দয়াল নবী আপনার দরবারে আমি গোলাম হাজির হইয়াছি।
গাউছুল আজম মাইজভাণ্ডারীর বেলায়েতী শান হলো আধ্যাত্মিক জগতের আসমানে এক চিরন্তন নূরের আলোকবর্তিকা তিনি এমন এক মহাসমুদ্র, যাঁর পবিত্র ফয়েজ, তাওয়াজ্জুহ ও বাতেনি বরকত কেবল মানুষের ইহকালীন জীবনেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং মৃত্যুর কঠিনতম মুহূর্তে, ওফাতের অন্তিম পর্বে এবং সাকরাতুল মউত তীব্র যাতনার সময়েও আশেক মুরিদদের তৃষ্ণার্ত কলবকে ঈমানের নূরে সিক্ত করে। সর্বশক্তিমান আল্লাহ রব্বুল আলামীন এই ধরাধামে তাঁর খাস ও প্রিয় ওলী-আউলিয়াদের পাঠিয়েছেন পথহারা দিশেহারা মানবজাতিকে হেদায়েতের সরল, সঠিক ও নূরানী পথ প্রদর্শন করতে এবং তেনাদের পবিত্র উসিলার মাধ্যমে সৃষ্টিজগতকে দুনিয়া ও আখেরাতের চিরন্তন সুখ ও কল্যাণ দান করতে।
সুফি দর্শন, আহলে সুন্নাত ওয়াল জামায়াতের বিশুদ্ধ আকিদা এবং মারেফতের সুপ্রাচীন কিতাবসমূহের অকাট্য দলিল অনুযায়ী, ওলী-আল্লাহগণের আধ্যাত্মিক ক্ষমতা, রূহার্নী তাছরূফ বা বাতেনি নজর স্থান, কাল ও দূরত্বের কোনো জাগতিক দেয়াল বা সীমানায় কখনো আবদ্ধ থাকে না। তেনাদের খাঁটি মুরিদ, আশেক ও অনুসারীগণ দুনিয়ার যে প্রান্তেই অবস্থান করুন না কেন, জীবনের শেষ প্রহরে যখন মৃত্যুর ফেরেশতা হযরত আজরাইল আলাইহিস সালাম সম্মুখে উপস্থিত হন, তখন ওলীগণের রূহার্নী তাশরীফ ও বাতেনি পাহারা মুরিদের ঈমানী হেফাজতের এক পরম উসিলা হয়ে চাক্ষুষ দেখা দেয়।
তরিকত-ই-মাইজভাণ্ডারিয়ার মহান ইমাম, গাউসুল আজম হযরত মওলানা সৈয়দ আহমদ উল্লাহ মাইজভাণ্ডারী রহমাতুল্লাহি আলাইহি ছিলেন বেলায়েতের আসমানের এক ধ্রুবতারা যেনার পবিত্র সান্নিধ্য, আধ্যাত্মিক শাসন ও বেলায়েতী দাপটের অসংখ্য জ্যান্ত কাহিনী ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে সংরক্ষিত রয়েছে। আজ আমরা অত্যন্ত ভক্তিপূর্ণ হৃদয়ে, পরম আদবের সাথে এবং পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বিস্তারিত জানবো ওলীর প্রতি নিষ্ঠা এবং গাউছুল আজম মাইজভাণ্ডারীর বেলায়েতী শান এর এক জগতকাঁপানো কালজয়ী ইতিহাস, যা আমাদের হৃদয়কে পরিশুদ্ধ করবে এবং ওফাতের শেষ প্রহরে ঈমানি মউত বা জান্নাতী বিদায়ের সেই অলৌকিক রহস্য চাক্ষুষ উন্মোচন করবে।
মৌলভী আবদুস হকিম সাহেবের একশত এক বছরের নিষ্ঠা ও মুরিদত্বের কালজয়ী ইতিহাস
মাইজভাণ্ডারী তরিকার অন্যতম বিশ্বস্ত আশেক, প্রবীণ আলেম ও প্রত্যক্ষদর্শী মৌলভী মীর আহমেদ সাহেব তেনার জীবনের এক পরম সত্য ও রূহার্নী ঘটনার বিবরণ দিতে গিয়ে এক কালজয়ী আধ্যাত্মিক ইতিহাস প্রকাশ করেছেন। তেনার শ্রদ্ধেয় চাচা মৌলভী আবদুস হকিম সাহেব ছিলেন তরিকতের মূল প্রবর্তক ও গাউসিয়াতের রাজকীয় মাকামের অধিকারী হযরত আহমদ উল্লাহ শাহ প্রকাশ হযরত কেবলা রহমাতুল্লাহি আলাইহির-এর একনিষ্ঠ, পরম ভক্ত ও আত্মনিবেদিত মুরিদ। তিনি তেনার দীর্ঘ জিন্দেগী ও জীবনের প্রতিটি কদম ওলীর ইশকে, তরিকতের কঠোর সাধনায় এবং সুন্নাহর পরিপূর্ণ অনুসরণে অতিবাহিত করেছিলেন।
আধ্যাত্মিক সাধনার ময়দানে পীরের প্রতি মুরিদের অন্তরের খাঁটি একিন, অবিচল ভক্তি ও বিশ্বাসের গভীরতা কতখানি সুদৃঢ় হতে পারে, তেনার এক পরম ও জীবন্ত দৃষ্টান্ত ছিলেন এই বুজুর্গ মুরিদ। দীর্ঘ একশত এক বছর বয়সের এক সুদীর্ঘ ও বরকতময় জিন্দেগী লাভ করার পর, যখন তেনার ইহকালীন জীবনের শেষ সময় সমাগত হলো, তখন তেনার সেই ওফাত শয্যায় এক অলৌকিক ও নূরানী দৃশ্যের অবতারণা ঘটে, যা সাধারণ মানুষের জাগতিক ও যান্ত্রিক বুদ্ধির সম্পূর্ণ অতীত।
সুফিবাদের মূল তত্ত্ব ও আধ্যাত্মিক দর্শন অনুযায়ী, ওলীর প্রতি মুরিদের মহব্বত ও ভালোবাসা যখন ইশকের সর্বোচ্চ চূড়ান্তে পৌঁছায়, তখন ওলী এবং মুরিদের রূহের মধ্যে আধ্যাত্মিক যোগসূত্র বা আত্মিক মিলন একশত ভাগ জ্যান্ত ও সক্রিয় হয়ে ওঠে। মৌলভী আবদুস হকিম সাহেব যখন বার্ধক্যের শেষ সীমায় পৌঁছে মৃত্যুর শয্যায় শায়িত হলেন এবং তেনার জীবনের শেষ প্রহর ঘনিয়ে এলো, ঠিক তখন তেনার শারীরিক এবং মানসিক অবস্থার মধ্যে এক পরম আধ্যাত্মিক পরিবর্তন লক্ষ্য করা গেল।
তেনার অবয়ব ও চেহারায় কোনো প্রকার মৃত্যুযন্ত্রণার কষ্ট, ছটফটানি বা মৃত্যুর যাতনা চাক্ষুষ ছিল না, বরং তেনার চোখ দুটো বাতেনি জগতের কোনো এক মহাসৌন্দর্য দর্শনে ব্যাকুল ও আনন্দিত হয়ে উঠেছিল। ওলী-আল্লাহদের প্রতি খাঁটি মহব্বতের শেষ পরিণতি যে কতটা জান্নাতী, শান্তিপূর্ণ ও গৌরবময় হতে পারে, তেনারই এক জীবন্ত অলৌকিক প্রমাণ চাক্ষুষ তৈরি হচ্ছিল তেনার সেই ওফাতের সময় উপস্থিত ঘরভর্তি মানুষকে পরম বিষ্ময়ে স্তব্ধ ও নির্বাক করে দিয়েছিল।
ওফাতের অন্তিম ক্ষণে হযরত কেবলার নূরানী তাশরীফ ও কালেমা স্মরণ করানোর অলৌকিক দৃশ্য
ইন্তেকালের ঠিক শেষ মুহূর্তে, যখন মৌলভী আবদুস হকিম সাহেবের শ্বাস-প্রশ্বাস ধীর হয়ে আসছিল এবং আত্মীয়-স্বজনরা তেনার শিয়রে বসে পবিত্র কুরআন তিলাওয়াত করছিলেন, তখন তিনি হঠাৎ বিছানা থেকে উঠে বসার চেষ্টা করলেন এবং অত্যন্ত ব্যাকুল হয়ে দুই হাত বাড়িয়ে অদৃশ্য কারও কদমে বারবার কদমগুচি করতে উদ্যত হলেন। তেনার এই আকস্মিক ও রহস্যময় আচরণ দেখে উপস্থিত আত্মীয়-স্বজনগণ কৌতূহলি হলেন। সবাই তেনাকে শান্ত করে বিছানায় শুইয়ে দেওয়ার চেষ্টা করতেই, তেনার মুখ থেকে নির্গত হলো এক পরম সৌভাগ্যের রূহার্নী ও ঐশী বাণী।
তিনি অত্যন্ত স্পষ্ট, সাবলীল ও ভক্তিপূর্ণ কণ্ঠে সবার উদ্দেশ্যে উচ্চস্বরে বলে উঠলেন, “তোমরা দেখ, আমার দয়াল গাউসুল আজম সৈয়দ আহমদ উল্লাহ মাইজভাণ্ডারী রহমাতুল্লাহি আলাইহি এখানে সশরীরে তাশরীফ এনেছেন এবং তেনার এই অধম গোলামকে পবিত্র কালেমা স্মরণ করাচ্ছেন। তেনার এই কথা শোনা মাত্রই ঘরের ভেতরের পুরো বাতাস যেন এক স্বর্গীয় সুবাসে, সুফি ফয়েজে ও কুদরতি নূরের আলোয় মুখরিত হয়ে উঠল। এটিই ছিল মূলত গাউছুল আজম মাইজভাণ্ডারীর বেলায়েতী শান যা প্রমাণ করে যে মৃত্যুর সময়ও ওলী-আল্লাহদের রূহার্নী শাসন ও আশেকদের প্রতি তেনাদের বাতেনি পাহারা একশত ভাগ জ্যান্ত ও জাগ্রত থাকে।
পীরের এই নূরানী দর্শন ও বাতেনি তাশরীফ পাওয়ার পর, মৌলভী আবদুস হকিম সাহেব তেনার আধ্যাত্মিক হালতে আরও গভীরে তলিয়ে গেলেন। তিনি ক্ষণকাল নীরব থাকার পর হঠাৎ দৃঢ় কণ্ঠে বলে উঠলেন, “না, আমি এক ছাড়া দ্বিতীয় কাউকে জানিনা! না, আমি দুই বলিতে পারিনা! ইহা আমার দয়াল পীরের খাস ছবক!” তেনার এই মারেফতি ও তওহীদি বাণী চাক্ষুষ প্রমাণ করে যে- ওলীর দেওয়া প্রথম ছবক অর্থাৎ ‘আল্লাহ এক ও অদ্বিতীয় এবং তেনার কোনো শরিক নেই’- তা মুরিদের কলবের ভেতর ও হৃদস্পন্দনে এমনভাবে গেঁথে গিয়েছিল যে, মৃত্যুর কঠিনতম মুহূর্তে শয়তান যখন নানা বেশে ঈমান হরণ করতে আসে, তখন ওলীর বাতেনি তছরূফ ও ছবকের জোরে শয়তানের সমস্ত কুচক্র ও ধোঁকা এক সেকেন্ডে ধূলিসাৎ হয়ে যায়।
তিনি পরম সুখে, অত্যন্ত শান্ত চিত্তে ও উচ্চ কণ্ঠে পবিত্র কালেমা শাহাদাত তিলাওয়াত করতে লাগলেন। সবচেয়ে বড় অলৌকিক ও বিস্ময়কর বিষয় হলো, কোনো প্রকার সাকরাতুল মউত এর কষ্ট, ছটফটানি বা শারীরিক বেদনা ছাড়াই, পরম শান্তিতে ঈমানের সাথে এই নশ্বর দুনিয়া ত্যাগ করে জান্নাতের উদ্দেশ্যে বিদায় নিলো। একশত এক বছর বয়সী এক আশেক মুরিদের এই ঈমানী জান্নাতী বিদায় দেখে উপস্থিত প্রত্যেকের কলব ওলীর শানে ও আল্লাহর কুদরতে পরম ভক্তি ও কান্নায় ভেঙে পড়ল।
মারেফতি তত্ত্ব, উসুলে সুফিবাদ ও ওলীসুলভ তাওয়াজ্জুহের গভীর হাকিকত
সুফিবাদ, মারেফত এবং তরিকতের মূল দর্শন ও হাকিকত অনুযায়ী, যখন একজন কামেল ওলীর বাতেনি নজর কোনো মুরিদের ওপর পূর্ণরূপে পতিত হয়, তখন মুরিদের নফস বা কুপ্রবৃত্তি সম্পূর্ণ শান্ত হয়ে মানবাত্মা বা রূহের আসল বিকাশ ঘটে। গাউছুল আজম মাইজভাণ্ডারীর বেলায়েতী শান এর এই ঐতিহাসিক ঘটনাটি আমাদের এই পরম আত্মিক শিক্ষাই দেয় যে- দুনিয়ার ক্ষণস্থায়ী জীবনে পীরের দেওয়া ছবক, জিকির বা ধ্যান যে ব্যক্তি নিষ্ঠার সাথে অন্তরে ধরে রাখে, মৃত্যুর সময় স্বয়ং পীর তেনার ঈমানী হেফাজতের জন্য বাতেনিভাবে জ্যান্ত হাজির হন।
সুফি কিতাব ‘তাজকিরাতুল আউলিয়া’, ‘ফাওয়াইদুল ফুয়াদ’ এবং ‘নাফাহাতুল উনস’-এর বিভিন্ন অকাট্য তত্ত্বে উল্লেখ আছে যে, ওলী-আল্লাহগণ আল্লাহর দেওয়া বিশেষ নূরানী ক্ষমতায় ও বেলায়েতী সার্বভৌমত্বে স্থান ও কালের দেয়াল এক নিমেষে জয় করতে পারেন। তাই ফটিকছড়ির মাইজভাণ্ডার গ্রাম থেকে বহু দূরে অবস্থান করার পরেও, একশত এক বছর বয়সী মুরিদ আবদুস হকিম সাহেবের শেষ বিদায়ের প্রহরে হযরত কেবলার রূহার্নী তাশরীফ আনা এবং নিজ মুখে কালেমা স্মরণ করানো সুফিবাদের বেলায়েতী সার্বভৌমত্ব ও বাতেনি তছরূফের এক পরম ও জ্যান্ত বাস্তব দলিল হয়ে চিরকাল মানবজাতির সামনে দীপ্তি ছড়াবে। তেনাদের এই শক্তি মূলত নূর নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর মুজিযারই এক একটি অনন্য প্রকাশ।
উপসংহার ও আধ্যাত্মিক মুক্তির রাজকীয় আলোকবর্তিকা
পরিশেষে বলা যায়, গাউছুল আজম মাইজভাণ্ডারীর বেলায়েতী শান এবং মুরিদ আবদুস হকিম সাহেবের এই অলৌকিক ও গৌরবময় জান্নাতী বিদায়ের সত্য ইতিহাস আমাদের এই পরম ও শাশ্বত শিক্ষাই দেয় যে- ওলী-আল্লাহদের পবিত্র সংস্পর্শ, নেক নজর ও খাঁটি মহব্বতই হলো মৃত্যুর কঠিনতম সময়ে ঈমান বাঁচানোর একমাত্র রাজকীয় উসিলা। আজকের এই যান্ত্রিক, বস্তুবাদী ও আধুনিক যুগে, যেখানে মানুষ কেবল জাগতিক মোহে অন্ধ হয়ে কুপ্রবৃত্তির দাসত্বে লিপ্ত হচ্ছে এবং আত্মিক শান্তি হারিয়ে ঘোর অন্ধকারে নিমজ্জিত হচ্ছে, সেখানে ওলী-আউলিয়াদের পবিত্র বাণী, স্মারক ও জীবনদর্শনই হতে পারে আমাদের প্রকৃত আত্মিক প্রশান্তি এবং নফসের জিঞ্জির বা কুপ্রবৃত্তির দাসত্ব থেকে মুক্তির একমাত্র পথ। তেনাদের শেখানো ইশকের পথে চললে যেমন মানুষের কলব হবে সম্পূর্ণ পাপমুক্ত, নির্মল ও আয়নার মতো স্বচ্ছ, তেমনি ইহকাল ও পরকালে চিরন্তন মুক্তির কুদরতি দ্বার এক সেকেন্ডে খুলে যাবে।











1 thought on “গাউছুল আজম মাইজভাণ্ডারীর বেলায়েতী শান: একশত এক বছর বয়সী মুরিদের অলৌকিক জান্নাতী বিদায়।”