দয়াল নবী আপনার দরবারে আমি গোলাম হাজির হইয়াছি।
আজ আমরা আলোচনা করব- “আল্লাহর অলি ও চোর: অন্তর জয়ের অলৌকিক গল্প”। কারণ, জীবনে অনেক মানুষই আল্লাহর অলিগণের কারামত কেবল বাহ্যিক বিস্ময় হিসেবেই দেখে। কিন্তু কখনো কখনো এমন ঘটনা ঘটে- যা চোখ দিয়ে নয়, অন্তরের গভীরে গিয়েই স্পর্শ করে।
এই গল্প তেমনই এক আল্লাহর অলির-যিনি চোরকে শাস্তি দেননি; বরং ভালোবাসা ও করুণায় তাঁর ভাগ্যটাই বদলে দিয়েছেন। এটি শুধু একজন চোরের পরিবর্তনের কাহিনি নয়; বরং এক অলৌকিক সত্য, যেখানে একজন আল্লাহর বন্ধু (ওলি) আল্লাহর রাহমতের দরজা খুলে দেন এমন একজনের জন্য, যে এসেছিল লুট করতে- কিন্তু পেয়ে গেল আলোর পথ।
আসুন, সেই হৃদয় ছুঁয়ে যাওয়া ঘটনার অন্তরালটুকু আমরা একটু গভীরভাবে জানার চেষ্টা করি।
অন্তর জয়ের অলৌকিক গল্প
একজন আল্লাহর অলি সফরে যাচ্ছিলেন। সঙ্গে ছিল তেনার একমাত্র পুটলি। পথিমধ্যে এক চোর সেই পুটলিটি দেখে মনে করল- এতে নিশ্চয় অনেক টাকা-পয়সা আছে! লোভে পড়ে চোর বিনয়ের সাথে এসে বলল,
— “হুজুর, আমি আপনার সফরসঙ্গী হতে চাই। আপনার খেদমত করতে চাই।”
আল্লাহর অলি গভীর দৃষ্টিতে তার চোখে তাকিয়ে শান্তভাবে বললেন,
— “বাবা, তুমি কি সত্যিই আমার সফরসঙ্গী হয়ে খেদমত করতে চাও?”
চোর বলল,
— “জি হুজুর, আমি আন্তরিকভাবে চাই। আপনি আমাকে গ্রহণ করুন।”
আল্লাহর অলির মুখে মুচকি হাসি ফুটে উঠল। তিনি বললেন,
— “তবে এসো। মনে রেখো- আমার সফরসঙ্গী হতে হলে আমানতের হক আদায় করতে জানতে হবে।”
চোর আশ্বাস দিয়ে বলল,
— “হুজুর, আমি গচ্ছিত জিনিস সততার সাথে রক্ষা করব। আমাকে আপনার পুটলিটি দিন, আমি বহন করব।”
আল্লাহর অলি সম্মতি দিলেন। এরপর তিনি সামনে আর চোর পেছনে হাঁটতে লাগল। হঠাৎ একসময় চোর ভাবল,
— “পুটলির ভিতর হাত দিয়ে যা কিছু আছে বের করে নিয়ে নিজের কাছে রেখে দিই। পরে সুযোগ বুঝে পালিয়ে যাবো।”
সে পুটলিতে হাত ঢুকিয়ে দেখল- সেখানে আছে কেবল একটি তসবি ও একটি ঘটি!
চোর বিস্মিত হয়ে মনে মনে ভাবল,
— “এই তো ঠকেছি! টাকাপয়সা কিছু নেই, আমি কেন তার পেছনে সময় নষ্ট করলাম?”
পালিয়ে যাওয়ার উপায় খুঁজতে খুঁজতে কিছুদূর যেতেই দেখল, এক বৃদ্ধা মহিলা কান্না করছেন।
আল্লাহর অলি জিজ্ঞেস করলেন,
— “মা, আপনি কাঁদছেন কেন?”
বৃদ্ধা বললেন,
— “বাবা, আমার ঘর ভেঙে গেছে। স্বামী-সন্তান কেউ নেই। কিভাবে মেরামত করব, বুঝতে পারছি না।”
আল্লাহর অলি সান্ত্বনা দিয়ে বললেন,
— “মা, চিন্তা করবেন না। আল্লাহ চাইলে সবই সম্ভব।”
তিনি চোরকে বললেন,
— “পুটলিটি খোলো, এবং ভেতরে থাকা সব টাকা এই বৃদ্ধা মায়ের হাতে দাও।”
চোর হতবাক হয়ে বলল,
— “হুজুর, পুটলিতে তো কোনো টাকা নেই! আমি তো একটু আগেই দেখেছি- সেখানে শুধু একটা তসবি আর একটা ঘটি আছে।”
আল্লাহর অলি মুচকি হাসি দিয়ে বললেন,
— “না, সেখানে টাকা আছে। দাও, আমি খুলে দিচ্ছি।”
তিনি পুটলি হাতে নিয়ে “বিসমিল্লাহ” বলে খুললেন।
চোর চোখ বড় বড় করে দেখল- ভেতরে রয়েছে অনেক টাকা!
আল্লাহর অলি সেগুলো তুলে বৃদ্ধাকে দিয়ে বললেন,
— “মা, এগুলো দিয়ে আপনার ঘর মেরামত করে নিন।”
চোর বিস্ময়ে নির্বাক। সমস্ত শরীর কাঁপতে লাগল। মনে মনে বলল,
— “তিনি তো সাধারণ কোনো মানুষ নন! আমি পুটলিতে হাত দিয়েও কিছু পাইনি। অথচ এখন সেই পুটলি থেকেই বের হলো এত টাকা! তিনি নিশ্চয়ই সত্যিকার আল্লাহর অলি। আমি তো বড় অন্যায় করে ফেলেছি”।
চোর আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। ভেঙে পড়ে আল্লাহর অলির পায়ে পড়ে কান্না করতে লাগল,
— “হুজুর, আমাকে মাফ করুন। আমি একজন চোর। আপনার টাকা চুরি করার উদ্দেশ্যেই আপনার সঙ্গী হয়েছিলাম। কিন্তু আপনি তো আল্লাহর বন্ধু! আমাকে ক্ষমা করুন। আমি আর কখনো চুরি করব না। আমাকে তাওবার সুযোগ দিন। আপনি যদি মুরিদ বানিয়ে নেন, তবে আমি নতুন জীবন শুরু করতে চাই।”
আল্লাহর অলি স্নেহময় কণ্ঠে বললেন,
— “বাবা, তুমি যে চোর, তা আমি প্রথম দেখাতেই বুঝেছিলাম। তুমি কেন আমার সঙ্গী হতে চাইছো, তাও জেনে গিয়েছিলাম।
তবে যখন তুমি বলেছিলে- ‘আমি সত্যিই আপনার খেদমত করতে চাই’, তখনই তোমার জন্য আল্লাহর দরবারে ক্ষমা চেয়ে নিয়েছিলাম। ওই মুহূর্তেই তোমার নাম চোরের তালিকা থেকে মুছে ফেলে আমি তোমাকে আমার খাদেম বানিয়ে নিয়েছি।”
সেদিন থেকেই চোরের অন্তর পাল্টে গেল।
সে হয়ে উঠল আল্লাহর অলির প্রকৃত খাদেম।
ধীরে ধীরে তার হৃদয়ের অন্ধকার দূর হয়ে গেল, আর সে আলোর পথে চলতে শুরু করল।
পরিশেষে
এই গল্প শুধু এক আল্লাহর অলির কারামতের গল্প নয়।
এটা এক অন্তর জাগরণের গল্প- যেখানে চুরি নয়, বিশ্বাস জিতেছে।
যেখানে এক চোরের হাত খালি ফিরেছে, কিন্তু অন্তর ফিরে পেয়েছে পূর্ণতা।
এ যেন প্রমাণ- আল্লাহর অলিরা শুধু জিনিসপত্র রক্ষা করেন না, তারা মানুষের হৃদয়ের তালাও খুলে দেন।










