহস্য ও স্তরসমূহ অনুযায়ী ওলী-আল্লাহগণের কারামতসমূহ কোনো মনগড়া গল্প নয়; বরং তা হলো মহান আল্লাহর অসীম কুদরত ও বেলায়েতের এক জ্যান্ত চাক্ষুষ দলিল।
গাউসুল আজম সৈয়দ আহমদ উল্লাহ মাইজভান্ডারী-এর পবিত্র নজর বা আধ্যাত্মিক চাহনির স্পর্শে এসে কীভাবে এক পচনশীল দেহের মরণব্যাধি এক সেকেন্ডে পাল্টে গিয়েছিল এবং সেই অলৌকিক ঘটনাটি বাস্তব রূপ লাভ করার সেই অবিশ্বাস্য, প্রামাণ্য ও রূহানি দলিলভিত্তিক রূপ নিচে আলোচনা করা হলো।
আল্লাহর ওলির জবান-আল্লাহর জবান: তরিকতের আলোয় গভীর বাতেনি হাকিকত
তরিকত, তাসাউফ এবং আধ্যাত্মিক সাধনার গভীর রহস্য ও স্তরসমূহ অনুযায়ী, যখন একজন কামেল মুর্শিদ বা আল্লাহর ওলি কঠোর রিয়াজত, জিকির-আসকার, নফল ইবাদত এবং নূর নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর প্রতি ইশক ও মহব্বতের মাধ্যমে নিজের নফসকে সম্পূর্ণরূপে কোরবানি করে ‘ফানা ফিল্লাহ’ ও ‘বাকা বিল্লাহ’র সর্বোচ্চ মাকামে অধিষ্ঠিত হন, তখন তাঁর নিজের ব্যক্তিগত ইচ্ছা বা আকাঙ্ক্ষা বলতে আর কিছুই অবশিষ্ট থাকে না। ওলী আল্লাহর ইচ্ছা তখন স্বয়ং পরম মাওলার কুদরতি ইচ্ছার এক বাতেনি আয়না বা প্রতিচ্ছবিতে রূপান্তরিত হয়ে যায়। গাউসুল আজম সৈয়দ আহমদ উল্লাহ মাইজভান্ডারী ছিলেন তরিকতের সেই সর্বোচ্চ রূহানি মাকামের একচ্ছত্র অধিকারী, যাঁর বাতেনি দৃষ্টি এবং অন্তরের চোখ স্থান-কালের সমস্ত জাগতিক দেয়াল ভেদ করে অদৃশ্যের খবর এবং ভবিষ্যতের ঘটনাপ্রবাহকে পরম নিখুঁতভাবে চাক্ষুষ দেখতে পেত।
ওলি-আউলিয়াগণের আধ্যাত্মিক উন্মোচন বা ‘কাশফ’ তত্ত্ব অনুযায়ী, ওলিদের জবান থেকে নিঃসৃত প্রতিটি পবিত্র বাণী নিছক কোনো পার্থিব শব্দ নয়; বরং তা হলো সরাসরি আল্লাহর পক্ষ থেকে আসা এক একটি ইলহামী ইশারা ও আসমানী কুদরতের গোপন চাবিকাঠি, যা বহন করে হিকমতের গভীর ও সুদূরপ্রসারী অর্থ। তেনার এই বাতেনি ‘তাওয়াজ্জুহ’ বা রূহার্নী দৃষ্টিের ক্ষমতা ছিল এতটাই প্রখর যে, কোনো ঘোর অন্ধকার কলবের পাপী মানুষ বা দূরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত পঙ্গু মানুষও যদি তেনার পবিত্র নজরের সীমানায় আসত, তবে সে এক সেকেন্ডে নিজের নফসকে কোরবানি করে খাঁটি ঈমানদার এবং রোগমুক্ত শরীরে পরিণত হতে বাধ্য হতো।
পবিত্র বুখারী শরীফের অকাট্য হাদিস ও বেলায়েতের প্রামাণ্য দলিলসমূহ
গাউসুল আজম সৈয়দ আহমদ উল্লাহ মাইজভান্ডারী-এর পবিত্র জবান এবং তেনার মাধ্যমে চাক্ষুষ প্রকাশিত এই অলৌকিক কারামতসমূহ যে ইসলামের খাঁটি সুফি আকিদা ও আহলে সুন্নাত ওয়াল জামায়াতের মূল ধারার একশত ভাগ অনুসারী, তার সবচেয়ে বড় এবং অকাট্য দলিল সংরক্ষিত রয়েছে সিহাহ সিত্তাহর অন্যতম প্রধান ও জগৎবিখ্যাত কিতাব সহীহ বুখারী শরীফের কিতাবুর রিকাক অধ্যায়ে
পবিত্র বুখারী শরীফের হাদিস
হযরত আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে অত্যন্ত বিশুদ্ধ ও নির্ভরযোগ্য সনদে বর্ণিত হয়েছে, সাইয়্যিদুল মুরসালীন নূর নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরশাদ করেছেন, “আল্লাহ তাআলা বলেন- আমার বান্দা ফরজের পাশাপাশি সর্বদা নফল ইবাদতের মাধ্যমে ক্রমাগত আমার নিকটবর্তী হতে থাকে, অবশেষে আমি তাকে আমার পরম ভালোবাসার বাতেনি চাদরে জড়িয়ে নিই। আর যখন আমি আমার সেই প্রিয় কামেল বান্দাকে মহব্বত করি, তখন আমি স্বয়ং হয়ে যাই তাঁর শোনার পবিত্র কান, যার দ্বারা সে শোনে; আমি হয়ে যাই তাঁর দেখার নূরানী চোখ, যার দ্বারা সে সবকিছু দেখে; আমি হয়ে যাই তাঁর ধরার কুদরতি হাত, যার দ্বারা সে ধরে এবং আমি হয়ে যাই তাঁর চলার পা, যার দ্বারা সে চলে।”
এই অকাট্য এবং অখণ্ডনীয় হাদিসে কুদসী চাক্ষুষ প্রমাণ করে দেয় যে, আল্লাহ তাআলা যেনাদের হাত, চোখ, কান ও পা হয়ে যান, তেনাদের আত্মিক ক্ষমতা এবং পবিত্র নজরের শক্তি সাধারণ মানুষের পার্থিব ও যান্ত্রিক লজিকের সম্পূর্ণ ঊর্ধ্বে চলে যায়। গাউসুল আজম সৈয়দ আহমদ উল্লাহ মাইজভান্ডারী-এর জিন্দেগীতে প্রকাশিত প্রতিটি অলৌকিক কারামত ছিল স্বয়ং রব্বুল আলামীনের সেই ঐশ্বরিক ইচ্ছারই চাক্ষুষ প্রতিচ্ছবি। তেনাদের কর্ম, কথা এবং অন্তরের প্রতিটি স্পন্দনে সরাসরি আল্লাহর কুদরত প্রতিফলিত হয়। এই ওলি আউলিয়াগণ যুগে যুগে ছিলেন, বর্তমানেও আছেন এবং কেয়ামত পর্যন্ত হেদায়েতের আলো দেখানোর জন্য থাকবেন।
পবিত্র দরবারে মীরসরাইয়ের হিন্দু জমিদার বাবু প্রসন্ন কুমারের আগমন: এক করুণ দৃশ্য
মীরসরাইয়ের জোরারগঞ্জ এলাকার এক অত্যন্ত সম্ভ্রান্ত, ধনী ও প্রতিপত্তিশালী হিন্দু জমিদার ছিলেন, যাঁর নাম ছিল বাবু প্রসন্ন কুমার সেন। তিনি এক মারাত্মক ও পচনশীল মরণব্যাধি কুষ্ঠ রোগে আক্রান্ত হন। সেকালের বড় বড় ডাক্তার, কবিরাজ এবং হাকিমদের সমস্ত চিকিৎসা ও চিকিৎসা বিজ্ঞানের আধুনিক সমীকরণ তেনার এই ভয়াবহ রোগের কাছে চরম পরাজয় বরণ করেছিল। তার পুরো শরীর থেকে সার্বক্ষণিক রক্ত ও পুঁজ ঝরছিল এবং সমাজ ও আত্মীয়-স্বজন তাকে সম্পূর্ণ বর্জন করেছিল।
জমিদার বাবু প্রসন্ন কুমার উপায়ান্তর না দেখে, লোকমুখে গাউসুল আজম সৈয়দ আহমদ উল্লাহ মাইজভান্ডারী-এর বেলায়েতের শান ও অলৌকিক ক্ষমতার কথা শুনে এক বুক আশা ও বিশ্বাস নিয়ে মাইজভান্ডার শরীফে এসে হাজির হন। তেনার শরীরের অবস্থা এতটাই শোচনীয় ছিল যে দরবারের সাধারণ মানুষও তেনার শরীরের দুর্গন্ধের কারণে পাশ থেকে দূরে সরে যাচ্ছিল।
পবিত্র নজরে চোখের পলকে পচনশীল কুষ্ঠ রোগ মুক্তির জ্যান্ত দৃশ্য
অসহায় জমিদার যখন অঝোরে রোদন করে গাউসুল আজম সৈয়দ আহমদ উল্লাহ মাইজভান্ডারী-এর কদম মোবারক স্পর্শ করে তেনার এই পচনশীল দেহের করুণ আরজি পেশ করলেন, তখন গাউসুল আজম সৈয়দ আহমদ উল্লাহ মাইজভান্ডারী তেনার স্বভাবজাত রূহার্নী মহিমায় অত্যন্ত ধীর, স্থির এবং এক চিরন্তন প্রশান্তিতে মগ্ন ছিলেন। তিনি তেনার সেই জালালী ও নূরানী দৃষ্টিতে সরাসরি সেই কুষ্ঠরোগী জমিদারের পচন ধরা শরীরের দিকে তাকালেন এবং তেনার পবিত্র জবান মোবারক হতে এক বাতেনি ইশারা ও দোয়া করলেন।
তেনার সেই চাহনিতে ছিল না কোনো জাগতিক বৈষম্য বা অহংকার, ছিল কেবল রব্বুল আলামীনের রহমত ও জালালিয়াতের এক আশ্চর্য মিশ্রণ। যেই মুহূর্তেই গাউসুল আজম সৈয়দ আহমদ উল্লাহ মাইজভান্ডারী-এর পবিত্র নজর সেই জমিদারের ওপর পড়ল, অমনি এক অলৌকিক ও বিদ্যুতিক রূহার্নী কম্পনে জমিদারের পুরো শরীর থরথর করে কেঁপে উঠল। এ যেন ছিল এক অন্ধকার রজনীতে হঠাৎ নূরের প্রখর আলোর উদয়।
সেই অবিশ্বাস্য মুহূর্তেই, চিকিৎসা বিজ্ঞানের সমস্ত থিওরি ও কোষীয় পচনশীলতার নিয়মকে পরম বিস্ময়ে স্তব্ধ করে দিয়ে, মাত্র এক রাতের ব্যবধানে সেই জমিদারের শরীরের সমস্ত পচনশীল কুষ্ঠ রোগ সম্পূর্ণ গায়েব হয়ে গেল! তার গায়ের চামড়া এক সদ্যজাত শিশুর মতো নরম, মসৃণ, সুবাসিত ও স্বাভাবিক হয়ে উঠল। তেনার এই একটিমাত্র কুদরতি নজর জমিদারের দেহের সমস্ত ঘা ও রক্ত-পুঁজকে এক সেকেন্ডে ধুয়ে-মুছে সাফ করে দিল। এই জ্যান্ত কারামতের পর জমিদার প্রসন্ন কুমার সেন দয়াল মুর্শিদের কদমে অশ্রুসিক্ত নয়নে আছড়ে পড়েন এবং তেনার পুরো পরিবার আজীবন মাইজভান্ডার শরীফের একনিষ্ঠ ভক্ত ও আশেকের খাতায় নাম লেখান।
পরিশেষে: ঈমানদারের কলবে ঈমানী আলো ও তাজকিয়াতুন নাফসের মহান রূহানি শিক্ষা
পরিশেষে বলা যায়, গাউসুল আজম শাহানশাহ সৈয়দ আহমদ উল্লাহ মাইজভান্ডারী রহমতুল্লাহি আলাইহির এই জগতকাঁপানো অলৌকিক কারামত কেবল একটি ঐতিহাসিক বিবরণী বা গল্পকথা নয়; এটি হলো বর্তমান তথ্যপ্রযুক্তির যুগে বিভ্রান্ত মানুষের কলবে ঈমানী আলো জাগ্রত করার এবং বাতেনি প্রশান্তি লাভ করার এক জ্যান্ত ও চিরন্তন আলোর দিশারী। আল্লাহর ওলিদের পবিত্র সংস্পর্শে আসলে মানুষের অবাধ্য নফস যেমন শান্ত হয়, তেমনি তেনাদের তাওয়াজ্জুহ বা বাতেনি নজরের উসিলায় মানুষের পার্থিব জীবনের সমস্ত জটিল রোগব্যাধি ও মুসিবত এক নিমেষে দূর হয়ে যায়।
আজকের এই আধুনিক যুগেও যদি কোনো আশেক খাঁটি মহব্বত, বিশুদ্ধ আকিদা এবং ইশক নিয়ে তেনার বাতেনি ফয়েজ বা তাওয়াজ্জুহ অনুসন্ধান করে, তবে সে আত্মশুদ্ধি বা তাজকিয়াতুন নাফস অর্জন করতে সক্ষম হবে। আসুন, আমরা ওলী-আউলিয়াগণের প্রতি আন্তরিক মহব্বত ও অটল আস্থা রাখি এবং তেনাদের বাণীর আলোকে নিজের কলবকে জাগ্রত করি, তবেই দুনিয়া ও আখিরাতে পরম প্রশান্তি ও মুক্তি লাভ করা সম্ভব হবে। আর এটিই হবে ঈমানদারের জীবনের চরম সার্থকতা।










