দয়াল নবী আপনার দরবারে আমি গোলাম হাজির হইয়াছি।
বড়পীর গাউসে পাকের কারামত: শুকনো হাড় থেকে জ্যান্ত মুরগি হওয়ার অলৌকিক ঘটনা ও বাতেনি শিক্ষা- “কারামাতুন আউলিয়া হাক্কুন” অর্থ আল্লাহর ওলীগণের কারামত সত্য। আল্লাহর ওলীগণের মাধ্যমে সর্বদা এমন অলৌকিক ঘটনা ঘটে থাকে যা সাধারণ মানুষের কল্পনাকেও হার মানায়। গাউসুল আজম হযরত আব্দুল কাদের জিলানী রহমাতুল্লাহি আলাইহি-এর শান ও মান এমন সুউচ্চ যা লিখে বা বলে শেষ করা যায় না। আজ আমরা শুকনো হাড় থেকে জ্যান্ত মুরগি হওয়ার অলৌকিক ঘটনাটির হাকিকত ও রূহার্নী দর্শন সম্পর্কে পুঙ্খানুপুঙ্খ আলোচনা করব, যা মারেফাত পিয়াসী পাঠকদের কলব এক সেকেন্ডে হেদায়েতের আলোয় জাগ্রত করবে।
গাউসে পাকের দরবারে এক ব্যাকুল মায়ের রূহার্নী আরজি
বিখ্যাত কিতাব ‘বাহজাতুল আসরার’ এবং ‘কালাইদুল জাওয়াহির’-এ বর্ণনা করা হয়েছে, একদা একজন মহিলা তেনার একমাত্র সন্তানকে নিয়ে গাউসুল আজম হযরত আব্দুল কাদের জিলানী রহমাতুল্লাহি আলাইহি-এর পবিত্র দরবার শরীফে হাজির হলেন। ওই মায়ের একমাত্র আকুতি ছিল, তেনার সন্তান যেন এই মহান কামেল মুর্শিদের নেক নজরে থেকে আত্মশুদ্ধি, বাতেনি জ্ঞান এবং তাজকিয়াতুন নাফস লাভ করতে পারে। গাউসুল আজম রহমাতুল্লাহি আলাইহি ওই মায়ের ব্যাকুলতা দেখে ছেলেটিকে তেনার আধ্যাত্মিক আশ্রয়ে গ্রহণ করলেন এবং তাকে খানকার একটি নির্জন হুজরায় জিকির-আসকার ও কঠোর রিয়াজতের জন্য নির্ধারণ করে দিলেন।
মুরিদের জীর্ণ দশা ও মায়ের কলবে খটকা
কিছুদিন অতিবাহিত হওয়ার পর, ওই মা তেনার আদরের সন্তানকে দেখার জন্য পুনরায় খানকা শরীফে আগমন করলেন। কিন্তু হুজরার ভেতরে প্রবেশ করা মাত্রই মায়ের কলব ডুকরে কেঁদে উঠল। তিনি দেখলেন, তেনার কলিজার টুকরো সন্তান কঠোর সাধনায় অত্যন্ত জীর্ণ-শীর্ণ, দুর্বল ও মলিন হয়ে এক কোণায় বসে শুকনো শক্ত রুটি চিবিয়ে খাচ্ছে।
সন্তানের এই করুণ দশা দেখে মায়ের জাহেরী চোখ অশ্রুসিক্ত হলো। তেনি সোজা গাউসুল আজম হযরত শেখ কাদের জিলানী রহমাতুল্লাহি আলাইহি-এর হুজরা শরীফের দিকে এগিয়ে গেলেন। ঠিক তখনই তিনি অবলোকন করলেন, গাউসুল আজম হযরত শেখ আব্দুল কাদের জিলানী রহমাতুল্লাহি আলাইহি তেনার দস্তরখানে বসে দুপুরের আহার গ্রহণ করছেন এবং তেনার পাত্রে অত্যন্ত সুস্বাদু ও পরিপাটি করে রান্না করা মুরগির মাংস শোভা পাচ্ছে।
তা দেখে মায়ের সাধারণ জাহেরী মনে তীব্র খটকা লেগে গেল। তেনি নিজেকে ধরে রাখতে না পেরে পরম আদব ও কিছুটা অভিমানের সুরে আরজ করলেন, “হে গাউসুল আজম! আমার একমাত্র সন্তান আপনার দরবারে ক্ষুধার্ত হয়ে শুকনো শক্ত রুটি চিবোচ্ছে, আর আপনি সুস্বাদু ও নরম মুরগির মাংস আহার করছেন? এটি কেমন ইনসাফ।
অলৌকিক কুদরতের মহাবিস্ফোরণ: শুকনো হাড়ে ফুঁৎকার
মায়ের অন্তরের এই জাহেরী অন্ধত্ব ও কুধারণার দেয়াল এক সেকেন্ডে চূর্ণ-বিচূর্ণ করতে গাউসুল আজম হযরত আব্দুল কাদের জিলানী রহমাতুল্লাহি আলাইহি এক অলৌকিক পদক্ষেপ নিলেন। তিনি দস্তরখানে থাকা তামাম খাওয়া ও চিবানো মুরগির শুকনো হাড়গুলোকে অত্যন্ত পরিপাটি করে এক সাঙ্গে একত্র করলেন।
এরপর তিনি তেনার নূরানি বরকতময় হাতটি ওই মরা হাড়গুলোর ওপর রাখলেন। তামাম খানকা শরীফে তখন এক স্বর্গীয় নীরবতা নেমে এলো। গাউসুল আজম হযরত আব্দুল কাদের জিলানী রহমাতুল্লাহি আলাইহি তেনার জবান মোবারক থেকে উচ্চারণ করলেন “কূমী বিইযনিল্লাহিল্লাযী ইয়ুহয়িল ‘ইয-মা ওয়া হিয়া রামীম।” অর্থ: “তুমি আল্লাহর হুকুমে জ্যান্ত হয়ে সোজা দাঁড়িয়ে যাও, যিনি তামাম মরা ও পচা হাড়কে পুনরায় জীবন দান করেন!” এবং হাড়ের উপর বাতেনি ফুঁৎকার দিলেন।
মরা হাড় থেকে জ্যান্ত মুরগির আত্মপ্রকাশ!
গাউসুল আজম হযরত আব্দুল কাদের জিলানী রহমাতুল্লাহি আলাইহি-এর পবিত্র মুখ থেকে এই বাণী বের হওয়া মাত্রই তামাম শুকনো হাড় জোড়া লেগে গেল! দেখতে দেখতে হাড়ের ওপর গোশত, রগ ও পালক গজিয়ে একটি জীবন্ত, হৃষ্টপুষ্ট ও পূর্ণাঙ্গ মোরগ তৈরি হয়ে গেল। মোরগটি দস্তরখান থেকে সজোরে লাফ দিয়ে মাটিতে সোজা হয়ে দাঁড়াল এবং ডানা ঝাপটে জোরে জোরে ডাক দিতে শুরু করল-আল্লাহু আকবার!
তা দেখে ওই মায়ের তামাম শরীরের লোম খাড়া হয়ে গেল, অন্তরের তামাম খটকার জ্যাম ধুয়ে সাফ হয়ে বাতেনি চোখ খুলে গেল। তখন গাউসুল আজম হযরত আব্দুল কাদের জিলানী রহমাতুল্লাহি আলাইহি ওই মায়ের দিকে তাকিয়ে পরম রূহার্নী মুচকি হেসে বললেন, “হে জননী! যখন তোমার সন্তান আধ্যাত্মিক সাধনার মাধ্যমে এই উচ্চ মাকাম লাভ করবে যে তার মুখের আজ্ঞায় মরা হাড় জ্যান্ত হবে, তখন সেও দুনিয়ার বুকে এমন সুস্বাদু খাবার পরম স্বস্তিতে গ্রহণ করতে পারবে।”
শুকনো হাড় থেকে জ্যান্ত মুরগি হওয়ার অলৌকিক ঘটনা ও বাতেনি শিক্ষা
এই মহিমান্বিত ঘটনাটি কেবল পড়ার আনন্দ দেয় না, বরং এই ঘটনার মধ্যে ইসলামের সুগভীর বাতেনি ও আত্মশুদ্ধির শিক্ষা লুকিয়ে রয়েছে। নিচে তা বিশ্লেষণ করা হলো:
কামেল মুর্শিদের সোহবতের গুরুত্ব: খানকায় মুরিদকে শুকনো রুটি খাওয়ানো কোনো জুলুম ছিল না, বরং তা ছিল নফসের তামাম কুপ্রবৃত্তি ও দুনিয়াবী লোভ পুড়িয়ে ছাই করার রূহার্নী ঔষধ। কামেল মুর্শিদ জানেন কার কলব কীভাবে পরিষ্কার করতে হয়।
“কুম বিইজনিল্লাহ” এর হাকিকত: আম্বিয়া আলাইহিমুস সালামগণের যেমন মুজিযা থাকে, ওলীদের তেমনি কারামত থাকে। হাদিসে কুদসীর অকাট্য প্রমাণ অনুযায়ী, ওলী-আল্লাহগণের জবান স্বয়ং খোদার কুদরতের জবান হয়ে প্রকাশ পায়। গাউসুল আজম হযরত শেখ আব্দুল কাদের জিলানী রহমাতুল্লাহি আলাইহি-এর পবিত্র মুখের বাণী “কুম বিইজনিল্লাহ” (আল্লাহর হুকুমে জ্যান্ত হও) খোদার সেই কুদরতি মহিমাকেই দুনিয়ার বুকে চাক্ষুষ জাহের করে দিয়েছে।
জাহেরী চোখের ভ্রান্তি দূরীকরণ: মানুষ সবসময় বাইরের রূপ দেখে বিচার করে ভুল করে। ওলী আল্লাহর দরবারে কোনো বৈষম্য থাকে না, তেনাদের তামাম মেহনতের মূল লক্ষ্যই হলো ঘুমন্ত মানুষকে জাগ্রত করা এবং সত্য ও আলোর পথ দেখানো।
উপসংহার:
পরিশেষে বলা যায়, বড়পীর গাউসে পাকের কারামত: শুকনো হাড় থেকে জ্যান্ত মুরগি হওয়ার অলৌকিক ঘটনা ও বাতেনি শিক্ষা- কেবল একটি অলৌকিক কাহিনীর বিবরণী নয়, বরং তা মারেফাতের এক অনন্ত বাতিঘর। ওলী-আউলিয়াগণের জীবনের প্রতিটি কারামত আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, নফসের তামাম গোলামী থেকে মুক্ত হয়ে কামেল মুর্শিদের সোহবতে আত্মশুদ্ধি লাভ করাই হলো প্রকৃত ঈমানী কামিয়াবি। মাওলা পাক তেনার পরম প্রিয় এই ওলীর উসিলায় আমাদের সবার ঘুমন্ত কলব জাগ্রত করুন এবং আমাদের অন্তরে সত্য, হেদায়েত ও বাতেনি প্রশান্তির নূরানি আলো ছড়িয়ে দিন। আমীন, ছুম্মা আমীন।










