দয়াল নবী আপনার দরবারে আমি গোলাম হাজির হইয়াছি।
মানুষের ব্যক্তিত্ব, শিক্ষা এবং বংশের পরিচয় সবচেয়ে বেশি প্রকাশ পায় তার মুখের ভাষার মাধ্যমে। আমরা প্রতিদিন অবচেতন মনে কত কথাই না বলে ফেলি। কিন্তু আপনি কি জানেন, অতিরিক্ত কথা বলা আপনার মানসিক শক্তি এবং সামাজিক সম্মান দুটোই কমিয়ে দেয়? বর্তমান যুগে মনোবিজ্ঞানীরা পরিমিত কথা বলার পরামর্শ দিলেও, আজ থেকে চৌদ্দশত বছর আগেই ইসলাম এর চমৎকার সমাধান দিয়েছে। বিশেষ করে, মাওলা আলী আলাইহিস সালাম মানুষের বুদ্ধিমত্তা ও মুখের ভাষার সম্পর্ক নিয়ে একটি ঐতিহাসিক বাণী করেছেন, যা আমাদের চোখ খুলে দেয়।
মাওলা আলী আলাইহিস সালাম এর সেই ঐতিহাসিক বাণী
মাওলা আলী আলাইহিস সালাম এর খুতবা, চিঠি ও প্রজ্ঞাপূর্ণ বাণীর বিখ্যাত কিতাব ‘নাহজুল বালাগা’-এর ৭১ নম্বর বণীতে তিনি বলেছেন:
“যখন মানুষের বুদ্ধিমত্তা পূর্ণতা পায়, তখন তার অপ্রয়োজনীয় কথা বলার অভ্যাস কমে যায়।”
এই একটি মাত্র লাইনের ভেতরে মানুষের মনস্তত্ত্ব এবং আত্মশুদ্ধির এক বিরাট রহস্য লুকিয়ে আছে।
বুদ্ধিমত্তার সাথে কথা কম বলার সম্পর্ক কী?
মাওলা আলী আলাইহিস সালাম এর এই বাণীর অর্থ অত্যন্ত গভীর। একজন মানুষ যখন মানসিকভাবে পরিপক্ক ও আধ্যাত্মিকভাবে উন্নত হয়ে ওঠে, তখন সে বুঝতে পারে যে-সব জায়গায় সব কথা বলতে হয় না।
কম বুদ্ধিসম্পন্ন বা মূর্খ মানুষ সাধারণত কোনো বিষয়ে গভীর চিন্তা না করেই অনর্গল কথা বলে ফেলে। এর ফলে তারা প্রায়ই বিভিন্ন ভুল করে বসে এবং পরে অনুতপ্ত হয়। অন্যদিকে, একজন প্রকৃত জ্ঞানী মানুষ কোনো কথা বলার আগে নিজের মনে তা যাচাই করেন। তিনি জানেন, প্রতিটি কথার একটি নির্দিষ্ট ওজন রয়েছে এবং এর জন্য আল্লাহর কাছে জবাবদিহি করতে হবে। তাই মানুষের ভেতরে যখন সত্যিকারের বুদ্ধির বিকাশ ঘটে, তখন সে অনর্থক কথা বলা ছেড়ে দেয় এবং নীরবতাকে আপন করে নেয়।
ইসলাম ও সুফিবাদের দৃষ্টিতে নীরবতার গুরুত্ব
মাওলা আলী আলাইহিস সালাম এর এই প্রজ্ঞাপূর্ণ বাণীটি সরাসরি নূর নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর পবিত্র শিক্ষারই প্রতিফলন। নূর নবীজি সর্বদা পরিমিত কথা বলতেন এবং উম্মতকে জবান হেফাজতের নির্দেশ দিয়েছেন। হাদিস শরিফে এসেছে:
“যে ব্যক্তি আল্লাহ ও পরকালের প্রতি ঈমান রাখে, সে যেন ভালো কথা বলে অথবা চুপ থাকে।” (সহিহ বুখারি)
পবিত্র কুরআনেও আল্লাহ তায়ালা আমাদের সতর্ক করে বলেছেন, মানুষ যে কথাই মুখ থেকে উচ্চারণ করে, তা লেখার জন্য একজন প্রহরী ফেরেশতা সবসময় প্রস্তুত থাকে (সূরা কাফ, আয়াত: ১৮)। সুফিবাদের সাধক এবং ওলী-আউলিয়াগণও সবসময় ‘কম কথা বলা’ বা ‘খামুশি’ (নীরবতা)-কে আত্মশুদ্ধির অন্যতম প্রধান হাতিয়ার হিসেবে গণ্য করেছেন।
কথা কম বলার ৪টি আত্মিক ও জাগতিক উপকারিতা
যাঁরা নিজেদের জীবনে মাওলা আলী আলাইহিস সালাম এর এই উপদেশটি মেনে চলবেন, তাঁরা প্রধানত ৪টি বড় সুবিধা পাবেন:
- ১. গুনাহ ও ভুল থেকে মুক্তি: মানুষ সবচেয়ে বেশি গুনাহ করে তার জিহ্বা দিয়ে (যেমন: গিবত, মিথ্যা, পরনিন্দা)। কম কথা বললে এই সমস্ত বড় গুনাহ থেকে খুব সহজে বেঁচে থাকা যায়।
- ২. চিন্তাশক্তি ও হেকমত বৃদ্ধি: মানুষ যখন চুপ থাকে, তখন তার মস্তিষ্ক গভীরচিন্তাভাবনা (তাফাক্কুর) করার সুযোগ পায়। এই নীরবতাই মানুষের ভেতরের লুকিয়ে থাকা বুদ্ধিমত্তাকে জাগিয়ে তোলে।
- ৩. সমাজে সম্মান ও গ্রহণযোগ্যতা বৃদ্ধি: সমাজে সেই ব্যক্তির কথার মূল্য এবং সম্মান সবচেয়ে বেশি, যিনি সচরাচর কম বলেন কিন্তু যখন বলেন অত্যন্ত যুক্তিপূর্ণ ও দামি কথা বলেন।
- ৪. মানসিক শান্তি লাভ: অনর্থক তর্ক-বিতর্ক ও ঝগড়াঝাঁটি থেকে দূরে থাকা যায় বলে মন সবসময় শান্ত ও পবিত্র থাকে, যা আধ্যাত্মিক উন্নতির জন্য অপরিহার্য।
উপসংহার
পরিশেষে বলা যায়, কথা কম বলার উপকারিতা শুধু দুনিয়াবি দিক থেকেই নয়, আখিরাতের মুক্তির জন্যও সমান গুরুত্বপূর্ণ। আসুন, আজ থেকেই আমরা আমাদের নিজেদের একটু পরখ করি। আমরা কি সারাদিন অনর্থক কথা বলে নিজের বুদ্ধিমত্তার ঘাটতি প্রকাশ করছি, নাকি পরিমিত কথা বলে মাওলা আলী আলাইহিস সালাম এর এই বাণীকে জীবনে ধারণ করছি? আল্লাহ আমাদের সবাইকে আমাদের জবানকে হেফাজত করার তৌফিক দান করুন। আমীন।










