দয়াল নবী আপনার দরবারে আমি গোলাম হাজির হইয়াছি।
ইলমে লাদুন্নী কাকে বলে? যদি প্রশ্ন করেন তবে উত্তর হলো আধ্যাত্মিক তাসাউফ জগতের এক পরম রহস্যময় এবং উচ্চমার্গীয় জ্ঞান, যা কোনো পাঠ্যপুস্তক, পার্থিব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বা বাহ্যিক গবেষণার মাধ্যমে অর্জন করা সম্ভব নয়। এটি হলো সরাসরি দয়াল মাওলার পক্ষ থেকে তাঁর প্রিয় মাহবুব ওলী-আউলিয়াগণের পরিশুদ্ধ কলব বা হৃদয়ে অবতীর্ণ হওয়া এক বিশেষ ঐশ্বরিক নূর। একবিংশ শতাব্দীর এই সর্বগ্রাসী ধর্মীয় অবক্ষয় ও বস্তুবাদের যুগে যখন মানুষ কেবল জাহেরী বা বাহ্যিক জ্ঞান নিয়ে অহংকারে মত্ত, তখন অন্তরের চোখ সচল করতে এই বাতেনি ইলমের হাকিকত জানা প্রতিটি সাচ্চা আশেকের জন্য অপরিহার্য। আজকের এই বিস্তারিত নিবন্ধে আমরা কুরআন, সুন্নাহ এবং ওলী-আউলিয়াদের বাণীর আলোকে অনুসন্ধান করব যে ইলমে লাদুন্নী কাকে বলে এবং কীভাবে এই আধ্যাত্মিক জ্ঞান মানুষের আত্মাকে নূরে খোদার আলোয় আলোকিত করে।
ইলমে লাদুন্নী সম্পর্কে মাওলানা জালাল উদ্দিন রুমি রহমাতুল্লাহি আলাইহি-এর ব্যাখ্যা
মরমী সাহিত্যের রাজমুকুট এবং আশেকুল মুমিনীন হযরত মাওলানা জালাল উদ্দিন রুমি রহমাতুল্লাহি আলাইহি তাঁর অমর সৃষ্টি ‘মসনবি শরীফ’-এ অত্যন্ত প্রাঞ্জল ও গভীর আধ্যাত্মিক ভাষায় এই বিশেষ আল্লাহপ্রদত্ত জ্ঞানের হাকিকত বর্ণনা করেছেন।
মাওলানা জালাল উদ্দিন রুমি রহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন –
“সাধারণ লোকের খেয়াল বৃথা বলে প্রমাণিত হয়।
কিন্তু ওলী-আওলিয়াগণের খেয়াল কখনও মিথ্যা বা বৃথা প্রমাণিত হয় না
কেননা তেনারা অন্তরকে মোরাকাবা ও মোকাশাফা দ্বারা পরিস্কার করে ফেলেন।
পরবর্তীতে আল্লাহর তরফ হইতে সব কিছুর ইলহাম তেনাদের অন্তরে পতিত হয়।
আল্লাহর ইলম হইতে তেনাদের অন্তরে ইলমে গায়েবী প্রতিফলিত হয়।
সেই খেয়াল মেতাবেক তেনারা কাজ করেন ও কথা বলেন।
এই বিশেষ জ্ঞানকেই বলা হয় ইলমে লাদুন্নী, অর্থাৎ আল্লাহপ্রদত্ত গায়েবি জ্ঞান।
মাওলানা জালাল উদ্দিন রুমি রহমাতুল্লাহি আলাইহি-এর এই কালজয়ী বাণী আমাদের চাক্ষুষ শিক্ষা দেয় যে, ওলীগণের চিন্তা বা খেয়াল সাধারণ মানুষের মতো দুনিয়াবী স্বার্থের ওপর ভিত্তি করে গঠিত হয় না। তাঁদের কলব যখন আল্লাহর জিকির ও মোরাকাবার মাধ্যমে আয়নার মতো স্বচ্ছ হয়ে যায়, তখন সরাসরি লওহে মাহফুজ থেকে আল্লাহর গায়েবি ইলম সেখানে প্রতিফলিত হতে শুরু করে।
পবিত্র কুরআনে ইলমে লাদুন্নীর অকাট্য প্রমাণ: হযরত খিজির ও মূসা আলাইহিস সালাম-এর ঘটনা
অনেকেই মনে করেন ইলমে লাদুন্নী বা বাতেনি ইলমের কোনো শরীআহ ভিত্তিক ভিত্তি নেই। কিন্তু পবিত্র কুরআন মজিদে আল্লাহ তাআলা স্বয়ং এই বিশেষ জ্ঞানের কথা অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে বর্ণনা করেছেন। সূরা কাহাফে বর্ণিত হযরত মূসা আলাইহিস সালাম এবং হযরত খিজির আলাইহিস সালাম-এর ঐতিহাসিক ঘটনাটিই হলো এই বাতেনি ইলমের সবচেয়ে বড় ও অকাট্য দলিল।
পবিত্র কুরআনের সরাসরি আয়াত
মহান আল্লাহ তাআলা হযরত খিজির আলাইহিস সালাম -এর শান ও তাঁর বিশেষ জ্ঞানের পরিচয় দিতে গিয়ে ইরশাদ করেছেন:
“অতঃপর তাঁরা আমার বান্দাদের মধ্যে এমন এক বান্দার (হযরত খিজির) সাক্ষাৎ পেলেন, যাকে আমি আমার পক্ষ থেকে বিশেষ রহমত দান করেছিলাম এবং যাকে আমি আমার পক্ষ থেকে এক বিশেষ জ্ঞান (ইলমে লাদুন্নী) শিক্ষা দিয়েছিলাম।” – (সূরা কাহাফ, আয়াত: ৬৫)
এই আয়াতে ব্যবহৃত ‘মিন লাদুন্না’ শব্দগুচ্ছ থেকেই মূলত ‘ইলমে লাদুন্নী’ শব্দের উৎপত্তি, যার অর্থ হলো-সরাসরি আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রাপ্ত বিশেষ বাতেনি জ্ঞান। হযরত মূসা আলাইহিস সালাম উলুল আযম নবী হওয়া সত্ত্বেও, আল্লাহ তাআলা তাঁকে এই বাতেনি রহস্য বোঝার জন্য হযরত খিজির আলাইহিস সালাম-এর সোহবতে পাঠাতে নির্দেশ দিয়েছিলেন, যা প্রমাণ করে যে ইলমে লাদুন্নী কাকে বলে তা জানা ও এর প্রতি বিশ্বাস রাখা কতটা জরুরি।
ইলমে জাহেরী বনাম ইলমে বাতেনী: দুই জ্ঞানের সূক্ষ্ম পার্থক্য
ইসলামিক জ্ঞান মূলত দুই ভাগে বিভক্ত-একটি হলো ইলমে জাহেরী (বাহ্যিক জ্ঞান) এবং অন্যটি হলো ইলমে বাতেনী (অভ্যন্তরীণ বা লাদুন্নী জ্ঞান)। এই দুই জ্ঞানের মধ্যকার পার্থক্য বুঝতে পারলে সমাজে ধর্মীয় উগ্রতা ও ভুল বোঝাবুঝি দূর হওয়া সম্ভব।
ইলমে জাহেরী (বাহ্যিক বিদ্যা): এটি হলো কিতাব পড়ে, মাদ্রাসায় গিয়ে বা গবেষণার মাধ্যমে অর্জিত জ্ঞান, যেমন-ফেকাহ, কালাম এবং ব্যাকরণ। এই জ্ঞান অর্জনের জন্য মেধা ও পরিশ্রমের প্রয়োজন হয়, তবে এর মাধ্যমে অন্তরের অহংকার বা নফস দূর নাও হতে পারে।
ইলমে বাতেনী বা লাদুন্নী: এটি পড়ার মাধ্যমে অর্জিত হয় না, বরং এটি গড-গিফটেড বা আল্লাহপ্রদত্ত। যখন কোনো বান্দা তাঁর আমল ও আখলাক দিয়ে আল্লাহর প্রিয় পাত্রে পরিণত হয়, তখন আল্লাহ নিজেই তাঁর শিক্ষক হয়ে যান। যেমন কুরআনে এসেছে: “তোমরা আল্লাহকে ভয় করো, তাহলে আল্লাহ নিজেই তোমাদের শিক্ষা দেবেন” (সূরা বাকারা, আয়াত: ২৮২)।
ইমাম গাজ্জালী রহমাতুল্লাহি আলাইহি-এর দৃষ্টিভঙ্গি ও ‘রিসালাতুল লাদুন্নিয়াহ’
হুজ্জাতুল ইসলাম হযরত ইমাম গাজ্জালী রহমাতুল্লাহি আলাইহি এই দিব্যজ্ঞানের ওপর ‘রিসালাতুল লাদুন্নিয়াহ’ নামে একটি স্বতন্ত্র ও বিখ্যাত কিতাব রচনা করেছেন। সেখানে তিনি প্রমাণ করেছেন যে, মানুষের রুহ বা আত্মা যখন দুনিয়ার নোংরামি ও নফসের গোলামি থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত হয়, তখন তা সরাসরি ‘আকলে আওয়াল’ বা ঐশ্বরিক প্রজ্ঞার সাথে সংযুক্ত হয়ে যায়।
ইমাম গাজ্জালী রহমাতুল্লাহি আলাইহি-এর মতে, একজন কামেল মুর্শিদের সোহবত ছাড়া এই ইলমে লাদুন্নীর সিনা-ব-সিনা নূর স্পর্শ করা কোনো সাধারণ মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়। কারণ কাগজের পাতা থেকে শুধু অক্ষর চেনা যায়, কিন্তু অন্তরের নূর কেবল একজন ওলীর সিনা থেকেই অন্য আশেকের সিনায় স্থানান্তরিত হয়।
শেষ জামানার ফেতনা ও ইলমে লাদুন্নীর ঢাল: কামেল মুর্শিদের সোহবত
বর্তমান শেষ জামানার এই কঠিন সময়ে চারদিকে যখন ভন্ড মৌলভী ও উগ্রবাদীদের ফিতনা ছড়িয়ে পড়েছে, তখন কোনটি হক আর কোনটি বাতিল- তা বাহ্যিক আকল দিয়ে চেনা অসম্ভব। উগ্রবাদীরা বাহ্যিক কিতাব ও হাদিসের অপব্যাখ্যা দিয়ে সমাজকে পাথুরে করে তুলছে। এই সময়ে আমাদের ঈমান সুরক্ষার একমাত্র ঢাল হলো একজন কামেল মুর্শিদের সোহবত।
মুর্শিদের কুদরতি নেগাহবানি ও দোয়ার বরকতে মুরিদের কলব থেকে স্বার্থান্বেষী সমাজ ও পরোপকারহীনতার ময়লা ধুয়ে যায়। যখন কলব জ্যান্ত হয়, তখন মুরিদের অন্তরেও ইলমে লাদুন্নীর ছোট ছোট স্ফুলিঙ্গ বা ইলহাম পতিত হতে শুরু করে, যা তাকে প্রতি পদক্ষেপে হকের ওপর অটল রাখে।
উপসংহার
পরিশেষে বলা যায়, ইলমে লাদুন্নী কাকে বলে তা কেবল মুখের তর্কে বা বুদ্ধির মাপে বোঝার বিষয় নয়; এটি হলো মহব্বত ও ত্যাগের এক পরম আধ্যাত্মিক সমুদ্র। মাওলানা রুমি রহমাতুল্লাহি আলাইহি-এর সেই কালজয়ী মসনবির শিক্ষা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, ওলী-আল্লাহদের চরণে নিজেকে সঁপে দিলেই কেবল এই গায়েবি ইলমের স্বাদ পাওয়া সম্ভব। আসুন, আমরা লোকদেখানো আচার-আচরণ বা যান্ত্রিক ইবাদত ত্যাগ করে ওলী-আউলিয়াদের বাতেনি দর্শনের আলোয় নিজেদের কলবকে জ্যান্ত করি। দয়াল মাওলা আমাদের সবাইকে ওলীগণের মহব্বতের উসিলায় এই নূরানি ইলমের কিঞ্চিত অংশ নসীব করুন। আমিন।










