দয়াল নবী আপনার দরবারে আমি গোলাম হাজির হইয়াছি।
সুফি দর্শনের আকাশে মাওলানা জালালুদ্দিন রুমি রহমাতুল্লাহি আলাইহি এক উজ্জ্বল নক্ষত্র, যাঁর অমর সৃষ্টি ‘মসনবী শরীফ’ বিশ্বজুড়ে মানুষের আত্মিক খোরাক জুগিয়ে আসছে। মাওলানা রুমির শিক্ষা আমাদের জীবনের জটিল সমস্যাগুলোকে আধ্যাত্মিক নূরে আলোকিত করতে শেখায়। আজ আমরা তেনার মসনবী শরীফের একটি বিখ্যাত কিচ্ছা-বাঘ ও খরগোশের গল্পের মাধ্যমে রাগ ও নফসের পতনের এক অনন্য হাকিকত জানবো।
বাঘ ও বনের পশুদের চুক্তি: নফসের ক্ষুধার প্রতীক
মাওলানা রুমির শিক্ষা অনুযায়ী, এই গল্পের বাঘটি মূলত মানুষের অবাধ্য ‘নফস’ বা পাশবিক প্রবৃত্তির প্রতীক। বনের পশুরা প্রতিদিন একটি করে পশুকে বাঘের আহার হিসেবে পাঠাতে রাজি হয়েছিল যাতে তারা বাকিরা শান্তিতে থাকতে পারে। এই চুক্তিটি আসলে আমাদের জীবনের সেই অবস্থার প্রতিফলন, যখন আমরা আমাদের বদ-অভ্যাস বা নফসের লালসাকে প্রতিদিন প্রশ্রয় দিয়ে চলি। কিন্তু নফসের ক্ষুধা কখনো মেটে না, বরং তা দিন দিন আরও বাড়তে থাকে।
চতুর খরগোশের আগমন ও রাগের অন্ধত্ব
একদিন আহার হিসেবে একটি ছোট খরগোশের পালা এল। চতুর খরগোশটি ইচ্ছে করেই দেরি করে বাঘের দরবারে হাজির হলো। বাঘটি রাগে অগ্নিশর্মা হয়ে গর্জাতে থাকলে খরগোশ খুব বিনীতভাবে বলল যে, পথিমধ্যে অন্য এক শক্তিশালী বাঘ তার এলাকা দখল করেছে এবং তাকে আটকে দিয়েছিল। এই মিথ্যা শুনে বাঘের রাগ বাড়ে এবং তার হিতাহিত জ্ঞান লোপ পায়। মাওলানা রুমির শিক্ষা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, রাগ মানুষকে অন্ধ করে দেয় এবং বুদ্ধিমান মানুষকেও ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেয়।
কুয়োর পানিতে নিজের প্রতিবিম্ব ও বাঘের পতন
খরগোশ বাঘটিকে একটি গভীর কুয়োর কাছে নিয়ে গেল এবং বলল যে ওই কুয়োর ভেতরেই অন্য বাঘটি লুকিয়ে আছে। বাঘ যখন কুয়োর ভেতরে তাকাল, তখন সে নিজের প্রতিবিম্ব দেখতে পেল। রাগের মাথায় সে বুঝতে পারেনি যে এটি আসলে তারই ছবি। সে তার প্রতিবিম্বকে শত্রু মনে করে আক্রমণ করতে কুয়োর ভেতর ঝাঁপ দিল এবং নিজের মৃত্যু ডেকে আনল। এই ঘটনায় রুমি দেখিয়েছেন যে, বাঘ মূলত তার কোনো শত্রুর কাছে হারেনি, সে হেরেছে নিজের রাগ ও আত্মকেন্দ্রিকতার কাছে।
জিহাদ্-এ আকবর: নফস দমনের শিক্ষা
বাঘকে পরাজিত করে খরগোশ যখন বনের পশুদের কাছে ফিরে এল, তখন সে তাদের সতর্ক করে দিয়ে এক পরম সত্য উচ্চারণ করল। খরগোশ বলল-আমরা বাইরের বাঘকে তো মেরেছি, কিন্তু এখন আমাদের লড়াই করতে হবে নিজেদের ভেতরের সেই অদৃশ্য বাঘের (নফস বা অহংকার) বিরুদ্ধে। মাওলানা রুমির শিক্ষা আমাদের এই পরম সত্যই চাক্ষুষ প্রমাণ করে যে, নিজের কুপ্রবৃত্তিকে জয় করাই হলো পৃথিবীর সবচেয়ে বড় যুদ্ধ বা ‘জিহাদ-ই-আকবর’।
উপসংহার: রাগের আগুনে নিজের মুক্তি
পরিশেষে বলা যায়, মাওলানা জালালুদ্দিন রুমি রহমাতুল্লাহি আলাইহির এই কালজয়ী কিচ্ছা আমাদের শেখায় যে-রাগ হলো সেই আগুন যা সবার আগে নিজের বিচারবুদ্ধিকে জ্বালিয়ে দেয়। যখন আমরা রাগের বশবর্তী হই, তখন আমরা সত্য দেখতে পাই না এবং বাঘের মতো নিজেরাই নিজেদের পতন ডেকে আনি। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে মাওলানা রুমি রহমাতুল্লাহি আলাইহির এই দর্শনের আলোকে রাগ দমন ও নফস সংশোধনের তৌফিক দান করুন। আমীন।










