দয়াল নবী আপনার দরবারে আমি গোলাম হাজির হইয়াছি।
এ এক চোরের গল্প, যার জীবন বদলে যায় একজন জিকিররত দরবেশের নীরব আলো ও কোমল বাক্যের ছোঁয়ায়। এটি শুধুই একটি চুরির গল্প নয়- এটি এক অন্তর পরিবর্তনের গল্প, যেখানে একজন মানুষ ভেতর থেকে নতুনভাবে জীবন শুরু করে। কখনো কখনো আল্লাহ কোনো এক মুহূর্তেই বান্দার অন্তরকে জাগিয়ে দেন। সেই মুহূর্ত আসে এক সাধকের নিঃশব্দ যিকরে, চোখের শান্ত চাহনিতে, বা এক বাক্যের আলতো ঝঙ্কারে। এই গল্প আমাদের শেখায়- আল্লাহর রহমতের দরজা কখনো বন্ধ হয় না। তওবার আলো সেই পথকেই আলোকিত করে, যেটি দীর্ঘদিন অন্ধকারে ছিল।
আসুন জানি, কিভাবে এক দরবেশের আধ্যাত্মিক আলোর ছোঁয়ায় বদলে গেল এক চোরের জীবন।
তওবার অশ্রুতেই খুলে গেল আল্লাহর রহমতের দরজা।
তওবার আলোর গল্প
এক গ্রামে ছিল এক চোর- নির্লজ্জ, নির্দয়। তার অত্যাচারে কেউ ঘরে কিছু রাখতে পারত না। মানুষ রাত্রি হলে দুশ্চিন্তায় থাকত, কখন যেন চোর এসে সব নিয়ে যায়।
একদিন সন্ধ্যায় সেই গ্রাম দিয়ে এক দরবেশ হেঁটে যাচ্ছিলেন। পথে গ্রামের পাশেই একটা বিশাল বটগাছ দেখে তিনি থেমে গেলেন। গাছের ছায়া, পাখির কিচিরমিচির- সবকিছুতেই ছিল এক শান্তির ছোঁয়া। দরবেশের কাধে থাকা পোটলাটি পাশে রেখে বসে পড়লেন। চোখ বন্ধ করে তিনি ডুবে গেলেন পরম প্রিয় রবের যিকরে।
রাত গভীর হলো। ঠিক সেই সময় সেই চোর চুপিচুপি গ্রামের বাইরে যাচ্ছিল নতুন কোনো শিকারের খোঁজে। হঠাৎ সে দেখতে পেল- বটগাছের নিচে এক লোক বসে আছে, তার পাশে একটি পোটলা। চোরের চোখ চকচক করে উঠল। মনে মনে বলল, “বাহ! আজ ভাগ্য সহায়। কোথাও যেতে হবে না- রাস্তাতেই মাল পড়ে আছে!”
সে ধীরে ধীরে দরবেশের দিকে এগিয়ে গেল। পা টিপে টিপে এসে পোটলায় হাত রাখল- ঠিক তখনই দরবেশ ধীরে চোখ খুলে মৃদু হেসে বললেন, “বলো হে পথিক, তুমি কি দুনিয়ার মাল চাও- না অন্তরের শান্তি?” চোর কেঁপে উঠল। শব্দটা যেন মাটি ফাটিয়ে তার অন্তরে গিয়ে লাগল। সে ভাবতে লাগল, “কে এই লোক? আমি তো কখনো এমন কথা শুনিনি। এমন প্রশান্তি তো কারও চোখে দেখি না।”
সে দরবেশের মুখের দিকে তাকাতেই চমকে উঠল। দরবেশের চেহারা যেন আলোয় ভরে আছে- একটা আলো, যা কোনো বাতির নয়, কোনো আগুনের নয়, বরং আল্লাহর নূর যেন! চোরের কাঁপুনি বেড়ে গেল। তার চোখে পানি চলে এল। সে ফুপিয়ে উঠল, “হুজুর, আমি বড় পাপী। চুরি করেছি, মিথ্যা বলেছি, মানুষের ঘর ভেঙেছি আমার তওবা কি কবুল হবে?”
দরবেশ কোমল চোখে তাকিয়ে বললেন, “পাপ যত বড়ই হোক, আল্লাহর দয়া তার থেকেও বড়। তুমি ফিরে এস, দরজা খোলা। তোমার কান্না এই প্রমাণ যে তোমার অন্তর মরেনি।” চোর কাঁদতে কাঁদতে দরবেশের পায়ে পড়ে বলল, “আমাকে বদলে দিন বাবা। আমি আর সেই চোর হতে চাই না। আমি ভালো মানুষ হয়ে বাঁচতে চাই।”
দরবেশ বললেন, “তুমি এখন হতে আল্লাহর পথে চলা শুরু কর। দুনিয়ার পথে নয়- রবের দিকে ফির।” তারপর তিনি বললেন, “তোমার চোখ দিয়ে যে অশ্রু গড়িয়েছে, তা তো তওবার ফুল। এখন শুধু লালন কর। মনে রাখ, কাঁটার ঝোপে যখন প্রথম কুঁড়ি ফোটে, তখন থেকেই বসন্ত আসে।”
ভোরের আলো ফুটে উঠল। মানুষ দেখল- চেনা চোরটি আর চোর নেই। এখন সে দরবেশের পাশে বসা এক শান্ত মানুষ। তার ঠোঁটে যিকর, চোখে আলো, আর হৃদয়ে বদলে যাওয়ার দীপ্তি।
পরিশেষে
আল্লাহর রহমতের দরজা কখনো বন্ধ হয় না। পাপ যত গভীর হোক, অনুশোচনার একটি অশ্রু সেই অন্ধকার ভেদ করে আলো আনতে পারে। সেই চোর যেমন এক রাতে বদলে গিয়ে হয়ে উঠল এক যিকিররত মানুষ- তেমনি আমাদের মাঝেও জাগতে পারে আত্মপরিচয়ের আলো। এই গল্প মনে করিয়ে দেয়– বদলে যেতে সারা জীবন লাগে না- প্রয়োজন কেবল একটি সত্যিকারের মুহূর্ত, একজন আল্লাহর প্রিয় বান্দার হৃদয়ছোঁয়া দৃষ্টি, আর একটি খাঁটি কান্না- যা অন্তরকে জাগিয়ে তোলে, আর জীবনকে ঘুরিয়ে দেয় নূরের পথে।










