দয়াল নবী আপনার দরবারে আমি গোলাম হাজির হইয়াছি।
ইসলামিক জীবনদর্শনে আত্মশুদ্ধি বা নফসের সংশোধন হলো ঈমানদারের জন্য সবচেয়ে বড় আধ্যাত্মিক ইবাদত। মানুষের কলব বা হৃদয়কে যে কয়টি মারাত্মক রোগ চিরতরে ধ্বংস করে দেয়, তার মধ্যে ‘হিংসে’ বা পরশ্রীকাতরতা অন্যতম। আজ আমরা জানবো মানুষের নফসের অহংকার ও হিংসে দমনের এক চমৎকার রূপক কাহিনী- কাক ও বুলবুলির কিচ্ছা, যা আমাদের শেখাবে কীভাবে আল্লাহর দেওয়া নিয়ামতের প্রতি সন্তুষ্ট থেকে একটি আলোকিত জীবন গড়া সম্ভব।
বনভূমিতে দুই পাখির দুই রূপ: অহংকার বনাম বিনম্রতা
এক সবুজ মনোমুগ্ধকর বনভূমিতে পাশাপাশি দুটি গাছে বাস করত একটি কাক ও একটি বুলবুলি। প্রতিদিন ভোরে বুলবুলি তার সুমধুর কণ্ঠে আল্লাহর মহিমা গেয়ে গান গাইত। তার মিষ্টি সুরে পুরো বন যেন নতুন এক প্রাণ ফিরে পেত। বনের সমস্ত পশুপাখিরা আনন্দিত হতো, আর সবাই বুলবুলির এই মিষ্টি স্বভাবের প্রশংসা করত। কিন্তু অন্য গাছে বসে থাকা কাক এসব দেখে মনে মনে হিংসার আগুনে জ্বলতে লাগল। সে ভাবল- “কেন সবাই শুধু বুলবুলির প্রশংসা করে? আমার দিকে তো কেউ তাকায় না!”
কাকের অহংকার ও বুলবুলির আধ্যাত্মিক নসিহত
কাকের ভেতরের হিংসা যখন চরম সীমায় পৌঁছাল, তখন একদিন কাক বুলবুলিকে অপমান করে অহংকারের সাথে বলল- “তোমার এই গান গেয়ে কী লাভ? আমার মতো চতুর হতে পারলে বুঝতে।” বুলবুলি তার এই বেয়াদবিতে বিন্দুমাত্র রাগ না করে অত্যন্ত শান্ত ও রূহার্নী কণ্ঠে উত্তর দিল- “আল্লাহ প্রত্যেক প্রাণীকেই আলাদা আলাদা নিয়ামত দিয়েছেন। কেউ সুন্দর কণ্ঠ পেয়েছে, কেউ শক্তি পেয়েছে, কেউ বুদ্ধি পেয়েছে। নিজের নিয়ামতের শুকরিয়া আদায় করাই উত্তম, অন্যের নিয়ামত দেখে হিংসা করা নয়।” কিন্তু অবাধ্য কাক সেই শান্তির কথা মোটেও শুনল না।
অবাধ্য কাকের চূড়ান্ত অহংকার ও হিংসার করুণ পরিণতি
অবাধ্য কাকটি অহংকারে মত্ত হয়ে সিদ্ধান্ত নিল সে বুলবুলির চেয়েও জোরে চিৎকার করে বনের সবার নজর কাড়বে। পরের দিন ভোরে যখন বুলবুলি তার সুরে জিকির শুরু করল, কাকটি তখন হিংসার বশবর্তী হয়ে পরম কর্কশ ও বিকট আওয়াজে চেঁচাতে শুরু করল। সে এত জোরে এবং এত কুৎসিতভাবে চিৎকার করতে লাগল যে, বনের শান্ত পরিবেশ এক সেকেন্ডে বিষাক্ত হয়ে উঠল। বনের হিংস্র পশুরা তার এই যন্ত্রণাদায়ক চিৎকারে অতিষ্ঠ ও ক্ষুব্ধ হয়ে উঠল।
ঠিক সেই মুহূর্তে এক ক্ষুধার্ত বাজপাখি কাকের সেই বিকট চিৎকার শুনে শিকারের উদ্দেশ্যে তেড়ে এল। কাকটি অহংকারের ঘোরে এতটাই অন্ধ ছিল যে সে বিপদ চাক্ষুষ দেখতেই পায়নি। বাজপাখিটি মুহূর্তের মধ্যে হিংসুটে কাকটিকে থাবা দিয়ে ধরে নিয়ে গেল এবং কাকটি তার নিজের হিংসা ও বোকামির কারণে নিজের মৃত্যু ডেকে আনল। অন্যদিকে, বিনম্র বুলবুলি আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করে পরম শান্তিতে বনের বুকে জিন্দা রইল।
কাক ও বুলবুলির কিচ্ছা থেকে হিংসে দমনের শিক্ষা
এই রূপক কাহিনীটি আমাদের কলবের এক মস্ত বড় হাকিকত চাক্ষুষ প্রমাণ করে। এই কাক ও বুলবুলির কিচ্ছা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, যে মানুষ অন্যের মেধা, সৌন্দর্য বা নিয়ামত দেখে নিজের মনে হিংসার আগুন জ্বালিয়ে, তার তামাম নেক আমল এক সেকেন্ডে কর্পূরের মতো উড়ে যায়। নূর নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর পাক জবানের বাণী- “তোমরা হিংসা থেকে বেঁচে থাকো, কারণ হিংসা মানুষের নেক আমলকে ঠিক সেভাবেই খেয়ে ফেলে, যেভাবে আগুন শুকনো কাঠকে পুড়িয়ে ছাই করে দেয়।”
উপসংহার: আল্লাহর শুকরিয়ায় কলবের প্রশান্তি ও আত্মিক মুক্তি
পরিশেষে বলা যায়, আমাদের জীবনকে অন্যের সাথে তুলনা না করে, আল্লাহ আমাদের যে হালাল নেয়ামত দিয়েছেন তেনারি ওপর একশত ভাগ রাজি ও খুশি থাকা উচিত। এই গভীর কাক ও বুলবুলির কিচ্ছা আমাদের এই পরম সত্যই শেখায় যে, শুকরিয়া আদায়ের মাধ্যমেই কলব শান্ত হয় এবং নফসের দাসত্ব থেকে আত্মা চিরন্তন মুক্তি পায়। আল্লাহ আমাদের সবাইকে হিংসামুক্ত পবিত্র হৃদয়ের অধিকারী করুন। আমীন।










