দয়াল নবী আপনার দরবারে আমি গোলাম হাজির হইয়াছি।
ওলী-আল্লাহদের মাজার হলো আধ্যাত্মিক জগতের আসমানে এক চিরন্তন নূরের আলোকবর্তিকা এবং হকের এমন এক পরম পথ, যা কেয়ামত পর্যন্ত ঈমানদার বান্দাদের তৃষ্ণার্ত কলবকে আল্লাহ ও নূর নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর মহব্বতে সিক্ত করে যাবে। মহান আল্লাহ রব্বুল আলামীন এই ধরাধামে তাঁর খাস ও প্রিয় ওলী-আউলিয়াদের পাঠিয়েছেন পথহারা মানবজাতিকে হেদায়েতের সঠিক পথ দেখাতে। সুফি দর্শন, আহলে সুন্নাত ওয়াল জামায়াতের বিশুদ্ধ আকিদা এবং মারেফতের কিতাবসমূহের অকাট্য দলিল অনুযায়ী, ওলী-আল্লাহগণের পবিত্র রওজা বা মাজার শরীফ জিয়ারত করা একশত ভাগ বৈধ এবং ইবাদতের এক পুণ্যময় স্থান।
কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হলো, বর্তমান সময়ে ওহাবী, সালাফী ও দেওবন্দীসহ কিছু বাতিল সম্প্রদায় ওলী-আল্লাহদের এই পবিত্র মতাদর্শকে অস্বীকার করে এবং মাজার ভাঙার মতো জঘন্য ও ভ্রান্ত আকিদা প্রচার করছে। আজ আমরা পবিত্র কুরআন-সুন্নাহ ও ইতিহাসের অকাট্য দলিলের আলোকে জানবো মাজারের শরয়ী বৈধতা এবং বর্তমান সময়ে বাংলাদেশের মাজার ভাঙার অপচেষ্টাকারী ওহাবী ফেরকাদের ইতিহাসের চরম মুখোশ উন্মোচন, যা প্রকৃত বিশ্বাসীদের ঈমানী শক্তিকে পাহাড়ের মতো দৃঢ় ও অটল করে তুলবে।
মাজার শব্দের শাব্দিক অর্থ ও শরয়ী বৈধতার অকাট্য কুদরতি দলিল
আহলে সুন্নাত ওয়াল জামায়াতের প্রামাণ্য কিতাব এবং আরবি শব্দতত্ত্ব অনুযায়ী, ‘মাজার’ শব্দের আভিধানিক অর্থ হলো- জিয়ারতের স্থান বা পরিদর্শনের পবিত্র জায়গা। ওলী-আল্লাহগণের পবিত্র রওজা মোবারককে সম্মানার্থে ও আদব বশত মাজার শরীফ বলা হয়। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা ওলী-আল্লাহদের মর্যাদা ঘোষণা করে সূরা ইউনুসের ৬২ নম্বর আয়াতে এরশাদ করেন, আলা ইন্না আওলিয়া-আল্লাহি লা খওফুন আলাইহিম ওয়ালা হুম ইয়াহযানূন। অর্থ- “মনে রেখো, নিশ্চয়ই আল্লাহর ওলীদের কোনো ভয় নেই, চিন্তা নেই এবং তাঁরা দুঃখিতও হবেন না।” ওলীগণ আল্লাহর এতই প্রিয় যে, তাঁদের পর্দা করার পরও রূহার্নী ক্ষমতা ও ফয়েজ জারি থাকে। তাই ওলী-আল্লাহদের মাজার কোনো সাধারণ কবর নয়, বরং এটি আল্লাহর খাস রহমত ও বরকত নাজিল হওয়ার পবিত্র স্থান।
পবিত্র কুরআনের সূরা কাহাফের ২১ নম্বর আয়াতে- মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন আসহাবে কাহাফের (আল্লাহর খাস ওলী) পুণ্যময় গুহার ঘটনার বিবরণ দিতে গিয়ে এরশাদ করেছেন, ‘যখন তারা নিজেদের মধ্যে তাদের (আসহাবে কাহাফের) বিষয়ে বাদানুবাদ বা বিতর্ক করছিল, তখন (একদল) বলল- তাদের গুহার ওপর একটি ইমারত (সৌধ) নির্মাণ করো; তাদের প্রতিপালক (রব)-ই তাদের অবস্থা ভালো জানেন। (পরিশেষে) তাদের বিষয়ের ওপর যাদের সিদ্ধান্ত জয়ী হলো (তৎকালীন ঈমানদার শাসক দল), তারা বলল- আমরা অবশ্যই তাঁদের পবিত্র মাজারের পাশে একটি মসজিদ (ইবাদতের স্থান) নির্মাণ করব’।
মাজার জিয়ারতের শরয়ী বৈধতা ও স্বয়ং নবীজির আমলের প্রমাণ
বাতিল ওহাবী সম্প্রদায় প্রায়শই দাবি করে যে, মাজার জিয়ারত করা নাকি শিরক ও বিদআত। তেনাদের এই চরম অজ্ঞতা ও ভ্রান্তি দূর করতে সহীহ হাদিস শরীফের দলিলই যথেষ্ট। সহীহ মুসলিম শরীফের আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে ৯৭৪ নম্বর হাদিসে উল্লেখ আছে, নূর নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরশাদ করেছেন, “আমি পূর্বে তোমাদের কবর জিয়ারত করতে নিষেধ করেছিলাম, কিন্তু এখন থেকে তোমরা কবর জিয়ারত করো। কারণ ইহা তোমাদের পরকালকে স্মরণ করিয়ে দেয়।” স্বয়ং রাসূলে পাক ﷺ প্রতি বছরের শুরুতে ওহুদ পাহাড়ের শহীদগণের মাজারে জিয়ারত করতে তাশরীফ নিতেন এবং বলতেন, “আপনাদের ওপর শান্তি বর্ষিত হোক।”
ওলী-আউলিয়াগণের বাতেনি নজর ও সুফি দর্শন অনুযায়ী, সাধারণ কবর জিয়ারত আর ওলী-আল্লাহদের মাজার জিয়ারতের মধ্যে এক বিশাল মারেফতি পার্থক্য রয়েছে। সাধারণ কবর জিয়ারত করা হয় মইয়্যতের মাগফেরাত বা দোয়ার জন্য, পক্ষান্তরে ওলী-আল্লাহদের মাজার জিয়ারত করা হয় আল্লাহর ওলীর উসিলায় নিজের রুহানী উন্নতি ও আল্লাহর দরবারে ফয়েজ হাসিল করার জন্য। ওলী-আল্লাহগণ মাজারে সশরীরে ও রূহার্নীভাবে জ্যান্ত বা হায়াতুন্নবী আকিদার ছায়ায় সুরক্ষিত থাকেন। ইমাম শাফেয়ী রহমাতুল্লাহি আলাইহি তেনার কিতাবে লিখেছেন, “আমি যখনই কোনো কঠিন মুসিবতে পড়ি, তখন ইমাম আবু হানিফা রহমাতুল্লাহি আলাইহি-এর মাজার মোবারকে গিয়ে তেনার উসিলায় আল্লাহর দরবারে দোয়া করি এবং আল্লাহ আমার মুসিবত দূর করে দেন।” অতএব, ওলীগণের মাজার জিয়ারতের মাধ্যমে বরকত হাসিল করা স্বয়ং সালাফে সালেহীন ও ইমামগণের আমল দ্বারা চাক্ষুষ প্রমাণিত।
ওলী-আল্লাহদের মাজার কেন ইবাদত ও পরম ভক্তির পবিত্র স্থান
সুফিবাদের মূল নির্যাস অনুযায়ী, ওলী-আল্লাহদের মাজার হলো এক পরম ভক্তি ও আল্লাহর ইবাদত করার স্বর্গীয় মিলনমেলা। ওলী-আল্লাহরা জিন্দেগীভর আল্লাহর জিকির, নামাজ এবং ইশকে রসুলে নিজেদের বিলিয়ে দিয়েছেন। তেনাদের পবিত্র কদমের স্পর্শে যে মাটি ধন্য হয়েছে, সেখানে আল্লাহর রহমত ও নূরের বৃষ্টি অহর্নিশ সদা-সর্বদা ঝরতে থাকে। আশেক মুরিদগণ যখন ওলীদের মাজারে যান, তখন তেনাদের কলবে কোনো জাগতিক লোভ থাকে না, বরং আল্লাহর মহব্বত জ্যান্ত হয়ে ওঠে। মাজারে গিয়ে আল্লাহর জিকির করা, পবিত্র কুরআন তিলাওয়াত করা এবং দয়াল নবীর শানে দুরুদ ও সালামের তোহফা আরজ করা পরম ইবাদত।
ওহাবী ও সালাফী সম্প্রদায় সাধারণ মুসলমানদের বিভ্রান্ত করতে কুযুক্তি দেয় যে, সুন্নী মুসলমানরা নাকি ওলীদের পূজা করে (নাউজুবিল্লাহ)। ওলী-আল্লাহদের মতাদর্শে বিশ্বাসী কোনো খাঁটি সুন্নী আশেক কখনো মাজারে পূজা করে না। আশেকরা ওলী-আল্লাহদের সম্মান করে আল্লাহর খাস বন্ধু বা মাহবুব হিসেবে। ওলীর প্রতি এই ভক্তি ও আদব রাখা স্বয়ং ঈমানের মূল প্রাণ। কারণ যে আল্লাহর ওলীকে ভালোবাসলো, সে প্রকৃতপক্ষে আল্লাহ এবং তেনার রসূলকেই ভালোবাসলো। তাই ওলী-আল্লাহদের মাজার হলো ঈমানদারের কলব পরিষ্কার করার এবং বাতেনি ফয়েজ হাসিল করার এক রাজকীয় আস্তানা, যা চিরকাল ভক্তির স্থান হিসেবেই টিকে থাকবে।
মুখোশ উন্মোচন: সর্বপ্রথম কারা এবং কেন মাজার ভেঙেছিল?
মাজার ভাঙার এই হিংস্র ও ধ্বংসাত্মক আকিদা ইসলামের আদি ইতিহাসের কোনো অংশ নয়। ইসলামের ইতিহাস চাক্ষুষ সাক্ষী- ইসলামের সোনালী যুগে সাহাবায়ে কেরাম, তাবেয়ী ও তাবে-তাবেয়ীনগণের আমলে মক্কা ও মদিনা শরীফসহ পুরো বিশ্বে ওলী-আল্লাহ ও সাহাবিদের মাজার শরীফের ওপর রাজকীয় গম্বুজ ও সৌধ অক্ষত ছিল। তাহলে সর্বপ্রথম কারা এই পবিত্র মাজার ভাঙার অপকর্ম শুরু করেছিল? ইতিহাসের পাতা ও ওহাবীদের নিজস্ব তথ্য অনুযায়ী, আজ থেকে প্রায় আড়াইশো বছর পূর্বে আরবের নজদ এলাকায় মুহাম্মদ ইবনে আব্দুল ওহাব নজদী নামক এক চরমপন্থী বাতিল ব্যক্তির আত্মপ্রকাশ ঘটে, যে ওহাবী ফেরকার মূল প্রতিষ্ঠাতা।
এই ওহাব নজদী এবং তার অনুসারী ওহাবী সালাফী সম্প্রদায় আরবের বুকে এক চরম রক্তক্ষয়ী ফেতনা জ্যান্ত করে তোলে। তারা মক্কা ও মদিনার পবিত্র মাটি স্পর্শ করে জান্নাতুল বাকী এবং জান্নাতুল মুয়াল্লায় তাশরীফ রাখা আহলে বাইতে পাক, উম্মুল মুমিনীন হযরত খাদিজাতুল কুবরা রাদ্বিয়াল্লাহু আনহা এবং রসূলুল্লাহ ﷺ-এর খাস সাহাবিদের পবিত্র মাজার ও গম্বুজগুলো হাতুড়ি দিয়ে ভেঙে মাটির সাথে মিশিয়ে দেয় (নাউজুবিল্লাহ)। তাদের এই উগ্র মতাদর্শ সুফি আউলিয়াদের প্রতি হিংসা ও কুফুরির ওপর প্রতিষ্ঠিত। ওহাবীদের এই ঐতিহাসিক ধ্বংসযজ্ঞ চাক্ষুষ প্রমাণ করে যে, মাজার ভাঙার আকিদা কোনো শরিয়ত নয়, বরং এটি হলো নজদী ফেতনার এক উগ্র ও বাতিল বহিঃপ্রকাশ, যা আজ বিশ্বজুড়ে মুসলমানদের ঈমানী ঐতিহ্যকে ধ্বংস করার জন্য কাজ করছে।
বাংলাদেশের বর্তমান মাজার ভাঙার ভ্রান্ত আকিদার বিরুদ্ধে উপযুক্ত জবাব
বর্তমান সময়ে বাংলাদেশেও নজদী ওহাবী ও সালাফী উগ্রপন্থী ফেরকারা গা ঢাকা দিয়ে সাধারণ মুসলমানদের মধ্যে উস্কানি ছড়াচ্ছে এবং ওলী-আল্লাহদের পবিত্র মাজার ও খানকাহ ভাঙচুর করার চরম দুঃসাহস দেখাচ্ছে। তাদের এই ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে ইসলামের উসুলে ফেকাহ ও শরীয়তের আলোকে উপযুক্ত দাঁতভাঙা জবাব দেওয়া প্রতিটি খাঁটি সুন্নী মুসলমানের ঈমানী দায়িত্ব। এই বাতিল ফেরকারা দাবি করে মাজার নাকি ইসলামে নেই। তাদের এই ফতোয়া চাক্ষুষ মিথ্যা। হযরত শাহ জালাল রহমাতুল্লাহি আলাইহি, হযরত শাহ পরান রহমাতুল্লাহি আলাইহি,গাউসুল আজম সৈয়দ আহমদ উল্লাহ মাইজভাণ্ডারী রহমাতুল্লাহি আলাইহি, সৈয়দ আবেদ শাহ আল-মাদানী রহমাতুল্লাহি আলাইহি, মোল্লা কাজীম উদ্দিন আউলিয়া কালিয়াপুরী রহমাতুল্লাহি আলাইহি, আব্দুর রহমান ক্বেবলা কা’বা কালিয়াপুরী রহমাতুল্লাহি আলাইহি,আকবর আলী রেজভী রহমাতুল্লাহি আলাইহি এবং দয়াল বাবা জালালী মাওলাসহ সকল মহান ওলী-আল্লাহদের পবিত্র কদমের উসিলাতেই আজ বাংলাদেশে ইসলামের নূরের আলো জ্যান্ত হয়েছে। তেনাদের পবিত্র মাজারগুলো বাংলাদেশের ইসলামি সংস্কৃতির মূল শিকড়।
আইন নিজের হাতে তুলে নিয়ে ওলী-আল্লাহদের মাজার ভাঙা শরিয়ত ও রাষ্ট্রের দৃষ্টিতে এক চরম অপরাধ। ইসলাম কখনো উগ্রতা ও ভাঙচুর সমর্থন করে না। ওহাবী-সালাফীদের এই সন্ত্রাসী আচরণ চাক্ষুষ প্রমাণ করে যে, তেনাদের কলবে নূর নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও ওলী-আল্লাহদের প্রতি বিন্দুমাত্র মহব্বত নেই, বরং নজদী কুফুরির আগুন জ্বলছে। মাজার ভাঙলেই ওলীদের আধ্যাত্মিক বেলায়েত ও শান কখনো মুছে ফেলা যায় না। ওলী-আল্লাহদের মাজার ঈমানদারের কলবে ছিল, আছে এবং কেয়ামত পর্যন্ত একশত ভাগ সচল ও জ্যান্ত থাকবে। বাতিল ফেরকাদের এই মুখোশ আজ বাংলার জমিনে চাক্ষুষ উন্মোচিত হয়ে গেছে।
উপসংহার ও ওলী-আল্লাহদের ইশকে অটল থাকার রাজকীয় আহ্বান
পরিশেষে বলা যায়, ওলী-আল্লাহদের মাজার হলো হকের এক অনন্য আলোকবর্তিকা এবং ওলী-আউলিয়াদের দেখানো সুন্নী মতাদর্শই হলো সিরাতুল মুস্তাকিমের একমাত্র রাজপথ। আজকের এই ফেতনার যুগে বাতিল ওহাবী ও সালাফী ফেরকাদের বিভ্রান্তিকর বয়ান ও উগ্রতা থেকে নিজের ঈমান রক্ষা করা পরম ফরজ দায়িত্ব। আসুন, আমরা ওলী-আউলিয়াদের প্রতি অকৃত্রিম মহব্বত ও নিঃশর্ত ইশক রাখি, মাজার ভাঙচুরকারী বাতিলদের সমস্ত মনগড়া ফতোয়া ও উগ্রতাকে বর্জন ও প্রতিরোধ করি। মহান আল্লাহ রব্বুল আলামীন আমাদের সকলকে ওলী-আল্লাহদের পবিত্র উসিলায় দুনিয়া ও আখেরাতের চিরন্তন কল্যাণ দান করুন এবং ঈমানি মউত নসীব করুন। আমীন।







1 thought on “ওলী-আল্লাহদের মাজার ছিল, আছে এবং থাকবে: পবিত্র মাজার ভাঙার ভ্রান্ত আকিদা ও বাতিল ফেরকার মুখোশ উন্মোচন।”