দয়াল নবী আপনার দরবারে আমি গোলাম হাজির হইয়াছি।
হযরত গাউছুল আজম মাইজভাণ্ডারীর অলৌকিক কারামত যা কিয়ামত পর্যন্ত ঈমানদারের অন্তরে ঈমানী প্রশান্তি ও নূরের জ্যোতি ছড়িয়ে যাবে। গাউসুল আজম হযরত সৈয়দ আহমদ উল্লাহ মাইজভাণ্ডারী রহমাতুল্লাহি আলাইহি ছিলেন বেলায়েতে এমন এক সূর্য। যিনি ১৮২৬ সালের ১৪ জানুয়ারি ১লা মাঘ, ১২৩৩ বঙ্গাব্দ চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি উপজেলার মাইজভাণ্ডার গ্রামে শুভ আগমন করেন। এই মহান আধ্যাত্মিক আউলিয়ার প্রতিটি কদম ছিল অলৌকিকতা এবং বাতেনি হাকিকতে ভরপুর। তেনার এই বেলায়েতী জৌলুস ও আধ্যাত্মিক রাজত্ব আজ বিশ্বজুড়ে দিশেহারা মানুষের জন্য সঠিক পথের চিরন্তন আলোকবর্তিকা হিসেবে চাক্ষুষ সমাদৃত। সুফি দর্শন এবং আহলে সুন্নাত ওয়াল জামায়াতের আকিদা অনুযায়ী, ওলী-আল্লাহগণের মাধ্যমে যে অলৌকিক কারামত প্রকাশিত হয়, তা মূলত মহান আল্লাহর অসীম কুদরত এবং নূর নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর মুজিযারই এক একটি বাতেনি প্রতিফলন।
আধ্যাত্মিক মাকাম ও ওলী-আউলিয়াদের অসীম ক্ষমতা
মাইজভাণ্ডারী তরিকতের মহান প্রবর্তক গাউসুল আজম সৈয়দ আহমদ উল্লাহ মাইজভাণ্ডারী রহমাতুল্লাহি আলাইহি-এর আধ্যাত্মিক জীবনের এক বিস্ময়কর দিক হলো মহাবিশ্বের প্রতিটি স্তরের ওপর তেনার বাতেনি আধিপত্য। তেনার বাতেনি বা আধ্যাত্মিক ক্ষমতা ছিল এতটাই প্রখর যে, তেনার একটি বাতেনি ইশারা মহান আল্লাহর হুকুমে প্রকৃতির হাজার বছরের সুপ্রতিষ্ঠিত নিয়মকেও এক নিমেষে পাল্টে দিতে পারত। হযরত গাউছুল আজম মাইজভাণ্ডারীর অলৌকিক কারামত সমূহের মধ্যে বাঘের আনুগত্য ও কন্যার আবদার পূরণের ঘটনাটি তেনার আধ্যাত্মিক দাপট ও দয়াল মাওলার দরবারে তেনার মকবুলিয়াতের এক অকাট্য দলিল হিসেবে বিবেচিত হয়। তিনি যখন আধ্যাত্মিক জালালী হালতে মগ্ন থাকতেন, তখন বনের হিংস্র পশু থেকে শুরু করে বিষধর সর্পসমূহ তেনার শানে তটস্থ ও অনুগত থাকত। তেনার বেলায়েতের চাদর এতোটাই বিস্তৃত ছিল যে, তেনার অনুমতি ছাড়া বনের হিংস্র বাঘও তেনার সীমানায় কোনো প্রকার অনিষ্ট করার সাহস পেত না। এটিই হলো বেলায়েতের সেই সার্বভৌমত্ব যা আল্লাহ কেবল তাঁর খাস বন্ধুদের দান করেন।
আদরের কন্যার আবদারে জ্যান্ত বাঘের উপস্থিতি: এক অবিশ্বাস্য ও ঐতিহাসিক অধ্যায়
মাইজভাণ্ডারী তরিকার ইতিহাসে এক পরম মধুর ও বিস্ময়কর ঘটনা বর্ণিত আছে যা হযরত গাউছুল আজম মাইজভাণ্ডারীর পারিবারিক ও আধ্যাত্মিক শাসনের এক অনন্য বহিঃপ্রকাশ। একদিন হযরত কেবলার পরম আদরের কন্যা মোছাম্মাত সৈয়দা আনোয়ারুন্নেসা বিবি হযরতের নিকট আবদার করে বলেছিলেন, “বাবা, আমি তো কোনোদিন বাঘ দেখি নাই, বনের বাঘ দেখতে আমার বড়ই ইচ্ছা। আমাকে বাঘ দেখাতে হবে।” দয়ার সাগর হযরত কেবলা কন্যার এই অবুঝ আবদার শুনে মুচকি হেসে স্নেহভরে উত্তর দিয়েছিলেন, “আচ্ছা মা, সময় হলে তোমাকে অবশ্যই বাঘ দেখাব।”
এক নিবিড় নিঝুম রাতে পুরো গ্রাম যখন নিস্তব্ধতায় মগ্ন এবং পশুপাখিরাও গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন, ঠিক তখন হযরত গাউছুল আজম মাইজভাণ্ডারী রহমাতুল্লাহি আলাইহি হঠাৎ ডেকে বললেন- ‘মাগো! তোমরা কারা বাঘ দেখতে চেয়েছিলে? বাইরে এসে দেখো, বাঘ তোমাদের উঠানে এসে দাঁড়িয়েছে।’ ঘরের মানুষেরা উঁকি দিয়ে পরম বিস্ময়ে বাকরুদ্ধ হয়ে পড়ল। তারা দেখল, প্রকাণ্ড ও বলিষ্ঠ একটি বন্য বাঘ অত্যন্ত শান্ত ও নির্ভয় চিত্তে উঠানে দাঁড়িয়ে আছে। মনে হচ্ছিল, কেউ যেন তাকে মন্ত্রমুগ্ধের মতো বশ করে ওলীর কদমে হাজির করেছে। বাঘটি বিন্দুমাত্র হিংস্রতা না দেখিয়ে কেবল আল্লাহর বন্ধুর নির্দেশের অপেক্ষায় ছিল। এটিই ছিল হযরত গাউছুল আজম মাইজভাণ্ডারীর অলৌকিক কারামত, যা প্রমাণ করে যে ওলী-আউলিয়াদের পবিত্র ইশারায় হিংস্র পশুপাখিও তাদের স্বভাবজাত হিংস্রতা ভুলে অনুগত দাসে পরিণত হয়। দীর্ঘ সময় উঠানে অবস্থানের পর গাউসুল আজম হযরত সৈয়দ আহমদ উল্লাহ মাইজভাণ্ডারী রহমাতুল্লাহি আলাইহি ইশারায় বাঘটি পুনরায় বনে ফিরে যায়। এই অলৌকিক দৃশ্য যারা প্রত্যক্ষ করেছিলেন, তাদের ঈমানী শক্তি বহুগুণ বেড়ে গিয়েছিল।”
হিংস্র পশুর বশ্যতা ও ওলীগণের বেলায়েতী শাসনের হাকিকত
তরিকতের গুঢ় হাকিকত অনুযায়ী, আল্লাহর প্রিয় বান্দারা যখন নফসকে পূর্ণরূপে জয় করে ফানা-ফিল্লা এবং বাকা-বিল্লা মাকামে পৌঁছান, তখন তারা আল্লাহর কুদরতি সিফাত বা গুণের জ্যোতি লাভ করেন। গাউসুল আজম হযরত সৈয়দ আহমদ উল্লাহ মাইজভাণ্ডারী রহমাতুল্লাহি আলাইহি ছিলেন বেলায়েতের সেই সুউচ্চ চূড়ায়। তেনার শানে বাঘের এই আনুগত্য কেবল একবারের বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং প্রায়ই দেখা যেত গভীর রাতে হিংস্র বাঘ এবং বিষধর সর্পসমূহ তেনার হুজরা শরীফের সামনে অত্যন্ত আদব ও বিনয়ের সাথে হাজিরা দিচ্ছে।
ওলী-আউলিয়াগণ যখন সম্পূর্ণ আল্লাহর হুকুমে বিলীন হয়ে যান, তখন দয়াল আল্লাহ পুরো সৃষ্টিজগতকে ওই ওলী-আউলিয়াগণের হুকুমে বাধ্য করে দেন। হযরত গাউছুল আজম মাইজভাণ্ডারীর অলৌকিক কারামত এর এই আধ্যাত্মিক জৌলুস আজও আশেকদের অন্তরে ইশকের তপ্ত আগুন জ্বালিয়ে রাখে। তেনার দরবারে এসে বাঘ এবং বনের হরিণ একই স্থানে অবস্থান করার মতো ঘটনাও তেনার বেলায়েতী শাসনের সাক্ষ্য দেয়। সুফিদের মতে, কারামত হলো নবীগণের মুজিযার স্থলাভিষিক্ত এবং এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে ওলীগণের সম্মানের এক নিদর্শন।
হযরত গাউছুল আজম মাইজভাণ্ডারীর আধ্যাত্মিক শিক্ষা
হযরত কেবলা গাউসুল আজম সৈয়দ আহমদ উল্লাহ মাইজভাণ্ডারী রহমাতুল্লাহি আলাইহি কেবল কারামত দেখানোর জন্য এই নশ্বর পৃথিবীতে শুভ আগমন করেননি, বরং তিনি বিশেষ পদ্ধতির মাধ্যমে পথহারা মানুষের জন্য আত্মশুদ্ধির এক রাজকীয় মহাসড়ক তৈরি করে গেছেন। তেনার এই বৈপ্লবিক পদ্ধতির মূল লক্ষ্য হলো কুপ্রবৃত্তির দাসত্ব থেকে মানুষের রূহকে মুক্তি দেওয়া। হযরত গাউছুল আজম মাইজভাণ্ডারীর অলৌকিক কারামত আমাদের এই মহাসত্যটিই বারবার মনে করিয়ে দেয় যে, যে ব্যক্তি আল্লাহর প্রেমে মগ্ন হয়ে নিজের নফসকে জয় করতে পারে, জগতের প্রতিটি মাখলুকাত তেনার অনুগত হয়ে যায়। তেনার শিক্ষা হলো- মানুষ যেন পরনিন্দা ও পাপাচার থেকে নিজেকে দূরে রাখে এবং সর্বদা আল্লাহর জিকিরে মশগুল থাকে। তেনার আধ্যাত্মিক প্রভাবে আজও লাখো কোটি মানুষ আত্মিক শান্তি খুঁজে পাচ্ছে এবং তেনার কারামতসমূহ ঈমানদারের বিশ্বাসের ভিতকে পাহাড়ের মতো মজবুত করছে। তেনার দরবার আজ জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকল মানুষের জন্য এক মিলন মেলায় পরিণত হয়েছে।










