দয়াল নবী আপনার দরবারে আমি গোলাম হাজির হইয়াছি।
কারামাতুল আউলিয়া হাক্কুন-অর্থাৎ, আউলিয়াগণের অলৌকিক ক্ষমতা সত্য। দয়াল বাবা জালালী মাওলার কারামত আল্লাহ তাআলার এমনই এক বিস্ময়কর নিদর্শন, যা প্রমাণ করে তাঁর প্রিয় বন্ধুরা বিশেষ রূহানী মর্যাদার অধিকারী। দয়াল বাবা জালালী মাওলা ছিলেন আল্লাহ ও রাসূল ﷺ-এর ভালোবাসায় নিমগ্ন এক পরম প্রেমময় আউলিয়া, যিনি ছয় ঘণ্টা পানির নিচে আল্লাহ ও রাসূল ﷺ-এর জিকিরে মশগুল ছিলেন।
চলুন জানি ১৯৭৭ সালে ঘটে যাওয়া দয়াল বাবা জালালী মাওলার সেই বিস্ময়কর কারামতের ঘটনা, যা ঈমানদারের ঈমানকে আরও দৃঢ় করবে। একই সঙ্গে আমরা জানব, আল্লাহর ওলী-আউলিয়াগণ বেলায়েতি শক্তির মাধ্যমে মানুষের দৃষ্টিতে অসম্ভব মনে হওয়া বিষয়ও সম্ভব করতে পারেন।
কচুয়া বাস স্টেশনের ঘটনা
দয়াল বাবা জালালী মাওলা কচুয়া বাস স্টেশনে উপস্থিত ছিলেন। সিলেটে মাহফিলে যাওয়ার উদ্দেশ্যে তখন চাঁদপুরগামী একটি বাস ছেড়ে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিল।
বাসের মালিক, যিনি দয়াল বাবা জালালী মাওলাকে চিনতেন, তিনি অনুরোধ করে বললেন-
“বাবা, আমার বাসে উঠুন। কালিয়াপাড়া নামিয়ে দিলে কুমিল্লার পথে কুমিল্লায় এবং সিলেটের পথে সিলেটে পৌঁছে যাবেন।”
বাস দুর্ঘটনা ও পানিতে ডুবে যাওয়া
এই অনুরোধে দয়াল বাবা জালালী মাওলা বাসে উঠলেন। মালিক নিজেই বাস চালাতে শুরু করলেন, কিন্তু তিনি দক্ষ ড্রাইভার ছিলেন না। কিছু দূর যাওয়ার পরই বাসটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে খালে পড়ে যায়।
বাসটি উল্টে গিয়ে পানিতে ডুবে যায়। বাসের ছাদ নিচে এবং চাকা উপরের দিকে অবস্থান করছিল। তখনকার দিনে বাসে কাঁচের জানালা ছিল না; কাঠের জানালা ছিল। সে সময়ের মানুষ এসব বাসকে প্রচলিত ভাষায় “মুড়ির টিন” বলেও অভিহিত করতেন।
এই দুর্ঘটনার পর যে ঘটনা ঘটেছিল, তা পরবর্তীতে পুরো এলাকার মানুষকে বিস্মিত করে দেয়।
পানির নিচে ছয় ঘণ্টা জীবিত থাকা
বাসটি উল্টে যাওয়ায় দয়াল বাবা জালালী মাওলার বুক থেকে মাথা পর্যন্ত অংশ পানির নিচে ছিল, আর বুক থেকে পা পর্যন্ত অংশ বাসের উপরে অবস্থান করছিল। তেনার সঙ্গে একজন খাদেমও ছিলেন।
এদিকে বাসের ড্রাইভার কোনোমতে বাস থেকে বের হয়ে নিজের গ্রাম শ্রীরামপুরে চলে যায়, যা কচুয়া বাজারের পূর্ব দিকে অবস্থিত। বাসের মালিক গ্রামে গিয়ে আতঙ্কিত কণ্ঠে লোকজনকে বললেন-
“জালালী সাহেবকে তো আমি এক্সিডেন্ট করে ফেলেছি। তোমরা যে যেভাবে পারো, ওনাকে উদ্ধার করো। মানুষ আমাকে ধরলে মেরে ফেলবে। আমার মনে হয় তিনি আর দুনিয়াতে নেই; অন্তত তেনার লাশটা হলেও তুলে আন।”
এত বড় একটি বাস কি ক্রেন মেশিন ছাড়া তুলে নেওয়া সম্ভব? তারপরও এলাকাবাসী হাল ছাড়েননি। তারা রশি ও লাঠিসোঁটার সাহায্যে প্রাণপণ চেষ্টা চালিয়ে যান এবং অবশেষে ছয় ঘণ্টা পর দয়াল বাবা জালালী মাওলাকে উদ্ধার করতে সক্ষম হন।
দয়াল বাবা জালালী মাওলার বক্তব্য
তেনাকে উদ্ধার করার পর উপস্থিত লোকজন বিস্ময়ের সঙ্গে দেখলেন-দয়াল বাবা জালালী মাওলা সম্পূর্ণ জীবিত আছেন, যদিও তেনার সারা শরীর গাড়ির মবিলে কালো হয়ে গিয়েছিল।
তখন দয়াল বাবা জালালী মাওলা বললেন-
“আমি আল্লাহ ও রাসূল ﷺ-এর জিকিরে মগ্ন ছিলাম। আমার নানাজান, মোল্লা কাজী মুদ্দিন কেবলা কাবা আমাকে কোলে করে নিয়ে রাখছেন।”
পরিণতি ও শিক্ষা
এই ঘটনাটি প্রমাণ করে যে, আল্লাহ তাআলা চাইলে তাঁর প্রিয় বন্ধুদের জন্য মানুষের দৃষ্টিতে অসম্ভব বলে মনে হওয়া বিষয়ও সম্ভব করে দিতে পারেন। পানির নিচে ছয় ঘণ্টা অক্সিজেন ছাড়া জীবিত থাকা সাধারণ জ্ঞানের বাইরে হলেও, দয়াল বাবা জালালী মাওলার কারামত হিসেবে বর্ণিত এই বিস্ময়কর ঘটনা অসংখ্য মানুষের হৃদয়ে গভীর প্রভাব ফেলে এবং আল্লাহর কুদরতের প্রতি বিশ্বাসকে আরও দৃঢ় করে।
অনেক মানুষ মনে করেন, ওলী-আউলিয়াগণ সাধারণ মানুষের মতোই। কিন্তু এই ঘটনা আমাদের শেখায় যে, আল্লাহর প্রিয় বন্ধুদের বিশেষ মর্যাদা রয়েছে, যা তিনি নিজ ইচ্ছায় প্রকাশ করেন।
পরিশেষে
দয়াল বাবা জালালী মাওলার কারামত আমাদের ঈমানকে আরও দৃঢ় করে এবং আল্লাহর কুদরতের প্রতি বিশ্বাস বাড়িয়ে দেয়। আল্লাহ তাআলা তাঁর প্রিয় বন্ধুদের মাধ্যমে এমন নিদর্শন প্রকাশ করেন, যা মানুষের চিন্তার সীমাকেও অতিক্রম করে।
আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে ওলী-আউলিয়াদের প্রতি ভালোবাসা দান করুন, তাঁদের মর্যাদা সঠিকভাবে উপলব্ধি করার তাওফিক দিন এবং ঈমানের ওপর অটল থাকার শক্তি দান করুন। আমীন।










