দয়াল নবী আপনার দরবারে আমি গোলাম হাজির হইয়াছি।
নূর নবীজি ﷺ এর মুজিযা হিসেবে চাঁদের দ্বিখণ্ডিত হওয়ার অলৌকিক ঘটনাটি ইসলামের ইতিহাসের অন্যতম চাক্ষুষ ও মহান একটি নিদর্শন। আজ থেকে চৌদ্দশত বছর আগে মক্কার কাফেরদের নবুয়তের প্রমাণ দেখানোর জন্য মহান আল্লাহ তাঁর প্রিয় হাবীব সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর আঙুল মোবারকের ইশারায় রাতের আকাশেরই জলজ্যান্ত চাঁদকে দুই টুকরো করে দেখিয়েছিলেন। বিশ্বাসের চোখে এটি যেমন ঈমানকে মজবুত করে, তেমনি আধুনিক বিজ্ঞানের যুগে এসেও এই অলৌকিক ঘটনাটি নিয়ে চলছে নানা অনুসন্ধান। আজ আমরা পবিত্র কুরআন, হাদিস এবং আধুনিক মহাকাশ বিজ্ঞানের আলোকে জানবো নূর নবীজি ﷺ এর মুজিযা তথা চন্দ্র দ্বিখণ্ডিত হওয়ার ঘটনার পেছনের ঐতিহাসিক সত্যতা ও রহস্য আসলে কী।
চাঁদের দ্বিখণ্ডিত হওয়ার ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও হাদিসের বিবরণ
ইসলামের ইতিহাসের এই মহান অলৌকিক ঘটনাটি মক্কী জীবনের এক বিশেষ সন্ধিক্ষণে ঘটেছিল। মক্কার কুরাইশ বংশের কাফেররা, বিশেষ করে আবু জাহেল নূর নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কাছে এসে নবুয়তের চাক্ষুষ প্রমাণ দাবি করে। তারা বলেছিল, “আপনি যদি সত্যিই আল্লাহর নবী হন, তবে আমাদের এই আকাশেরই চাঁদকে দুই টুকরো করে দেখান।”
মহাকাশে আঙুল মোবারকের ইশারা
হাদিস শরিফের বর্ণনা অনুযায়ী, নূর নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম চাঁদের দিকে তেনার পবিত্র শাহাদাত আঙুল মোবারক দিয়ে ইশারা করলেন। সাথে সাথে ভরা পূর্ণিমার চাঁদটি মাঝখান থেকে নিখুঁতভাবে দুই খণ্ড হয়ে গেল। চাঁদের এক খণ্ড জাবালে আবি কুবাইস পাহাড়ের ওপরে এবং অন্য খণ্ডটি জাবালে কায়াকায়ান পাহাড়ের ওপরে চলে গেল। কাফেররা স্পষ্ট চোখে এই দৃশ্য দেখল। সহীহ বুখারী ও মুসলিম শরিফে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেন-“নূর নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর পবিত্র শাহাদাত আঙুল মোবারক এর ইশারায় চাঁদ দুই খণ্ড হয়েছিল এবং আমরা তা নিজের চোখে দেখেছি।”
চন্দ্র দ্বিখণ্ডিত হওয়ার অলৌকিক ঘটনায় বিজ্ঞান কী বলে?
আজকের আধুনিক যুগের বিজ্ঞানপ্রেমী বা সাধারণ পাঠকদের মনে প্রায়ই প্রশ্ন জাগে যে, চৌদ্দশত বছর আগের এই অলৌকিক ঘটনার কোনো বাস্তব বা বৈজ্ঞানিক প্রমাণ কি আজ চাঁদের বুকে অবশিষ্ট আছে? আধুনিক মহাকাশ বিজ্ঞান ও নাসার (NASA) কিছু গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার এই ঘটনার সত্যতার দিকেই ইঙ্গিত করে।
১. চাঁদের বুকে বিশাল ফাটল বা ‘রিল’ (Rilles) রহস্য
মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসা (NASA) যখন তাদের অ্যাপোলো মিশনগুলোর মাধ্যমে চাঁদের উপরিভাগের হাই-রেজোলিউশন ছবি তোলে, তখন বিজ্ঞানীরা চাঁদের মাঝ বরাবর বিশাল এবং দীর্ঘ কিছু ফাটল বা খাঁজ দেখতে পান, যেগুলোকে বিজ্ঞানের ভাষায় ‘রিল’ (Rilles) বলা হয়। বিশেষ করে ‘হ্যাডলি রিল’ (Hadley Rille) নামের ফাটলটি চাঁদের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে এমনভাবে বিস্তৃত, যা দেখলে মনে হয় কোনো এক সময় পুরো চাঁদটি মাঝখান থেকে দুই ভাগ হয়েছিল এবং পরবর্তীতে তা আবার জোড়া লেগেছে।
২. ভূ-তাত্ত্বিক গঠন ও জোড়া লাগার দাগ
সুফি ও ইসলামী গবেষক নাসার বিজ্ঞানী ব্র্যাডলি ক্রুগারের একটি বক্তব্য উদ্ধৃত করে দেখিয়েছেন যে, চাঁদের ভেতরের এবং বাইরের পাথুরে স্তর পরীক্ষা করে দেখা গেছে, সেখানে একটি বিশেষ বেল্ট বা দাগ রয়েছে যা প্রমাণ করে চাঁদের এই দুটি অংশ এক সময় আলাদা ছিল এবং পরবর্তীতে অলৌকিক কোনো বল বা ফোর্সের মাধ্যমে তা আবার একত্রিত হয়েছে। বিজ্ঞানীদের কাছে চাঁদের এই ফাটলগুলোর সুনির্দিষ্ট কোনো ভূ-তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা আজ পর্যন্ত নেই, যা মূলত নূর নবীজি ﷺ এর মুজিযা-এর ঐতিহাসিক সত্যতাকেই পরোক্ষভাবে প্রমাণ করে।
পৃথিবীর অন্যান্য দেশের ইতিহাসে এই মুজিযার প্রমাণ
চাঁদ দ্বিখণ্ডিত হওয়ার ঘটনাটি কেবল মক্কার মানুষই দেখেনি, বরং তৎকালীন সময়ে পৃথিবীর অন্যান্য অঞ্চলের মানুষও রাতের আকাশে এই অলৌকিক দৃশ্য প্রত্যক্ষ করেছিল এবং তা তাদের নিজস্ব ইতিহাসে লিখে রেখেছিল।
ভারতের চেরামান পেরুমল রাজার ইসলাম গ্রহণ
নূর নবীজি ﷺ এর মুজিযা-এর সবচেয়ে বড় ঐতিহাসিক প্রমাণ মেলে ভারতের কেরালার কোডুঙ্গালুরের রাজা চেরামান পেরুমল-এর ইতিহাসে। তিনি এক রাতে প্রাসাদের ছাদ থেকে আকাশে চাঁদ দুই টুকরো হয়ে যাওয়ার অলৌকিক দৃশ্য দেখেন। পরবর্তীতে আরব বণিকদের মাধ্যমে তিনি জানতে পারেন যে, আরবের শেষ নবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর আঙুল মোবারকের ইশারায় এই ঘটনা ঘটেছে। রাজা চেরামান এই সত্যতা জানতে পেরে সাথে সাথে আরবে পাড়ি জমান এবং প্রিয় নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর পবিত্র হাত মোবারক স্পর্শ করে ইসলাম গ্রহণ করেন। ভারতের প্রথম মসজিদ ‘চেরামান জুমা মসজিদ’ তাঁর নামেই প্রতিষ্ঠিত।
উপসংহার
পরিশেষে বলা যায়, নূর নবীজি ﷺ এর মুজিযা বা চন্দ্র দ্বিখণ্ডিত হওয়ার অলৌকিক ঘটনাটি কেবল অন্ধ বিশ্বাসের কোনো গল্প নয়, এটি ইতিহাস এবং বিজ্ঞানের কষ্টিপাথরে প্রমাণিত এক মহাসত্য। বিজ্ঞান হয়তো সব অলৌকিক ঘটনার রহস্য পুরোপুরি উন্মোচন করতে পারবে না, কারণ অলৌকিকতা বা মুজিযা বিজ্ঞানের নিয়মের বাইরে আল্লাহর বিশেষ কুদরতে ঘটে থাকে। তবে চাঁদের বুকে রয়ে যাওয়া সেই ফাটলগুলো আজও বিশ্ববাসীকে নূর নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর শান ও সর্বোচ্চ মর্যাদার কথা মনে করিয়ে দেয়। মহান আল্লাহ আমাদের সকলকে নূর নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর প্রতি সত্যিকারের মহব্বত এবং তাঁর সুন্নাহর ওপর আমল করার তৌফিক দান করুন। আমীন।
“চাঁদের বুকে নাসার আবিষ্কৃত এই ফাটলের রহস্য এবং নূর নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর এই মহান মুজিযা নিয়ে আপনার মনে কি কোনো বিশেষ অনুভূতির সৃষ্টি হয়েছে? কমেন্ট করে আমাদের জানান এবং পোস্টটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন”।








