দয়াল নবী আপনার দরবারে আমি গোলাম হাজির হইয়াছি।
“কুল কায়েনাত কিসের উপরে?”- এই প্রশ্নটি আমাদের গভীর চিন্তার জগতে নিয়ে যায়। আমরা ভাবতে শুরু করি- সব কিছুর আসল ভিত্তি আসলে কী? আসমান-জমিন, মানুষ এবং সমগ্র সৃষ্টির অস্তিত্ব কি শুধু প্রাকৃতিক নিয়মে টিকে আছে, নাকি এর মধ্যে লুকিয়ে আছে কোনো গভীর আধ্যাত্মিক রহস্য?
দয়াল বাবা জালালী মাওলা “কুল কায়েনাত কিসের উপরে” এই গভীর বিষয়ে স্পষ্ট ও হৃদয়ছোঁয়া ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তেনার কথায় প্রকাশ পেয়েছে সৃষ্টির আসল রহস্য। আসুন, আমরা জানার চেষ্টা করি- তিনি এই মহাজাগতিক প্রশ্নের উত্তরে কী বলেছেন, এবং কীভাবে তিনি আমাদের সামনে উন্মোচন করেছেন কুল কায়েনাতের আধ্যাত্মিক ভিত্তির সেই গভীর রহস্য।
সূর্য ওঠা ও ডোবার রহস্য
দয়াল বাবা জালালী মাওলা বলেন-
মাদিনার সিয়ানের ডান পাশে, মঙ্গলবারের দিন আসরের নামাজের পরে নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম শরীর মোবারক মোড়ামুড়ি দিচ্ছেন। সা’দ ইবনে ত্বোহা রাদিয়াল্লাহু আনহু উমাইয়া বংশের নবীপ্রেমিক ছিলেন।
তিনি এসে বললেন, “ইয়া রাসূল আল্লাহ, আরাম করবেন?”
নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, “করলে ভালো হতো।”
সা’দ ইবনে ত্বোহা রাদিয়াল্লাহু আনহু জানু পেতে দিলেন। দয়াল নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম সা’দ ইবনে ত্বোহা রাদিয়াল্লাহু আনহুর হাঁটুর মধ্যে মাথা মোবারক রেখে, রুমাল মোবারক মুখ মোবারকের উপরে দিয়ে নাক ডাকছেন।
নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম যে নাক ডাকছেন, সা’দ ইবনে ত্বোহা রাদিয়াল্লাহু আনহু মনে করলেন, নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম ঘুমিয়ে আছেন।
এখন তিনি মনে মনে বললেন, “রাব্বুল মাশরিকাইন ওয়া রাব্বুল মাগরিবাইন।”
নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম মাথা মোবারক হতে রুমাল মোবারক সরিয়ে বললেন, সাদ্দাকতা “সত্য বলছো।”
সা’দ ইবনে ত্বোহা রাদিয়াল্লাহু আনহু বিস্ময়ে বললেন, “মাগো! নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম ঘুমে ছিলেন, তবু আমার কথা কীভাবে শুনলেন?”
তখন সা’দ ইবনে ত্বোহা রাদিয়াল্লাহু আনহু জিজ্ঞাসা করলেন, “ইয়া রাসুল আল্লাহ, তাহলে সূর্যটা কোন দেশে উঠে?”
দয়াল নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, “মাশরিকে।”
সা’দ ইবনে ত্বোহা রাদিয়াল্লাহু আনহু জিজ্ঞাসা করলেন, “সূর্যটা ডোবে কোথায়?”
দয়াল নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, “মাগরিবে।”
সা’দ ইবনে ত্বোহা রাদিয়াল্লাহু আনহু আবার জিজ্ঞাসা করলেন, “দূরত্ব কত দূর?”
দয়াল নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, “৫০০ বছরের রাস্তা।”
এবার সা’দ ইবনে ত্বোহা রাদিয়াল্লাহু আনহু বললেন, “নবীগো, তাহলে মাগরিবের মাগরিব কি আর একটা জমিন?”
দয়াল নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, “হ্যাঁ।”
ও সা’দ, যে সূর্যটা ৫০০ বছরের রাস্তা অতিক্রম করে মাগরিবে ডোবে, সেই সূর্যের মাগরিবের মাগরিব জমিনটা পার হতে সূর্যটার ৪০ দিন ও ৪০ রাত লাগে।
সা’দ ইবনে ত্বোহা রাদিয়াল্লাহু আনহু জিজ্ঞাসা করলেন, “নবীগো, ঐ দেশটা শয়তান চেনে কি?”
নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, “ঐ দেশের খবর শয়তান জানে না।”
সা’দ ইবনে ত্বোহা রাদিয়াল্লাহু আনহু জিজ্ঞাসা করলেন, “জিবরাইলের দখলে আছে কি?”
নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, “জিবরাইল ঐ দেশ সম্বন্ধে বোঝে না।”
সা’দ ইবনে ত্বোহা রাদিয়াল্লাহু আনহু জিজ্ঞাসা করলেন, “আজরাইল জানে কি?”
নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, “ঐ দেশের খবর আজরাইলের কাছে নেই।”
সা’দ ইবনে ত্বোহা রাদিয়াল্লাহু আনহু জিজ্ঞাসা করলেন, “ঐ দেশের খোদা কে?”
নূর নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, “আলহামদুলিল্লাহি রাব্বিল ‘আলামিন।”
ঐ দেশের খোদা তোমার খোদা আর আমার খোদা।
সা’দ ইবনে ত্বোহা রাদিয়াল্লাহু আনহু বললেন, “নবীগো, ঐ দেশের কামলি ওয়ালা কে?”
নূর নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, “ইল্লা রাহমাতাল্লিল ‘আলামিন।”
৭ তবক জমি ও ১৮ হাজার জাতের রহস্য
দয়াল নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন-
আমি ৮০ হাজার আলম, ১৮ হাজার জাতের নবী।
সা’দ ইবনে ত্বোহা রাদিয়াল্লাহু আনহু বললেন, “নবীগো, আপনি বললেন ১৮ হাজার আলম।”
নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, “না, ৮০ হাজার আলম, ১৮ হাজার জাত।”
সা’দ ইবনে ত্বোহা রাদিয়াল্লাহু আনহু বললেন, “নবীগো, জাতসমূহ কোনদিকে, আলমসমূহ কোনদিকে?”
দয়াল নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, “আলম হলো উপরের দিকে, জাত হলো নিচের দিকে।”
সা’দ ইবনে ত্বোহা রাদিয়াল্লাহু আনহু বললেন, “নবীগো, কিভাবে?”
নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, “৬ হাজার ডিম, ৬ হাজার গেজ, ৬ হাজার মনি বা বির্য- এই ১৮ হাজার জাত ৭ তবক জমি আছে নিচের দিকে।”
সা’দ ইবনে ত্বোহা রাদিয়াল্লাহু আনহু বললেন, “নবীগো, ৭ তবক জমি আছে কিসের উপরে?”
দয়াল নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন,
“সা’দ, রাদিদ নামে একটা ফেরেশতা আছে। গরুর আকৃতিতে, সমস্ত শরীর সাদা, পা দু’খানা লাল। ঐ গরুটা ৭ তবক জমি এবং ১৮ হাজার জাত ১ টা শিং-এর মধ্যে রেখে দিয়েছে।”
সা’দ ইবনে ত্বোহা রাদিয়াল্লাহু আনহু বললেন, “নবীগো, গরুটা আছে কিসের উপরে?”
নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, “সা’দ, গরুটা আছে একটা পাথরের উপরে।”
সা’দ ইবনে ত্বোহা রাদিয়াল্লাহু আনহু বললেন, “নবীগো, পাথরটা আছে কিসের উপরে?”
নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, “সা’দ, পাথর আছে অন্ধকারের উপরে।”
সা’দ ইবনে ত্বোহা রাদিয়াল্লাহু আনহু বললেন, “নবীগো, অন্ধকারটা আছে কিসের উপরে?”
নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, “সা’দ, অন্ধকার আছে আবরুনের উপরে।”
সা’দ ইবনে ত্বোহা রাদিয়াল্লাহু আনহু বললেন, “নবীগো, আবরুনটা আছে কিসের উপরে?”
দয়াল নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, “সা’দ, আবরুন আছে মাইজার উপরে।”
সা’দ ইবনে ত্বোহা রাদিয়াল্লাহু আনহু বললেন, “নবীগো, মাইজা আছে কিসের উপরে?”
দয়াল নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, “সা’দ, মাইজা আছে আল্লাহর কুদরতের উপরে।”
সা’দ ইবনে ত্বোহা রাদিয়াল্লাহু আনহু বললেন, “নবীগো, আল্লাহর কুদরত আছে কিসের উপরে?”
দয়াল নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, “সা’দ, আল্লাহর কুদরত আছে বাতাসের উপরে।”
সা’দ ইবনে ত্বোহা রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, “নবীগো, বাতাস আছে কিসের উপরে?”
দয়াল নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, “সা’দ, বাতাস আছে পানির উপরে।”
সা’দ ইবনে ত্বোহা রাদিয়াল্লাহু আনহু বললেন, “নবীগো, পানি আছে কিসের উপরে?”
নূর নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর বদনে ১১ হাতের একটি কম্বল ছিল। কম্বলটি ফেলে দিয়ে বাম হাতের কানি আঙ্গুল মোবারক বের করে বলেন,
“সা’দরে, সাদ পানি আছে তোর হাবীবের কানি আঙ্গুলের উপরে।”
পরিশেষে
কুল কায়েনাত কিসের উপরে- এই রহস্যময় আলোচনার মাধ্যমে আমরা জানতে পারি, নূর নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম আশি হাজার আলম ও আঠার হাজার জাতের নবী। সমগ্র সৃষ্টি জগতে তেনার তুলনা তিনিই, তেনার সাথে আর কারো তুলনা হয় না। তিনি তুলনাবিহীন নবী।
তেনার আনুগত্য করা মানে আল্লাহ তাআলার আনুগত্য করা। যারা নূর নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লামকে অন্তর থেকে ভালোবাসেন, তারা প্রকৃতপক্ষে আল্লাহ তাআলাকেই ভালোবাসেন। আল্লাহ তাআলা আমাদের সকলকে নূর নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লামের পথে চলার তাওফিক দান করুন। আমিন।










