দয়াল নবী আপনার দরবারে আমি গোলাম হাজির হইয়াছি।
নূর নবীজি ﷺ-এর অলৌকিক মুজিযা ইসলামের ইতিহাসে এমন এক মহিমান্বিত অধ্যায়, যা ঈমানদারের ঈমান বৃদ্ধি করে এবং সাধারণ মানুষের চিন্তাজগতকে এক পরম বিস্ময়ে স্তব্ধ করে দেয়। তার মধ্যে অন্যতম প্রধান এবং একটি মুজিযা হলো খায়বারের যুদ্ধের পর ইহুদি নারীর দেওয়া বিষাক্ত ছাগলের মাংসের অলৌকিকভাবে বাকশক্তি লাভ করা এবং নূর নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কুদরতি পরশে সেই জড় মাংসখণ্ডের সশরীরে কথা বলা। এই ঘটনাটি যেমন ঈমানদারের অন্তরে ইশক ও বাতেনি নূর বৃদ্ধি করে,তেমনই আধুনিক বিজ্ঞানের “সেলুলার মেমোরি” বা কোষের নিজস্ব স্মৃতিশক্তি এবং জড় পদার্থের “বায়ো-কেমিক্যাল কোয়ান্টাম” অর্থাৎ জীবন্ত কোষের ভেতরের বাতেনি শক্তি ও অতি সূক্ষ্ম আলো-কণার তত্ত্বকেও এক পরম বিস্ময়ের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয়।
খায়বারের ঐতিহাসিক পটভূমি ও বিষাক্ত মাংসের চাক্ষুষ অলৌকিকতা
হিজরী সপ্তম সনে ইহুদিদের প্রধান দুর্গ খায়বার বিজয়ের পর, মদীনার মুসলিম সাম্রাজ্যে এক নতুন দিগন্তের উন্মোচন হয়। তবে পরাজয়ের গ্লানি ও প্রতিশোধের আগুন জ্বলছিল ইহুদিদের অন্তরে। খায়বারের অন্যতম প্রধান ইহুদি সর্দার সালাম বিন মিশকামের স্ত্রী এবং হারিসের কন্যা জয়নব বিনতে হারিস নূর নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে দুনিয়া থেকে সরিয়ে দেওয়ার জন্য এক জঘন্য ও বাতেনি ষড়যন্ত্রের জাল বোনে। সে অত্যন্ত সুকৌশলে একটি মাদী ছাগল জবাই করে তার পুরো মাংসে তীব্র ও প্রাণঘাতী বিষ মিশিয়ে দেয়। আর সে আগেই গোপনে অনুসন্ধান চালিয়ে জেনে নিয়েছিল যে, নূর নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম ছাগলের সামনের পায়ের বাহু বা কাঁধের গোশত সবচেয়ে বেশি পছন্দ করেন। তাই সে ওই নির্দিষ্ট অংশে বিষের মাত্রা সবচেয়ে তীব্র করে তোলে।
জড় মাংসখণ্ডের অলৌকিক বাকশক্তি লাভ ও নূর নবীজি ﷺ-এর কুদরতি ঘোষণা
সিহাহ সিত্তাহর আলোয় অকাট্য হাদিস ও ঐতিহাসিক দলিলসমূহ
নূর নবীজি ﷺ-এর সাথে বিষাক্ত মাংসের কথা বলার এই মহান মুজিযাটি সিহাহ সিত্তাহ বা ইসলামের প্রধান প্রধান বিশুদ্ধ হাদিস গ্রন্থে অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য সনদে সংরক্ষিত রয়েছে। পাঠকদের ঈমানী দৃঢ়তার জন্য নিচে প্রধান প্রধান হাদিসের রেফারেন্স নম্বরসহ তুলে ধরা হলো:
সহীহ বুখারী শরীফের অকাট্য প্রমাণ
হযরত আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, খায়বার যুদ্ধের পর যখন সেই বিষাক্ত ছাগলের মাংস আনা হয়, তখন জড় মাংসের কথা বলার পর ইহুদি নারীকে ডেকে আনা হলো। নূর নবীজি ﷺ তাকে জিজ্ঞাসা করলেন, “তুমি কেন আমার খাদ্যে বিষ মিশালে?” জয়নব বিনতে হারিস জবাবে বলেছিল, “আমি মনে মনে ভেবেছিলাম, আপনি যদি সাধারণ কোনো রাজা হন, তবে এই বিষে মারা যাবেন এবং আমরা আপনার হাত থেকে মুক্তি পাব। আর আপনি যদি আল্লাহর প্রেরিত খাঁটি সত্য নবী হন, তবে আল্লাহ আপনাকে ওহীর মাধ্যমে আগেই জানিয়ে দেবেন এবং এই বিষ আপনার কোনো ক্ষতি করতে পারবে না!”
সহীহ বুখারী, হাদিস নম্বর- ৩১৬৯ (অধ্যায়: জিযিয়া ও সন্ধি) এবং হাদিস নম্বর- ৪২৪৯ (অধ্যায়: মাগাযী বা যুদ্ধসমূহ)।
সহীহ মুসলিম ও সুনানে আবু দাউদ শরীফের বর্ণনা
হযরত জাবির ইবনে আব্দুল্লাহ রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত হাদিসে স্পষ্ট উল্লেখ আছে যে, ছাগলের ওই মাংস নূর নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সাথে কথা বলেছিল।
সহীহ মুসলিম, হাদিস নম্বর-৫৮৩২ (অধ্যায়: সালাম ও রোগব্যাধি) এবং সুনানে আবু দাউদ, হাদিস নম্বর-৪৫০৮ ও ৪৫১২।
আধুনিক বিজ্ঞানের বিস্ময়: রান্না করা গোশতের বাকশক্তি ও নূর নবীজি ﷺ-এর কুদরতি স্পর্শ
সুফি দর্শন ও বাতেনি হাকিকত: নূর নবীজি ﷺ-এর পরম ইশক ও বেলায়েতের প্রকাশ
হক্কানী ওলী-আল্লাহ ও কামেল সুফি সাধকগণের মতে, নূর নবীজি ﷺ-এর এই মুজিযাটি কেবল একটি সাধারণ ঐতিহাসিক ঘটনামাত্র নয়; এটি হলো সমগ্র সৃষ্টির ওপর স্রষ্টার প্রেরিত হাবীব, নূর নবীজি ﷺ-এর বাতেনি আধিপত্য ও চরম বেলায়েতের এক জ্যান্ত প্রকাশ। মহাবিশ্বের গাছপালা, পাহাড়-পর্বত, এমনকি আগুনের তাপে রান্না করা জড় মাংসখণ্ডও তেনাকে চেনে এবং একশত ভাগ সাক্ষ্য দেয় যে-তিনিই হলেন আল্লাহর রাসুল। রান্না করা জড় পদার্থের এই অলৌকিক বাকশক্তি লাভ পরমভাবে প্রমাণ করে যে, আল্লাহর রাসূলের পবিত্র সংস্পর্শে আসলে মৃত কলব বা অন্ধ অন্তরের বাতেনি চোখও এক নিমেষে আলোর মতো খুলে যায়।
উপসংহার: মুমিনের ঈমানী আলো ও আত্মশুদ্ধির শিক্ষা
পরিশেষে বলা যায়, নূর নবীজি ﷺ-এর এই পরম অলৌকিক মুজিযা আমাদের এই শিক্ষাই দেয় যে-বাহ্যিক জগতের কোনো জঘন্য ষড়যন্ত্র কিংবা পৃথিবীর কোনো শক্তিই আল্লাহর প্রিয় হাবীব সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবং তেনার প্রিয় ওলীগণের বাতেনি নূরকে কখনো নিভিয়ে দিতে পারে না। নূর নবীজি ﷺ-এর প্রতি অকৃত্রিম ইশক বা মহব্বত পোষণ করা এবং তেনার এই জ্যান্ত মুজিযাসমূহের ওপর দৃঢ় বিশ্বাস রাখাই হলো একজন প্রকৃত ঈমানদারের তাজকিয়াতুন নাফস বা আত্মশুদ্ধি অর্জনের মূল ভিত্তি। আধুনিক বিজ্ঞান ও সভ্যতার এই চরম উৎকর্ষের যুগেও নূর নবীজি ﷺ-এর প্রতিটি কুদরতি পরশ মানবজাতির ঘুমন্ত কলব জাগ্রত করার এবং বাতেনি রূহানী প্রশান্তি লাভ করার এক পরম ও জ্যান্ত আলোর দিশারী হিসেবে চাক্ষুষ বিদ্যমান থাকবে।










