দয়াল নবী, আপনার দরবারে আমি গোলাম হাজির হইয়াছি।
নূর নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম আল্লাহর জাতি নূরের জ্যোতি- তেনার জামা মোবারকও জ্যোতির্ময়। তেনার প্রতিটি পদচারণা, প্রতিটি বাক্য- এমনকি তেনার শরীর মোবারকের স্পর্শেও ছিল অগণিত রহমত ও বরকতের ছায়া।
এই আলোচনায় আমরা স্মরণ করবো এক শীতার্ত রাতের হৃদয়ছোঁয়া ঘটনা- যখন মা আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর একটি লুঙ্গি মোবারক গায়ে জড়িয়ে নিলেন। তারপর যা ঘটল, তা কেবল একটি অলৌকিক মুহূর্ত নয়- বরং তা ছিল এক জ্বলন্ত প্রমাণ যে, নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম সত্যিই আল্লাহর জাতি নূরের জ্যোতি।
দয়াল বাবা জালালী মাওলা বলেন-
নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম আল্লাহর জাতি নূরের জ্যোতি। তেনার পবিত্র শরীর মোবারকে যে কাপড় লেগেছে, সেটিও জ্যোতির্ময় হয়ে গেছে। এই মহান সত্য তিনি আমাদের সামনে তুলে ধরেছেন এক বিস্ময়কর, হৃদয়ছোঁয়া আধ্যাত্মিক ঘটনায়। চলুন, সেই আলোভরা বর্ণনার পরশ গ্রহণ করি- যেখানে জড়িয়ে আছে নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নূর, বরকত ও ভালোবাসার সুধা।
শীতের তীব্রতা সহ্য করতে না পেরে মা আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর ৭২ তালির লুঙ্গি মোবারক চাদরের মতো গায়ে জড়িয়ে নিলেন।
মা আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা-এর পরনে ছিল ৭২ তালির একটি কাপড় এবং ২৭ তালির একটি সুলি। “সুলি” বলতে বোঝায়- এমন একটি শালীন পোশাক যা গলা থেকে নাভির নিচ পর্যন্ত এবং দুই হাতের কব্জি পর্যন্ত আবৃত রাখে। বর্তমানে মহিলারা স্বল্প দৈর্ঘ্যের (১২ বা ১৪ গিরা) কাপড় দিয়ে ব্লাউজ তৈরি করেন, যা শালীনতা ও আবরণ সংক্রান্ত আদর্শের সঙ্গে খাপ খায় না।
মা আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা ঠান্ডায় থরথর করে কাঁপছেন। আজকাল আমাদের ঘরে কাপড় রাখার জন্য রয়েছে আলনা, কিন্তু তখন ব্যবহার হতো কাঙ্গুনি। “কাঙ্গুনি” বলতে বোঝায়- ঘরের মধ্যে বাঁশ বা কাঠের দুই মাথার মাঝে রশি বেঁধে তৈরি কাপড় রাখার স্থান।
ঠান্ডায় কাঁপতে কাঁপতে মা আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা কাঙ্গুনির দিকে তাকিয়ে দেখলেন-
সেখানে আছে নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর ৭২ তালির একটি পবিত্র লুঙ্গি মোবারক।
শীতের জ্বালা সহ্য করতে না পেরে মা আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর লুঙ্গি মোবারক টেনে নিজের গায়ে জড়িয়ে নিলেন। গায়ে দেওয়ার পরেই মা আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা এর স্মরণ হলো-
নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম তো নিমা (গেঞ্জি) পরে ঘর থেকে বের হয়েছেন! আমার গায়ে ১০ হাতের কাপড়, একটা সুলি- তবুও শীতের জ্বালা নিবারণ করতে না পেরে নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর লুঙ্গি মোবারক চাদররূপে শরীরে আবৃত করলাম। তবুও শীত নিবারণ করতে পারি না। আল্লাহর হাবীব সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম কী হালে আছেন?”
নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর লুঙ্গি মোবারকের আলোয় আলোকিত মা আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা।
মা আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা-এর হুজরা হতে মসজিদে নববীর দূরত্ব ২৭ হাত। মা আয়েশা খেজুরপাতার বেড়া দুই হাত দিয়ে ফাঁক করে নজর করে দেখলেন-
নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম মসজিদে নববীতে হেলান দিয়ে পূর্বদিকে ফিরে দাঁড়িয়ে আছেন। আর তেনার নূরানী বদনে মুসলধারে বৃষ্টি পড়ছে।
মা আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা চিৎকার দিলেন (দলিলে আরবাআ আদিল্লাতে উল্লেখ আছে)-
“মা আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা যত জোরেই চিৎকার দিন না কেন, আওয়াজ আড়াই হাতের বেশি যেত না। আর আমাদের নারীদের চিৎকার কতদূর যায়, তা নিজেরাই ভালো বুঝি।”
ভোরে দয়াল নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম মা আয়েশার হুজরার দরজায় দাঁড়িয়ে দরজায় ধাক্কা দিচ্ছেন-
আরবিতে বলে: “কারা আল বাবা?” (দরজায় কড়া নাড়ল” বা “দরজায় টোকা দিল)
ভিতর থেকে আওয়াজ এল: “মান আনতা?” (তুমি কে?)
নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন-
“আমি সাত আসমানের নবী, সাত জমিনের নবী, অগণিত নবী-ফেরেশতার নবী,
আমি স্বয়ং আল্লাহর নবী- আয়েশা গো, আমি তোমার স্বামী মুহাম্মদ ইবনে আব্দুল্লাহ।”
মা আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা দ্রুত দরজা খুলে নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে জড়িয়ে ধরে দেখছেন- নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর শরীর মোবারক ভেজা কি না।
নূর নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম জানেন মা আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা কেন এমন করছেন, তার পরও তিনি জগতবাসীকে জানানোর জন্য জিজ্ঞেস করলেন- “আয়েশা, আপনি এমন করছেন কেন?”
মা আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা বললেন-
“নবী গো! আপনার নূরানী কদম মোবারকে আমার জীবন কুরবান।
নবী গো! আপনি আমার হুজরা হতে মাত্র ২৭ হাত দূরে ছিলেন,
আর আমি আমার দুই চোখে দেখেছি-
আপনার নূরানী বদনে মুসলধারে বৃষ্টি পড়েছে।
এখন তো ভোর, সূর্য নেই, বাতাস নেই-
আপনি আপনার ঘর মোবারকে এলেন-
আপনার চুল মোবারক শুকনো, গেঞ্জি মোবারক শুকনো, লুঙ্গি মোবারক শুকনো-
আপনার শরীরে একটি বিন্দুও পানি নেই!”
নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন-
“আয়্যুকুম মিসলি?”- কে আছ আমার মতো?
আয়েশা, ঐ সময় তোমার শরীরে কী ছিল?”
মা আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা মনে মনে বললেন-
“ইয়া আল্লাহ! নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমার কাছ হতে ২৭ হাত দূরে থেকেও আমার শরীরে কী ছিল, জানলেন কীভাবে?”
মা আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা বললেন-
“নবী গো! আপনার নূরানী কদম মোবারকে আমার জীবন কুরবান।
আমি শীতের জ্বালা নিবারণ করতে না পেরে
আপনার লুঙ্গি মোবারক চাদরের মতো করে গায়ে জড়িয়েছিলাম।”
নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন-
“আয়েশা, লুম আতুম মিন নূরিহি- আমি তো আল্লাহ পাকের জাতি নূরের জ্যোতি।
ও আয়েশা! যে কাপড়টা আমার শরীরে লেগেছে, সেটাও জ্যোতির্ময় হয়ে গেছে।
আয়েশা! তুমি যখন আমার লুঙ্গিটা চাদরের রূপে গায়ে দিয়েছ,
তুমিও আল্লাহ পাকের জাতি নূরের জ্যোতি হয়ে গেছ।
আমি আল্লাহ পাকের জাতি নূরের জ্যোতি,
আল্লাহর জাতি নূর আমার শরীরে বৃষ্টির মতো পড়তেছে,
সেটা তোমার চোখে দেখা গেছে।”
পরিশেষে
এই হৃদয়স্পর্শী ঘটনা আমাদের শেখায় নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লামের নূরানী বরকত ও মহত্ত্বকে।
তেনার ছোঁয়ায় যে কিছু স্পর্শ পায়, তা জ্যোতির্ময় ও বরকতময় হয়ে ওঠে। এই বর্ণনা আমাদের হৃদয়ে নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লামের প্রতি অগাধ প্রেম ও বিশ্বাসের আলোকবর্তিকা জ্বালিয়ে তোলে, যা আমাদের জীবনে রহমত ও বরকতের প্রবাহ ঘটায়।








