নূর নবীজি ﷺ নূর নাকি মাটি? পবিত্র কুরআন ও হাদিসের আলোয় বাতিলদের ভ্রান্ত আকিদা খণ্ডন।

নূর নবীজি ﷺ নূর নাকি মাটি? পবিত্র কুরআন ও হাদিসের আলোয় বাতিলদের ভ্রান্ত আকিদা খণ্ডন এবং বাশার ও মিছলুকুম শব্দের প্রকৃত আভিধানিক অর্থ জানতে পড়ুন কিতাবী দলিল সমৃদ্ধ এই ঐতিহাসিক পোস্ট।

August 28, 2026 5:56 PM
নূর নবীজি ﷺ নূর নাকি মাটি পবিত্র কুরআন ও হাদিসের আলোয় বাতিলদের ভ্রান্ত আকিদা খণ্ডন
---Advertisement---

দয়াল নবী আপনার দরবারে আমি গোলাম হাজির হইয়াছি।

নূর নবীজি ﷺ নূর নাকি মাটি-বর্তমান মুসলিম সমাজে তথাকথিত কিছু ইসলামপন্থী ও উগ্র সালাফী-ওহাবী ফেরকাদের মনগড়া ফতোয়ার কারণে এটি একটি চরম বিতর্কিত বিষয়ে পরিণত হয়েছে, যা আধুনিক যুগের এক জঘন্য ধর্মীয় অবক্ষয় ও বাস্তবতা। মুখে নিজেদের ইসলামের ধারক-বাহক দাবি করলেও, এই বাতিল ফেরকারা নূর নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম যে নূর তা অস্বীকার করে, তাদের নিজেদের মতো একজন ‘সাধারণ মাটির মানুষ’ বলে দাবি করার দুঃসাহস দেখায়। তাদের এই ভ্রান্ত আকিদা মূলত ঈমান হরণের এক জঘন্য চক্রান্ত। আজ আমরা পবিত্র কুরআন, সহীহ হাদিস শরীফের অকাট্য দলিল, সাহাবায়ে কেরামের পবিত্র আকিদা এবং আউলিয়ায়ে কেরামের অমিয় বাণীর জৌলূস ছড়ানো আলোয় জানবো নূর নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নূরানী সত্তার নিগূঢ় হাকিকত এবং বাতিলদের কুযুক্তির মুখোশ চাক্ষুষ উন্মোচন করব

পবিত্র কুরআনের অকাট্য দলীলের আয়নায় রাসূলে পাক ﷺ-এর নূরানী হাকিকত

আহলে সুন্নাত ওয়াল জামায়াতের আকিদা অনুযায়ী মহান আল্লাহ রব্বুল আলামীন আল্লাহ তাঁর প্রিয় হাবীব নূর নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে সর্বপ্রথম নিজের নূর থেকে সৃষ্টি করেছেন। পবিত্র কুরআনের সূরা মায়েদার ১৫ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ পাক এরশাদ করেন: “ক্বাদ জা-আকুম মিনাল্লাতি নূরুন ওয়া কিতাবুম মুবীন।” অর্থাৎ, “নিশ্চয়ই তোমাদের নিকট আল্লাহর পক্ষ থেকে এসেছে নূর এবং সুস্পষ্ট কিতাব।”

আলা হযরত ইমাম আহমদ রেযা খান বেরলভী রহমাতুল্লাহি আলাইহি তেনার কালজয়ী ‘তাফসীরে কানযুল ঈমান’ এবং হাকিমুল উম্মাত মুফতি আহমদ ইয়ার খান নঈমী রহমাতুল্লাহি আলাইহি তেনার ‘তাফসীরে নূরুল ইরফান’-এ অকাট্য আরবী ব্যাকরণের আলোয় চাক্ষুষ প্রমাণ করেছেন যে- এই আয়াতে বর্ণিত ‘নূর’ শব্দের একমাত্র প্রকৃত হাকিকত হলেন স্বয়ং নূর নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবং ‘কিতাব’ হলো পবিত্র কুরআন।

জগৎবিখ্যাত তাফসীর কারক ইমাম জালালুদ্দীন সুয়ূতী রহমাতুল্লাহি আলাইহি তেনার ‘তাফসীরে জালালাইন’  ইমাম তাবারী রহমাতুল্লাহি আলাইহি তেনার ‘তাফসীরে তাবারী’ এবং ইমাম ফখরুদ্দীন রাযী রহমাতুল্লাহি আলাইহি তেনার ‘তাফসীরে কাবীরে অকাট্য সনদে লিপিবদ্ধ করেছেন যে- এই আয়াতে ‘নূর’ শব্দ দ্বারা স্বয়ং নূর নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে বোঝানো হয়েছে। অতএব, স্বয়ং আল্লাহ পাক যেনাকে ‘নূর’ বলে পাঠালেন, তেনাকে যারা অবলীলায় শুধু ‘মাটি’ বলে ফতোয়া দেয়, তাদের বাতেনি অন্ধত্ব এক পরম মূর্খতার শামিল। নূর নবীজি ﷺ নূর নাকি মাটি এই প্রশ্নের চূড়ান্ত ফয়সালা স্বয়ং আল্লাহর কালাম দ্বারাই একশত ভাগ প্রমাণিত।

সহীহ হাদিস শরীফের আলোয় সৃষ্টির আদি হাকিকত ও ‘নূরে মোহাম্মদী’

পবিত্র হাদিস শরীফের মহাসমুদ্র গভীর অনুসন্ধান করলে দেখা যায়, যখন আসমান, জমিন, আরশ-কুরসি, লওহ-কলম, জান্নাত কিংবা জাহান্নাম- কোনো কিছুরই অস্তিত্ব ছিল না, তখনও নূর নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নূর মোবারক আল্লাহর দরবারে ছিল। মুসান্নাফে ইবনে আবী শায়বাহ এবং ইমাম কাসতালানী রহমাতুল্লাহি আলাইহি তেনার ‘মাওয়াহিবুল লাদুন্নিয়া’ গ্রন্থে মুহাদ্দিসগণের নির্ভরযোগ্য ও বিশুদ্ধ সনদে হযরত জাবের রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত বিখ্যাত হাদিসটি উল্লেখ করেছেন।

হযরত জাবের রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু আরজ করলেন, “ইয়া রসূলাল্লাহ সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম! আমার পিতা-মাতা আপনার কদম মোবারকে কোরবান হোক, আপনি মেহেরবানী করে জানান-মহান আল্লাহ সর্বপ্রথম কোন জিনিস সৃষ্টি করেছিলেন?” তখন কুল কায়েনাতের রহমত, দয়াল নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরশাদ করলেন, “হে জাবের! নিশ্চয়ই মহান আল্লাহ রব্বুল আলামীন সমস্ত কিছু সৃষ্টির পূর্বে তেনার নিজের নূর হতে তোমার নবীর নূরকে সৃষ্টি করেছেন।” এই সহীহ দালিলিক বিবরণ চাক্ষুষ প্রমাণ করে যে, মহান আল্লাহ নূর নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নূর মোবারক সর্বপ্রথম সৃষ্টি করেছেন। যা উগ্র ওহাবী ও সালাফী ফেরকাদের কুযুক্তির বুকে হকের এক প্রচণ্ড আঘাত।

সাহাবায়ে কেরামগণের আকিদা এবং নূর নবীজির শানে ঈমানী কাসিদা

নূর নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর পাশে থাকা পবিত্র সাহাবায়ে কেরামগণ তেনাকে কোন আকিদায় দর্শন করতেন, তা জানা আমাদের ঈমান রক্ষার জন্য পরম ফরজ দায়িত্ব। নিচে আউলিয়ায়ে কেরামের কিতাবী দলীলমালার আলোয় সাহাবায়ে কেরামগণের সেই খাঁটি ঈমানী আকিদা তুলে ধরা হলো
শেরে খোদা মাওলা আলী আলাইহিস সালাম স্বয়ং দয়াল নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর বাতেনি হাকিকত বর্ণনা করতে গিয়ে এরশাদ করেছেন, ‘রাসূলে পাক নূর নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন আমাদের মাঝে হেঁটে তাশরীফ নিতেন, তেনার পবিত্র দেহ মোবারক থেকে এমন এক নূরের জ্যোতি বিচ্ছুরিত হতো, যা অন্ধকার রাতকেও পূর্ণিমার আলোর মতো উজ্জ্বল করে তুলত।
দলিল:
১. সুনানে তিরমিযী শরীফ: ইমাম তিরমিযী রহমাতুল্লাহি আলাইহি তেনার ‘কিতাবুশ শিমায়িল’ (শিমায়িলে তিরমিযী)-এর শুরুতেই মওলা আলী আলাইহিস সালাম থেকে এই হাদিসটি নির্ভরযোগ্য সনদে বর্ণনা করেছেন [হাদিস নম্বর: ৭]।
২. দলাইলুন নবুওয়াত: ইমাম বায়হাকী রহমাতুল্লাহি আলাইহি তেনার কিতাবের ১ম খণ্ডে মওলা আলী আলাইহিস সালাম-এর সূত্রে স্পষ্ট উল্লেখ করেছেন যে-নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন হাঁটতেন, তেনার নূরানী শরীর মোবারক থেকে কুদরতি আলো বিচ্ছুরিত হতো এবং তেনার কোনো ছায়া মাটিতে পড়ত না।”

নূর নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর আপন চাচাতো ভাই হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু, যিনি ছোটবেলা থেকেই নূর নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর খেদমত করেছেন। একদিন তেনার পরম আদব দেখে নূর নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম তেনার বুকে কুদরতি হাত মোবারক রেখে খাস দোয়া করলেন-‘হে আল্লাহ! তুমি একে দ্বীনের গভীর জ্ঞান এবং কুরআনের তাফসীর বোঝার খাস তৌফিক দান করো।’

এই কুদরতি দোয়ার বরকতেই তিনি ইসলামের ইতিহাসে ‘রইসুল মুফাসসিরীন’ (তাফসীর কারকগণের সুলতান) এবং ‘বাহরুল এলম’ (জ্ঞানের মহাসমুদ্র) উপাধিতে ভূষিত হয়েছেন। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু তেনার জগতখ্যাত ‘তাফসীরে আব্বাসিয়া’তে সূরা মায়েদার ১৫ নম্বর আয়াতের তাফসির করতে গিয়ে স্পষ্ট এরশাদ করেন- পবিত্র কুরআনে আল্লাহ পাক যে ‘নূর’ এর কথা বলেছেন, সেই নূর হলো স্বয়ং দয়াল নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম। তিনি আরও বলেন- নূর নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন সূর্যের আলোতে কিংবা চাঁদের আলোতে হাঁটতেন, তেনার কোনো ছায়া জমিনে দৃশ্যমান হতো না। কারণ আলোর কখনো কোনো ছায়া হয় না, ছায়া কেবল অন্ধকার বা ঘন অস্বচ্ছ বস্তুর হয়।

নূর নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন তাবুক যুদ্ধ থেকে বিজয়ী হয়ে মদিনায় ফিরলেন, তখন তেনার আপন চাচা হযরত আব্বাস ইবনে আব্দুল মুত্তালিব রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু নবীজির সামনে দাঁড়িয়ে এই কাসিদাটি পড়েছিলেন-
‘মিন ক্বাবলিহা ত্বিবতা ফিজ জিলালি ওয়া ফী মুসতাওদা’ইন হাইছু ইয়ুখসাফুল ওয়ারাক্ব। ওয়া আন্তা লাম্মা উলিদতা আশরাক্বাতিল আরদ্বু ওয়া দ্বাআত বিনূরিকাল উফুক্ব।’
অর্থ: হে দয়াল নূর নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম! হযরত আদম আলাইহিস সালামকে যখন জান্নাতে গাছের পাতা দিয়ে আবৃত করা হচ্ছিল, আপনি তেনারও আগে কুদরতি ছায়ায় এক পরম পবিত্র নূরানী অবস্থায় আসীন ছিলেন। অতঃপর যখন আপনি দুনিয়ার বুকে শুভ আগমন করলেন, তখন আপনার নূরের কুদরতি আলোয় সমগ্র পৃথিবী আলোকোজ্জ্বল হয়ে উঠেছিল এবং আসমান আপনার নূরের জ্যোতিতে ঝলমল করে উঠেছিল। এবং আপনার সেই নূরের জ্যোতির ছায়াতেই আজ আমরা হকের সিরাতুল মুস্তাকিমের পথ চাক্ষুষ খুঁজে পেয়েছি।” সাহাবায়ে কেরামের এই সমস্ত খাঁটি ঈমানী আকিদা চাক্ষুষ প্রমাণ করে যে, সাহাবাগণ নূর নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লামকে মাটি নয় বরং নূর মনে করতেন।
দলিল: জগৎবিখ্যাত মুহাদ্দিস ইমাম আবু বকর বাইহাকী রহমাতুল্লাহি আলাইহি তেনার ‘দলাইলুন নবুওয়াত’ কিতাবে এই বাণী মোবারক নির্ভরযোগ্য সনদে উল্লেখ করেছেন।”
উম্মুল মুমিনীন হযরত মা আয়েশা সিদ্দীকা রাদ্বিয়াল্লাহু আনহা হতে বর্ণিত-তিনি এরশাদ করেন, “আমি রাত্রে প্রদীপের (বাতির) আলোতে বসে নবী করীম সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর পবিত্র কাপড় মোবারক সেলাই করছিলাম। এমন সময় প্রদীপটি কোনো কারণে নিভে গেল এবং আমি সুঁচটি হারিয়ে ফেললাম। এর পরপরই নবী করীম সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম সেই অন্ধকার ঘরে প্রবেশ করলেন। তেনার পবিত্র চেহারা মোবারকের কুদরতি নূরের জ্যোতিতে আমার পুরো অন্ধকার ঘর আলোময় হয়ে গেল এবং আমি সেই নূরের আলোতেই আমার হারানো সুঁচটি খুঁজে পেলাম।

দলিল: ইমাম জালালুদ্দীন সুয়ূতী রহমাতুল্লাহি আলাইহি তেনার ‘আল-খাসাইসুল কুবরা, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা নং ১৫৬  কিতাবে উল্লেখ করেছেন।”

নূর নবীজি ﷺ নূর নাকি মাটি? ওলী-আল্লাহগণের বাণীর আয়নায় আসল সত্য উন্মোচন

গাউছুল আজম বড় পীর হযরত আব্দুল কাদির জিলানী রহমাতুল্লাহি আলাইহি তেনার অমর আধ্যাত্মিক কিতাব ‘সিররুল আসরার’-এর প্রথম অধ্যায়ে সৃষ্টির আদি রহস্য উন্মোচন করে এক জগতকাঁপানো হাকিকত এরশাদ করেছেন। তিনি বলেন, ‘জেনে রাখো, মহান আল্লাহ রব্বুল আলামীন সর্বপ্রথমে যা সৃষ্টি করেছেন, তা হলো নূরে মোহাম্মদী সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম। স্বয়ং আল্লাহ পাক এরশাদ করেছেন-আমি আমার কুদরতি নূর থেকে আমার বন্ধু নূর নবীজি ﷺ-এর নূর মোবারক সৃষ্টি করেছি, আর সেই পবিত্র নূর হতেই আরশ, কুরসি, লওহে মাহফুজ, কলম, ফেরেশতা এবং সমগ্র কুল কায়েনাত সৃষ্টি করেছি।

ইমামে রব্বানী মুজাদ্দিদে আলফে সানী রহমাতুল্লাহি আলাইহি তেনার অমর কিতাব ‘মাকতুবাত শরীফ’-এর ১ম খণ্ডে এক জগতকাঁপানো হাকিকত চাক্ষুষ বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন- নবীজির এই বাশারিয়্যাত হলো মূলত আল্লাহর একটি কুদরতি পর্দা। যদি নবীজি তেনার আসল নূরের তীব্র জ্যোতি নিয়ে সরাসরি প্রকাশ পেতেন, তবে দুনিয়ার কোনো মানুষ তেনার সামনে এক সেকেন্ডও টিকতে পারত না, সবাই নূরের আলোয় পুড়ে ছাই হয়ে যেত। উম্মত যেন তেনার কাছে এসে ঈমান কবুল করতে পারে, সেজন্যই তিনি বাশারী সুরতে শুভ আগমন করেছেন। অতএব, দুনিয়ার কোনো সাধারণ মাটির মানুষের সাথে তেনাকে তুলনা করা এক পরম বাতেনি অন্ধত্বের শামিল।

ইমামে রব্বানী মুজাদ্দিদে আলফে সানী রহমাতুল্লাহি আলাইহি আরও এরশাদ করেন, ‘দয়াল নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর বাশারিয়্যাত বা মানবীয় লেবাস হলো মূলত একটি কুদরতি পর্দা; যাতে সাধারণ মানুষ তেনার নূরের তীব্র জ্যোতিতে পুড়ে না গিয়ে পরম সুখে তেনার সান্নিধ্যে এসে ঈমান কবুল করতে পারে। কিন্তু যারা কেবল সেই বাহ্যিক পর্দাকেই একমাত্র সত্য মনে করে ভেতরের আসল কুদরতি নূরকে অস্বীকার করে, তাদের মানসিক হাকিকত মূলত আবু লাহাব ও আবু জাহেলের সেই বাতেনি অন্ধত্বের মতোই-যারা নূর নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে কেবলই একজন সাধারণ মাটির মানুষ মনে করে চিরতরে ঈমান থেকে মাহরূম হয়েছিল।

ভারতবর্ষের আধ্যাত্মিক সম্রাট, সুলতানুল হিন্দ হযরত খাজা মঈনুদ্দীন চিশতী গরীব নওয়াজ রহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, ‘নূর নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম হলেন আল্লাহর জাতি নূরের জ্যোতি। আজ সমগ্র হিন্দুস্তানে ইসলামের যে নূরের আলো ছড়িয়ে পড়েছে, তা মূলত দয়াল নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সেই পবিত্র নূরে মোহাম্মদীরই এক জ্যান্ত মোজেজা!’ চিশতীয়া তরিকার এই মহান ওলীর নূরানী বাণী ঈমানদার মুসলমানদের আকিদাকে যুগের পর যুগ ধরে হিরের টুকরোর মতো ঝকঝকে ও লোহার মতো মজবুত করে তোলে।

একইভাবে চতুর্দশ হিজরীর মহান মুজাদ্দিদ, আলা হযরত ইমাম আহমদ রেযা খান ফাযেলে বেরলভী রহমাতুল্লাহি আলাইহি তেনার বিশ্ববিখ্যাত ও কালজয়ী পবিত্র কুরআনের তরজমা ‘তাফসীরে কানযুল ঈমান’ এবং তেনারই খাস শরাহ ‘তাফসীরে নূরুল ইরফান’-এ সূরা আল-মায়েদার ১৫ নম্বর আয়াতের তাফসির ও বাতেনি মর্ম চাক্ষুষ উন্মোচন করতে গিয়ে স্পষ্ট ফয়সালা দান করেছেন যে- এই পবিত্র আয়াতে আল্লাহ পাক বর্ণিত ‘নূর’ বলতে একক ও সুনির্দিষ্টভাবে স্বয়ং নূর নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে বোঝানো হয়েছে।

তরিকতের আসমানের উজ্জ্বল নক্ষত্র, দয়াল বাবা জালালী মাওলা বলেন- ‘আমার দয়াল নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম কেবল কোনো সাধারণ সৃষ্টিগত নূর নন, তেনাকে অন্য কোনো সৃষ্টির মতো সহজে পরিমাপ করা যায় না; বরং তিনি হলেন স্বয়ং আল্লাহ পাকের পবিত্র জাতি নূরের জ্যোতি! তিনি হলেন রহমাতুল্লিল আলামিন, সমগ্র সৃষ্টিজগৎ তেনার রহমতে টিকে আছে। যে সৌভাগ্যবান ব্যক্তি নূর নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর এই চিরন্তন, অলৌকিক ও নূরানী হাকিকতকে কোনো প্রকার কুযুক্তি ছাড়া নিজের অন্তরের অন্তস্তল থেকে বিশ্বাস ও মনে-প্রাণে স্বীকার করে, সে-ই হলো জগতের বুকে রাসূলে পাকের প্রকৃত আশেকে রসূল, হক্কানী সুন্নী এবং একশত ভাগ খাঁটি ঈমানদার

বাতিল ওহাবী-সালাফীদের কুযুক্তির দাঁতভাঙা জবাব ও শরয়ী খণ্ডন

তথাকথিত ইসলামপন্থীরা ঈমানদার মুসলমানদের ঈমান হরণ করতে পবিত্র কুরআনের সূরা আল-কাহাফের ১১০ নম্বর আয়াতের একটি খণ্ডিত অংশ পেশ করে কুযুক্তি দেখায়। তারা ‘কুল ইন্নামা আনা বাশারুম মিছলুকুম’ অংশে ব্যবহৃত ‘বাশারুম’ শব্দের সরল অর্থ করে ‘মানুষ’ এবং ‘মিছলুকুম’ শব্দের অর্থ করে ‘তোমাদের মতো’। এর ওপর দাঁড়িয়ে তারা সরাসরি দাবি করে- ‘বলুন, আমি তো তোমাদের মতোই একজন মানুষ’! কিন্তু আরবী ভাষাতত্ত্বের গভীর ব্যাকরণে ‘বাশার’ শব্দের প্রকৃত হাকিকত কি কেবলই সাধারণ মানুষ? আরবী অভিধানের মহাসমুদ্র ‘লিসানুল আরব’ ও ‘তাজুল আরুস’ এবং শব্দতাত্ত্বিক গবেষণায় চাক্ষুষ দেখা যায়-‘বাশার’ শব্দটি মূলত ‘বাশারা’ থেকে উৎসারিত, যার মূল আভিধানিক অর্থ হলো ‘ত্বক’, ‘উন্মুক্ত চামড়া’ বা ‘বাহ্যিক অবয়ব’।”
‘বাশারিয়্যাত’ মূলত মানুষের বাহ্যিক আকৃতি, জন্ম, মৃত্যু, ক্ষুধা, তৃষ্ণা এবং রক্ত-মাংসের প্রকাশ্য কাঠামো বা লেবাসকে নির্দেশ করে। অর্থাৎ, আরবী ব্যাকরণের নিরেট মানদণ্ডে ‘বাশার’ শব্দের প্রকৃত ও বাতেনি অর্থ হলো কভার বা কুদরতি পর্দা! এই ভাষাতাত্ত্বিক সত্য থেকে প্রমাণিত হয় যে-কুল কায়েনাতের রহমত, নূর নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম মানবজাতির হেদায়াতের জন্য বাহ্যিক মানবীয় সুরতে বা কুদরতি মানবীয় কভারে আমাদের মাঝে শুভ আগমন করছেন, তেনার বাতেনি হাকিকত একশত ভাগ আল্লাহর জাতি নূর। তিনি বাহ্যিক অবয়বে মানুষের বেশে শুভ আগমন করলেও আমাদের মতো কোনো সাধারণ মানুষ নন।
বিশ্বখ্যাত সুফী মুফাসসির আল্লামা ইসমাইল হক্কী বরূসবী রহমাতুল্লাহি আলাইহি তেনার কালজয়ী ‘তাফসীরে রূহুল বায়ান’-এ ‘মিছলুকুম’ শব্দের প্রকৃত ও বাতেনি হাকিকত চাক্ষুষ উন্মোচন করে এক অকাট্য শরয়ী ফয়সালা দান করেছেন। আরবী ভাষাতত্ত্বের গভীর ব্যাকরণ ও উসুলের নিয়মে তিনি সাব্যস্ত করেছেন যে-‘মিছলুকুম’ শব্দের প্রকৃত ও আসল অর্থ হলো ‘তোমাদের বাহ্যিক আকৃতির সদৃশ’ বা ‘তোমাদের প্রকাশ্য লেবাসের মতো’। জগৎবিখ্যাত এই তাফসীর গ্রন্থে স্পষ্ট অক্ষরে ফয়সালা দেওয়া হয়েছে- এই শব্দ দ্বারা দয়াল নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম কেবল তেনার প্রকাশ্য মানবীয় অবয়ব ও সুরতের বাহ্যিক সাদৃশ্যতাটুকু বুঝিয়েছেন; যা সাধারণ মানুষের সাথে যোগাযোগের জন্য মহান আল্লাহর একটি কুদরতি পর্দা! প্রকৃত হাকিকত তিনি হলেন স্বয়ং আল্লাহ পাকের জাতি নূর, যা সমগ্র কায়েনাত ও তামাম মখলুকাতের সমস্ত চিন্তার সীমানার বহু ঊর্ধ্বে আসীন।
পবিত্র কুরআনের সূরা কাহাফের ১১০ নম্বর আয়াতের এই মহিমান্বিত অংশটি তথাকথিত উগ্র আলেমগণ চাক্ষুষ লুকিয়ে ফেলে; যেখানে স্বয়ং আল্লাহ পাক এরশাদ করেছেন-‘ইউহা ইলাইয়্যা’ যার প্রকৃত ও আসল অর্থ হলো ‘আমার প্রতি ওহী (আল্লাহর বাণী) নাজিল বা অবতীর্ণ করা হয়’। জগৎবিখ্যাত সুফী মুফাসসির আল্লামা ইসমাইল হক্কী বরূসবী রহমাতুল্লাহি আলাইহি তেনার কালজয়ী ‘তাফসীরে রূহুল বায়ান’-এ এবং হাকিমুল উম্মাত মুফতি আহমদ ইয়ার খান নঈমী রহমতুল্লাহি আলাইহি তেনার ‘তাফসীরে নূরুল ইরফান’-এ এই ‘ইউহা ইলাইয়্যা’ শব্দের এক পরম অলৌকিক ও বৈজ্ঞানিক হাকিকত চাক্ষুষ সাব্যস্ত করেছেন।”
“তেনারা স্পষ্ট লিখেছেন-মহান আল্লাহর পবিত্র কালাম বা ওহী হলো সরাসরি এক প্রচণ্ড ও তীব্র কুদরতি নূরের আলো। আর আরবী ব্যাকরণের অকাট্য উসুল ও সৃষ্টির নিয়মানুযায়ী- জগতের কোনো সাধারণ মানুষ সরাসরি আল্লাহর সেই তীব্র নূরানী ওহী বা ফেরেশতা জিব্রাইল আলাইহিস সালাম এর ভার ধারণ করার বিন্দুমাত্র যোগ্যতা রাখে না। ওহীর সেই মহা-আলো নিজের ভেতর ধারণ করার জন্য যে অনন্ত আত্মিক শক্তি ও রূহার্নী আলোর প্রয়োজন, তা একমাত্র নূর নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এরই রয়েছে! অতএব, ‘ইউহা ইলাইয়্যা’ শব্দ প্রমাণ করে যে-দয়াল নবীজি বাহ্যিক লেবাসে মানবীয় সুরতে দুনিয়ার বুকে শুভ আগমন করলেও, তেনার বাতেনি সত্তা একশত ভাগ আল্লাহর জাতি নূর। যেমনটি কাঁচ এবং হিরা-উভয়টি দেখতে এক মনে হলেও তার হাকিকত যেমন সম্পূর্ণ আলাদা, ঠিক তেমনি নূর নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম মানবীয় লেবাসে শুভ আগমন করলেও তিনি হলেন নূর ।

শেষ কথা: ঈমানী আকিদার অপরাজেয় দুর্গ

নূর নবীজি ﷺ নূর নাকি মাটি- পবিত্র কুরআন, সহীহ হাদিস শরীফের অকাট্য দলিল, সাহাবায়ে কেরামগণের পবিত্র আকিদা এবং আউলিয়ায়ে কেরামের অমিয় বাণীর জৌলূস ছড়ানো আলোয় আজকের এই দীর্ঘ আলোচনা হতে প্রমাণিত হলো যে, এই প্রশ্নটি কোনো সাধারণ বিতর্কিত বিষয় নয়, বরং এটি ঈমানদার মুসলমানদের ঈমান রক্ষার মূল স্তম্ভ! তথাকথিত ইসলামপন্থী ও উগ্র সালাফী-ওহাবী ফেরকারা নিজেদের বাতেনি অন্ধত্ব লুকাতে পবিত্র কুরআনের সূরা কাহাফের ১১০ নম্বর আয়াত কিংবা সূরা মায়েদার ১৫ নম্বর আয়াতের যে খণ্ডিত ও মনগড়া অপব্যাখ্যা ছড়ায়, আরবী ভাষাতত্ত্বের গভীর ব্যাকরণ এবং তাফসীরে রূহুল বায়ান ও কানযুল ঈমানের অকাট্য দলীলের কুঠারাঘাতে তেনাদের সেই জঘন্য কুযুক্তির মুখোশ চাক্ষুষ উন্মোচিত হয়েছে।
দয়াল নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম মানবজাতির হেদায়াতের জন্য মানবীয় সুরতে বা মানবীয় লেবাসে আমাদের মাঝে শুভ আগমন করলেও, তিনি হলেন আল্লাহ পাকের জাতি নূরের জ্যেতি। গাউছুল আজম বড় পীর হযরত আব্দুল কাদির জিলানী রহমাতুল্লাহি আলাইহি থেকে শুরু করে ইমামে রব্বানী মুজাদ্দিদে আলফে সানী রহমাতুল্লাহি আলাইহি, খাজা গরীব নওয়াজ রহমাতুল্লাহি আলাইহি এবং আলা হযরত ইমাম আহমদ রেযা খান ফাযেলে বেরলভী রহমাতুল্লাহি আলাইহিসহ সমস্ত ওলী-আল্লাহগণের ফয়সালা একশত ভাগ সাব্যস্ত করেছে যে-দয়াল নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লামকে নিজেদের মতো একজন ‘সাধারণ মাটির মানুষ’ মনে করা আবু জাহেল ও আবু লাহাবের সেই অভিশপ্ত কুফরি আকিদারই জঘন্য নামান্তর, যা মানুষকে চিরতরে ঈমান থেকে মাহরূম করে দেয়।
অতএব, আসুন তরিকতের আসমানের উজ্জ্বল নক্ষত্রগণের দেখানো পথে কোনো প্রকার কুযুক্তি ছাড়া দয়াল নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে আল্লাহর জাতি নূর হিসেবে মনে-প্রাণে স্বীকার করে জগতের বুকে নিজেদের প্রকৃত আশেকে রসূল, হক্কানী সুন্নী এবং একশত ভাগ খাঁটি ঈমানদার হিসেবে গড়ে তুলি। মহান আল্লাহ আমাদের সকলকে বাতিলদের ঈমান হরণের চক্রান্ত থেকে হেফাজত করুন এবং নূর নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর পবিত্র নূরানী শাফায়াত নসীব করুন-আমীন, ছম্মা আমীন!

Join WhatsApp

Join Now

Join Telegram

Join Now

Leave a Comment