দয়াল নবী আপনার দরবারে আমি গোলাম হাজির হইয়াছি।
ঈমানদার মুসলমানদের বাবা কয়জন? প্রথমে শুনতে এটি এক সাধারণ প্রশ্ন মনে হলেও এর গভীরে রয়েছে তাসাঊফ বা সুফি দর্শনের এক সুগভীর ও মহৎ রূহার্নী শিক্ষা। বর্তমান যান্ত্রিক ও বস্তুবাদী সমাজে আমরা কেবল রক্ত ও মাংসের জাগতিক সম্পর্ককেই একমাত্র সম্পর্ক মনে করি। কিন্তু একজন ঈমানদারের জীবন কেবল দুনিয়াবী দেহের মাঝে সীমাবদ্ধ নয়, তার রয়েছে একটি অমর আত্মা বা রূহ। শুধু জন্মদাতাই কি আমাদের সত্যিকারের পিতা, নাকি এমন কেউ আছেন যেনারা আমাদের ঈমান, নৈতিকতা ও পরকালের পথপ্রদর্শক হন? আজকের এই বিস্তারিত নিবন্ধে আমরা কুরআন, হাদিস এবং ওলী-আউলিয়াদের মরমী ব্যাখ্যার আলোকে চাক্ষুষ অনুসন্ধান করব যে ঈমানদার মুসলমানদের বাবা কয়জন? এবং জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে এনাদের গুরুত্ব কতখানি অপরিহার্য।
দয়াল বাবা জালালী মাওলা বলেছেন- একজন ঈমানদার মুসলমানের ছয়জন পিতা আছেন। আসুন আমরা জানি এবং শিখি, কে এই ছয়জন পিতা, এবং তেনাদের পরিচয় ও বাতেনি হাকিকত জানার মাধ্যমে আমাদের ঈমানকে আরও দৃঢ় ও শক্তিশালী করি।
১. নূর নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম (আবুল আরওয়াহ – সমস্ত রুহের পিতা)
২. হযরত আদম আলাইহিস সালাম (আবুল বাশার -মানবজাতির আদি পিতা)
ঈমানদার মুসলমানদের দ্বিতীয় পিতা হলেন হযরত আদম আলাইহিস সালাম। জগতের সমস্ত মানুষ, সে যেকোনো ধর্মের বা বর্ণের হোক না কেন, তাদের দৈহিক ও জৈবিক বংশধারা হযরত আদম আলাইহিস সালাম থেকেই শুরু হয়েছে। এই জন্য শরিয়ত ও ইতিহাসের পরিভাষায় তাঁকে ‘আবুল বাশার’ বা মানবজাতির আদি পিতা বলা হয়।
কুরআনি দলিল- মহান আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনুল কারীমে হযরত আদম আলাইহিস সালাম যে মানবজাতির আদি পিতা, তা স্পষ্ট করে মানবজাতিকে উদ্দেশ্য করে ইরশাদ করেছেন:
— (সূরা আন-নিসা, আয়াত: ১)
মহান আল্লাহ তাআলা কুদরতি হাতে মাটি দিয়ে হযরত আদম আলাইহিস সালাম-এর দেহ মোবারক তৈরি করেছেন এবং তাঁর ভেতরে পবিত্র রুহ ফুঁকে দিয়েছেন। হযরত আদম আলাইহিস সালাম আদি পিতা এই শাশ্বত সত্যতাকে অস্বীকার করা মানে সমগ্র মানবজাতির অস্তিত্ব ও সৃষ্টিতত্ত্বকেই অস্বীকার করা।
৩. হযরত ইব্রাহিম আলাইহিস সালাম (মুসলমানদের জাতির পিতা)
আমাদের তৃতীয় পিতা হলেন মিল্লাতের রেহবার হযরত ইব্রাহিম আলাইহিস সালাম। তিনি হলেন মুসলমানদের মিল্লাত বা জাতির পিতা। আল্লাহ তাআলা তাঁকে ঈমানদারদের জন্য এক মহান আদর্শ হিসেবে দুনিয়াতে পাঠিয়েছিলেন।
কুরআনি দলিল- পবিত্র কুরআনুল কারীমে আল্লাহ তাআলা হযরত ইব্রাহিম আলাইহিস সালাম-কে মুসলমানদের জাতির পিতা হিসেবে ঘোষণা করে স্পষ্ট ইরশাদ করেছেন:
“মিল্লাতা আবীকুম ইব্রাহিমা, হুয়া সম্মাকুমুল মুসলিমীন।”
আয়াতের অর্থ: “তোমাদের পিতা ইব্রাহিমের দ্বীন বা আদর্শ; স্বয়ং আল্লাহ তোমাদের নাম ‘মুসলমান’ রেখেছেন পূর্ববর্তী কিতাবসমূহে এবং এই কুরআনেও”
— (সূরা আল-হাজ্জ, আয়াত: ৭৮)
এই আয়াত চাক্ষুষ প্রমাণ করে যে, ঈমানদার মুসলমানদের জাতীর পিতা হলেন হযরত ইব্রাহিম আলাইহিস সালাম।
৪. জন্মদাতা পিতা (দুনিয়াবী বংশধারার রক্ষক)
আমাদের চতুর্থ পিতা হলেন আমাদের পরম পূজনীয় জন্মদাতা পিতা, যাঁর উসিলায় আমরা এই সুন্দর পৃথিবীতে আলোর মুখ দেখেছি। সুফি দর্শনে ও তাসাউফ শাস্ত্রে জন্মদাতা পিতাকে দয়াল মাওলার এক বিশেষ এবং শ্রেষ্ঠ নেয়ামত মনে করা হয়। ইসলামে এই পিতার সুমহান অবদান ও ত্যাগের কথা বারবার স্মরণ করানো হয়েছে।
কুরআনি দলিল- মহান আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনুল কারীমে নিজের ইবাদতের নির্দেশের পরপরই জন্মদাতা পিতা-মাতার সাথে উত্তম ব্যবহার করার কঠোর হুকুম জারি করেছেন। তিনি স্পষ্টভাবে ইরশাদ করেছেন:
— (সূরা বনী ইসরাঈল, আয়াত: ২৩)
তরিকতের বাতেনি বিজ্ঞান অনুযায়ী, জন্মদাতা পিতার সেবা করা, তেনাকে মনে-প্রাণে সন্তুষ্ট রাখা এবং তাঁর বিন্দুমাত্র অবাধ্য না হওয়া হকের পথে চলার অন্যতম প্রধান বুনিয়াদি শর্ত। কারণ হাদিস শরীফে এসেছে— “পিতার সন্তুষ্টির মাঝেই আল্লাহর সন্তুষ্টি লুকিয়ে আছে”।
৫. শ্বশুর আব্বা (বৈবাহিক সম্পর্কের সূত্রে পিতা)
— (সূরা আল-ফুরকান, আয়াত: ৫৪)
৬. পীর, গুরু বা মুর্শিদ (রূহার্নী ও বাতেনি পিতা)
ঈমানদার মুসলমানদের আত্মশুদ্ধির জগতের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও প্রধান পিতা হলেন আপন কামেল মুর্শিদ, পীর বা আধ্যাত্মিক গুরু। কেন তিনি পিতা এবং কেন তেনাকে পরম প্রয়োজন, সেই ব্যাপারে আল-কুরআন কী বলে- আসুন সেই সুগভীর বাতেনি হাকিকত সম্পর্কে আমরা জানি ও শিখি।
— (সূরা বনী ইসরাঈল, আয়াত: ৭১)
তরিকতের বাতেনি বিজ্ঞানের আলোকে, কামেল মুর্শিদ হলেন সিনা-ব-সিনা বাতেনি ইলমের পরম রক্ষক, যিনি মুরিদকে ভয়াবহ ফেতনা ও নফসের গোলামি থেকে নিজের কুদরতি নেগাহবানি ও দোয়ার বরকতে সর্বদা রক্ষা করেন। মুর্শিদের পবিত্র চরণে নিজেকে সঁপে দেওয়া এবং তাঁর রূহার্নী গোলামী করার মাধ্যমেই একজন সাচ্চা আশেক ‘জিহাদে আকবরে’ জয়ী হয়ে ‘ইলমে লাদুন্নী’ বা গায়েবি জ্ঞানের পরম অধিকারী হয়। তাই তরিকতের জগতে মুর্শিদের স্থান জন্মদাতা পিতার চেয়েও অনেক উচ্চে, কারণ জন্মদাতা পিতা দেন ক্ষণস্থায়ী দেহের জীবন, আর মুর্শিদ হলেন চিরস্থায়ী আত্মার পরম মুক্তিদাতা।
উপসংহার
পরিশেষে বলা যায়, দয়াল বাবা জালালী মাওলার নির্দেশিত এই ছয়জন পিতার পরিচয় এবং তাঁদের গুরুত্ব একজন ঈমানদারের জীবনে অপরিসীম। এনাদের মধ্যে একজনকেও অস্বীকার বা অবমাননা করার কোনো সুযোগ নেই। আসুন, আমরা এই ছয়জন পিতার শান ও মান অন্তরে ধারণ করি, লোকদেখানো যান্ত্রিক জীবন পরিহার করি এবং ওলী-আউলিয়াদের বাতেনি দর্শনের আলোয় নিজেদের ঈমানকে জ্যান্ত ও শক্তিশালী করি। দয়াল মাওলা আমাদের সবাইকে এই সত্য উপলব্ধি করার তৌফিক দিন। আমিন।










