নূর নবীজি ﷺ এর মুজিযা: মিম্বর তৈরির পর শুকনো খেজুর গাছের গুঁড়ির কান্নার রহস্য কী?

নূর নবীজি ﷺ এর মুজিযা হিসেবে খেজুর গাছের গুঁড়ির কান্নার ঘটনাটি ইসলামের ইতিহাসের এক অনন্য নিদর্শন। বিজ্ঞান ও কার্যকারণের চেনা নিয়ম পেরিয়ে নূর নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর পবিত্র স্পর্শে নির্গত এই অলৌকিক প্রেমের ঐতিহাসিক সত্যতা ও রূহানী রহস্য নিয়ে এখানে আলোচনা করা হয়েছে।

June 19, 2026 6:54 PM
নূর নবীজি ﷺ এর মুজিযা
---Advertisement---
দয়াল নবী আপনার দরবারে আমি গোলাম হাজির হইয়াছি।
নূর নবীজি ﷺ এর মুজিযা হিসেবে মসজিদে নববীর শুকনো খেজুর গাছের গুঁড়ির মানুষের মতো ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কান্নার অলৌকিক ঘটনাটি ইসলামের ইতিহাসের সবচেয়ে আবেগঘন এবং হৃদয়স্পর্শী একটি নিদর্শন। জড়বস্তু বা উদ্ভিদের কোনো প্রাণ বা অনুভূতি মানুষের মতো প্রকাশ পায় না-এটিই প্রকৃতির সাধারণ নিয়ম। কিন্তু সৃষ্টির প্রতিটি কণা নূর নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম- এর প্রেমে ব্যাকুল। “আজ আমরা সহীহ বুখারী শরিফের নির্ভরযোগ্য ও অকাট্য ‘মোতাওয়াতির হাদিস’ (Mutawatir Hadith)-এর আলোকে জানবো নূর নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর বিরহে একটি শুকনো কাঠের টুকরোর কান্নার ঐতিহাসিক সত্যতা এবং এর ভেতরের গভীর আধ্যাত্মিক রহস্য আসলে কী।”

খেজুর গাছের কান্নার ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও হাদিসের বর্ণনা

মসজিদে নববী যখন প্রথম নির্মাণ করা হয়, তখন সেখানে খুতবা দেওয়ার জন্য কোনো কৃত্রিম বা কাঠের তৈরি মিম্বর ছিল না। নূর নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম একটি শুকনো খেজুর গাছের গুঁড়ির ওপর দাঁড়িয়ে সাহাবায়ে কেরামের সামনে জুমার খুতবা প্রদান করতেন।

নতুন মিম্বর তৈরি ও খেজুর গাছের গুঁড়ির বিরহ

পরবর্তীতে হযরত জুলিয়াদাইন রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু নূর নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর জন্য একটি নতুন কাঠের মিম্বর তৈরি করেন। নূর নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম কাঠের মিম্বরে বসে খেজুর গাছের গুঁড়িটা পা মোবারক দিয়ে ঠেলে দিয়েছেন। উস্তুনে হান্নানা (খেজুর গাছের গুঁড়ি) গড়াতে গড়াতে বেড়ার মধ্যে লাগছে। সেই পুরোনো শুকনো খেজুর গাছের গুঁড়িটি থেকে হঠাৎ করে ছোট শিশুর মতো ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কান্নার আওয়াজ আসতে লাগল। নূর নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন “কাদে কে” সাহাবিরা এপাশ-ওপাশে তাকিয়ে বললেন: “নবীগো, এই উস্তুনে হান্নানা (খেজুর গাছের গুঁড়ি) কাদতেছে।”

ক্রন্দনরত উস্তুনে হান্নানা (খেজুর গাছের গুঁড়ি) প্রতি নবীজি ﷺ এর দয়া

খেজুর গাছের গুঁড়ির এই বুকফাটা কান্নার আওয়াজ শুনে নূর নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম মিম্বর হতে বাম হাত মোবারক মাটিতে লাগিয়ে, ডান হাত মোবারক লম্বা করে খেজুর গাছের গুঁড়িটা পরম মমতায় ধরলেন এবং তেনার পবিত্র হাত মোবারকের স্পর্শ পাওয়ার সাথে সাথে খেজুর গাছের গুড়িটি শান্ত হলো, ঠিক যেমন কোনো মা তাঁর কাঁদতে থাকা শিশুকে বুকে জড়িয়ে ধরলে শিশুটি শান্ত হয়ে যায়। এই ঘটনাটি ইসলামের ইতিহাসে উস্তুনে হান্নানা (খেজুর গাছের গুঁড়ি) বা ক্রন্দনরত স্তম্ভের মুজিযা নামে সুপরিচিত।

সহীহ বুখারী শরিফের প্রত্যক্ষ সাক্ষ্য

এই অলৌকিক ঘটনাটি কোনো রূপকথা বা সাধারণ গল্প নয়, এটি ইসলামের ইতিহাসের সবচেয়ে অকাট্য ও প্রমাণিত সত্য। হযরত জাবের রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেন-“নূর নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন মিম্বরে আরোহণ করলেন, তখন সেই খেজুর গাছটি দশ মাসের গর্ভবতী উটের মতো চিৎকার করে কাঁদতে লাগল। তখন নূর নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম সেটিকে ধরলেন এবং সেটি শান্ত হলো।” (সহীহ বুখারী: ৩৫৭৪)। হযরত হাসান বসরী রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু যখনই এই হাদিসটি বর্ণনা করতেন, তখনই তিনি কেঁদে ফেলতেন এবং বলতেন, “হে মুসলমানেরা! একটি শুকনো খেজুর গাছের গুঁড়ি যদি নূর নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর বিরহে কাঁদতে পারে, তবে তেনার সাক্ষাত পাওয়ার জন্য তোমাদের অন্তর আরও কত বেশি ব্যাকুল হওয়া উচিত!”

এই অলৌকিক মুজিযার পেছনের আধ্যাত্মিক ও রূহানী রহস্য

ওলী-আউলিয়াদের মতে, নূর নবীজি ﷺ এর মুজিযা তথা এই শুকনো  খেজুর গাছের গুঁড়ির কান্নার পেছনে গভীর রূহানী শিক্ষা লুকিয়ে আছে।

১. জড়বস্তুর ভেতরের সুপ্ত অনুভূতি

সাধারণ মানুষের চোখ মনে করে পাথর বা কাঠের কোনো অনুভূতি নেই। কিন্তু তাসাউউফের শিক্ষা হলো-সৃষ্টির প্রতিটি অণু-পরমাণু তার নিজস্ব স্তরে জীবিত এবং তারা তাদের সৃষ্টিকর্তা ও আল্লাহর রসূলকে চেনে। নূর নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম ‘রাহমাতুল্লিল আলামীন’ তিনি সৃষ্টি জগতের জন্য রহমত, তাই তেনার সেই রূহানী রহমতের টান থেকে একটি শুকনো খেজুর গাছের গুঁড়ি নিজেকে মুক্ত রাখতে পারেনি।

২. প্রেম ও সোহবতের আসল দৃষ্টান্ত

শুকনো খেজুর গাছের গুঁড়িটি নূর নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর পবিত্র শরীর মোবারকের স্পর্শ পেত। সেই রূহানী সোহবতের স্বাদ যখন সে নতুন মিম্বর তৈরির কারণে হারাতে বসল, তখন তার আত্মিক বিরহ কান্নায় রূপ নিল। ওলী-আউলিয়াদের মতে, এই ঘটনা আমাদের শেখায় যে, নূর নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সোহবত বা ভালোবাসা ছাড়া ঈমানের পূর্ণতা পাওয়া এবং কলব জীবিত করা অসম্ভব।

উপসংহার

পরিশেষে বলা যায়, নূর নবীজি ﷺ এর মুজিযা বা মিম্বর তৈরির পর শুকনো খেজুর গাছের গুঁড়ির কান্নার ঘটনাটি ঈমানদারের হৃদয়ে খোদা প্রেমের আগুন জ্বালানোর এক পরম চাবিকাঠি। আরামের ঘুম বা জাগতিক ব্যস্ততা সরিয়ে আমরা যখন নূর নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর এই অসীম শান ও মহব্বত নিয়ে ধ্যান করি, তখন আমাদের রূহানি বা আধ্যাত্মিক উন্নতি লাভ হয়।
এই অলৌকিক ঘটনাটি আজও আমাদের নূর নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর প্রতি সত্যিকারের নিখাদ ভালোবাসার শিক্ষা দেয়। মহান আল্লাহ আমাদের সকলকে নূর নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর প্রতি সত্যিকারের আশেক হওয়ার তৌফিক দান করুন। আমীন।
শুকনো খেজুর গাছের গুঁড়ির এই রূহানী ভালোবাসার অলৌকিক মুজিযা নিয়ে আপনার মনে কি কোনো বিশেষ অনুভূতির সৃষ্টি হয়েছে? কমেন্ট করে আমাদের জানান এবং পোস্টটি ভালো লাগলে অবশ্যই শেয়ার করুন।

Join WhatsApp

Join Now

Join Telegram

Join Now

Leave a Comment