দয়াল নবী আপনার দরবারে আমি গোলাম হাজির হইয়াছি।
মা রাবেয়া বসরীর কারামত: বনের হিংস্র পশুদের বশ মানার ঘটনাটি তাসাউউফ ও ওলীগণের ইতিহাসের এক পরম বিস্ময়কর অধ্যায়। যখন কোনো মানুষ নিজের নফসকে মাওলার প্রেমে বিলীন করে দেয়, তখন জগতের হিংস্রতা তেনার সামনে এসে নতজানু হয়। বসরার পবিত্র ভূমিতে জন্ম নেওয়া এই মহান ওলী, হযরত রাবেয়া বসরী রহমাতুল্লাহি আলাইহা ছিলেন ইশকে ইলাহীর এক জ্বলন্ত প্রদীপ। আজ আমরা হৃদয়ের গভীর থেকে জানবো মা রাবেয়া বসরীর কারামত এর সেই রূহানী সত্য এবং কীভাবে জঙ্গল থেকে বাঘ ও সিংহ এসে তেনার খেদমতে হাজির হয়েছিল।
নির্জন পাহাড়ে মা রাবেয়া বসরীর রূহানী নির্জনতা
ইসলামের ইতিহাসে হযরত রাবেয়া বসরী রহমাতুল্লাহি আলাইহা ছিলেন এমন এক জাহিদ বা সংসারত্যাগী ওলী, যাঁর কাছে দুনিয়ার চাকচিক্যের কোনো মূল্য ছিল না। একদিন তেনি বসরার লোকালয় ছেড়ে একটি নির্জন পাহাড়ের পাদদেশে মাওলার স্মরণে মগ্ন ছিলেন। চারদিকে নিস্তব্ধতা, তিনি গভীর ধ্যানে মগ্ন। তেনার চারপাশ ঘিরে বনের হরিণ, পাহাড়ী ছাগল এবং বন্য খরগোশগুলো পরম শান্তিতে বিচরণ করছিল। মনে হচ্ছিল, পুরো প্রকৃতি যেন তেনার রূহানী নূরে শান্ত হয়ে আছে।
হাসান বসরী রহমাতুল্লাহি আলাইহির আগমন ও বন্য পশুদের পলায়ন
এমন সময় বসরার প্রখ্যাত ওলী হযরত হাসান বসরী রহমাতুল্লাহি আলাইহি সেখানে উপস্থিত হলেন। তেনাকে দূর থেকে আসতে দেখেই শান্ত থাকা বনের হরিণ ও খরগোশগুলো প্রাণের ভয়ে দিগ্বিদিক ছুটতে শুরু করল। হাসান বসরী রহমাতুল্লাহি আলাইহি অবাক হয়ে দেখলেন, পশুগুলো তেনাকে দেখে পালালেও মা রাবেয়া বসরীর পাশে তারা শান্ত ছিল। তিনি মা রাবেয়াকে জিজ্ঞেস করলেন, “রাবেয়া, আমাকে দেখে ওরা পালাচ্ছে কেন, অথচ তোমার পাশে ওরা নির্ভয়ে ছিল?”
হিংস্র বাঘ ও সিংহের পাহারাদারি: এক বিস্ময়কর কারামত
মা রাবেয়া বসরী রহমাতুল্লাহি আলাইহা মুচকি হেসে হাসান বসরী রহমাতুল্লাহি আলাইহি-কে একটি মারফতি প্রশ্ন করলেন- আজ দুপুরের খাবারে আপনি কী খেয়েছেন?” হাসান বসরী রহমাতুল্লাহি আলাইহি উত্তর দিলেন, “আমি পশুর চর্বি বা গোশত দিয়ে খাবার খেয়েছি।” তখন রাবেয়া বসরী রহমাতুল্লাহি আলাইহা তেনার কারামতের রহস্য উন্মোচন করে বললেন, “আপনি তো পশুর গোশত খেয়েছেন, তাই তারা আপনাকে দেখে ভয় পাচ্ছে। আর আমি দীর্ঘকাল ধরে নিজের নফসকে আল্লাহর প্রেমে এমনভাবে কুরবান করেছি যে, আমি পশুদের কোনো ক্ষতি করি না, তাই ওরাও আমার ক্ষতি করে না।”
বনের রাজা যখন ওলীর পাহারাদার
ঐতিহাসিক বর্ণনায় পাওয়া যায়, মা রাবেয়া বসরী রহমাতুল্লাহি আলাইহা যখন গভীর বনে একা ইবাদত করতেন, তখন বনের ভয়ংকর বাঘ ও সিংহগুলো তেনার চারপাশ ঘিরে শান্ত হয়ে বসে থাকত। কোনো কোনো রাতে হিংস্র পশুরা তেনার জায়নামাজের চারপাশে পাহারা দিত, যেন কোনো শত্রু তেনার ইবাদতে ব্যাঘাত ঘটাতে না পারে। সুফি দর্শনে মা রাবেয়া বসরীর কারামত, প্রমাণ করে যে- ব্যক্তি আল্লাহর হয়ে যায়, পুরো সৃষ্টিজগত তেনার গোলাম হয়ে যায়। নূর নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর উম্মতের ওলীগণের এই ক্ষমতা মূলত ইশকে রাসূল সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এরই প্রতিফলন।
সুফি দর্শনে ইশকে ইলাহী ও নফস পবিত্র করা
সুফি সাধকগণের মতে, মা রাবেয়া বসরী রহমাতুল্লাহি আলাইহার এই জিন্দা কারামত আমাদের শিক্ষা দেয় যে, অহংকার ও হিংসা ত্যাগ করে নাফসকে পবিত্র করলে (তাজকিয়াতুন নাফস) মানুষের ভেতরে এক ঐশ্বরিক নূরের সৃষ্টি হয়। ওলীগণ যখন দুনিয়ার সব মোহ ত্যাগ করে কেবল আল্লাহর জন্য হয়ে যান, তখন পাহাড়ের পাথর থেকে শুরু করে বনের পশু- সবই তেনার রূহানী ইশারার অনুগত হয়ে যায়।
উপসংহার
পরিশেষে বলা যায়, মা রাবেয়া বসরীর কারামত বা হিংস্র পশুদের বশ মানার এই ইতিহাসটি আমাদের হৃদয়ে খোদা প্রেমের নতুন জোয়ার তৈরি করে। এটি কেবল একটি অলৌকিক কাহিনী নয়, বরং এটি হলো আনুগত্য ও ভালোবাসার এক পরম পরীক্ষা। মহান আল্লাহ আমাদের সকলকে ওলী-আউলিয়াগণের এই পরম আদর্শ থেকে শিক্ষা নিয়ে নূর নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর প্রতি সত্যিকারের আশেক হওয়ার তৌফিক দান করুন। আমীন।
বনের পশুদের সাথে মা রাবেয়া বসরী রহমাতুল্লাহি আলাইহার এই অলৌকিক ভালোবাসা ও কারামত নিয়ে আপনার মনে কি কোনো বিশেষ অনুভূতির সৃষ্টি হয়েছে? কমেন্ট করে আমাদের জানান এবং পোস্টটি শেয়ার করে অন্যদের ঈমানী আলো ছড়াতে সাহায্য করুন।










